ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)—এর আধ্যাত্মিক প্রভাব।
রাসূলনোমা হযরতুল্লামা শাহ সুফি সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)—এর আধ্যাত্মিক প্রভাব।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে তাসাউফ এমন এক শান্তির পথ, যা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে; আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। নবী—রাসূলদের ধারাবাহিকতায় এই আধ্যাত্মিক জাগরণের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন, অগণিত আউলিয়ায়ে কেরাম। তাঁরা মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন, প্রকৃত মালিক—আল্লাহ তাআলার সঙ্গে, যিনি পরম সত্য, সর্বশক্তিমান ও সর্বদাতা। আর হযরত মুহাম্মাদে মুস্তফা আহমদে মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল এবং রাহমাতুল্লিল আলামিন। ইসলামের এই নূরানি পথকে যুগান্তরে সত্য ও সৌন্দর্যের বাণী হিসেবে মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নানা সাধক। তাঁদেরই একজন ছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি ফারসি কবি, প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ এবং অসামান্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব— হযরতুল আল্লামা শাহ সুফি সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)।

সুফি ফতেহ আলী (রহ.) ১৮২৩ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার আমিরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তাঁর মন আলোর পথে, জ্ঞানের পথে আকৃষ্ট ছিল। জীবনের বড় অংশ তিনি কাটিয়েছেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে। শিক্ষা—দীক্ষায় ছিলেন অসাধারণ; কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় তিনি কেবল ছাত্রই ছিলেন না, পরবর্তীতে শিক্ষক হিসেবেও জ্ঞান ও আলো ছড়িয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একাধারে সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ এবং ধর্মতাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
দিওয়ান—ই—ওয়াইসি, যা ফারসি ভাষায় রচিত, হযরত সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসির হৃদয়ের গভীর নবীপ্রেমের এক অমর সাক্ষ্য। এটি কেবল সাহিত্য নয়, বরং আশেকে রাসূলদের হৃদয়ের জন্য আধ্যাত্মিক খোরাক হিসেবে সমাদৃত। দিওয়ানটির প্রতিটি লাইন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নবীর প্রতি অন্তরের আনুগত্যকে ফুটিয়ে তোলে, যা পাঠককে গভীর ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে।
এই দিওয়ানটি পীরকন্যা সৈয়দা জোহরা খাতুনের কাছে সংরক্ষিত ছিল, যার মাধ্যমে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আধ্যাত্মিক ধারা বহন করে। ফারসি ভাষার মাধুর্য ও ছন্দের সঙ্গে লেখা এই গ্রন্থটি মন ও হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, পাঠককে নবীজির প্রতি প্রেম ও ভক্তিতে উদ্বুদ্ধ করে।
বাংলা ভাষায় অনুবাদ হওয়া এই দিওয়ান—ই—ওয়াইসি আজও বাংলা ও ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা অনুসারীদের অন্তরে নবীজির প্রতি প্রেম এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের আকর্ষণ জাগিয়ে দেয়।
তার বিখ্যাত দিওয়ান—এর সেই মোহনীয় কলি—
“মাশরেকে হুব্বে মুহাম্মদ মাতলায়ে দিওয়ানে মা,
মাতলায়ে খুরশিদে ইশকে শিনায়ে সুজানে মা।”
অনুবাদ— আমাদের সব ভালোবাসা ও পথচলার শুরু নবীজি (দ.)—এর প্রেম থেকে।
আমাদের হৃদয়ের জ্বালা—জোশ—উত্তেজনাও সেই নবীপ্রেমই জাগিয়ে তোলে।
এই দুই পংক্তি যেন কোনো দিগন্তভরা ভোরের আলো—
যেখানে প্রথম সূর্যকিরণ হিসেবে উদিত হয় নবীর প্রতি প্রেমের অনির্বচনীয় জ্যোতি।
কবি যেন বলতে চান—
মুহাম্মদী প্রেমই হৃদয়ের আকাশে প্রকৃত সূর্যোদয়;
এ আলো না থাকলে হৃদয় যতই বিস্তীর্ণ হোক, তবু তা অন্ধকারেই ডুবে থাকে।
কবির ভাষায়,
যেদিন অন্তর—মশকের পূর্বাকাশে নবীপ্রেমের সূর্য ওঠে,
সেদিন মানুষ তার নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব অমানিশা ভুলে যায়।
ইশকের সেই খুরশিদ যখন সম্পূর্ণ রূপে উদিত হয়,
তখন হৃদয়ের সিনা—অন্তরলোক—
সুজনের বাগানে পরিণত হয়,
যেখানে শুধু নূর, শুধু শান্তি, শুধু রাহমতের সুবাস।
এই পংক্তি তাই কোনো সাধারণ কবিতার কলি নয়—
এ হলো নবীপ্রেমে দীপ্ত এক আধ্যাত্মিক জাগরণের সুর,
যা যুগে যুগে মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করেছে,
আল্লাহর পথে ফিরিয়ে এনেছে,
অন্তরজগতকে সৌন্দর্যের নতুন ভাষা শিখিয়েছে।

হযরত সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)—কে প্রায়শই “রাসূলনোমা” বলা হতো, কারণ তিনি মানুষকে রাসূল (দ.)—এর জিয়ারত লাভের বিশেষ সুযোগ প্রদান করতে পারতেন। তাঁর প্রসিদ্ধ নাম ওয়াইসি, এবং এই নামের সঙ্গে যুক্ত তাঁর আধ্যাত্মিক পদ্ধতি, যা তিনি নিজের জীবনে প্রয়োগ করে অনুসারীদের মধ্যে বিস্তৃত করেছিলেন। তিনি এই পদ্ধতির অন্যতম ধারক এবং বাহক ছিলেন। এছাড়া, তাঁকে মানিকতলার পীর বলা হয়ে থাকে, কারণ তাঁর মাজার বর্তমান মানিকতলায় অবস্থিত, যা আজও অনেক ভক্ত ও মুরিদের কাছে পুণ্যলাভের কেন্দ্র।
বাংলার ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টি করা সিপাহী বিদ্রোহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শৃঙ্খলা, প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা এবং ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে জনগণকে তিনি পথ দেখিয়েছেন। সমাজসংস্কার, মানবসেবা এবং শিক্ষাজাগরণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখার মতো।
আত্মিক জগতে প্রবেশের সোপান হিসেবে তিনি তাসাউফ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও শাইখুল হাদিস হযরত শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)—এর কাছ থেকে। মীরসরাইয়ের সেই নূরানী মাজার শরীফ আজও তাঁদের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের অমলিন স্মৃতি বহন করে।
পীরকন্যা সৈয়দা জোহরা খাতুন (রহ.)—এর একমাত্র সাহেবজাদা হযরত শাহ সুফি সৈয়দ এহসান আহমেদ মাসুম (রহ.)—এর তিন সাহেবজাদার পরিবার বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করছেন এবং তাঁদের বংশের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সযত্নে ধারণ করছেন। অন্যদিকে, ছোট সাহেবজাদা হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আবুল বাশার (রহ.)—এর দুই সাহেবজাদা—সৈয়দ জাব্বুর আলম তুষার ও সৈয়দ আজমীর আলম নিশার—সিরাজগঞ্জের উকিলপাড়া ও শেরখালী এলাকায় বাস করছেন। তাঁরা তাঁদের আব্বাজান প্রতিষ্ঠিত “আওলাদে ওয়াইসী পাক দরবার শরীফ” নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করছেন। এই দরবার শরীফ থেকে ওয়াইসীয় নূরানী সিলসিলার দাওয়াত, জিকির—আসকার, সুন্নাহর চর্চা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা এখনো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর ২১ ডিসেম্বর ওয়াইসি হযরতের বার্ষিক ফাতিহা শরীফ পালন করা হয়। আমি (লেখক) নিজেও দু’বার এ মহাসমাবেশে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।
হযরত ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)—এর মাধ্যমে বাংলা ও সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে যে আধ্যাত্মিক জাগরণের সূচনা হয়েছিল, তা ক্রমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে তাসাউফের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর অন্যতম খলিফা, ফুরফুরা শরীফের মহাকরীশ্মায়ী মুর্শিদ আল্লামা মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকি আল—কুরাইশী (রহ.)—যিনি ‘মুজাদ্দেদে জামান’ নামে খ্যাত—বাংলা—বিহার—ওড়িশাসহ উপমহাদেশে তরিকত ও ইহসানের যে নবজাগরণ ঘটান, তা ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত বা প্রেরণায় বিকশিত বহু খানকাহ ও দরবার শরীফ আধ্যাত্মিক শক্তিকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশে তাঁর সিলসিলার উজ্জ্বলতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছারছিনা দরবার শরীফ, ছতুরা দরবার শরীফ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) এবং সোনাকান্দা দরবার শরীফ (কুমিল্লা)। এই তিনটি দরবার বহুদিন ধরে ফুরফুরা শরীফের আধ্যাত্মিক নূর বহনকারী প্রধান ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। পাশাপাশি ফান্দাউক, চৈতা, শামছাবাদ, মোকামিয়া, সিরাজিয়া, বানিয়াপাড়া—এগুলিও দাদা হুজুরের সিলসিলার শক্তিমান শাখা—প্রশাখা হিসেবে সুপরিচিত।
এ ছাড়া বাংলাদেশে তাঁর তরিকতের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন আরও বহু দরবার: ঠনঠনিয়া, দুধল, ফরায়েজিকান্দি, ছালাম—আবাদ, মাগুরা সিদ্দিকিয়া, ভান্ডারিয়া, বাগাদী, মাছিহাতা, ধামতী, পুরকুইল, খাড়েরা, সিংগুলা, দারুল আমান, আমানটোলা, দারুল হুদা গাউছিয়া—ফয়’সলেক, জামালিয়া—সীতাকুন্ড, রাহমানিয়া—ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর—এসব খানকাহ ও দরবারও তাঁর সিলসিলার বহমান ধারা ধারণ করে আজও আধ্যাত্মিক সেবায় অবিচল রয়েছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব দরবার ইসলামী শিক্ষা, তাসাউফী প্রশিক্ষণ, জিকির—আসকার, দাওয়াত, ইলমচর্চা, নৈতিকতার জাগরণ, তরুণ ও সাধারণ মানুষের চরিত্রগঠনে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছে। দরিদ্র ও দুঃস্থ মানুষের সেবায়, সামাজিক শৃঙ্খলায় এবং মিলাদ—মাহফিল ও সুন্নতি আমলের প্রচারে তারা বিশেষ অবদান রেখে আসছে।
দেশের সীমা অতিক্রম করেও এই নুরানী সিলসিলার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মেহেনিবাগ দরবার শরীফ ফুরফুরার তরিকতের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আজও সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলা—বিহার—ওড়িশা—আসাম পর্যন্ত এই সিলসিলার আধ্যাত্মিক জোয়ার বিস্তৃত হয়ে আছে নানা খানকাহ, মাদরাসা ও দরবারের মাধ্যমে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, হযরত ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.) হতে আরম্ভ হয়ে মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকি (রহ.)—এর মধ্য দিয়ে যে তরিকতরীতি ও আধ্যাত্মিক আলোকধারা উপমহাদেশে প্রসার লাভ করেছে, তা আজও জীবন্ত রয়েছে এসব দরবার শরীফের মাধ্যমে। প্রত্যেক দরবার তার নিজস্ব এলাকায় তাওহিদ, সুন্নাহ, আচার—আখলাক, জিকির—আসকার, মানবিকতা, সামাজিক ঐক্য ও ধার্মিক চেতনার সুমহান দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছে অবিরাম।
ওয়াইসি হযরতের খলিফা শামসুল উলামা গোলাম সালমানি আব্বাসী (রহ.)—এর মাধ্যমে ভারতের বান্ডেল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ঢাকা, নেত্রকোনা, পাবনা, বগুড়া—বাংলার সবুজ ভূমি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর তাসাউফের স্নিগ্ধ প্রভাব। হালিশহর, গারাংগিয়া, কুতুব শরীফ, কাগতিয়া দরবার শরীফগুলো তাঁর সিলসিলার নূরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। হযরত মাওলানা গোলাম সালমানি আব্বাসী (রহ.)—এর সিলসিলার বর্তমান আধ্যাত্মিক প্রতিনিধি, বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. প্রফেসর নুরুল আলম, কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি শুধু শিক্ষাবিদ হিসেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক ধারার নূর বিস্তারে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর রূহানি কার্যক্রমও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রসারিত হয়ে মানুষের অন্তরে আধ্যাত্মিক জাগরণের আলো ছড়াচ্ছে।
ওয়াইসি হযরতের খলিফা মাওলানা সৈয়দ একরামুল হক (রহ.)—এর মাধ্যমে ভারতের মুর্শিদাবাদ এবং বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ, রংপুরের সব জায়গায় তাসাউফের শক্ত ভিত্তি গড়ে ওঠে। পাশাপাশি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে।

ওয়াইসি হযরতের খলিফা মাওলানা সৈয়দ আহমদ আলী সুরেশ্বরী (জানশরীফ মাওলানা বা ভক্তের জানুবাবা) (রহ.)—এর মাধ্যমে শরীয়তপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে তিনি আধ্যাত্মিকতার স্থায়ী নিশান রেখে যান। সুফিধারার একটি বিস্তৃত অংশ তার অনুসারী ও প্রভাববলয়ে অন্তভূর্ক্ত।
ওয়াইসি হযরতের খলিফা হযরত সৈয়দ আমজাদ আলী (রহ.)। মুন্সিগঞ্জের পাউসার গ্রামে তাঁর মাজার আজও কালের নীরব স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট ও আসাম জুড়ে তিনি বিস্তৃতভাবে তাঁর আধ্যাত্মিক াওয়াত ও পথচলা পরিচালনা করেছেন, যার সুফলা প্রভাব আজও লক্ষ মানুষের হৃয়ে জাগিয়ে তোলে ঈমানের আলো।
ওয়াইসি হযরতের খলিফা সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহ.) উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর পবিত্র মাজার ভারতের মেহেদীবাগে অবস্থিত। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরগণ বাংলাদেশে আগমন করে তরিকতের নূরানী ধারা ছড়িয়ে দেন বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত দরবারসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ মেহেদীবাগ দরবার শরীফ (তালোড়া, বগুড়া), যা সাধারণভাবে ‘কোলকাতা মেহেদীবাগ দরবার শরীফ’ নামে পরিচিত হলেও এর বর্তমান অবস্থান আসলে বগুড়ার তালোড়া অঞ্চলেই। এছাড়াও খুলনা ও বগুড়ার দুপচাচিয়া এলাকায় তাঁদের শাখা দরবারসমূহ আজও আধ্যাত্মিক দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
এই ধারার অন্যতম খলিফা ছিলেন খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহ.)। তাঁর তত্ত্বাবধানে লালকুটি, আটরশি, চন্দ্রপাড়া, প্যারাডাইস পাড়া ইত্যাদি দরবার শরীফ জ্ঞানের আলো ও আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্রে রূপ নেয়।
ওয়াইসি হযরতের বিশিষ্ট মুরিদ চট্টগ্রাম মোহসেনিয়া মাদ্রাসার প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, সাহিত্যিক, গবেষক ও কবি কাজী মাওলানা আব্দুল মজিদ ইসলামাবাদী (রহ.) আজও তাঁর কবর বোয়ালখালীতে বহন করে আধ্যাত্মিক আলো। আরেক বিশিষ্ট মুরিদ যিনি একজন গভীর জ্ঞানের আলেম হিসেবে পরিচিত মাওলানা আব্দুল মজিদ (রহ.)—চরতি, সাতকানিয়া—প্রায় তিন শতাধিক আলেমকে তাঁর সান্নিধ্যে গড়ে তুলেছেন।
বাংলাদেশে হযরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহ.)—এর নামে দুটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় এবং খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর আধ্যাত্মিক ও মানবিক প্রভাব আজও গভীরভাবে অনুভূত হয়। একইভাবে, ছারছিনার পীর মাওলানা নেছার উদ্দীন আহমদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ছারছীনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদরাসা শিক্ষাজগতে আলোকবর্তিকা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এছাড়া, বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। এই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার ক্ষেত্রে—সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসির প্রভাবের সরাসরি প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর শিক্ষা ও নূরানী দাওয়াত এখনও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানবিক ও জ্ঞানীয় উন্নয়নে জীবন্ত ভূমিকা রাখছে।
হযরত সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি (রহ.)—এর আধ্যাত্মিক সিলসিলা আজও বাংলা, ভারত, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যে এবং পশ্চিমা বিশ্বে প্রবাহমান। কোটি কোটি মানুষ তাঁর অনুসৃত তাসাউফ, আদব, আধ্যাত্মিক কৃঙ্খলা এবং নূরানী বরকতকে নিজেদের জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ.)—এর সন্তুষ্টির সন্ধানে এগিয়ে চলেছে। তিনি শুধুমাত্র একজন সাধকই নন—তিনি একটি ধারার সূচনা, একটি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ এবং এক অন্তর্লোক নির্মাতা। তাঁর রেখে যাওয়া আধ্যাত্মিক আলোকরেখা আগামী প্রজন্মের পথও আলোকিত করবে।
সৈয়দ ফতেহ আলী (রহ.) ১৮৮৬ সালে কলকাতা যাওয়ার পথে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনে ইন্তিকাল করেন, তখন তার বয়স ৬৩ বছর। এতে অনুরূপভাবে, আমাদের প্রিয় রাসূল (দ.)—ও ৬৩ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেছেন।






