মায়া – অন্তর্নিহিত গোপন শক্তি

মায়া – অন্তর্নিহিত গোপন শক্তি

মায়া – যা সৃষ্টির প্রাথমিক শক্তি, এক ধরনের স্বকীয় আকর্ষণ যা জগতের মূল কাঠামোকে শক্তি দেয়। এটি যে সর্বব্যাপী, তা নয়, বরং একটি অন্তর্নিহিত গোপন শক্তি, যা সমস্ত সত্তার মাঝে বিরাজমান। প্রতিটি সত্তা, অস্তিত্বের নিজস্ব আকর্ষণে, একে অপরকে নিজের দিকে টানে, একে অপরের দিকে পৌঁছানোর জন্য। এই আকর্ষণই মায়া, যা সৃষ্টির প্রথম ধারাবাহিকতার পথ তৈরি করে। কিন্তু এই আকর্ষণের সূত্র কোথাও গোপন থাকে—এটি আমাদের দৃষ্টির বাইরে। মায়া, যদিও জীবনের পরিপূরক, কিন্তু সেই একই মায়া একে অপরের জন্য সঙ্কট সৃষ্টি করতে থাকে, যখন তার মধ্যে থাকে নৈকট্য, মিলন, বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা।

যতই সত্তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে যায়, ততই তাদের একে অপরের মধ্যে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের অস্তিত্ব ফুটে ওঠে। যতক্ষণ তারা নিজেদেরকে বিভাজিত এবং ভিন্নভাবে অনুভব করে, ততক্ষণ তারা সৃষ্টির ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। কিন্তু একসময়, এই মায়া যখন পূর্ণতা লাভ করে, তখন সে নিজেই সংকট তৈরি করে, যা তাদের মধ্যে বিভাজনকে শেষ করে দেয়। সেই বিভাজন শেষ হতে, সেই একীকরণের প্রবণতায়, মায়া তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, একটি গভীর বিপর্যয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে মায়ার সংযোগ বা আকর্ষণ নিজেই তার অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক গতি অনুযায়ী বিপরীত হয়ে যায়—মায়া অবশেষে নিজের অবসান ঘটায়।

এই অবসান সৃষ্টির অনস্বীকার্য পরিণতি—এটি চিরন্তন সত্যের আবির্ভাবের শর্ত সৃষ্টি করে, যেখানে সত্তা ও সৃষ্টির বিভাজন দূরীভূত হয়ে এক অদ্ভুত সমন্বয়ের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির এই শেষতম ধাপেও, আমরা দেখতে পাই মায়ার চিরন্তন অবক্ষয়—যে শক্তি এককালের মধ্যে সমস্ত সত্তাকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কাজ করেছিল, সেটি এখন তার নিজস্ব অনুঘটক হয়ে ওঠে।

তবে, এই অবসানের মধ্য দিয়ে, সৃষ্টির মূল সত্যের প্রকৃতির আবিষ্কার ঘটে। এই সত্য হলো—যেখানে মায়া এক সময় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, সেখানে একসময় তা অস্তিত্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে একটি চিরস্থায়ী শক্তির আবির্ভাব ঘটায়, যা শাশ্বত একত্বের উপলব্ধি করে। সৃষ্টির সর্বোচ্চ বোধ, একসময় অজানা ছিল, কিন্তু মায়ার অবসানের পর, সেই একমাত্র সত্যকে আবিষ্কার করা হয়, যা কোনো ভ্রান্তির অন্তর্গত নয়।

এটি একটি গোপন অধ্যায়—যেখানে সৃষ্টির সমস্ত জটিলতা, দ্বন্দ্ব এবং প্রতিক্রিয়াগুলি একসময় সুষমাবস্থায় একত্রিত হয়ে তাদের অতিরিক্ত মাত্রা হারায় এবং এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। সৃষ্টির এই গতি, যেখানে সকল কিছু মিলিত হয়ে এক সত্তায় পরিণত হয়, তা বুঝতে গেলে আমাদের ভেতরের “আমি”-কে মুক্তি দিতে হবে, সেই “আমি” যা মায়ার দ্বারা আবদ্ধ ছিল। যখন “আমি” মায়ার ফাঁদে বন্দী থাকে, তখন সে নিজে মিথ্যার অন্ধকারে ঘুরতে থাকে। কিন্তু একসময়, এই মায়ার অন্তর্নিহিত সত্য আবিষ্কৃত হয়, এবং “আমি” তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

এই পর্যায়ে আমরা দেখি, মায়া যা প্রথমে আমাদের অন্তর্নিহিত শক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা একসময় নিজের অপূর্ণতার মাধ্যমে এক শাশ্বত সত্যের দিকে পরিচালিত করে। এর মধ্য দিয়ে আমরা “আমি”-এর মুক্তি এবং ঐক্যের এক গভীর উপলব্ধি লাভ করি, যা সৃষ্টির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে।

–ফরহাদ ইবনে রেহান

২৩/০৩/২০২৫

আরো পড়ুনঃ