হোম পেজ আহলে বায়াত (পাকপাঞ্জাতন) প্রিয় রাসুল (সা:) এর চাচা আবু তালিব (রা:) মুমিন

প্রিয় রাসুল (সা:) এর চাচা আবু তালিব (রা:) মুমিন

প্রিয় রাসুল (সা:) এর চাচা আবু তালিব (রা:) মুমিন

হযরত আবু তালিব (রা.) মুমিন। আলাহর হাবিব, রাহমাতুল্লিল আলামিন, যাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহপাক তাঁর। বুববিয়াত বা প্রভুত্ব প্রকাশ করতেন না, সর্বপ্রথম আল্লাহতায়ালার নূর থেকে সৃষ্ট। নূরনবী, মহান রাব্বল আলামিনের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গাম্বর, মানবতার মুক্তির দিশারী আমাদের আকা ও মওলা হযরত মুহাম্মদ মােস্তফা (সা.) এর প্রাণপ্রিয় চাচা, অভিভাবক, লালন-পালন কর্তা ছিলেন হযরত আবু তালিব (রা.)। দুশমনে আহলে বাইতে রাসুল (সা.) নবীকরিম (সা.) এর পবিত্র ওফাতের পর পরই আহলে বাইতে রাসুল (সা.) এর শান-মান ও অধিকারকে ভুলুণ্ঠিত ও খর্ব করার গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্যে লিপ্ত হতে দেখা যায়। তারই ফলশ্রুতিতে ইসলামের মহান খাদেম, প্রিয়নবীজীর (সা.) প্রাণপ্রিয় চাচা হযরত আবু তালিব (রা.)‘মুশরিক বা পৌত্তলিক ছিলেন এবং ওই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।

ফলে মুসলিম উম্মার একাংশ এখনাে ওই মহান ব্যক্তি সম্পর্কে সন্দিহান রয়েছে। এতদ্বিষয়ে বাংলাদেশে দু’একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমার লেখা একখানা প্রবন্ধ ‘মহানবী (সা.) এর মাতা পিতা ইমানদার ছিলেন’ শিরােনামে বাংলাদেশে বহুল প্রচারিত দৈনিক কালেরকণ্ঠ পত্রিকায়, ২১আগষ্ট ২০১০ইং তারিখে প্রকাশিত হয় যাতে আমি হযরত আবু তালিব (রা.) মুমিন ছিলেন বলে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।। ইসলামের ইতিহাসে তিনজন ইমরান বিখ্যাত ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। প্রথমজন হচ্ছেন হযরত মুসা (আ.) এর পিতা। দ্বিতীয়জন হচ্ছেন হযরত মরিয়ম (আ.) এর পিতা এবং তৃতীয়জন হচ্ছেন হযরত আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)। হযরত আবু তালিবের (রা.) আসল নাম ছিল ইমরান (সূত্র-হযরত আলী (রা.) জীবন ও খেলাফত, সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, পৃ.২৪, ই:ফা:বা:)। তার জেষ্ঠ্য পুত্র তালিব এর নাম অনুসারে তাকে তালিবের পিতা তথা আবু তালিব বলে ডাকা হত।

তালিব নবুয়তের পূর্বে ইন্তেকাল প্রাপ্ত হন। একমাত্র তালিব ছাড়া হযরত আবু তালিব (রা.) এর সমস্ত সন্তান ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন এবং অধিকাংশ পুত্র সন্তান ইসলাম ও মুহাম্মদ (সা.) এর জন্য জীবন বিসর্জন (শহীদ) দেন (বিদায়া ওয়াল নিহায়া, ৮ খণ্ড, পৃ. ১০০, ই, ফা, বা.) এবং আবু তালিবের পবিত্র বংশ হতে ইমামত এবং বেলায়তের ধারা কেয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে (বাকারা : ১২৪)। এ মহত্বের কারণে অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ বুক্তগনেদীন ও গবেষকের মতে পবিত্র কোরআনে ‘আলে ইমরান’ সুরায় ইমরান ও তার আল (বংশধর) বলতে হযরত আবু তালিব (রা.) ও কেয়মত পর্যন্ত তার পবিত্র বংশধারায় আগমনকারী ইমামত ও বেলায়তের পবিত্র ইমামগণের কথায় আল্লাহতায়ালা বুঝাতে চেয়েছেন।

যেমন ইরশাদ হচ্ছে

۞ إِنَّ ٱللَّهَ ٱصْطَفَىٰٓ ءَادَمَ وَنُوحًۭا وَءَالَ إِبْرَٰهِيمَ وَءَالَ عِمْرَٰنَ عَلَى ٱلْعَـٰلَمِينَ ٣٣

‘ইন্নাল্লাহা ছত্বাফা আদামা, অ নূহাউ, অ আলা ইব্রাহীমা অ আলা ইমরানা আলাল আলামীন (সুরা ৩ আলে ইমরান:৩৩)।

অর্থ- “আল্লাহ নির্বাচন করেছেন আদম ও নূহকে এবং ইব্রাহিম ও ইমরানের বংশধরদের সকল বিশ্বের ওপর।”

এখানে আলে ইমরান তথা ইমরানের বংশধর বলতে হযরত আবু তালিবের বংশধর বুঝাই অধিকতর সমীচীন বলে মনে হয়। অন্যথায় হযরত মুসার (আ.) পিতা ইমরানের আলে (বংশে) মুছা (আ.) এবং হারুন (আ.) ছাড়া এবং মরিয়মের (আ.) পিতা ইমরানের আলে (বংশে) কোন নবী পরিদৃষ্ট হয়না। সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয় যে, পবিত্র কোরআনে আলে ইমরান তথা ইমরানের বংশ বলতে হযরত আবু তালিব (রা.) এর পবিত্র বংশধর, যারা কারবালার প্রান্তরে মুয়াবিয়ার পুত্র, কুলাঙ্গার, পাপিষ্ট ইয়াজিদের লস্করদের হাতে ইসলাম রক্ষার্থে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে বেলায়তের ইমাম, গাউস কুতুব এবং সর্বশেষ ইমাম মাহদী (আ.) হিসেবে আবির্ভূত হয়ে কেয়ামত পয্যন্ত ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন সে সমস্থ মহাত্মাকে বুঝানাে হয়েছে।

সুরা দোহার ৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মহানবীকে (সা.) উদ্দেশ করে বলছেন

أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًۭا فَـَٔاوَىٰ

“আলাম ইয়াজিদকা ইয়াতীমান ফা-আওয়া”

অর্থ- তিনি কি আপনাকে ইয়াতীম অবস্থায় পাননি অত:পর আপনাকে আশ্রয় দেননি? উক্ত আয়াতের তফসীর করতে গিয়ে কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি বলেন, “আপনার প্রতিপালক আপনাকে আশ্রয় দিয়েছেন আপনার চাচা আবু তালিবের (রা) নিকট এবং আপনাকে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন এবং তিনিই (আবু তালিব) আপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

(সূত্র: তফসীরে মাযহারী, ১৩ খন্ড, পৃ:২৫৭, ইবনে কাছীর, ১১ খন্ড, পৃ. ৫৩২, ইফা:বা:) ।

শে’বে আবু তালিব বা অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামাজিক বয়কট:

কোরাইশ নেতৃবর্গ ইসলাম ধর্মের আশ্চর্যজনক প্রসার ও প্রভাবের কারণে অত্যন্ত ভীত শঙ্কিত হয়ে পড়লো। এ কারণেই তারা কয়েকটি মারাত্মক নীল নক্শা প্রনয়ণের চিন্তা ভাবনা করতে থাকে এবং তারা মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সমর্থক ও অনুসারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামাজিক বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়।
সুতরাং কুরাইশ নেতৃবর্গের উচ্চ পর্যায়ের একটি পরিষদ মনসুর বিন ইকরামার হস্তলিখিত একখানা অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর করে তা কাবার অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে রাখে এবং সাবই অঙ্গীকারবদ্ধ হয় যে, তারা সবাই আমৃত্যু নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কাজ করবে।

  • (১) মুহাম্মদের (সা.) সকল অনুসারী ও সমর্থকের সাথে সব ধরনের বেচা কেনা নিষিদ্ধ করা হবে।
  • (২) তাঁদের (মুসলমানদের) সাথে সকল প্রকার সামাজিক মেলা মেশা জোরালোভাবে নিষিদ্ধ করা হবে।
  • (৩) মুসলমানদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার কারো থাকবে না।

উপরিউক্ত ধারা সম্বলিত অঙ্গীকারনামাটি কেবল মুতঈম বিন আদী ব্যাতীত সকল কোরাইশ নেতা স্বাক্ষর করে কঠোরতার সাথে বাস্তবায়নের শপথ করে। মুহাম্মদ (সা.) এর একমাত্র সমর্থক, লালন পালন কর্তা, আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক তাঁর পিতৃব্য হযরত আবু তালিব (রা.) তাঁর সকল আত্মীয় স্বজনকে মুহাম্মদকে (সা.) নি:শর্তভাবে সমর্থন ও সাহায্য করার আহব্বান জানান। তিনি সবাইকে নিয়ে মক্কার বাইরে একটি পাবর্ত্য উপত্যকায় অবস্থান গ্রহণ করেন যা ‘শে’বে আবু তালিব’ (আবু তালিবের উপত্যকা) নামে প্রসিদ্ধ। তিন বছর তাঁরা শে’বে আবু তালিবে অবরুদ্ধ ছিলেন। খাদ্যের অভাবে তাঁরা মাটি, শুকনো উটের চামড়া পয্যন্ত খেয়েছেন কিন্তু কেউ মুহাম্মদের (সা.) সঙ্গ ত্যাগ করেননি। ওই সময়ে হযরত আবু তালিব হযরত মুহাম্মদের (সা.) শানে একটি কসিদা রচনা করেন যাতে ১০০টিরও বেশী কবিতা আছে, যার নাম কাসিদায়ে লামিয়া (সীরাতুল মুস্তাফা (সা.) ইদরীস কান্দলবী, ১ খণ্ড, পৃ. ২৩৪, ই.ফা.বা.)।

তার একটি পক্তি হচ্ছে-
“তোমরা কি জানো না যে, আমরা মুহাম্মদকে পেয়েছি মুসার মতো নবী হিসেবে, যার কথা আদি ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।”

(বিদায়া ওয়াল নিহায়া, ৩ খণ্ড, পৃ.১৬৭, ই.ফা.বা.; ইবনে হিশাম, সীরাতুন্নবী (স’ ), ২ খণ্ড, পৃ.৪, ই.ফা.বা.)।

মহানবী (সা.) একদিন চাচা আবু তালিবকে (রা.) বললেন, চাচা, তাদের লিখিত চুক্তিপত্রে একমাত্র আল্লাহর নাম ছাড়া বাকি সব লেখা উঁই পোকা খেয়ে পেলেছে। হযরত আবু তালিব তখন কোরইশদের উদ্দেশে বললেন, ‘চুক্তিপত্রটি নিয়ে এস’। তারা চুক্তিপত্রটি নিয়ে আসল যাতে তখনও তাদের দেয়া সীলমোহর বিদ্যমান ছিল।

আবু তালিব (রা.) বললেন ‘এটিই কি তোমাদের সেই চুক্তিপত্র’? তারা বললো, ‘হ্যা’। তিনি বললেন, ‘এতে তোমরা কোন পরিবর্তন করেছ কি?’ তারা বললো ‘না’। তিনি বললেন, ‘তোমরা চুক্তিপত্রে যা লিখা আছে তা মানবে কি?’ তারা বললো ‘আমরা তা মানছি এবং মানবো’। তিনি বললেন, ‘তোমরা যা করছো তা যদি চুক্তিতে লিখা থাকে, তাহলে আমি মুহাম্মদকে (সা.) তোমাদের হাতে সোপোর্দ করবো, তোমরা তাঁকে যা ইচ্ছে তা করবে আর যদি তোমাদের কার্যকলাপগুলো চুক্তিপত্রে লিখা না থাকে তাহলে তোমরা যা করছো তা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

তারা বলাবলি করলো, ‘এবার আবু তালিব সঠিক পথে এসেছে, এবার মুহাম্মদ (সা.) যাবে কোথায়?’ তারা তাতে সম্মত হল। আবু তালিব (রা.) তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘চুক্তিপত্রটি খোল এবং পড় তাতে কী লিখা আছে?’ তারা চুক্তিপত্রটি খুলে পড়ে দেখলো তথায় একমাত্র আল্লাহর নাম ছাড়া বাকী সব শর্তগুলো নেই অর্থাৎ উঁই পোকা খেয়ে পেলেছে। তখন আবু তালিব (রা.) নিম্নোক্ত কসিদাটি পাঠ করলেন, ‘তোমাদের কি খবর নেই যে, ওই চুক্তিনামা ছিন্ন করা হয়েছে যা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়, তা এভাবে নষ্ট ও ধ্বংস হয়ে থাকে’

(খাসাইসুল কুবরা, জালালউদ্দিন সিয়্যুতি;বিদায়া ওয়াল নিহায়া, ৩ খণ্ড, পৃ. ১৮৫, ই.ফা.বা.;)।

তখন কোরাইশরা লজ্জিত হল এবং বয়কট প্রত্যাহারে বাধ্য হল। কিন্তু তাতেও তারা ক্ষান্ত হল না। তারা মহানবীর (সা.) সুমহান ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে খর্ব করার জন্য তাঁকে ‘আবতার’ তথা নির্বংশ বলে গালা-গালি করতে শুরু করলো। আল্লাহপাক তাদের এ অপবাদের জওয়াবে সুরা কাওসার নাযিল করেন, যাতে উল্লেখ আছে যে, মহানবীকে (সা.) অগণিত সন্তান-সন্ততি ও বংশধর দেয়া হবে।

আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযী তাঁর প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন:-

এ গায়েবী তথ্য (অহি, সুরা কাওসার) এতটা সত্য ও দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং আছে যে, এ মুহুর্ত্বেও হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা (আ.) এর বংশধরগণ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং মহানবীর (সা.) দ্বীনকে সমুন্নত রেখেছেন যা কেয়ামত পয্যন্ত অব্যাহত থাকবে (দ্র: মাফাতিহুল গাইব, ৩০ খন্ড, সুরা কাওসারের ব্যাখ্যা)। এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, পবিত্র কোরআনে আলে ইমরান তথা ইমরানের বংশধর বলতে হযরত আবু তালিবের (রা.) পবিত্র বংশধরদের বোঝানো হয়েছে যাঁরা যুগে যুগে ইমাম, গাউস, কুতুব, অলি আল্লাহ ও সর্বশেষে ইমাম মাহদী (আ.) নামে আবির্ভূত হয়ে মানুষকে সত্য পথের দিক নির্দেশনা দিবে?

তথ্যসূত্র: “হযরত আবু তালিব (রা.) মুমিন”, (সৈয়দ গোলাম মোরশেদ)

Donationdonate
পূর্ববর্তী পোস্টঈদে গাদীর বা মাওলা আলীর অভিষেক
পরবর্তী পোস্টজাকের পার্টির আত্মপ্রকাশ
হে মানব! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত যে কঠোর সাধনা করে থাকো, তা তুমি দেখতে পাবে। - (সূরাঃ আল ইনশিকাক-৬)

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন