হোম ইলমে মারেফত মানুষ যেভাবে ফানাফিল্লাহ হাসিল করতে পারে।

মানুষ যেভাবে ফানাফিল্লাহ হাসিল করতে পারে।

মানুষ যেভাবে ফানাফিল্লাহ হাসিল করতে পারে।

ফানা বলতে কি বুঝায়? মানুষ ফানাফিল্লাহ হাসিল করতে পারে কি? তর্ক নয় বরং জ্ঞানের আলোকে জানতে হবে। আসুন কোরআন ও হাদিসের আলোকে জানি।

ফানা আরবী শব্দ, যার অর্থ হলো বিলীন হওয়া, মিশে যাওয়া ইত্যাদি। প্রচলিত অর্থে ফানা বলতে নিজের আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সাথে মিশে একাকার হয়ে যাওয়াকে বুঝায়। প্রতিটি মানুষের ভিতরেই আল্লাহর এক টুকরো নূর সুপ্ত রয়েছে। যিনি সাধনা করে হৃদয়ের ৭ম স্তরের ঐ সুপ্ত নূরকে জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং নিজেকে ঐ নূর দ্বারা আলোকিত করতে পেরেছেন, তিনিই আল্লাহর নিকট থেকে নির্দেশ পেয়ে থাকেন। ঐ অবস্থায় বান্দা আল্লাহতে বিলীন বা একাকার হতে সক্ষম হয়। আর এ বিলীন বা একাকার হওয়াকে ফানাফিল্লাহ বলে।

পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে,
“হে রাসূল (সঃ)! তখন আপনি (বালি) নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।” (সূরা আল আনফল, আয়াত নং ১৭)।

“হে রাসূল (সঃ)! যারা আপনার হাতে বায়াত গ্রহণ করে তারা আল্লাহর হাতেই বায়াত গ্রহন করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।” (সূরা আল ফাতহ, আয়াত নং ১০)।

“আমি (আল্লাহ ) আমার রুহ থেকে আদমের ভিতরে রুহ ফুঁকে দিলাম।” (সূরা আল হিজর, আয়াত নং ২৯)।

রাসূল পাক সঃ বলেন,
“আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার এতো নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, আমি তাকে ভাল বাসতে বাসতে তার কর্ণ হয়ে যাই, যে কর্ণ দ্বারা সে শোনে; চক্ষু হয়ে যাই, যে চক্ষু দ্বারা সে দেখে; হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে; পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাঁটে। অবশ্য যখন কোন বিষয়ে প্রার্থনা করে, তখন মাত্র উহা দান করে থাকি এবং যখন কোন বিষয় ক্ষমা চায়, তখনই উহা মাফ করে থাকি।”

(তাফসীরে মাজহারী ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং ৫৮; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং ১৯৮; বোখারী শরীফ ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা নং ৯৬৩; মেশকাত শরিফ, পৃষ্ঠা নং ১৯৭)।

প্রতিটি মানুষের রুহ একসময় আল্লাহতে মিশে ছিল। আল্লাহ নিজের রুহ থেকে রুহ মানব দেহে ফুঁকে দিলেন। এই রুহই তাঁর সাথে পুনরায় মিশে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। যেমন সাগরের পানি বাস্পাকারে উত্থিত হয়ে মেঘরুপে আকাশে ভেসে বেড়ায়। পরে বৃষ্টি রুপে জমিনে পতিত হয়ে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা ইত্যাদির পানি নামে পরিচিত হয়ে থাকে। যে পানি যাত্রা পথে কোন ডোবা,পুকুর বা জলাশয় বন্ধ হয়ে আটকে পড়ে যায়, তার পক্ষে সাগরে মিলিত হওয়া কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন কোন প্লাবনে উক্ত ডোবা, পুকুরসহ লোকালয় প্লাবিত হয়ে যায়, তখনই কেবল আটকে পড়া পানির পক্ষে নদীবাহিত হয়ে সাগরের সাথে মিলিত হওয়া সম্ভব হয়। অনুরুপভাবে আল্লাহ থেকে আগত মানুষের ভিতরে আটকে পড়া রুহ কোন না কোন মহামানবের সান্নিধ্যে গিয়ে নিজের মাঝে ফায়েজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেমের জোয়ার আনতে পারলে আল্লাহতে বিলীন হয়ে চির মুক্তি লাভ করতে পারে।

আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট মানুষ সাধনা করে যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সাথে পুনরায় আল্লাহতে মিলিত হতে না পারবে, ততক্ষণে সে চিরমুক্তি লাভ করবে না। আল্লাহ প্রাপ্ত সাধকের অভিজ্ঞতালব্দ বিশ্লেষণে ‘ফানা’ সূফীদের সাধনার একটি অতি উঁচু স্তরের নাম। যে স্তরে সাধক গভীর সাধনার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহতে বিলীন করে দিয়ে একাকার হয়ে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়ে ফানা ফিল্লাহ হাসিল করে।

মানুষের নফস পরিশুদ্ধি লাভ করতঃ রুহের আনুগত্য স্বীকার করে তার সাথে মিলিত হতে পারে। আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী রুহের ভিতরে আল্লাহর যাবতীয় গুণাবলি বিদ্যমান। পরিশুদ্ধ নফস রুহের সাথে মিলিত অবস্থায় আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হয় এবং তাঁর প্রেমাকর্ষণে নিজেকে সম্পূর্ণরুপে আল্লাহতে বিলীন করে ফেলে। এভাবে মানুষ ফানা ফিল্লাহ হাসিল করে।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনার পাশাপাশি তাসাউফের সাধনা দ্বারা ফানা বলতে আমি যা বুঝেছি, তা হলো সাধনার পথে সাধকগণকে ফানার ৩টি স্তর অতিক্রম করতে হয়। যথা – ১/ ফানা ফিশ শায়েখ ২/ ফানা ফির রাসূল এবং ৩/ ফানা ফিল্লাহ। প্রত্যেকটি ফানাকে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন – সাধারণ ফানা, আদর্শ ফানা এবং মোকাম্মেল ফানা। সে মতে ফানা ফিশ শায়েখ এর ৩টি স্তর হলো – সাধারণ ফানা ফিশ শায়েখ, আদর্শ ফানা ফিশ শায়েখ এবং মোকাম্মেল ফানা ফিশ শায়েখ।

সাধারণ ফানা ফিশ শায়েখ অর্জন হলে আপন মোর্শেদের কথা স্মরণ হওয়া মাত্রই সাধকের কান্না আসবে। এ অবস্থায় আরো এক ধাপ অগ্রগতি হলে সাধক আদর্শ ফানা ফিশ শায়েখ অর্জন করে। তখন সাধক যে দিকে তাকাবে সর্বত্রই মোর্শেদের চেহারা মোবারক সামনে দেখতে পায়। এ অবস্থায় আরো এক ধাপ অগ্রগতি হলে সাধক মোকাম্মেল ফানা ফিশ শায়েখ এর স্তরে পৌঁছে যায়। এ অবস্থায় সাধক নিজেকে মোর্শেদের সাথে মিশে একাকার দেখতে পায়। এ স্তরে পৌঁছলে মোর্শেদ উক্ত মুরীদকে হযরত রাসূল পাক সঃ এর হাতে তুলে দেন। তখন তার ফানা ফির রাসূল হাসিল হয়। ফানা ফির রাসূলের ৩টি অবস্থা। যথা সাধারণ ফানা ফির রাসূল, আদর্শ ফানা ফির রাসূল এবং মোকাম্মেল ফানা ফির রাসূল।

সাধক যখন সাধনা করে সাধারণ ফানা ফির রাসূল অর্জন করে, তখন হযরত রাসূল পাক সঃ এর নাম শোনা মাত্রই তার কান্না আসতে থাকে। এ থেকে আর এক ধাপ অতিক্রম করে সাধকের যখন আদর্শ ফানা ফির রাসূল হাসিল হয়, তখন সে যেদিকে তাকায় সেদিকেই রাসূল পাক সঃ এর চেহারা মোবারক দেখতে পায়। এ অবস্থায় সাধক সাধনা করতে করতে আরো এক স্তর উপরে চলে যায়, যাকে মোকাম্মেল ফানা ফির রাসূল বলে। এ অবস্থায় সাধক নিজেকে রাসূল পাক সঃ এর সাথে মিশে একাকার দেখতে পায়। তখন হযরত রাসূল পাক সঃ ঐ আশেককে আল্লাহর হাতে তুলে দেন। তাকে ফানা ফিল্লাহ বলা হয়।

ফানাফিল্লাহর ৩টি অবস্থা রয়েছে। সাধারণ ফানা ফিল্লাহ, আদর্শ ফানা ফিল্লাহ এবং মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ। সাধক যখন সাধনা করে সাধারণ ফানা ফিল্লাহ অর্জন করতে সক্ষম হয় ঐ অবস্থায় সে আল্লাহর নাম শুনলেই কাঁদতে থাকে। সাধনার মাধ্যমে যখন সাধক আর এক ধাপ এগিয়ে যায়, তখন তার আদর্শ ফানা ফিল্লাহ হাসিল হয়। এ অবস্থায় সাধক যেদিকে তাকায় সেদিকেই আল্লাহর চেহারা মোবারক দেখতে পায়। পবিত্র কুরআনে এ

প্রসঙ্গেই আল্লাহ এরশাদ করেন,
“তুমি যেদিকেই তাকাও সেদিকেই আল্লাহর চেহারা মোবারক বিদ্যমান রয়েছে।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত নং ১১৫)।

আল্লাহ প্রেমিক সাধক যখন সাধনা করতে করতে আরো একটি স্তর অতিক্রম করে তখন তাকে মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ বলে। এ অবস্থায় সাধক নিজেকে আল্লাহর সাথে মিশে একাকার দেখতে পায়।

ফানাফিল্লাহর অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল সঃ বলেছেন,
“যে আমাকে দেখেছে সে হককে (আল্লাহ ) দেখেছে।”

সাধক প্রবর হযরত মোজাদ্দেদ আলফেনাসী রঃ বলেছেন,
“আমার প্রশাংসা করাই তোমাদের জন্য আল্লাহর ইবাদত।”

হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রঃ বলেছেন,
“আমার জামার নীচে যা আছে তা আল্লাহ ছাড়া আর কিছু নয়।”

হযরত মনসুর হিল্লাজ রঃ বলেছেন,
“আনাল হক। অর্থ- আমিই হক”

ফানাফিল্লাহ বিষয়টি একটি উপমার মাধ্যমে পরিস্কার বুঝা যায়, জ্বীন মানুষের উপর ভর করে তার সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। তখন মানুষের মুখ ব্যবহার করে জ্বীন কথা বলে, মানুষের হাত দিয়ে জ্বীন ধরে, মানুষের পা দিয়ে জ্বীন হাঁটে, মানুষের চোখ দিয়ে জ্বীন দেখে ও মানুষের কান দিয়ে জ্বীন শোনে। অনুরুপভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বন্ধুদের সাথে মিশে একাকার হয়ে তাঁর অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিজের করে নিয়ে থাকেন। আল্লাহ প্রাপ্তির পথে সাধকদের জন্য উহাই সর্বোচ্চ মাকাম। আর এই ফানাফিল্লাহর স্তর স্থায়িত্ব লাভ করাকেই বাকাবিল্লাহ বলে।

পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফের উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষ ক্বালবী জ্ঞান অর্জন করে ফানা ফিশ শায়েখ, ফানা ফির রাসূল এবং ফানা ফিল্লাহ হাসিল করে মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে মিশে একাকার হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: আল্লাহ কোন পথে? লেখক: হযরত শাহ দেওয়ানবাগী (রঃ)।

নিবেদক: অধম পাপী মোজাম্মেল পাগলা।

পূর্ববর্তী পোস্টনিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা সম্মানিত
পরবর্তী পোস্টহিন্দু শব্দের অর্থ কি
অধম ভিখারি তোমার দুয়ারে নতশিরে দাঁড়িয়ে আছে। চরণ ভিক্ষা দাও, নচেৎ গলাটিপে মেরে ফেলো।