সুন্নাতের প্রতিচ্ছবি: বকশী বাজার খানকা

সুন্নাতের প্রতিচ্ছবি: বকশী বাজার খানকা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’’ (সূরা আল—আহযাব, ৩৩:২১)। এই আয়াতের গভীরতা কেবল কথায় নয়, বাস্তবায়নে প্রমাণিত হয়। সুন্নাতের কথা আমরা বইয়ে দেখি বা বয়ানে শুনি। কিন্তু বাস্তবতায় কি তা দেখি? উত্তর হ্যাঁ—যদি তা বাস্তবায়িত হয়।

আমরা সুন্নতে নববী বলতে মূলত সেসব গ্রহণ করে থাকি যা নিজেদের জন্য উপকারী বা ভোগের উপযোগী—খাদ্যাভ্যাস, বিবাহ—সংক্রান্ত বিধান, হাদিয়া গ্রহণ ইত্যাদি। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে সুন্নাত ত্যাগ করতে শেখায়, ব্যয় করতে শেখায়—যেখানে বিনিয়োগের বিপরীতে জাগতিক প্রতিদানের কোনো সম্ভাবনা নেই—তা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা যা ব্যয় কর তা আল্লাহর পথে ব্যয় কর, নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না’’ (সূরা আল—বাকারা, ২:১৯৫), এবং হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সদকা সম্পদ কমায় না (মুসলিম)।

সুন্নাতের এই ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ব্যয়ের ধারার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পুরান ঢাকার ‘ফকির জহুরুল হক মোবারকী খানকা শরীফ’, বকশীবাজার, ঢাকা। খানকার বর্তমান গদীনশীন সাহেব কেবলা শায়খুজ্জামান সাঈদ আনোয়ার মোবারকী। ঢাকা নগরীর প্রাচীন খানকাসমূহ থেকে পুরনো ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা যখন হারিয়ে যাচ্ছে, তখন বকশীবাজার খানকা এখনো তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

পীরতান্ত্রিক প্রটোকল বনাম সাহাবি—চরিত্রের সারল্য

বর্তমান সময়ে অনেক খানকা বা দরবারে সাধারণ মানুষ পীর সাহেবের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান না—রাষ্ট্রীয় প্রধানের মতো প্রটোকল ঘিরে রাখে তাঁদের। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, তিনি এতটাই সহজলভ্য ছিলেন যে এক বেদুঈন তাঁর গায়ে ধাক্কা দিয়ে চাদর টেনে ধরলেও তিনি রাগ করেননি, বরং হেসে তার প্রয়োজন পূরণ করেছিলেন (বুখারি, মুসলিম)। এখানেই ইসলামি নেতৃত্বের প্রকৃত রূপ—ক্ষমতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় না, বরং নিকটবর্তী করে। বকশীবাজার খানকায় সাহেব কেবলা সাধারণ মানুষ হিসেবে সবার সাথে কথা বলেন—এই বৈশিষ্ট্য আধুনিক পীরতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে নবুওয়াতি সারল্যের প্রতিধ্বনি তোলে।

সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার ও সালামের প্রচলন

কুরআনে এসেছে, ‘‘আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করার অধিকার তো তাদেরই যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান আনে’’ (সূরা আত—তাওবা, ৯:১৮)—এখানে কোনো বংশ, শ্রেণি বা পদমর্যাদার শর্ত নেই। খানকায় সর্বসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার এই সর্বজনীন উম্মাহ—চেতনার প্রতিফলন। এর সাথে যুক্ত সালামের প্রচলন—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদের এমন কিছু বলে দেব না যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? তোমাদের মধ্যে সালামের প্রচলন ঘটাও’’ (মুসলিম)। সালাম নিছক অভিবাদন নয়, এটি একটি দোয়া ও সামাজিক বন্ধনের সেতু।

মুসাফাহা ও কুশলাদি বিনিময়

হাদিসে এসেছে, দুই মুসলিম সাক্ষাতে মুসাফাহা করলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ ঝরে পড়ে (আবু দাউদ, তিরমিযি)। এই স্পর্শ হৃদয়ের সংযোগ ও দূরত্ব ঘোচানোর মাধ্যম—আধুনিক মনস্তত্ত্বও স্বীকার করে, শারীরিক সংস্পর্শ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে। কুরআনে আরও এসেছে, ‘‘তোমাদের প্রতি অভিবাদন জানানো হলে তোমরা তার চেয়ে উত্তমভাবে জবাব দাও অথবা অনুরূপভাবে জবাব দাও’’ (সূরা আন—নিসা, ৪:৮৬)—কুশলাদি বিনিময় তাই একে অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের কুরআনি নির্দেশনা।

বৈঠকখানা ও উন্মুক্ত আলোচনা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে মজলিসে বসতেন, একত্রে আলোচনা করতেন। ইমাম গাযালী (রহ.) তাঁর ‘ইহইয়া উলুমুদ্দিন’ গ্রন্থে বলেছেন, সৎসঙ্গ মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। কুরআনে এসেছে, ‘‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও উত্তম উপদেশের সাথে, এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়’’ (সূরা আন—নাহল, ১৬:১২৫)। খানকার বৈঠকখানা ও উন্মুক্ত আলোচনার পরিসর জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়, কুসংস্কার ও অন্ধ অনুকরণের পথ রোধ করে।

বিনামূল্যে মেহমানদারি: এক গ্লাস পানির মূল্য

আজকের বাস্তবতায় অনেক দরবারে এক গ্লাস পানি পান করাও সহজ নয়—টিকেট বা হাদিয়া ছাড়া মেহমানদারির সুযোগ নেই। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে’’ (বুখারি, মুসলিম)। হযরত ইব্রাহিম (আ.)—কে ‘‘খলিলুল্লাহ’’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল আংশিকভাবে তাঁর নিঃশর্ত মেহমানপ্রীতির কারণে (সূরা আয—যারিয়াত, ৫১:২৪—২৭)—তিনি অচেনা মুসাফিরদের জন্যও তৎক্ষণাৎ খাবার প্রস্তুত করতেন, কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই। বকশীবাজার খানকায় বিনামূল্যে মেহমানদারির এই ধারা—যেখানে কেউ টাকা না দিয়েই আপ্যায়িত হতে পারেন—ঠিক এই সুন্নাতেরই বাস্তবায়ন। এটি সেই ব্যয় যার জাগতিক রিটার্নের সম্ভাবনা নেই, অথচ আখিরাতের প্রতিদান অসীম।

নিজের উপার্জনে জীবিকা, নিজের পকেট থেকে দান

সাহেব কেবলা কারো কাছ থেকে টাকা নেন না, বরং নিজে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন, এমনকি কারো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে নিজের পকেট থেকেই ব্যয় করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কোনো ব্যক্তি তার নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি’’ (বুখারি)। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদ্বি.) বায়তুল মাল থেকে সামান্যতম বাড়তি সুবিধাও গ্রহণ করতেন না, বরং নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ প্রজাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং কখনো তাঁর জ্ঞান বা ফতোয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেননি। আধুনিক ধর্মচিন্তার প্রেক্ষাপটে, যখন ধর্মীয় নেতৃত্ব বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঝুঁকছে, তখন স্বনির্ভর জীবিকা ও নিজ পকেট থেকে দানের এই মডেল প্রমাণ করে দ্বীনি খেদমত ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একত্রে সম্ভব।

মানুষকে সম্মান প্রদান: করপোরেট সমাজে বিরল দৃষ্টান্ত

আল্লাহ বলেন, ‘‘আমি বনী আদমকে সম্মানিত করেছি’’ (সূরা আল—ইসরা, ১৭:৭০)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সাহাবির সাথে এমনভাবে কথা বলতেন যে প্রত্যেকে মনে করতেন তিনিই সবচেয়ে প্রিয়। আধুনিক করপোরেট ও পীরতান্ত্রিক কাঠামোতে যেখানে মানুষকে প্রায়শই সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা হয়, সেখানে সাহেব কেবলার প্রতিদিনের সেবা ও সম্মানের এই চর্চা এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

জিকির, সালাত, দরুদ, খতমে খাজেগান, অজিফা ও তেলাওয়াত

খানকায় প্রবেশ করলেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা নিছক জনসমাগম নয়—এটি এক সমবেত স্মরণের মজলিস। এখানে নিয়মিত জিকির অনুষ্ঠিত হয়, আর আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’’ (সূরা আর—রাদ, ১৩:২৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে সম্প্রদায় আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য একত্রিত হয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে ও প্রশান্তি অবতীর্ণ হয় (মুসলিম)—খানকার প্রতিটি জিকিরের মজলিস যেন এই হাদিসের জীবন্ত দৃশ্যায়ন।

জিকিরের এই আবহের মধ্যেই সালাতের সময় হলে সব কার্যক্রম থেমে যায়—আলোচনা, মেহমানদারি, সবকিছু ছাপিয়ে অগ্রাধিকার পায় নামাজ। কুরআনে এসেছে, ‘‘নিশ্চয় সালাত মুমিনদের উপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে’’ (সূরা আন—নিসা, ৪:১০৩)। এখানেই প্রমাণ হয়, আধ্যাত্মিকতার নামে খানকা মৌলিক ফরজ বিধানকে কখনো ছাপিয়ে যায় না, বরং সালাতকে কেন্দ্র করেই বাকি সব কার্যক্রম আবর্তিত হয়।
সমবেত মজলিসে দরুদ শরীফ পাঠও একটি নিয়মিত অংশ। আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ ক’’ (সূরা আল—আহযাব, ৩৩:৫৬)—খানকার প্রতিটি মজলিসে দরুদের এই সম্মিলিত পাঠ সরাসরি এই কুরআনি নির্দেশের বাস্তবায়ন।

এছাড়াও তরিকতের ঐতিহ্য অনুযায়ী খানকায় নিয়মিত খতমে খাজেগান পরিচালিত হয়—সম্মিলিত জিকিরের এই বিশেষ পদ্ধতি নকশবন্দি সিলসিলার মাশায়েখগণ কর্তৃক প্রচলিত, যার লক্ষ্য উম্মাহর কল্যাণে দোয়া ও সম্মিলিত ইবাদতের বরকত অর্জন। এর পাশাপাশি নির্ধারিত অজিফা পাঠের যে ধারাবাহিক চর্চা এখানে দেখা যায়, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম —এর সেই শিক্ষার প্রতিফলন: ‘‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা—ই যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়’’ (বুখারি, মুসলিম)।

মজলিসের আরেকটি নিয়মিত অংশ কুরআন তেলাওয়াত, হামদ, নাত ও মানাকিবে আউলিয়া পাঠ। তেলাওয়াতের সুর হৃদয়কে সিক্ত করে, হামদ—নাত আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসায় অন্তর আপ্লুত করে, আর আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনী পাঠ উপস্থিত মানুষদের নেক আমলের অনুপ্রেরণা জোগায়—যেমন কুরআনে নবীদের কাহিনি বর্ণনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘এতে মুমিনদের হৃদয় দৃঢ় হয়’’ (সূরা হুদ, ১১:১২০)।
এভাবে জিকির, সালাত, দরুদ, খতমে খাজেগান, অজিফা ও তেলাওয়াত—এই ছয়টি উপাদান খানকায় বিচ্ছিন্ন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি অবিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক প্রবাহ, যেখানে প্রতিটি আমল পরবর্তী আমলের জন্য হৃদয় প্রস্তুত করে।

হাদিয়া প্রদান ও অভাবীদের আর্থিক সহযোগিতা

খানকায় প্রবেশকারী প্রত্যেক মেহমানের প্রতি যে হাদিয়া প্রদানের রীতি লক্ষ করা যায়, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সেই শিক্ষার বাস্তবায়ন: ‘‘তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও, এতে পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়’’ (বুখারি, আদাবুল মুফরাদ)। এখানে হাদিয়া কোনো লেনদেনের অংশ নয়, বরং ভালোবাসা বৃদ্ধির উপলক্ষ।

এর পাশাপাশি খানকায় নিয়মিত দেখা যায় অভাবীদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের চর্চা। আল্লাহ বলেন, ‘‘তাদের সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’’ (সূরা আয—যারিয়াত, ৫১:১৯)—এই আয়াতের আলোকে অভাবী মানুষের সহযোগিতা লাভ কোনো করুণা নয়, বরং তার অধিকার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ, জান্নাত ও মানুষের নিকটবর্তী, আর কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ থেকে দূরে (তিরমিযি)। খানকার এই সহযোগিতা—যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল সংগ্রহ ছাড়াই, সাহেব কেবলার নিজ পকেট থেকে প্রদত্ত হয়—ঠিক সেই ব্যয়, যেখানে জাগতিক রিটার্নের সম্ভাবনা নেই, কিন্তু আখিরাতের প্রতিদান অসীম।

মানসিক প্রশান্তি ও রুহানি পরিবেশ

খানকায় প্রবেশ করা মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায় তা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, মানসিকও। আধুনিক মনোবিজ্ঞান স্বীকার করে, সামাজিক সংযোগ ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে—আর খানকার সমবেত জিকির, তেলাওয়াত ও দোয়ার পরিবেশ ঠিক এই দুই উপাদানকেই একত্রে ধারণ করে। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেছেন, অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি আসে আল্লাহর নৈকট্য থেকে, বস্তুগত প্রাচুর্য থেকে নয়। খানকায় আগত মানুষ তাই যে রুহানি আবহ অনুভব করেন, তা দুনিয়াবি চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি নয়—বরং আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুত প্রশান্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যা তিনি বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’’ (সূরা আর—রাদ, ১৩:২৮)।।

হাদিয়া বক্স ও চাঁদার রশিদ বই নেই: ব্যতিক্রমী স্বচ্ছতা

এই দুটি বিষয় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ এখানেই সুন্নাতের ত্যাগের দর্শন সবচেয়ে স্পষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবীদের সাধারণ ঘোষণা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘‘হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক তো কেবল আল্লাহর কাছে’’ (সূরা হুদ, ১১:২৯)। প্রাতিষ্ঠানিক দান আদায়ের কাঠামো না রাখা প্রমাণ করে এই খানকা জাগতিক আর্থিক লেনদেনের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে খালিসভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিচালিত হয়—আধুনিক যুগের বাণিজ্যিকীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

‘‘আমি পীর নই, আমি খাদেমুল ইসলাম’’— আত্মবিনয়ের সুন্নাত

সাহেব কেবলার নিজ মুখের উক্তি—‘‘আমার এখানে যারা আসবেন তাদেরকে খাবার দিতে কোনো কৃপণতা করবে না। কে কাকে খাওয়াতে পারে এটি সৌভাগ্যের বিষয়। আমি কেন মানা করব? আমিতো তাদের খাদেম। আমি কোনো পীর নই। আমি একজন খাদেমুল ইসলাম। আমার পরিচয় আমি একজন নগণ্য মানুষ’’—ইসলামি আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিক্ষা আত্মবিনয়—এর প্রতিফলন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচু করে দেন’’ (মুসলিম)। বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) বলেছেন, প্রকৃত অলি তিনিই যিনি নিজেকে সবচেয়ে ছোট মনে করেন। নিজেকে ‘‘পীর’’ না বলে ‘‘খাদেমুল ইসলাম’’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া—বর্তমান যুগে যেখানে অনেক আধ্যাত্মিক নেতা নিজেদের অতিমানবীয় মর্যাদায় উপস্থাপন করেন, সেখানে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম।

আদর্শ চরিত্র গঠন ও ভালোবাসার শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য’’ (মুসনাদে আহমাদ)। সাহেব কেবলার নিজের ভাষায় লক্ষ্য: ‘‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে চাই, মানুষকে খাওয়াতে, মানুষের মনের দুঃখ দূর করতে, মানুষকে আল্লাহ ও রাসূলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে চেষ্টা করি।’’ এই লক্ষ্য দাওয়াতের নববী পদ্ধতির সারসংক্ষেপ। আল্লাহ বলেন, ‘‘আমি তো আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছি’’ (সূরা আল—আম্বিয়া, ২১:১০৭)।

একজন উত্তম শিক্ষক, উত্তম অনুপ্রেরণাদাতা ও উত্তম আচরণের অধিকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা—ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)—এর ভাষায়, ‘‘প্রকৃত আলেম তিনিই যিনি নিজের জীবনাচরণ দিয়ে শিক্ষা দেন, শুধু কথায় নয়’’—এই আদর্শের প্রতিফলন।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বকশীবাজার খানকা যা প্রতিনিধিত্ব করে তা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সেবা নয়—বরং সুন্নাতে নববীর সেই দিকটির পুনর্জাগরণ যা আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ ব্যয়, বিনয় ও প্রকৃত মানবপ্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক যুগে যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রায়ই প্রটোকল, বাণিজ্যিকীকরণ ও দূরত্বের প্রাচীর তুলে ফেলে, সেখানে হাদিয়া বাক্স বা রশিদ বইবিহীন এই খানকা এবং এর গদীনশীনের আত্মবিনয়ী পরিচয়—‘‘আমি খাদেমুল ইসলাম, আমি নগণ্য মানুষ’’—প্রমাণ করে যে প্রকৃত দ্বীনি নেতৃত্ব এখনও সম্ভব বিনিময়হীন, নিরহংকার ও একনিষ্ঠ চিত্তে।

কলামিস্ট: কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী

আরো পড়ুনঃ