হোম আহলে বায়াত (পাকপাঞ্জাতন) ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)-কি এবং কেন?

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)-কি এবং কেন?

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)-কি এবং কেন?

ঈদ শব্দের বাংলা অর্থ আনন্দ, খুশি ইত্যাদি। মিলাদ শব্দের বাংলা অর্থ জন্ম সময়, আগমন সময়। সুতরাং মিলাদুন্নবী অর্থ নবী করিম (সাঃ) এর জন্ম সময় বা আগমনের সময়। সহজ ভাষায় বলা চলে মিলাদুন্নবী অর্থ নবী (সাঃ) এর জন্ম বা আগমন। পরিভাষায় বলা যায়, নবী পাক (সাঃ) এর জন্ম দিন তথা প্রিয় নবীজির আগমন উপলক্ষে আল্লাহ্র শুকরিয়ার্থে শরিয়ত সম্মতভাবে খুশি বা আনন্দ উদযাপনের অনুষ্ঠান করাই হলো ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)। প্রিয় নবীজির (সাঃ) এর মিলাদ উপলক্ষ্যে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা মু‘মীনের অবশ্যই উচিৎ।

আল্লাহপাক কুরআনে বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللّهُ عَلَى الْمُؤمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبْلُ لَفِي ضَلالٍ مُّبِينٍ

“আল্লাহ মু‘মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিক্মত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল।” (সূরা ৩ আলে ইমরানঃ আয়াত ১৬৪)

কাজেই আমাদের মাঝে আল্লাহতায়ালা নবী করিমকে (সাঃ) পাঠিয়ে আমাদের উপরে দয়া বা রহমত বা অনুগ্রহ করেছেন। নবী-করিম (সাঃ) যে কেবলমাত্র ঈমানদারদের জন্য রহমত –তাই নহে। তিনি সমগ্র জগতসমূহের জন্য রহমত। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সুরা আম্বিয়া ২১:১০৭)

কাজেই বুঝা গেল, নবী করিম (সাঃ) আমাদের জন্য আল্লাহতায়ালার রহমত, দয়া, ফজল, করম বা অনুগ্রহ। আর এ জন্য নবী করিম (সাঃ) কে ‘নাবিউর রহমত’ বা রহমতের নবী বলা হয়। (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ১ম খন্ড)

আল্লাহর রহমত বা দয়া, ফজল বা অনুগ্রহ পেয়ে খুশী বা ঈদ উদযাপন করতে হবে। এ হুকুম আল্লাহ তায়ালা নিজেই দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন,

قُلْ بِفَضْلِ اللّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُواْ هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ

“হে নবী! আপনি বলুন, এটা আল্লাহর ফজল ও রহমতে, কাজেই এতে তারা যেন আনন্দ বা খুশী বা ঈদ উদযাপন করে।” (সূরা ১০ ইউনুসঃ আয়াত-৫৮)

আল্লাহর হুকুম পালন করা ঈমানদারদের জন্য ফরয বা অবশ্য কর্তব্য। তাই-ই আমরা ঈদে মিলাদুন্নবী বা দয়াল নবী (সাঃ) এর জন্মদিনে ঈদ বা খুশী উদযাপন করি। আর এটা দেখে ইয়াজীদের অনুসারী বাতিল পন্থীদের গা জ্বালা করে।

মুসলমানদের জন্য ৫প্রকারের ঈদ:

প্রসংগত উল্লেখ্য যে, মুসলমানদের জন্য ঈদ হলো ৫টি। যথাঃ

  • ১। ঈদুল ফিতরের দিন,
  • ২। ঈদুল আযহার দিন,
  • ৩। জুময়ার দিন,
  • ৪। আরাফাতের দিন,
  • ৫। ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) এর দিন।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। বাকী থাকে জুমআর দিন, আরাফাতের দিন ও ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) দিন। ঈদে মিলাদুন্নবীও যে ঈদ তার প্রমাণ শুরুতেই দেওয়া হলো। বাকী দুটোর দালিলিক প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে।

জুময়ার দিনও ঈদের দিন:

মুসলমানের একটি ঈদের দিন হল ‘ইয়াউমুল জুমুয়া’ তথা জুময়ার দিন। আর্থাৎ জুময়ার দিন মুসলমানের জন্য ঈদের দিন। যেমনঃ

(এক)
“হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলে পাক (সাঃ) এক জুময়ার দিন বললেনঃ এই দিনকে আল্লাহ্ তায়ালা মুসলমানদের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।”

তথ্যসূত্রঃ

  • ইবনে মাজাহ শরীফ, হাদিস নং-১০৯৮;
  • মুয়াত্তা ইমাম মালেক; হাদিস নং ৭৩৫৫;
  • মেরকাত শরহে মেসকাত, হাদিস নং- ১৩৯৯;

(দুই)
“হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলে করিম (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ নিশ্চয় জুময়ার দিন ঈদের দিন।”

তথ্যসূত্রঃ

  • মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-৮০২৫ ও ১০৮৯০;
  • মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস নং-১৫৯৫;
  • কানজুল উম্মাল, হাদিস নং২৩৯৩৩।

আরাফার দিনও ঈদের দিন:

‘‘আম্মার ইবনে আবী আম্মার (রঃ) বলেন, হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তেলাওয়াত করলেন, আল ইয়াওমাল আকলামতু লাকুম দিনুকুম…। তখন তাঁর নিকট এক ঈহুদী ছিল। সে বললঃ যদি এই আয়াত আমাদের উপর নাজিল হতো তাহলে আমরা ঐ আয়াত নাজিলের দিনকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করতাম। ইহা শুনে হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেনঃ এই আয়াত যেদিন নাজিল হয়েছিল সেদিন মুসলমানের দুই ঈদের দিন ছিল, তাহলোঃ জুময়ার দিন ও আরাফার দিন।”

তথ্যসূত্রঃ

  • ছহীহ্‌ বুখারী, হাদিস নং ৪৬০৬;
  • তিরমিজি শরীফ, হাদিস নং ৩০৪৪;

কাজেই বুঝা গেল-

  1. ঈদুল ফিতর ঈদের দিন,
  2. ঈদুল আযহা ঈদের দিন,
  3. জুময়ার দিন ঈদের দিন,
  4. আরাফাতের দিন ঈদের দিন,
  5. ঈদে মিলাদুন্নবীর(সাঃ) দিন ঈদের দিন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)-এ করণীয়:

উপসংহারে বলতে হয়- ঈদ উদযাপন করতে হবে শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে। যেমন, ঈদে মিলাদুন্নবীতে (সাঃ) যেগুলো করা যায়-

  • ১। কোরআন তেলোওয়াত করা।
  • ২। নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি বেশী বেশী দরুদ ও ছালাম পাঠানো।
  • ৩। নবী করিম(সাঃ) এর জন্মকালিন ঘটনা সমূহ থেকে শুরু করে তাঁর শৈশব, কৈশোর, কর্মজীবন, প্রচার জীবন, ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা।
  • ৪। এমন সব আলোচনা যে আলোচনায় নবীজীর মহব্বত বৃদ্ধি পায়। কারণ নবীজীর মহব্বতই হলো প্রকৃত ঈমান।
  • ৫। নবী করিম (সাঃ) এর শানে নাত ও গজল পেশ করা। এবং
  • ৬। মিলাদ শরীফ উদযাপন করা ।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)-এ যা যা নিষেধঃ

  • ১। বাজি ফুটানো যাবে না,
  • ২। নৃত্য করা যাবে না,
  • ৩। সর্বোপরি শরীয়তের খেলাপ হয় এমন কোন কাজ করা যাবে না।

বিশ্ব জাকের মঞ্জিল পাক দরবার শরীফে মহাধুমধামে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যে ঈদে-মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপিত হয়। বিশ্বওলী খাজাবাবা হযরত ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেব তাঁর লিখিত নির্দেশ ‘‘বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পরিচালনা পদ্ধতি”-তে যতগুলো ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের আদেশ করেছেন- ঈদে মিলাদুন্নবী(সাঃ) তার মধ্যে অন্যতম।

– আকতার হোসেন কাবুল
– ২০/১০/২১ ইং

পূর্ববর্তী পোস্টআহলে বাইয়াতের নামের শেষে আলাইহিস সালাম ব্যবহার করা যাবে কিনা।
পরবর্তী পোস্টঋষি আরুণী ও তাঁর পুত্র শ্বেতকেতুর মধ্যে কথোপকথন:
আমি বিজাত নই, তোমারই জাত! আজ গুন হারিয়ে গুরুত্বহীন-তুমি স্বাধীন আমি পরাধীন-অবশ্যই একসাথে ছিলাম একদিন।

এই পোস্টে একটি মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন