ইতিহাসের বিস্মৃত ধ্রুবতারা: হযরত মাওলানা প্রফেসর আবদুল খালেক (রা.)
লেখক ও গবেষক: কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী
ইতিহাস কখনো কলম সৈনিকদের কাছ থেকে হারিয়ে যায় না, বরং সত্যের সন্ধানে তা বারবার ফিরে আসে। আজ আমি এমন এক মহান পুরুষকে ইতিহাসের পাতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার তাগিদে কলম ধরেছি, যিনি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন প্রায় সত্তর বছরেরও বেশি সময় আগে। অথচ সমকালীন ইতিহাসে তাঁর প্রভাব ও অবদান আজও এক অনন্য ও অপরিহার্য উপজীব্য বিষয়। ১৮৯২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছতুরা গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই মহামনীষী ছিলেন একাধারে মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)—এর সংস্কারমূলক আন্দোলন যখন উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, ঠিক তখনই তাঁর এক সুযোগ্য ও শক্তিশালী শিষ্য বাংলা ও ভারতে জ্ঞানের দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদকজয়ী এই কৃতি পুরুষ তাঁর কর্মজীবনে ভারতের ঐতিহাসিক ফেনী সরকারি কলেজ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক প্রেসিডেন্সি কলেজ), লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ (কলকাতা), বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ এবং ইডেন মহিলা কলেজের মতো প্রথিতযশা বিদ্যাপীঠগুলোতে অত্যন্ত সফলতার সাথে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আধ্যাত্মিক বেলায়াতের নূরের সামনে তৎকালীন সময়ের তেজদীপ্ত সূর্যসন্তান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং কবি ফররুখ আহমদের মতো ব্যক্তিত্বরা গভীর শ্রদ্ধা ও মস্তক অবনত রাখতেন।
তিনি কেবল একজন আদর্শ শিক্ষকই ছিলেন না, বরং ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় গঠিত ‘বোর্ড অব তালিমাতে ইসলামিয়া’র একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এম.এল.এ নির্বাচিত হয়ে গণমানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। জীবনের এক কঠিন পরীক্ষায় ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টেইলর হোস্টেলের ছাত্রদের রক্ষায় তিনি যে অদম্য সাহস ও রূহানি দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকচিহ্ন হয়ে আছে; এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও এই সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি ছিলেন চার তরিক্বার খেলাফতপ্রাপ্ত এক মুকাম্মেল পীর, যাঁর রূহানি ছোঁয়ায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শান্তি খুঁজে পেতেন এবং কবি ফররুখ আহমদ তাঁর আদর্শিক রূপান্তর ঘটিয়ে ইসলামের পথে ধাবিত হয়েছিলেন।
তাঁর রচিত ‘ছেরাজুস্—সালেকীন’ ও ‘সাইয়েদুল মুরসালীন’—এর মতো কালজয়ী গ্রন্থগুলো আজও পাঠকদের জ্ঞানপিপাসা মিটিয়ে চলেছে। সমকালীন প্রেক্ষাপটে এমন একজন বহুমাত্রিক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ইতিহাসে বিরল, যিনি একইসাথে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, দূরদর্শী সংসদ সদস্য, তীক্ষ্ণ কলমধারী কলামিস্ট ও লেখক এবং একজন কামেল পীরে তরিকত হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে অকল্পনীয় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। উচ্চতর ডিগ্রি ও আধ্যাত্মিক সাধনার এমন বিরল সমন্বয় সচরাচর চোখে পড়ে না। তিনি আর কেউ নন, তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম বরেণ্য সন্তানদের একজন— হযরত মাওলানা প্রফেসর আবদুল খালেক (রা.)।
১৯৫৫ সালের ২রা এপ্রিল তাঁর ইন্তিকালে বাংলা হারিয়েছে এক অনন্য অভিভাবককে, কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছতুরা দরবার শরীফ ও তাঁর আদর্শ আজও যুগ যুগ ধরে দিশারী হিসেবে কাজ করছে। আজও আকাশছোঁয়া সেই রূহানী রহমতের ছায়া তাঁর ভক্ত ও মুরিদানদের আগলে রেখেছে। প্রতিদিন রাতে শত শত তৃষ্ণার্থ মানুষ তাঁর রূহানি তাওয়াজ্জুহ ও ফয়েজ—বরকত হাসিল করতে চাতক পাখির মতো ছুটে যান ছতুরা দরবার শরীফে। তাঁর বার্ষিক ইছালে সওয়াব মাহফিলে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমুদ্র জানান দেয়, তিনি আল্লাহর দরবারে কতই না মকবুল ও প্রিয় ছিলেন? তাঁর পবিত্র মাজার শরীফ আজ কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং এটি এক আধ্যাত্মিক শান্তির নীড়—যেখানে পথহারা মানুষ ফিরে পায় সঠিক দিশা, আর অশান্ত আত্মা খুঁজে পায় পরম প্রশান্তি।
তাঁর বিচ্ছুরিত রূহানি নূরের উপস্থিতিতে ভক্তকূল আজও অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহ ও নবী আলাইহিস সালামের প্রেমের চেরাগ জ্বালিয়ে নিচ্ছে এবং সেই রহমতের স্নিগ্ধ শীতল ছায়ায় অবগাহন করে ধন্য হচ্ছে।






