হোম আত্ম সচেতনতা জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও আদম-ইনসানের স্বরূপ

জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও আদম-ইনসানের স্বরূপ

জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও আদম-ইনসানের স্বরূপ

জ্ঞান:

ইন্দিয় অনুভূতির নির্ভুল ধারনাকে জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞান ব্যক্তিসত্তাকে পরিশুদ্ধ করে, জ্ঞান মন ও বিবেকের মধ্যে প্রক্রিয়া স্বরূপ যন্ত্র। জ্ঞান শক্তিস্বরূপ। চিত্তের চাওয়া পাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে জ্ঞান। জ্ঞান ইন্দ্রিয়সমূহকে বিশুদ্ধ করে। জ্ঞানের উদয় হয় ব্যক্তিসত্তার অন্তরলোকে। বাহির থেকে ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ব্যক্তিসত্তার মধ্যে যা প্রবেশ করে তা জ্ঞান নয়, তাকে তথ্য বলে অভিহিত করা হয়। ইন্দ্রিয়ের পথে আসা উপাদানসমূহের নির্যাস হল জ্ঞানের প্রকাশ। এই জ্ঞানই ব্যক্তিসত্তার দেহ ও মনকে নূরময় করে। দেহ ও মনকে পবিত্র করে। এই জ্ঞান শিখাই ব্যক্তির ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত রাখতে। রূপ, রস, আনন্দ, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ, দৃশ্য ইত্যাদি বিষয়সমূহ ব্যক্তির ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করে। এই ইন্দ্রিয়কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথাঃ স্থুল ইন্দ্রিয় পাঁচটি ও সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় পাঁচটি।

মোট ইন্দ্রিয় দশটি। স্থুল ইন্দ্রিয়সমূহ হল: হাত- পা- মুখ – লিঙ্গ – পায়ুপথ। আর সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়সমূহ হল চুক্ষ- কর্ণ- নাসিকা – জিহবা – ত্বক। এই দশটি ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে ব্যক্তিসত্তার মধ্যে জ্ঞানের আর্বিভাব হয়। ব্যক্তিসত্তায় নব রঙ্গের ব্যঞ্জনা তৈরী করে। ইন্দ্রিয়সমূহের আকর্ষণ ও বিকর্ষণের প্রভাবে ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ভাবের উদয় হয়।ভাবের মধ্যে অনুভূতির স্পর্শ উপলব্ধি হয়। উপলব্ধি নির্ভুল হলে জ্ঞানালোক প্রস্ফুটিত হয়। বুদ্ধি এবং যুক্তির অবসান হলে কলবের জ্ঞান জাগরূক হয়। জ্ঞান পবিত্রতার প্রতীক।

প্রজ্ঞা:

ইংরেজি wisdom শব্দের অর্থ হল প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার সংজ্ঞা এইভাবে নির্ণয় করা যায় যে, অন্তর দৃষ্টির নির্ভুল বিচার বিশ্লেষণের ভারসাম্যকে বলে প্রজ্ঞা। জ্ঞানকে মৈথুন করলে প্রজ্ঞার জম্ম হয়। প্রাজ্ঞ ব্যক্তির অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে বলে প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা দূরদৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত। প্রজ্ঞান পুরুষ ত্রিকালদর্শী। জ্ঞান ইন্দ্রিয়লব্ধ কিন্তু প্রজ্ঞা ইন্দ্রিয়ের অতীত। অতীন্দ্রিয়ই বিষয়।যাদের অন্তরের চক্ষু খোলা তাঁরাই প্রজ্ঞানপুরুষ। সৃজনশীলতা, নন্দনশীলতা ও প্রতিভার বিচ্ছুরণকে প্রজ্ঞার বিকাশক বলা হয়। প্রজ্ঞা বিদ্যজ্ঞান তথা দিব্যদৃষ্টির প্রতীক। প্রজ্ঞান পুরুষদের কামেল বলা হয়। তাঁদের রাসেখুনা ফিল এলেম বলা হয় তথা বোধশক্তিসম্পন্ন জ্ঞানী বলা হয়। সত্যদ্রষ্টা পূর্ণমানব তথা আদম অর্থে ব্যবহার করা যায়।

আদম ও ইনসানের স্বরূপ:

আদম কোরানিক শব্দ, আদম শব্দের অর্থ হল পরিপূর্ণ মানব। আদি+ইমন= আদম। আদমের ধাতু তথা প্রকৃতি হল আদি। আদি মানে আউয়াল। আদি মানে পুরাতন শক্তি কাদিম। যার ক্ষয় নাই, লয় নাই, বিনাশ নাই তাকেই কাদিম তথা আদি তথা পুরাতন বলে। ইনসান তথা মানুষ যখন বিবর্তনবাদে আবর্তিত হয়ে পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করে তাকে বলে আদম। আদম বিবর্তনবাদের সর্বশেষ ধাপ। আদম পূর্ণজ্ঞানী। ইনসান তথা মানুষ শরীক। কিন্তু আদম লা- শারিক। ইনসানের সাথে খান্নাস জড়িত রয়েছে। ইনসান যখন খান্নাস নামক জিন স্বভাব ত্যাগ করে তখন সে বাশাররূপ ধারণ করে। আদমের মধ্যে পুরাতন কদিমী শক্তি রূহরূপী রব জাগ্রত। আদম পুতপবিত্র। আদম আল্লাহর চেহারা, আদম আল্লাহর মাঝার। আদম সত্যদ্রষ্টা, আদম সৃষ্টির বন্ধনে আবদ্ধ নয়।যদিও তাকে সৃষ্টি মনে হয়। আদম দেখতে বাশার সুরত।আদম জৈবিক চাহিদার আকর্ষণ হতে মুক্ত।আদমকে ফেরেস্তা প্রকৃতির সত্তাগণ সিজদা করেন।

আদম আল্লাহর জাত নূর না হলে তাকে ফেরেস্তাগণ সিজদা দিত না, তা না হলে শিরিক হতো। আদম লা মোকামের বাসিন্দা। তাই আদম আশরাফুল মখলুকাত নয়। আশরাফুল মখলুকাত ইনসান। ইনসান আর মখলুক আবার আলাদা বিষয়। ইনসানের মধ্যে জীবত্ব ও পরমত্ব উভয়ই স্বভাবই রয়েছে।কিন্তু আদমের মধ্যে জীবত্বের ভাব নেই। আদম পরম। তাই আদম আল্লাহর নিশানা। আদম পর্যযায়ের অধিবাসীদের নিয়ে আল্লাহ আমরারূপ ধারণ করেন। আদম অখন্ড মহাকালের উপর চীর ভাস্কর। ইনসান খন্ডিত কালের মধ্যে আবর্তিত। আদম কামুক নয়, আদম প্রেমিক। আদম ভুল করতে পারে না। আদমকে কেউ ভুল বুঝাতে পারে না। আদমের ভিতর ও বাহির এক ও অভিন্ন। আদম সৃজনীশক্তির অধিকারী।

যেহেতু আদম আল্লাহর জাতনূর। তাই ইনসান পর্যায়ের নর নারীগণ আদমের কদমে সিজদা দিয়ে আনুগত্য গ্রহণ করতে হবে। জাত কে কেবল সিফাতই সিজদা দিতে পারে। সিফাত কখনো সিফাতকে সিজদা দেয় না।  ইনসান আদম ব্যতীত অন্যত্র সিজদা দিলে ইবলেশে পরিণত হবে। ইনসান আদমকে সিজদা না দিলে, আনুগত্য না করলে তার জন্য মুক্তির পথ বন্ধ। মুক্তি পেতে হলে ফেরেস্তাদের সুন্নত পালন করতেই হবে।  কারণ সত্যের পরিবর্তে মিথ্যা তথা অনুমানের কোনো মূল্য নেই। আদমই খোদা পরিচিত ব্যক্তি। আদমই খোদাকে প্রকাশ করেছেন। আদমই স্বীয় আধারে আল্লাহকে প্রকাশ করেছেন। আর কাফের ইনসানগণ আল্লাহকে নিজের মধ্যে ঢেকে রাখেন। কাফেরগণ আল্লাহকে প্রকাশ হতে দেয় না। তারা খান্নাস নামক পর্দা দ্বারা আল্লাহকে ঢেকে রাখেন। এবং আল্লাহকে দন্ডিত করে এবং বঞ্চিত করে। পবিত্র কোরানিক দর্শন জানান দিচ্ছে এই মানবরূপী বাশারের মধ্যে তিন মর্যাদার অধিবাসীর অবস্থান। এই মানবরূপী পোশাকের মধ্যে আদম ইনসান ও খান্নাসরূপী শয়তানটি রয়েছে। দেখতে মানবই মনে হয়।গুণ অনুসারে তিন কাতার। যে আদমের গুণ অর্জন করেছেন সে সিজদার যোগ্য। যে ইনসানিয়াতের গুণ অর্জন করেছেন সে জান্নাতি এবং যার মধ্যে আদম ও ইনসানের গুণ নাই ওইটা খান্নাসরূপী শয়তান তথা জাহান্নামী।

ইনসান:

ইনসান কোরানিক শব্দ। যার বাংলা পরিভাষা মানুষ। বিচারে মানুষ অবিচারে পশু। মখলুক হতে ইনসান নির্বাচন করা হয়। আর এই ইনসানকে বলা হয় আশরাফুল মখলুকাত।

– আর এফ রাসেল আহমেদ

পূর্ববর্তী পোস্টকোরানিক দর্শনে বর্নিত পর্দার হকিকত
পরবর্তী পোস্টইসলামে পর্দা মানে কি
Quranik philosophy and sufism.

এই পোস্টে একটি মন্তব্য করুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন