আধ্যাত্মিক জগতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদাঃ

আধ্যাত্মিক জগতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদাঃ
ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

আধ্যাত্মিক জগতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদাঃ

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব স্বীয় খেরকা নিজ পুত্রের হাতে অর্পণ পূর্বক অছিয়ত করিয়া যান, পাঁচশত বৎসর পরে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যে এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হইবে তাঁহার হস্তে যেন ইহা পৌঁছাইয়া দেওয়া হয়।

হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেবের দেওয়া সেই খেরকা মোবারক বিভিন্ন সাধকের হাত হইয়া যেদিন ইহা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী(রাঃ) হস্তে আসে, সেদিন আধ্যাত্মিক জগতে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে লইয়া নেতৃস্থানীয় সমস্ত ওলী আল্লাহর মধ্যে শোরগোল বা বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়-যাহার সমাধান করেন, সরোয়ারে কায়েনাত, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ)। সেদিনের সেই ঘটনা “জাওয়াহেরে মুজাদ্দেদীয়া” নামক পুস্তকে নিম্মোক্তভাবে বর্ণীত আছে”।

একদা অভ্যাস অনুযায়ী হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফজর নামাজের পরে মুরীদানসহ মোরাকাবায় রত। এমন সময় হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) এর দৌহিত্র হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) সেখানে উপস্থিত হন এবং একটি খেরকা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের স্কন্ধে রাখিয়া দেন। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের মোরাকাবা ভংগ হয়। চক্ষু খুলিয়া তিনি হযরত শাহ সেকান্দারকে দেখিয়া তাঁহাকে আলিংগন করেন এবং সম্মানের সাথে তাঁহাকে বসিতে অনুরোধ করেন।

হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) ছাহেব তখন বলেন, আমি আপনার পবিত্র স্কন্ধে যে খেরকাটি রাখিয়াছি, তাহা গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের স্মৃতির পবিত্র নিদর্শন। এইটি আমাদের খান্দানে দীর্ঘদিন যাবৎ বংশানুক্রমিকভাবে চলিয়া আসিতেছে। আমার বুজুর্গ পিতামহ হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব মৃত্যুর সময়ে এই পবিত্র জুব্বাটি আমাকে সোপর্দ করিয়া নির্দেশ করেন “এইটি আমানত স্বরূপ নিজের নিকট রাখিয়া দাও। আমি যাহাকে দিতে বলি, তাহাকে দিয়ে দিও।”

কিছুদিন হইতে আমার বুজুর্গ পিতামহ এই জুব্বাটি আপনাকে দেওয়ার জন্য তাগিদ করিতেছেন। কিন্তু এইরূপ অমূল্য সম্পদ হাত ছাড়া হউক-ইহা কি কেহ চায়? তাই ইহা আমার নিকট রাখিয়া দিয়াছিলাম। অতঃপর যখন আমার বুজুর্গ পিতামহ (রঃ) ছাহেব বারংবার আমাকে এইজন্যে তাগিদ দেন; শেষ পর্যন্ত আমাকে ধমক দিয়া বলেন, তুমি যদি ইহা তাহার হস্তে না পৌঁছাও, তাহা হইলে তোমার কামালিয়াত ও নেছবত এবং বাতেনী সম্পদ ছিনাইয়া লওয়া হইবে; ফলে অনন্যোপায় হইয়া এই দুর্লভ আমানতটি আপনার খেদমতে পেশ করিয়াছি।

অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সেই পবিত্র খেরকাটি পরিধান পূর্বক যখন আপন হোজরায় গমন করিলেন তখন তাহার মনে এইরূপ ভাবের উদয় হইলঃ যদি এই মাশায়েখ কেরাম আমাকে প্রথম হইতেই খলিফা নির্বাচিত করিতেন, অতঃপর খেরকা প্রদান করিতেন, তাহা হইলে ভাল হইত।

এমন সময় হঠাৎ তিনি অবলোকন করেন, হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব-হযরত আলী (রাঃ) ছাহেব ও কাদেরীয়া তরিকার অন্যান্য মাশায়েখগণসহ এমনকি হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেবসহ তশরিফ আনিয়াছেন। হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে স্বীয় নেছবত ও বাতেনী কামালাত দ্বারা ভরপুর করিয়া দেন।

অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মনে এই ধারণার সৃষ্টি হয় যে, আমার প্রতিপালন বা তরবিয়ততো নকশবন্দীয়া তরিকার মাশায়েখবর্গ করিয়াছেন। কাজেই, আমি নকশবন্দীয়া তরিকার বুজুর্গদের দলভুক্ত। এইরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে তিনি অবলোকন করেন যে, তাঁহার হোজরায় হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের সাথে হযরত খালেক গুজদোওয়ানী (রঃ) ছাহেবসহ নকশবন্দীয়া খান্দানের সমস্ত মাশায়েখবর্গ এমনকি হযরত বাকী বিল্লাহ (রাঃ) ছাহেব পর্যন্ত তশরীফ আনিয়াছেন।

কাদেরিয়া তরিকার মাশায়েখবর্গ পূর্বেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব গউসপাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের নিকটে উপবেশন করিয়াছেন। তখন তাঁহাদের মধ্যে পর¯পর আলোচনা চলিতে লাগিল।

অতঃপর নকশবন্দীয়া তরিকার মাশায়েখগণের ছর্দার হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব গউস পাক (রঃ) ছাহেবকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, শেখ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) আমাদের প্রতিপালনের দ্বারা কামালিয়াত হাছিল করিয়াছেন, আপনি অনর্থক তাহাকে আপনার দলভুক্ত করিবার চেষ্টা করিতেছেন।

এই কথার জবাবে হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব বলেন, “শায়খ আহমদ (রাঃ) প্রথমেই আমাদের তরিকা হইতে ফয়েজ প্রাপ্ত হইয়াছেন। কাজেই সে আমাদের দলভুক্ত।”
এই আলোচনার সময় চিশতিয়া, কুবরাবিয়া, সোহওয়ার্দ্দীয়া তরিকার মাশায়েখগণ তশরিফ আনেন এবং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে আপন আপন তরিকাভুক্ত বলিয়া দাবী জানান।

কেননা হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব প্রথম দিকে স্বীয় পিতার নিকট হইতে উক্ত তরিকাসমূহেরও নেছবত হাছিল করিয়াছিলেন। মাওলানা হাশেম কাশ্মেরী (রঃ) ছাহেব ও মোল্লা বদরুদ্দিন তাহাদের ইতিহাসে এইরূপ লিখিয়াছেন যে, ঐ সময় উম্মতে মুহাম্মদীর সমস্ত আউলিয়াগণ সেরহিন্দ শরীফে সমবেত হন। এই পবিত্র সময় ছিল ১০১১ হিজরীর ১১ই শাবানের সকাল হইতে জোহরের নামাজের শেষ সময় পর্যন্ত।

অতঃপর হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ওলী আল্লাহগণের সেই বিশাল জলসায় তশরিফ আনেন। তাঁহার খেদমতে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তৎপর রাসূলে পাক (সাঃ)-ই বিরোধের সুষ্ঠু মিমাংসা করেন। তিনি সমস্ত তরিকার মাশায়েখবর্গকে সান্তনা দিয়া বলেন, যেহেতু শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) এর পরিপূর্ণতা বা কামালিয়াত নকশবন্দীয়া তরিকার উপরে সম্পন্ন হইয়াছে;

কাজেই এই তরিকাকেই রেওয়াজ বা প্রচলন দান করা হউক এবং বাকী অন্যান্য সমুদয় তরিকার নেছবতও তাঁহাকে প্রদান করা হউক; যাহার ফলে শেখ আহমদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দেদীয়া তরিকা সমস্ত তরিকার সারাংশ হিসেবে পরিগণিত হইবে এবং তোমরাও সকলে সমভাবে ছওয়াবের অধিকারী হইবে।

হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আরও বলেন, যেহেতু নকশবন্দীয়া তরিকার যোগসত্র, সমস্ত নবীদের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের সাথে এবং এই তরিকার মধ্যে অন্য তরিকার চেয়ে সুন্নতের অনুসরণ ও বেদয়াত বর্জনের প্রতি বেশী লক্ষ্য রাখা হইয়াছে; তাই এই তরিকা দ্বীনের পুনুরুজ্জীবনে অধিক সহায়ক।

অতঃপর রাসূলে পাক (সাঃ) এর নির্দেশক্রমে সমস্ত তরিকার মাশায়েখগণ স্ব-স্ব কামালাত ও নেছবত হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে অর্পণ করেন। ফলে তাঁহার এই তরিকা (মুজাদ্দেদীয়া) সমস্ত তরিকার সমন¦য়ে সমৃদ্ধি লাভ করে। অতঃপর আকায়ে-নামদার রাসূলে পাক (সাঃ) নিজের তরফ থেকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে খাছ নেছবত ও কামালত প্রদান করেন।

উপরের এই ঘটনা থেকেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদা স¤পর্কে সহজেই ধারণা জন্মে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে এবং নকশবন্দীয়া তরিকাকে পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করিয়া এমনই এক শ্রেষ্ঠ তরিকা প্রবর্তন করেন, যাহা সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ তরিকা তরিকায়ে নক্‌শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া।

”হে জাকেরান ও আশেকান সকল! উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝিতে পারিলে যে, আসমানের নীচে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মত সাধক সাহাবাদের পরে আর আসেন নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে তাহারই পরিপূর্ণ কামালিয়াত ও নেছবতের অধিকারী হন আমার পীর কেবলাজান। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পর সমস্ত মাশায়েখগণের মধ্যে তাঁহার স্থান শীর্ষে।

তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তাহা হইলে আমার পীর কেবলাজানের এই তরিকামত চল। এই তরিকা মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের তরিকা-যাহা চিশতিয়া, কাদেরিয়া, কুবরাবিয়া, নকশবন্দীয়া তথা পূর্বের সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাছ নেছবত ও কামালিয়াতের মিশ্রণে প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠতম তরিকা।

এই তরিকার নীতিসমূহের মধ্যে বিশেষ দুই মুলনীতি হইল আদব ও মহব্বত। পীরের প্রতি যেমন আদব প্রদর্শন করিতে হয়, তেমনি সবকিছুর চেয়ে পীরকে বেশী মহব্বত করিতে হয়। পীর হওয়া সত্ত্বেও হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব ফয়েজ হাছিলের জন্য হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে কতই না আদব প্রদর্শন করিতেন!

কাজেই, তোমরা যদি খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছাইতে চাও, তবে আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের সাথে কামেল পীরের খেদমত করিতে থাক। আল্লাহপাক তোমাদিগকে কামিয়াবী বখশিস করুন। আমীন!

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফী হযরত ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত-৮ এর “মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ও খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ)” কিতাব পৃষ্ঠা: ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ও ২৯ হতে তুলে ধরা হয়েছে।

→ নসিহত: মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ও খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) এর সব গুলো অধ্যায়

আরো পড়ুন:

→ পীরের প্রতি মুরিদের আদব সর্ম্পকে মোজাদ্দেদ আলফেছানী রা: এর উপদেশ

→ সংক্ষিপ্ত ওজিফা সবগুলো পর্ব

→ আদাবুল মুরিদের সবগুলা নসিহত একসাথে

→ বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পরিচালনা-পদ্ধতির সব গুলো অধ্যায়

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!