হোম ইসলামী সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র মিউজিকের বিপক্ষে উত্থাপিত কিছু হাদীসের জবাব।

মিউজিকের বিপক্ষে উত্থাপিত কিছু হাদীসের জবাব।



Web Design

মিউজিকের বিপক্ষে উত্থাপিত কিছু হাদীসের জবাব।

(ব্যস্ততার কারণে মৌলিক লেখা দিতে দেরি হচ্ছে। আপাতত পুরোনো লেখা কপিপেস্ট করে শুক্রবারকে সঙ্গীতময় করে রাখছি)

নিচের আলাপটি হয়েছিল “R Ahmad Niloy Hudhayfah” এর সাথে। দুই বছর আগে। বেশ কয়েক স্থানে উন্নত যুক্তি প্রদান সম্ভব।

আপত্তি:
প্রথমে আবু উমারর হাদীস নিয়ে কথা বলা যাক।

হাদীস ১:

عَنْ أَبِيْ اُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لاَ تَبِيْعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوْهُنَّ وَلاَ تُعَلِّمُوْهُنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ.

আবু ওমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা গায়িকা নর্তকীদের বিক্রয় কর না, তাদের ক্রয় কর না, তাদের গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র শিখিয়ে দিয়ো না, তাদের উপার্জন হারাম’ (ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/২৭৮০)।

উত্তর:

– এই হাদীস দয়ীফ জিদ্দান (অতি দূর্বল), এমন হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণ দেয়া জায়েয নয়।

মিশকাতে এই হাদীস উল্লেখ করে গ্রন্থকার বলেন:

رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَعلي بن يزِيد الرواي يُضَعَّفُ فِي الْحَدِيثِ

“হাদীসটি আহমদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন। তিরমিযি বলেছেন – এটি গরীর (একক সুত্রে বর্ণিত) হাদীস। আর বর্ণনাকারী আলী বিন ইয়াযীদ হাদীসে দূর্বল।”

চল, এবার তিরমিযীর কিতাবে যাই, দেখি তিনি কী বলেন –

قال أبو عيسى حديث أبي أمامة إنما نعرفه مثل هذا من هذا الوجه وقد تكلم بعض أهل العلم في علي بن يزيد وضعفه وهو شامي.

“আবু ঈসা (তিরমিযী) বলেন – আবু উমামার এই হাদীসটি আমরা একে কেবল এই একটি সুত্রে জানি। বেশ কিছু আহলে ইলম আলী বিন ইয়াযীদের ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন এবং তাকে দয়ীফ সাব্যস্ত করেছেন।”

তো আহলে ইলমরা এই আলী বিন ইয়াযীদের ব্যাপারে কী বলেছেন, ইমাম যাহাবীর মীযানুল এ’তেদাল থেকে দেখা যাক –

قَالَ الْبُخَارِيُّ مُنْكَرُ الْحَدِيثِ
وَقَالَ النَّسَائِيُّ لَيْسَ بِثِقَةٍ
وقَالَ أَبُو زُرْعَةَ لَيْسَ بِقَوِيٍّ
وقَالَ الدَّارَقُطْنِيُّ مَتْرُوكٌ

বুখারী বলেছেন – তার হাদীস মুনকার।
নাসায়ী বলেছেন – নির্ভর অযোগ্য।
আবু যুর’আহ বলেছেন – শক্তিশালী নয়।
দারাকুতনী বলেছেন – পরিত্যাজ্য।

তোমার মনে প্রশ্ন হতে পারে – এমন হাদীসকে কোন যুক্তিতে তোমার বইয়ে সহীহ হাদীস বলা হয়েছে? – আসলে এটা আলবানীর তাকলীদ করে করা। আলবানী সিলসিলায়ে সহীহাতে এই হাদীসটা উল্লেখ করে একে দূর্বল বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি একে অন্য এক হাদীসের সাহায্য নিয়ে দয়ীফ থেকে হাসান লি-গায়রিহি প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এটা আলবানীর তাহকীক করার মানহাজে বড় ধরণের ত্রুটি। কারণ মাতরুক, মুনকার, গায়রে সিকাহ রাবীর হাদীসকে হাসান লি-গায়রিহি বানানো যায় না।

দেখো, ইবনে হাজার কী লিখেছেন –

ثم الطعن: إمَّا أنْ يَكُونَ:
1- لِكَذِبِ الرَّاوِي. 2- أَوْ تُهْمَتِهِ بِذلِكَ. 3- أوْ فُحْشِ غَلَطِهِ.
4- أَوْ غَفْلَتِهِ. 5- أَوْ فِسْقِهِ. 6- أَوْ وَهْمِهِ.
7- أَوْ مُخَالَفَتِه. 8- أَوْ جَهَالَتِه. 9- أَوْ بِدْعَتِهِ. 10- أو سُوءِ حِفْظِهِ.
فالأوَّلُ: الْمَوْضُوعُ، والثَّانِي: الْمَتْرُوكُ. والثَّالِثُ: المُنْكَرُ، عَلَى رَأْيٍ. وكَذَا الرَّابِعُ والخَامِسُ

অর্থাৎ রাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ১০টি স্তর আছে। সবচেয়ে মারাত্মক স্তর হল ১ নম্বর, সবচেয়ে কম মারাত্মক হল ১০ নম্বর।

১. যে রাবী মিথ্যা বলে তার হাদীসকে মাওদ্বু বলা হয়।
২. যার ব্যাপারে মিথ্যা বলার অভিযোগ থাকে, তাকে মাতরুক বলা হয়।
৩, ৪, ৫. যার বর্ণনায় মারাত্মক রকম ভূল থাকে, তার হাদীসকে মুনকার বলা হয়। একইভাবে সঠিকভাবে হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে গাফেল হলে কিংবা ফাসেক হলে, তার হাদীসকে মুনকার বলা হয়।


তোমার দেয়া হাদীস হচ্ছে – মাতরুক ও মুনকার রাবী আলী বিন ইয়াযীদের হাদীস। এমন লোকের হাদীসকে হাসান লি-গায়রিহি বানানো যায় না। কারণ হাসান লি-গায়রিহি বানানোর শর্ত হচ্ছে –

وَمَتَى تُوبِعَ سَيِّءُ الْحِفْظِ بِمُعْتَبَرٍ، وَكَذَا الْمَسْتُورُ، وَالْمُرْسَلُ، وَالْمُدَلَّسُ: صَارَ حَدِيثُهُمْ حَسَناً لا لِذَاتِهِ، بَلْ بالْمَجْمُوع.

অর্থাৎ দয়ীফ হাদীস হাসান লি-গায়রিহি হবে যদি দয়ীফ হাদীসের রাবী দূর্বল স্মৃতিবিশিষ্ট রাবী অথবা মাসতুর (এমন রাবী যার নাম বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় কিন্তু তিনি সিকাহ এমন কোন প্রমান পাওয়া যায় না) অথবা মুদাল্লিস হয়। অর্থাৎ ৯ ও ১০ নং স্তরের রাবীর হাদীসকেই কেবল অন্য হাদীস দিয়ে হাসান লি-গায়রিহি বানানো যায়। এর উপরের স্তরে যারা আছে, তাদের হাদীস দিয়ে নয়।

আহমদ শাকের এটা খোলাসা করে ‘আল বা’য়েস আল হাসীস’ কিতাবের টীকায় লিখেন –

وقد علق العلامة أحمد شاكر ـ رحمه الله ــ على هذا الكلام في الباعث الحثيث : [ص:38]:
” وبذلك يتبين خطأ كثير من العلماء المتأخرين في إطلاقهم أن الحديث الضعيف إذا جاء من طرق منعددة ضعيفة ارتقى إلى درجة الحسن أو الصحيح، فإنه إذا كان ضعف الحديث لفسق الراوي أو اتهامه بالكذب ، ثم جاء من طرق أخرى من هذا النوع ،ازداد ضعفا إلى ضعف ، لأن تفرد المتهمين بالكذب أو المجروحين في عدالتهم بحيث لا يرويه غيرهم يرفع الثقة بحديثهم ، ويؤيد ضعف روايتهم ، وهذا واضح .”

“এর মাধ্যমে পরবর্তী অনেক আলেমের ভ্রান্তি প্রমাণিত হয় যারা বলেন – দয়ীফ হাদীস বহু দয়ীফ সুত্রে বর্ণিত হলে এটি হাসান কিংবা সহীহ হয়ে যায়। হাদীসের দূর্বলতা যদি রাবীর ফিসক কিংবা মিথ্যা বলার অভিযোগ থাকার কারণে হয়, আর এর সমর্থনে একই জাতীয় হাদীস আসে, তবে এতে দূর্বলের সাথে কেবল দূর্বল যুক্ত হচ্ছে। আর মিথ্যা বলার অভিযোগে যারা অভিযুক্ত কিংবা যাদের আদলতে জরাহ থাকায় তাদের সুত্রে বর্ণনা করা হয় না, তাদের বর্ণনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় না এবং তাদের হাদীসের দূর্বলতা দূর হয় না। আর এটা স্পষ্ট বিষয়।”

যাই হোক, আলবানী এই হাদীসকে হাসান বানানোর প্রচেষ্টা করেছেন তাবারানীর মুজামে কাবীরের একটি হাদীস দিয়ে –

7749 – حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ سُفْيَانَ الرَّقِّيُّ، ثنا أَيُّوبُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْوَزَّانُ، ح وحَدَّثَنَا عَبْدَانُ بْنُ أَحْمَدَ، ثنا الْعَبَّاسُ بْنُ الْوَلِيدِ الْخَلَّالُ الدِّمَشْقِيُّ، قَالَا: ثنا الْوَلِيدُ بْنُ الْوَلِيدِ، ثنا ابْنُ ثَوْبَانَ، عَنْ يَحْيَى بْنِ الْحَارِثِ، عَنِ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمْ: «لَا يَحِلُّ بَيْعُ الْمُغَنِّيَاتِ وَلَا شِرَاؤُهُنَّ، وَلَا تِجَارَةٌ فِيهِنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ»

এই হাদীসে আছে – আল ওলীদ বিন আল ওলীদ এবং ইবনে সাওবান। এই দুইজনেই দূর্বল। অথচ আলবানী বলছেন –

قلت: وهذا إسناد حسن، الوليد بن الوليد هو
العنسي القلانسي الدمشقي، قال ابن أبي حاتم (4 / 2 / 19) عن أبيه: ” صدوق،
ما بحديثه بأس، حديثه صحيح “. ومن فوقه معروفون من رجال التهذيب على كلام في
بعضهم

তিনি আল ওলীদের পক্ষে কেবল ইবনে আবি হাতেমের তা’দীল উল্লেখ করছেন। ভালো কথা। কিন্তু এর উপরের রাবীদের ব্যাপারে? আলবানী বলছেন – “উপরের রাবীরা তাহযীব কিতাবের পরিচিত রাবী, তবে তাদের কারো কারো ব্যাপারে মন্তব্য আছে।” কী সেই মন্তব্য সেটা তিনি উল্লেখ করেন নি।

চল আমরা সেটা ইবনে হাজার লিখিত তাহযীবুত তাহযীবে থেকে দেখে নেই –

قال الأثرم عن أحمد أحاديثه مناكير

আসরাম ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন – তার হাদীসগুলো মুনকার।

وقال محمد بن الوراق عن أحمد لم يكن بالقوي في الحديث

মুহাম্মদ বিন ওয়াররাক ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেন – সে হাদীসে শক্তিশালী নয়।

وقال الدوري عن ابن معين والعجلي وأبو زرعة الرازي لين وقال معاوية بن صالح عن ابن معين ضعيف

দাওরী বর্ণনা করেন ইবনে মাঈন, আল ‘আজলী, আবু যুর’আহ বলেছেন : সে নরম/সহজতকারী। মুয়াবিয়া বিন সালেহ বর্ণনা করেন : ইবনে মাঈন বলেছেন – সে দূর্বল।

وقال النسائي ضعيف وقال مرة ليس بالقوي وقال مرة ليس بثقة

নাসায়ী বলেন – সে দূর্বল, আরেকবার বলেছেন – সে শক্তিশালী নয়, আরেকবার বলেছেন – সে সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) নয়।

অর্থাৎ আলবানী তিরমিযির দয়ীফ হাদীসকে যেই হাদীসের ভিত্তিতে হাসান বলার চেষ্টা করেছেন সেটা নিজেও দূর্বল। একজন মুনকার, মাতরুক রাবীর হাদীস অন্য আরেক দূর্বল রাবীর বর্ণনা দিয়ে হাসান হয় না।
এবার আসা যাক আল ওলীদের প্রসঙ্গে। আলবানী তো তার পক্ষে ইবনে আবি হাতেমের পক্ষে তা’দীল উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্য ইমামরা কী বলেছেন? মুসনাদে আহমদের তাহকীকে তোমার দেয়া হাদীসের ইসনাদ আলোচনায় শু’আইব আরনাউত ও তার সহকর্মীরা লিখেছেন –

وأخرجه الطبراني في “الكبير” (7749) ، وفي “الشاميين” (321) و (893) من طريق الوليد بن الوليد -وهو العنسي الدمشقي- عن عبد الرحمن بن ثابت ابن ثوبان، عن يحيى بن الحارث الذماري، عن القاسم، به. قلنا: الوليد بن الوليد قال فيه الدارقطني: منكر الحديث.

তাবারানী এই হাদীস মুজামে কবীরে ও শামিয়্যিন কিতাবে এনেছেন আল ওলীদ বিন আল ওলীদের সুত্রে। এই আল ওলীদ বিন আল ওলীদ হলেন আল আনসী আদ দিমাশকি। তিনি বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহমাত বিন সাবেত বিন সাওবান বিন হারেস আল যিমারী থেকে, তিনি আল কাসেম থেকে। আমরা বলি – এই আল ওলীদ বিন আল ওলীদের ব্যাপারে দারাকুতনী বলেছেন – “তার হাদীস মুনকার”।

এবার তুমিই বল এক মুনকার রাবীর হাদীসকে কীভাবে আরেক মুনকার রাবীর হাদীস দিয়ে আলবানী হাসান বানালেন? আর কীভাবে তোমার দেয়া বইয়ের লেখক আলবানীর হাসান লি গায়রিহি বলাকে সহীহ বানালেন? হয়ত তোমার দেয়া বইয়ের লেখক দেখছেন যে, এটা আলবানীর সিলসিলা সহীহাতে আছে। ব্যস, একে সহীহ বানিয়ে দিয়েছেন। খুবই সস্তা মানের লেখক হবে হয়ত।

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই এই হাদীস গ্রহণযোগ্য তবুও এতে বাদ্যযন্ত্র হারাম প্রমাণ হয় না। বরং গায়িকা দাসী কেনা-বেচা নিষেধ বোঝা যায় কেবল। তুমি মেশকাত কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করেছ।

মেশকাতের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী বলেন –

(ولَا تَبِيعُوا الْقَيْنَاتِ) : بِفَتْحِ الْقَافِ وَسُكُونِ التَّحْتِيَّةِ : فِي الصِّحَاحِ: الْقَيْنُ الْأَمَةُ مُغَنِّيَةً كَانَتْ أَوْ غَيْرَهَا (وَلَا تَشْتَرُوهُنَّ) قَالَ التُّورِبِشْتِيُّ: وَفِي الْحَدِيثِ يُرَادُ بِهَا الْمُغَنِّيَةُ، لِأَنَّهَا إِذَا لَمْ تَكُنْ مُغْنِيَةً فَلَا وَجْهَ لِلنَّهْيِ عَنْ بَيْعِهَا وَشِرَائِهَا (وَلَا تُعَلِّمُوهُنَّ) أَيِ الْغِنَاءَ فَإِنَّهَا رُقْيَةُ الزِّنَا (وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ) قِيلَ: لَا يَصِحُّ بَيْعُهُنَّ لِظَاهِرِ الْحَدِيثِ، وَقَالَ الْقَاضِي: النَّهْيُ مَقْصُورٌ عَلَى الْبَيْعِ وَالشِّرَاءِ لِأَجْلِ التَّغَنِّي، وَحُرْمَةُ ثَمَنِهَا دَلِيلٌ عَلَى فَسَادِ بَيْعِهَا، وَالْجُمْهُورُ صَحَّحُوا بَيْعَهَا، وَالْحَدِيثُ مَعَ مَا فِيهِ مِنَ الضَّعْفِ، لِلطَّعْنِ فِي رِوَايَتِهِ مُؤَوَّلٌ بِأَنَّ أَخْذَ الثَّمَنِ عَلَيْهِنَّ حَرَامٌ كَأَخْذِ ثَمَنِ الْعِنَبِ مِنَ النَّبَّاذِ ; لِأَنَّهُ إِعَانَةٌ وَتَوَصَّلٌ إِلَى حُصُولِ مُحَرَّمٍ، لَا لِأَنَّ الْبَيْعَ غَيْرُ صَحِيحٍ. اهـ.

“(তোমরা ‘কাইন’দের বিক্রি করো না) – ক্বাফ যবর, ইয়া সাকীন দিয়ে উচ্চারণ হবে। সিহাহ অভিধান অনুযায়ী – কাইন হচ্ছে দাসী, চাই সে গায়িকা হোক অথবা না হোক।

(তাদের খরিদ করো না) – তুরিবিশতি বলেন – এই হাদীসের উদ্দেশ্য হচ্ছে গায়িকা দাসী। কারণ দাসী যদি গায়িকা না হয়, তবে তার কেনা-বেচা নিষিদ্ধ হবার কোন যুক্তি নেই।

(তাদেরকে) গান (শিখিও না) – কেননা এটি যেনা-ব্যাভিচারের জন্য উস্কানী হবে।

(তাদের মূল্য গ্রহণ হারাম) – কেউ কেউ বলেন – হাদীসের বাহ্যিক অনুযায়ী তাদের বিক্রি করা শুদ্ধ হবে না। কিন্তু আল কাযি বলেছেন – এখানে কেনা-বেচা নিষেধ করা হয়েছে গান গাওয়ার কারণে। আর হাদীসে যেহেতু মূল্যকে হারাম বলা হয়েছে, এতে বোঝা যায় যে, বেচাবিক্রি শুদ্ধ হবে না। কিন্তু জুমহুর আলেম বলেছেন – বিক্রি শুদ্ধ হবে, এই হাদীস দূর্বল এবং এর রেওয়ায়াত প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু তারপরেও একে গ্রহণ করা যায়, তবে এভাবে তাবীল করে – তাদের মূল্যগ্রহণ করা সেই অর্থে হারাম যেই অর্থে নাবিয বানানোর জন্য আঙ্গুর বিক্রির মূল্য গ্রহণ হারাম। কেননা এখানে একটি জায়েয কাজকে হারামে সহযোগী হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হবে। বিক্রি শুদ্ধ না একারণে হারাম নয়।”

– মোল্লা আলী কারীর মেরকাত থেকে সমাপ্ত।

এখন প্রশ্ন জাগে, দাসীর গান শোনা কি শর্তহীনভাবে হারাম? নাকি মনিবের জন্য জায়েয এবং অন্য পুরুষের জন্য হারাম? হারাম হলে কেন হারাম?

প্রথম প্রশ্নে আসা যাক – দাসীর গান শোনা কি হারাম?

– তোমার সাথে আমার মতভেদ হচ্ছে বাজনা নিয়ে। গান নিয়ে নয়। কারণ গানকে তুমিও জায়েয বল। তাই এই হাদীস আমার বিরুদ্ধে যায় না এবং কিছু প্রমাণও হয় না।

এবার পরের প্রশ্ন দুইটি দেখা যাক।

আল্লামা মুনাভী “ফায়দ্বুল কাদীর” কিতাবে এর উত্তর দিয়েছেন –

প্রথমে তিনি জামে’উস সগীরের এই হাদীসটি উল্লেখ করেন –

لله أشد أذنا إلى الرَّجُلِ الحَسَنِ الصَّوْتِ بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ مِنْ صاحب القينة إلى قَيْنَتِهِ

“মনিব তার (গায়িকা) দাসীর গান যত মনোযোগ দিয়ে শোনে আল্লাহ তা’আলা সুমিষ্ট কণ্ঠে কুরআন পাঠকের কুরআন পাঠ তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনেন।” [মুসতাদরাকে হাকেমে এই হাদীসকে ইমাম হাকেম সহীহ হাদীস বলেছেন]

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মুনাভী বলেন –

وفيه حل سماع الغناء من قينته ونحوها لأن سماع الله لا يجوز أن يقاس على محرم وخرج بقينته فينة غيره فلا يحل سماعها بل يحرم إن خاف ترتب فتنة

“এই হাদীস থেকে বোঝা যায় – নিজ দাসীর কণ্ঠে গান শোনা হালাল। কারণ যদি এটা হারাম হত, তাহলে একটা হারাম কাজ শোনার সাথে আল্লাহ তায়ালার শোনাকে তুলনা করা হত না। আর হাদীসে নিজের দাসী বলা হয়েছে, এ থেকে বোঝা যায় অন্যের দাসীর কণ্ঠে গান শোনা হালাল হবে না, বরং ফিতনার আশংকা থাকলে হারাম হবে।” (সমাপ্ত)

আমি (শেখ সাদী) বলি – এই ফিতনার আশংকাকে মোল্লা আলী কারী যেনা-ব্যাভিচারের উস্কানী বলেছেন।
সুতরাং, এই হাদীসকে প্রথমত গ্রহণযোগ্য ধরার কোন সুযোগ নেই। মুনকার রাবীর হাদীস। আর যদি গ্রহণযোগ্য ধরিও তবু এটা বাদ্যযন্ত্রের বিপক্ষে যায় না, বরং অন্য পুরুষের দাসীর কন্ঠে গান শোনা হারাম বোঝা যায়। আবার এটাও যেনা ও ফেতনার আশংকার কারণে।

আপত্তি

হাদীস ২ :

عنْ أَبِيْ مَالِكِ الأَشْعَرِىِّ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَيَكُوْنَنَّ مِنْ أُمَّتِيْ أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّوْنَ الْحِرَ وَالْحَرِيْرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ.

বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত:

রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ‘অবশ্যই অবশ্যই আমার পরে এমন কিছু লোক আসবে যারা যেনা, রেশম, নেশাদার দ্রব্য ও গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে’ (বুখারী হা/৫৫৯০)।

১. এই হাদীসে ইস্তেহলাল শব্দ থেকে মা’আযিফ (music) হারাম প্রমাণ হয় না। কারণ ইস্তেহলাল বলতে হালালকে হালাল হিসেবে গণ্য করা অর্থও হয়।

উদাহরণ ইবনে হিব্বানের সহীহ হাদীস –

يوشك أحدكم أن يكذبني وهو متكئ على أريكته يحدث بحديثي، فيقول: بيننا وبينكم كتاب الله، فما وجدنا فيه من حلال استحللناه، وما وجدنا فيه من حرام حرمناه

এমন এক সময় আসবে যখন আসনে হেলান দিয়ে কিছু লোক আমাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করবে। তাকে যখন আমার হাদীস বলা হবে, সে বলবে – আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব আছে। এটাই যথেষ্ট। এতে আমরা যাকে হালাল পেয়েছি তাকে “ইস্তেহলাল” (হালাল গণ্য) করব। আর যাকে হারাম পেয়েছি, তাকে হারাম গণ্য করব।

এমন আরো হাদীস আছে। সময়ের অভাবে অনুবাদ করলাম না –

وفي الصحيحين عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «أحق ما أوفيتم من الشروط أن توفوا به ما استحللتم به الفروج» ، وهم إنما استحلوا الفروج المباحة بالنكاح الذي شرعه
الشارع .
وقال عمر بن الخطاب: «الطلاق بيدي من يستحل الفرج» ، وفي لفظ : « فلها الصداق بما يستحل من فرجها» .
· وقال عمر ايضًا: «ما ترونه يحل لي من مال الله؟ – أو قال: من هذا المال؟ -» ، قال: قلنا: أمير المؤمنين أعلم بذلك منا، – قال: حسبته قال: ثم سألنا فقلنا له مثل قولنا الأول – فقال: «إن شئتم أخبرتكم ما أستحل منه: ما أحج وأعتمر عليه من الظهر، وحلتي في الشتاء، وحلتي في الصيف، وقوت عيالي شبعهم، وسهمي في المسلمين، فإنما أنا رجل من المسلمين»
· وقال علي بن أبي طالب للخوارج : «أقيدوني من ابن خباب قالوا: كلنا قتله ، فحينئذ استحل قتالهم»، أي : رآه حلالا ، لا أنه استحل منهم الحرام .
· وقال علي رضي الله عنه أيضًا : «أدنى ما يستحل به الفرج عشرة دراهم» ، أي ما يجعله حلالا ، لا أنه ما به يستباح الحرام .

২. তুমি বলতে পারো – এই হাদীসে তো মদের কথা আছে। তাহলে মদ যেহেতু হারাম, আর মদকে যেহেতু তারা হালাল গণ্য করছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মদের বিধানই মদের সাথে উল্লিখিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। উসুলে ফিকহের ভাষায় বলা হয় – দালালাতুল ইকতিরান। অর্থাৎ পাশাপাশি থাকার দলীল।
এখন এই হাদীসের শব্দগুলোতে কি দালালাতুল ইকতিরান প্রযোজ্য? প্রযোজ্য হলেও কতটুকু প্রযোজ্য?
এর উত্তর পেতে আমরা হাদীসের শব্দগুলো দেখব।

(ক) প্রথম শব্দ ছিল (হির)। এর অর্থ হচ্ছে যৌনাঙ্গ। তোমার অনুবাদক একে যেনা অনুবাদ করেছেন। কিন্তু এটা আক্ষরিক/আভিধানিক অর্থ নয়। এখন যৌনাঙ্গ নিয়ে আলাপ করা যাক। হাদীসে বলা হচ্ছে – আমার উম্মতের একদল যৌনাঙ্গকে হালাল গণ্য করবে। এতে কি প্রমাণ হয় যে – সবধরণের যৌনাঙ্গ আমভাবে হারাম? নাকি এটা শর্তযুক্ত? আমরা সবাই জানি – স্ত্রী ও দাসীর সাথে সহবাস হারাম না। সুতরাং প্রমাণ হচ্ছে – এই হাদীসে শর্তযুক্তভাবে যৌনাঙ্গ হারাম হওয়া বোঝাচ্ছে।

(খ) এরপর আশা যাক (হারির) বা রেশম শব্দ নিয়ে। জানা আছে – নারীদের জন্য রেশম জায়েয। আর পুরুষের জন্য অনুর্ধ্ব চার আঙ্গুল পরিমান রেশম ব্যবহার জায়েয।

সুতরাং অলরেডি প্রমাণ হয়ে গেছে যে, এই হাদীসে শর্তহীনভাবে যৌনাঙ্গ কিংবা রেশম হারাম হবার কোন দলিল নেই। একই কথা মা’আযিফ বা বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এখন বলতে পারো – “তাহলে মদকেও শর্তযুক্তভাবে হালাল বলেন!”

এর জবাবে আমরা বলব – এই হাদীসের বাইরে কুরআনের অকাট্য আয়াত, মুতাওয়াতির সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, মদ শর্তহীনভাবে হারাম।

অন্যদিকে রেশম ও যৌনাঙ্গ শর্তযুক্তভাবে জায়েয হওয়া ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। তাই আমরা হাদীসের ‘মুতলাক’ কে মুকাইয়াদ করছি।

আবার, মা’আযিফ জায়েয হওয়ার ব্যাপারেও অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে দলিল আছে, তাই আমরা একেও শর্তযুক্ত করছি, মুকাইয়্যাদ বানাচ্ছি।

আপত্তি

হাদীস ৩:

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم إِنَّ اللهَ تَعَالَى حَرَّمَ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ والكُوْبَةَ.

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত :

রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মদ, জুয়া ও সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’ (বায়হাক্বী, হাদীছ ছহীহ, মিশকাত হা/৪৫০৩; বাংলা মিশকাত ৮ম খণ্ড হা/৪৩০৪)।

উত্তর:

এই হাদীসে তোমার (Niloy) অনুবাদক (কুবা) শব্দের অর্থ করেছেন – সব ধরণের বাদ্যযন্ত্র। এটা ভ্রান্তি বৈ কিছু নয়। কারণ কুবা শব্দটি ইয়েমেনিদের মাঝে প্রচলিত ছিল। এর শব্দের প্রসিদ্ধ অর্থ হচ্ছে – নারদ (লুডু খেলা)। হ্যাঁ, এর অন্য আরেক অর্থও হয় – সেটা হচ্ছে ঢোল (তবল) অথবা বারবাত (ছবি : google بربط )

لإمام أبو عبيد القاسم بن سلام الهروي (ت224هـ) في كتابه غريب الحديث ، فقد قال فيه : «وأما الكوبة : فإن محمد بن كثير أخبرني أن الكوبة النرد في كلام أهل اليمن ، وقال غيره الطبل» . غريب الحديث (4/ 278)

ইমাম আবু উবাইদ আল কাসেম বিন সালাম আল হারাবী (মৃ ২২৪) তার গরীবুল হাদীসে বলেন – “কুবা” সম্পর্কে মুহাম্মাদ বিন কাসীর আমাকে জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনিদের আঞ্চলিক ভাষায় “কুবা” অর্থ নারদ খেলা। অন্য মতে – এটি হচ্ছে তবল (ঢোল)।

. وقال ابن الأثير في النهاية في غريب الحديث والأثر : « فيه : “إن الله حرم الخمر والكوبة” : هي النرد . وقيل: الطبل. وقيل: البربط».

ইবনে আসীর “নিহায়াহ ফি গরিবিল হাদিস ওয়াল আছার” এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন – কুবা হচ্ছে নারদ খেলা। এছাড়াও বলা হয় – তবল কিংবা বারবাত।

অর্থাৎ ইমাম আবু উবায়দ ও ইবনে আসির দুইজনই কুবার অর্থ নারদ খেলা হওয়াকেই তারজিহ দিচ্ছেন।
হাদীসে উল্লিখিত কুবা অর্থ যে নারদ খেলা (জুয়ার উদ্দেশ্যে) সেটা স্পষ্ট হয় এ হাদীস থেকে। হাদীসটি বুখারী

আল আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেছেন:
সালমান বিন শুমাইর আল-আলহানী সাহাবী ফুযালা বিন ওবায়েদ সম্পর্কে বলেন:

«وكان بجمع من المجامع، فبلغه أن أقواما يلعبون بالكوبة، فقام غضبان ينهى عنها أشد النهي، ثم قال: ألا إن اللاعب بها ليأكل ثمرها، كآكل لحم الخنزير، ومتوضئ بالدم. يعني بالكوبة: النرد»

“সাহাবী ফুযালা বিন ওবায়েদ এক জমায়েতে ছিলেন এমন সময় তার কাছে সংবাদ আসল যে, একদল লোক “কুবা” খেলছে। তিনি রেগে দাড়ীয়ে গেলেন এবং কঠোর ভাষায় একে নিষেধ করে বললেন – যারা এটা খেলবে তারা এর মাধ্যমে (জুয়ায় জেতা) অর্থ যে খায় তার দৃষ্টান্ত তার মত যে শুয়োরের রক্তমাখা মাংস খায়। (রাবী বলেন) কুবা হচ্ছে – নারদ খেলা।”

আপত্তি

আল্লাহর রাসুল ও ইবনে উমারের কানে আঙ্গুল দেয়ার ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা।

হাদীস ৪ :

عَنْ نَافِعٍ قَالَ سَمِعَ ابْنُ عُمَرَ مِزْمَارًا قَالَ فَوَضَعَ إِصْبَعَيْهِ عَلَى أُذُنَيْهِ وَنَأَى عَنْ الطَّرِيقِ وَقَالَ لِي يَا نَافِعُ هَلْ تَسْمَعُ شَيْئًا قَالَ فَقُلْتُ لاَ قَالَ فَرَفَعَ إِصْبَعَيْهِ مِنْ أُذُنَيْهِ وَقَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَسَمِعَ مِثْلَ هَذَا فَصَنَعَ مِثْلَ هَذَا.

নাফে‘ (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

একদা ইবনু ওমর (রাঃ) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, নাফে’ তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম, না। তিনি তার দুই আঙ্গুল দুই কান হতে বের করে বললেন, আমি একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলেন এবং আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন যেভাবে আজ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম (ছহীহ আবূদাঊদ হা/ ৪৯২৪, সনদ ছহীহ)।

জবাব:

– এই হাদীস থেকে বরং বাদ্যযন্ত্র জায়েয হওয়া প্রমাণ হয় নিম্নোক্ত কারণে –

১. ইমাম ইবনে হাযম এই হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করেন –

ولو كان المزمار حراما سماعه لما أباح عليه السلام لابن عمر سماعه. ولو كان عند ابن عمر حراما سماعه لما أباح لنافع سماعه، ولأمر عليه السلام بكسره، ولكنه لم يفعل وإنما تجنب – عليه السلام – سماعه كتجنبه أكثر المباح من أكثر أمور الدنيا: كتجنبه الأكل متكئا، وأن يبيت عنده دينار أو درهم، وأن يعلق الستر على سهوة في البيت، وبالله تعالى التوفيق.

যদি বাঁশি হারাম হত তিনি (সাঃ) ইবনে ওমরকে শোনার অনুমতি দিতেন না। ইবনে ওমর যদি বাঁশির আওয়াজ শোনা হারাম মনে করতেন তিনি নাফে’কে শোনার অনুমতি দিতেন না। বরং আল্লাহর রাসুল এই বাদ্যযন্ত্র ভেঙ্গে ফেলার আদেশ দিতেন। কিন্তু তিনি এমন করেন নি। বরং তিনি নিজে এটা শোনা থেকে বিরত থেকেছেন। এটা তেমনই যেমন তিনি অধিকাংশ দুনিয়াবী জায়েয-মুবাহ বিষয় থেকে নিজেকে বাচিয়ে রাখতেন যেমন – হেলান দিয়ে বসে খাওয়া, ঘরে দিনার-দিরহাম জমা রাখা, ঘরের আঙ্গিনায় পর্দা ঝোলানো ইত্যাদি। আল্লাহু আ’লাম।

২. আল আবুররি মানাকেবে শাফেয়ী গ্রন্থে বর্ণনা করেন-

أخبرنا محمد بن رمضان المصري، أخبرنا ابن عبد الحكم قال:
((قلت للشافعي: في حديث نافع عن ابن عمر أنه مر بزمارة راع فجعل إصبعه في أذنه، وعدل عن الطريق، وجعل يقول: يا نافع أتسمع؟ حتى قلت: لا.

فقال: هكذا كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يفعل.
فقلت: ينبغي لأن يكون حجة في تحريم السماع. فقال الشافعي: لو كان حراماً ما أباح لنافع ولنهاه أن يسمع، ولكنه على التنزه)) .

আমাকে মুহাম্মদ বিন রমযান আল মাসরি বলেছেন, তাকে ইবনে আব্দুল হাকাম বলেছেন –

আমি শাফেয়ীকে জিজ্ঞেস করলাম – ইবন ওমর থেকে নাফে’ যেই হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে আলোচনা আছে যে তিনি রাখালের বাঁশির আওয়াজ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ফেলেন এবং পথ থেকে সরে যান। এরপর নাফে’কে জিজ্ঞেস করেন – আওয়াজ শোনা যায় , নাফে? অবশেষে নাফে’ বলেন – না শোনা যায় না। এরপর তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসুলও এমন করেছিলেন।

আমি বললাম – এই হাদীস (বাদ্যযন্ত্র) শোনা হারাম হওয়ার প্রমান হওয়া উচিত। শাফেয়ী জবাব দিলেন – যদি এটি হারাম হত, তাহলে তিনি নাফে’কে শোনার অনুমতি দিতেন না। বরং তিনি নিজে এটি থেকে বেচে থাকতে চাইতেন।

আপত্তি

সর্বশেষে আসা যাক – আকৃতি বিকৃত করা ও ভুমিধ্বসের আযাব নিয়ে। তুমি দুইটা হাদীস উল্লেখ করেছ। এর জবাব একসাথে দিচ্ছি।

হাদীস ৫ :

বুখারীর হাদীস লক্ষ্য করা যাক –

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ، يَسْتَحِلُّونَ الحِرَ وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ وَالمَعَازِفَ، وَلَيَنْزِلَنَّ أَقْوَامٌ إِلَى جَنْبِ عَلَمٍ، يَرُوحُ عَلَيْهِمْ بِسَارِحَةٍ لَهُمْ، يَأْتِيهِمْ – يَعْنِي الفَقِيرَ – لِحَاجَةٍ فَيَقُولُونَ: ارْجِعْ إِلَيْنَا غَدًا، فَيُبَيِّتُهُمُ اللَّهُ، وَيَضَعُ العَلَمَ، وَيَمْسَخُ آخَرِينَ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ “

উত্তর

<<আমার উম্মতের মধ্যে একদল লোক যৌনাঙ্গ, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল করবে।>> হাদীসের এই অংশ নিয়ে উপরে আলোচনা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে শর্তহীনভাবে বাদ্যযন্ত্র হারাম প্রমাণ হয় না।

বরং এই ব্যাখ্যা করা যায় যে, এই বাদ্যযন্ত্রের সাথে অশ্লীলতা, পর্দাহীনতা ইত্যাদি স্পষ্ট হারাম বিষয় যুক্ত থাকবে।

কিন্তু মদের আসর জমাতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হবে। অর্থাৎ লি গায়রিহি হারাম হবে, লি যাতিহি না।
এবার আসা যাক – হাদীসের দ্বিতীয় অংশে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন এই লোকদের আকৃতি বিকৃত করা হবে এবং কারো কারো উপর পাহাড় ধ্বসে পড়বে।

এর উত্তরে আমরা বলব – বুখারীর হাদীসটি আরো ভাল করে লক্ষ্য করা যাক –

“তারা ভেড়ার পাল চড়াতে বের হবে, এমনসময় তাদের কাছে কোন প্রয়োজনে পড়ে এক ফকীর আসবে। তারা বলবে – কাল আসো। আল্লাহ তাদের উপর রাতে আযাব পাঠাবেন। তাদের উপর পাহাড় ধ্বসিয়ে দিবেন। অন্যদের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শুয়োর বানিয়ে দিবেন।”

প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে –

এই হাদীসে আযাবপ্রাপ্ত লোকদের পরিস্থিতি ও বিশেষণ বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। আর এই বিশেষণগুলো হচ্ছে – তারা শরাব, রেশম, অবাধ যৌনতায় লিপ্ত হবে। সাথে এই বিশেষণও এসেছে যে, তারা বাদ্যবাজনা নিয়ে মশগুল থাকবে। এখন এই বাদ্যবাজনার সাথে তো অশ্লীলতা ও মদ-জুয়া জড়িত থাকার কারণে নিন্দা হতে পারে, যেভাবে যৌনতা ও রেশমের ক্ষেত্রে নিন্দা হবে যখন এটি হালালের সীমানা অতিক্রম করে।

এই হাদীসগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, আল্লাহ এই লোকদেরকে তাদের চরম গাফলতি ও দুনিয়া আসক্তির কারণে আযাব দিবেন। নয়ত শেষের বিষয়টা কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? ফকিরকে ভিক্ষা দেয়া তো মুস্তাহাব। মুস্তাহাব ত্যাগ করা কি হারাম? তাহলে হাদীসে কেন ফকিরের প্রসঙ্গ আনা হল?

বরং হাদীসে নির্দেশনা রয়েছে যে, তাদের টাকা-পয়সার প্রাচুর্য আছে। একারণেই তারা ভেড়ার পাল নিয়ে বের হয়েছে। আর ফকির তাদের কাছে নিজের প্রয়োজন নিয়ে এসেছে, কারণ ফকির দেখেছে যে তাদের ভেড়ার পাল আছে, টাকা-পয়সা আছে। কিন্তু এই লোকগুলো অলসতা করে ফকিরকে বলেছে – আজকে না, কাল আসো। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি তাদের প্রবল আসক্তি ও আখেরাতের প্রতি অমনোযোগ আছে। আর তাদের এই দুনিয়া আসক্তি যখন চরমে পৌছবে তখন আল্লাহ তাদের উপর আযাব পাঠাবেন।

কেউ যদি এই হাদীস দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করে যে, শর্তহীনভাবে বাদ্যযন্ত্র হারাম, তাহলে তাকে এটাও বলতে হবে যে, যাকাত ফরয হোক বা না হোক, শর্তহীনভাবে ফকিরকে সাহায্য না করা হারাম।

পূর্ববর্তী পোস্টবছরের শুরুতেই নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরী করিয়ে নিন (বিস্তারিত)
পরবর্তী পোস্টডাঃ বাবা জাহাঙ্গীরের কিতাবে আটরশির পীরের প্রশংসা।

এই পোস্টে একটি মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন