Tuesday, 9 Mar 2021

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

রোজা কি এবং রোজার হাকিকত।

রোজা’ শব্দটি ফারসি। আরবিতে এ শব্দটিকে ‘সাওম’ বলা হয়। ‘সাওম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। রোজার পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো- সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার, কামাচার ও পাপাচার হতে বিরত থেকে অন্তরে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকাকে ‘সাওম’ বা রোজা বলে।

বস্তুত রোজা রাখার বিধান সর্বযুগে ছিল। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবি-রাসুলের যুগেই রোজার বিধান চালু ছিল। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন- “হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মোত্তাকি হতে পারো।” (সূরা আল বাকারাহ : আয়াত ১৮৩) সুতরাং রেজা কেবল উম্মতে মোহাম্মদীর উপরই ফরজ করা হয়নি বরং রোজা রাখার বিধান পূর্ববর্তী যুগেও প্রচলিত ছিল।

রোজার হাকিকত হলো মু’মিনগণ রোজা পালনের মাধ্যমে আত্মিক দোষত্রুটি সংশোধন করে পরিশুদ্ধ হতে পারেন। আত্মাশুদ্ধ না হলে কোনো ইবাদতই শুদ্ধভাবে পালন করা যায় না। কেননা নফ্স বা জীবাত্মা কু-রিপুমুক্ত না হলে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় এখলাস তথা একনিষ্ঠতা অর্জন করা যায় না। রোজা মানুষের কু-রিপুসমূহকে সংযমী করে শুদ্ধভাবে ইবাদতের পথ সৃষ্টি করে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে রোজা পালনের মাধ্যমে যারা নিজের জীবপ্রবৃত্তিকে পরিশুদ্ধ করে হৃদয়ে আল্লাহ্কে লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারাই সফলতা লাভ করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন (মহান আল্লাহ্ বলেন)- “রোজা আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমি নিজেই।” (বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড : পৃষ্ঠা ২৫৪) আর রোজার মাধ্যমে আল্লাহ্কে পাওয়ার অর্থ হলো নিজের মাঝে আল্লাহর চরিত্র বিকশিত হওয়া। মূলে হাকিকতে রোজা হচ্ছে- মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে রোজা পালনের মাধ্যমে অন্তরের পাপ কালিমা দূর করে হৃদয়ের মাঝে বিরাজমান আল্লাহর সুপ্ত নূর বিকশিত করা এবং আল্লাহর চরিত্রে নিজেকে চরিত্রবান করা।

আর একটু সহজ করলে দাঁড়ায়, ষড়রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য আর দেহের ইন্দ্রিয় শক্তি এবং ভোরবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সকল পাপ কাজ এবং পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। যেমন – মাথা দ্বারা কোন খারাপ চিন্তা করা যাবে না, কান দ্বারা খারাপ কিছু শুনা যাবে না, নাক দ্বারা খারাপ গন্ধ শুকা যাবে না, মুখ দ্বারা মিথ্যা কথা বলা যাবে না, চোখ দ্বারা খারাপ কিছু দেখা যাবে না,হাত দ্বারা খারাপ কাজ করা যাবে না, লিঙ্গ দ্বারা খারাপ কিছু করা যাবে না এবং পা দ্বারা খারাপ কাজে ধাবিত হওয়া যাবে না। এগুলো থেকে বিরত থাকার নামই রোজা। এই জন্য আল্লাহ তায়ালা বলছেন সিয়াম সাধনা করো এবং রোজার মাস হল ট্রেনিং এর মাস। আচ্ছা বলুন তো ভাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার নাম কি সাধনা হতে পারে। এটা যেকোনো বাচ্চা ছেলে-মেয়েও পারে। মূলত সকল পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার নাম হল সাধনা। যা প্রতিটি মানুষের জন্য কষ্ট সাধ্য হয়ে যায়। সকল পাপ কাজ এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার নাম রোজা। শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকার নাম রোজা নয়। তাহলে এক প্লেট ভাত খেলে যদি রোজা ভঙ্গ হয়, তাহলে একটি মিথ্যা কথা বললে কেনো রোজা ভঙ্গ হবে না।

যেহেতু আল্লাহ নিজেই রোজার প্রতিদান, তাই যার রোজা আল্লাহ কবুল করবেন তাকে শেষ রোজার দিন অবশ্যই সাক্ষাৎ দিয়ে পুরস্কার করবেন। যদি আল্লাহ আপনাকে সাক্ষাৎ না দেয়, তাহলে ভেবে নিবেন আল্লাহ আপনার রোজা কবুল করে নাই। কিন্তু হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে পরবর্তী রোজা মাসের জন্য অপেক্ষা করুন এবং কঠোর সাধনায় লিপ্ত হোন। কারণ রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিজের সকল পাপ কাজ থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে আল্লাহকে পাওয়া। যেহেতু রোজা অর্থ সকল পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। তাই সাধকের জন্য রোজা কখনো এক মাস হতে পারে না। বরং ১২ মাস ২৪ ঘন্টা প্রতিটি সেকেন্ড মৃত্যু আগ পর্যন্ত। শুধুমাত্র সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকাটা বাদ যাবে। এবার আপনার জীবন থেকে মিলিয়ে নিন আপনি কখনো একটি রোজা রেখেছেন কিনা নাকি এতোদিন এজিদের শিক্ষা অনুযায়ী রোজা রেখেছেন। এজিদের রোজা আর আল্লাহর বিধান মোতাবেক অর্থাৎ মোহাম্মদী ইসলামের রোজা এক নয়।

প্রকৃত রোজা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, রোজা পালনকারীগণ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা- (১) সাধারণ শ্রেণির রোজা, (২) মধ্যম শ্রেণির রোজা (৩) উচ্চ শ্রেণির রোজা বা হাকিকতে রোজা।

সাধারণ শ্রেণির রোজা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধুমাত্র পানাহার ও কামাচার হতে বিরত থেকে রোজা পালন করাকে সাধারণ শ্রেণির রোজা বলে।

মধ্যম শ্রেণির রোজা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও পাপাচার হতে বিরত থেকে রোজা পালন করাকে মধ্যম শ্রেণির রোজা বলে।

উচ্চ শ্রেণির রোজা বা হাকিকতে রোজা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার, পাপাচার ও পাপের কল্পনা হতে বিরত থেকে সর্বক্ষণ ক্বালবে আল্লাহর জ্বিকির বা স্মরণে নিমগ্ন থেকে রোজা পালন করাকে উচ্চ শ্রেণির রোজা বা হাকিকতে রোজা বলে।

মূলত হাকিকতে রোজা পালনের জন্য আওলিয়ায়ে কেরামের সহবত লাভ এবং ক্বালবে আল্লাহর জ্বিকির জারি করা প্রয়োজন।

সূত্র: মোহাম্মদী ইসলামের বিভিন্ন কিতাবসমূহ।
নিবেদ : অধম পাপী মোজাম্মেল পাগলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!
Copy link
Powered by Social Snap