দেহের মধ‍্যে পাক পাঞ্জাতনের অবস্থান (সাধন তত্ত্ব)।

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

দেহের মধ‍্যে পাক পাঞ্জাতনের অবস্থান (সাধন তত্ত্ব)

দেহের মধ‍্যে পাক পাঞ্জাতনের অবস্থান (সাধন তত্ত্ব)/ পঞ্চতত্বে পাক পাঞ্জাতন লালনদর্শন মূলত আত্মদর্শন।

তত্ত্ব-মূল: যেমন- কলসীর তত্ত্ব হলাে মাটি, অলঙ্কারের তত্ত্ব হলাে সোনা, আলাের তত্ত্ব হলাে সূর্য বা আগুন মানবদেহ পঞ্চতত্ত্ব বা পাঁচটি মূল উপাদানে গঠিত। দেহে এ পাঁচ উপাদানের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট স্থান যেমন আছে, সেগুলাের সূক্ষ্ম এবং স্থুল কার্যক্রমও আছে। আত্মদর্শনের সাধক এ উপাদানগুলাে অন্তদৃষ্টি প্রয়ােগ করে স্পষ্ট দেখে থাকেন এবং স্থূলতত্ত্ব পেরিয়ে ক্রমে সূক্ষ্মতত্ত্বে উন্নীত হন। এ পাঁচতত্ত্বের পাঁচজন গুরু আছেন যাদের বলা হয় নবিজীর আদর্শিক গৃহ আহলে বাইত তথা পাক পাঞ্জাতন।

মহানবি মােহাম্মদ (সঃ), মাওলা আলী (আঃ), জগত জননী মা ফাতেমা (আঃ,) ইমাম হাসান (আঃ) ও ইমাম হােসাইন (আঃ) এ পাঁচজন মহামানবই সৃষ্টির আদি বা মূল, মধ্য ও শেষ। তারাই আল্লাহর বিভূতি। তাদের সংযােগেই চৈতন্য আর বিয়ােগে অপমৃত্যু। এ পঞ্চতত্ত্ব থেকেই সৃষ্টি তথা দেহ পরিচালিত ও সম্পাদিত হয়। আবার তত্ত্ব থেকেই তত্ত্বে লয়প্রাপ্ত হয়। যে তত্ত্ব এপঞ্চতত্ত্বের পর তিনিই তত্ত্বের অতীত নিরঞ্জন বা নিরাকার আল্লাহ। তার মূর্ত চেহারায় আকার-সাকার হলেন পাঁচ পাঞ্জাতন।

পঞ্চতত্ত্বের প্রকাশ পঞ্চভূত হলাে যথাক্রমে:

  • ১/ আকাশ
  • ২./ বাতাস
  • ৩./ আলাে
  • ৪./ পানি
  • ৫./ মাটি।

এদের একীভূত সমষ্টিই চেতনা চেতনাই গুরু তথা আল্লাহ সত্তা। পঞ্চভূত-বিভূতি থেকেই এ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিদৃশ্যমান দেহ অর্থাৎ জগত সৃষ্টি হয়েছে। পঞ্চভূতের মধ্যে আকাশ একটি মাত্র গুণ। এটি কারাে আশ্রয়ভুক্ত নয়। আকাশ (সূক্ষ্ম আকাশ ব্যোম) না থাকলে মাটি, জল, আলাে, হাওয়া কিছুই আর জায়গা পেতাে না। তাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যেতাে। বাকি চার ভূতের লীলার জন্যেই ব্যোমের তথা আকাশের প্রয়ােজন হয়েছে। এক আকাশের অভাবে সমস্ত সৃষ্টিজগত অচল বলেই আকাশের শ্রেষ্ঠত্ব। সর্বোপরি আকাশে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় প্রত্যেক পলে-অনুপলে ঘটে চলছে। সৃষ্টি ও স্থিতিতে অর্থাৎ জন্ম ও রক্ষা কাজে পঞ্চভূতের সংযােগ এবং প্রলয়ে তার বিয়ােগ। এ ধারা আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে।

পঞ্চভূতে কার কেমন অবস্থান ও গুণ তা মােটা দাগে একবার খোজা যাক:

১/ ছাফা নূরের মালিক-নূরীতন নূর নবী (সাঃ)
আকাশ: শব্দগুণ, স্থিতি। – কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, লজ্জা, সকল গুণ।

২/ মওলা আলী (আঃ)
আগুন: রূপগুণ, চোখে স্থিতি। – ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, ভ্রান্তি, আলস্য ইত্যাদি।

৩/ মাটির মালিক-মা ফাতেমা (আঃ)
গন্ধগুণ, নাকে স্থিতি। – অস্থি, মাংস, নােখ, লোম, চর্ম।

৪./ পানির মালিক-ইমাম হাসান (আঃ)
রসগুণ, জিহ্বায় স্থিতি। – বীর্য (শুক্র ও শশাণিত), মল, মূত্র, মজ্জা

৫./ বাতাসের মালিক ইমাম হোসেইন (আঃ)
স্পর্শগুণ, চামড়ায় স্থিতি। – ধারণ, চালন, সংকোচন, প্রসারণ গুণ ।

সুফিদের সাধনা জগতে এ পাঁচগুণ বা পঞ্চশক্তি বশীভূত হয় পাঁচটি বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে। দেহ বা মাটি বশীভূত হয় সম্যক গুরুর কৃপাবলে। অপ বা পানি বশীভূত হয় গুরুর নাম সংকীর্তনে তেজ বা আগুন বশীভূত হয় গুরুর সদৃভাবনায়। বাতাস বা বায়ু বশীভূত হয় ধ্যানযােগে। আকাশ বা ব্যোম বশীভূত হয় সাধন নাসিকায় বায়ুক্রিয়ায় অর্থাৎ প্রাণায়ামে। এ হলাে সুফিগণের পঞ্চভূতের শাসন বা সাধন প্রণালি। এ পঞ্চতত্ত্বের রাজসিক অহঙ্কার থেকে মানবদেহে একাদশ ইন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয়।

গুরুর কাছ থেকে শিক্ষাদীক্ষার আদর্শিক ও ব্যবহারিক অনুশীলন দ্বারা দেহরহস্য সাধনা দ্বারা মহাশক্তি অন্বেষণ করতে হয়। পাক পাঞ্জাতনের প্রতি ভক্তিপ্রেম বিশ্বাস তার পূর্বশর্ত। চুরাশি লক্ষ যােনিদ্বার পার হয়ে মানবদেহ লাভ করি আমরা। সৃষ্টি জগতে আল্লাহ বিকাশের শ্রেষ্ঠতম ক্ষেত্র এ মানবদেহে চব্বিশ চন্দ্রভেদ বা চতুর্বিংশ তত্ত্ব গুপ্ত – সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সাধারণ মানুষ এ ভেদ জানে না।

গুরু যদি দয়া করে জানান,
তবেই সে ভেদ জানা যায়।
চব্বিশ তত্ত্বের মধ্যে দেহ,
পঞ্চভূত ছাড়াও আছে,
আছে দশ ইন্দ্রিয়,
এ বড়াে আজব কারিগরী।
পদ্মফুল তথা কমল দিব্যজ্ঞানের প্রতীক।

এর বিকশিত দলগুলাে জীবাত্মার আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতিফলন। পদ্ম হতে উদ্ভিজ পঙ্কজের অনাবিল সৌন্দর্যের বৃদ্ধিতে আধ্যাত্মিক বিকাশের নিশ্চয়তা রয়েছে সাধন মহাবিশ্বে।

কেমন দেহভাণ্ড চমৎকার।
ভেবে অন্ত পাবা না যার॥
আগুন, জল, আকাশ, বাতাস
আর মাটিতে গঠন তার
এ পঞ্চতত্ত্ব করে একত্র কীর্তি কীর্তিকমার॥
মেরুদণ্ড শতখন্ড ব্রহ্মাণ্ড হয় তাহার পর
সাত সমুদ্র চৌদ্দ ভুবনে নয় নদী বয় নিরন্তর
ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না দেখাে রঙ হয় তিন প্রকার
উপরে ব্রহ্মনাড়িতে ব্রহ্মরন্ধ্র রয় মূলাধার॥

সপ্তদল পাতালের নিচে চতুর্দল
আর কুল কুণ্ডলিনী সদাই স্থির
তার উর্ধ্বে বিজনেতে দাদশ দল
কমলের পর মণিপুরের ঘর।

তাহার ঊর্ধ্বে দ্বাদশ দলে
উনপঞ্চাশ পবনের ঘর
পান, অপান, সমান, উদান,
ব্যাস হতে গতিকার॥

ষড়দলে দু লক্ষ যােজনের
পার ষােলােকলা গণ্য শরীরে
বিশুদ্ধাক্ষ নাম তার ঊর্ধ্বে
মহাজ্ঞান দ্বিদল কমলের পর॥

চন্দ্রবিন্দু অঙ্গ ইন্দুরে জীবের
বিন্দু ঝরে সিন্ধু হয় পাথার
লালন কয় জোড়াপদ্ম নীলপদ্ম
ভেদ করাে মন অতি দীপ্তকার॥

সুপ্রিয় আত্মজন পাক পাঞ্জাতন নিজের দেহতে ধারণ করতে হয়, আর আমরা তা না করে শুধু তর্ক দলিল বই পুস্তকে পাক পাঞ্জাতন খুঁজি কে কতটুক জানলো তা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি। যদি তা না করে পাক পাঞ্জাতন আঃ কে দেহতে ধারণ করতে পারতাম তাহলে আজ আমরা মুসলমান এই অবস্থায় পরিনত হতাম না। কারণ পাক পাঞ্জাতন এমন এক শক্তি আর সাধনা দিয়ে যে এই সত্য কে ধারণ করবে সে নিজেই একটা বুলেট বোমা।

-সুত্র গ্রন্থ: লালন দর্শন।
-ফকির লালন সাঁইজী।

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!