পীরের প্রতি মুরীদের আদব।

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

পীরের প্রতি মুরীদের আদব।

খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের আলোকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল পাক দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বওলী হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেবের প্রদত্ত নসিহত সমূহের ১ম খন্ড আদাবুল মুরীদ এর নসিহত নং-২ থেকে প্রদান করা হচ্ছে-

বিষয়ঃ পীরের প্রতি মুরীদের আদব।

পীরের কোন হুকুম যদি শরীয়তের খেলাফ মনে হয়, তবুও বিনা দ্বিধায় তাহা পালন করিবে। তবেই কল্যাণ। কারণ কামেল পীর যাহা কিছুই করেন না কেন, তাহা এলহামের নির্দেশে করেন। কাজেই শরীয়তের খেলাফ কোন কর্মই কোন কামেল করিতে পারেন না। যখন বুঝ খুলিবে, তখন বুঝিতে পারিবে। মূল কথা, পীরের আদেশ বিনা দ্বিধায় পালনের ভিতরেই মুরীদের মঙ্গল নিহিত। মহা কবি হাফেজ কি সুন্দরই না বলিয়াছেন,
“বমায়ে সুজ্জাদা রুংগীকুন গারব পীরে মগা গুয়েদ,
কে ছালেক বেখবর না বুয়াদ যে রাহ্‌ ও রেছমে মঞ্জেল হা।” অর্থাৎ- ‘‘তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া তদ্‌ উপরে নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর। কারণ মোকাম মঞ্জিলের পথ তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।”

সর্বাবস্থায় অর্থাৎ চলা ফেরা, উঠা-বসা, পানাহার, শয়ন-উপবেসন ইত্যাদিতে পীরকে অনুসরণ করিবে। ইহাতে বহু মঙ্গল লুকায়িত। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজা বাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, “তোমরা পীরের খাছলতে খাছলত ধর- তবেই ত্রান ও শান্তি।”

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রঃ)ছাহেব তদীয় “মাবদা ওয়া মাআদ” পুস্তিকাতে বলেন; মুরীদগণ যে কোন কামালিয়াত বা পূর্ণতাই লাভ করুক না কেন, তাহা স্বীয় পীরের অনুসরণ কর্তৃকই তাহারা লাভ করিয়া থাকে। পীরের ভুল-ত্রুটিও মুরীদের সত্য হইতে উৎকৃষ্ট। তাই হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব বলিয়াছিলেন, “আফসোস! যদি আমি দয়াল নবীর (সাঃ) ভুল-ত্রুটিও হইতাম।”

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব একই পুস্তিকাতে আরও বলেন যে, “জনৈক বুযুর্গের নিকট আমি শুনিয়াছি যে পূর্ববর্তী বুযুর্গ ও ওলী-আল্লহগণ হইতে যে সকল দু’আ ও অজিফা বর্ণিত আছে; ঘটনাক্রমে তাঁহারা ঐ সকল দু’আ ও অজিফার মধ্যে যাহা ভুল ও বিকৃতভাবে পাঠ করিয়াছিলেন, তাহাঁদের অনুগামী মুরীদগন যদি উহা ঐ ভাবেই পাঠ করেন, অর্থাৎ ভুলসহ, তাহা হইলে উক্ত ওজিফার পূর্ন তাছির ও উপকারিতা লাভ হয়। কিন্তু যদি উহা তাহারা শুদ্ধ ভাবে পড়িতে যায়, তাহা হইলে উহা তাছিরশুন্য ও উপকাররহিত হইয়া থাকে।”

কাজেই সর্বাবস্থায় পীরের অনুসরন করাই উত্তম। পীরের সহিত সাক্ষাতান্তে হোজরা হইতে বাহির হওয়ার সময় এমন ভাবে প্রস্থান করিবে যেন, পীরের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতে না হয়।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের পীর ছিলেন হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব। তিনি খাজা ছাহেবের প্রতি অতিশয় আদব প্রদর্শন করিতেন। পক্ষান্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রঃ) ছাহেব যখন মহান খোদাতায়ালার দয়া ও অনুকম্পায় মারেফাতের শেষের শেষ মাকামে নীত হন এবং হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবেরও বহু উর্দ্ধে গমন করেন, তখন পীর হওয়া সত্ত্বেও হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুরীদ মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রঃ) ছাহেবের নিকট হইতে ফয়েজ হাছিলের জন্য তাঁহার প্রতি যে আদব প্রদর্শন করেন-তাহা প্রণিধান যোগ্য ।

কিতাবে দেখা যায়, হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসনী (রাঃ) ছাহেবের হোজরার দরজায় জোড় হাতে দাঁড়াইয়া থাকিতেন এবং তাঁহার হোজরা হইতে ফিরিবার পথে উল্টা পায়ে আসিতেন-যাহাতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতে না হয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলরফেছানী (রঃ) ছাহেব খাজা ছাহেবের এমন আচরনে লজ্জিত হইতেন। তিনি মাঝে মাঝে বলিতেন,“এই নিকৃষ্ট খাদেমের প্রতি হযরত যেইরুপ আদব ও সম্মান প্রদর্শন করেন, তাহাতে এই অধম লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়।”

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব জবাব দিতেন, “আল্লাহপাকের নির্দেশ ছাড়া আমি কিছুই করি না। অদৃশ্য হইতে এলহাম মারফত আমাকে যাহা করিবার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহার বাইরে আমি কিছুই করি না।” খোদাপ্রাপ্তিতত্বজ্ঞান হাছিলের পথে পীরের প্রতি আদব সম্মান দেখানোর এমন নজির খুবই বিরল।

হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেবের পীর ছিলেন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব। উল্লেখ্য যে, বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের ইন্তেকালের উনচল্লিশ বছর পরে হযরত খেরকানী (রঃ) ছাহেবের জন্ম। খেরকানী (রঃ) ছাহেব চর্মচক্ষে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবকে দেখেন নাই। কিন্তু তাহার সাধনা জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাযার জেয়ারত করিতেন।

বর্ণিত আছে, তিনি প্রথম জীবনে বিশ(২০) বছর যাবৎ এই অভ্যাস করিয়া লইয়াছিলেন যে, খেরকানে এশার নামাজ জামাতের সহিত পড়িয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাজার যেয়ারতে বোস্তামে যাইতেন। মাযার জেয়ারতান্তে দাঁড়াইয়া এই দুআ করিতেন,“হে খোদাতায়ালা! যে নেয়ামত ও মারেফাত আপনি বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে দান করিয়াছেন, উহার কিছু অংশ আমাকেও দান করুন”; এইরুপ দু‘আ করিয়া তিনি রাত্রিতে খেরকানে ফেরত আসতেন এবং এশার নামাজের ওযু দ্বারাই ফজরের নামাজ খেরকানে আসিয়া আদায় করিতেন।

তিনি মাযার হইতে প্রত্যাবর্তন কালে মাযারের দিকে মুখ রাখিয়া উল্টা পায়ে পিছনের দিকে হাটিয়া খেরকানে পৌছাইতেন। খেরকানী (রঃ)এর এমন নজীরবিহীন আদব প্রদর্শন করিতে দেখিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) বার(১২)বছর অন্তে মাযার হইতে খেরকানী (রঃ) ছাহেবের প্রতি নেক নজর দিলেন এবং তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া তাঁহাকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইয়া দিলেন।

সেই মহান সাধক, এলেমের দরিয়া, হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব ইন্তেকালের পূর্বে শেষ যে ওসীয়ত করেন সে ওসীয়তও ছিল আদব প্রসংগে। ওসীয়তে তিনি বলেন,“আমার কবর ত্রিশ হাত গভীর হইলে খুশী হইবো। আমার এই শহর বোস্তামের মাটির চেয়ে উচু।” হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর (রঃ) কবরের তুলনায় উচুতে অন্তিম শয্যা রচিত হইলে আবার বেয়াদবী হয় কিনা।

(তথ্যসূত্রঃ নসিহত-সকল খন্ড একত্রে, পৃষ্ঠা নং ৪৫-৪৭, নসিহত নং-২)

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!