কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মুসলিম উম্মাহর করণীয়

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মুসলিম উম্মাহর করণীয়: মাওলানা মিশকাত সিদ্দিকী

 লেখক ও গবেষক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী 

বিশ্ব পরিস্থিতি ও মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, আমরা এক গভীর সংকট ও মতাদর্শগত বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই ক্রান্তিলগ্নে দ্বীনি জীবনের মৌলিক ভিত্তিগুলো নতুন করে দৃঢ় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। গত ৪ জুলাই, ২০২৬ ইংরেজি তারিখে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত মাওলানা মিশকাত সিদ্দিকী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান হযরত মাওলানা আবুবকর সিদ্দিকী ফুরফুরাভী (রহ.)-এর বংশধর হিসেবে তাঁর এই বক্তব্য চারটি মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, যা নিচে আলোচনা করা হলো।

১. খুতবার ভাষা: বোঝার মাধ্যম নাকি আনুষ্ঠানিকতা?:

খুতবা কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়—এটি উম্মাহর জন্য সাপ্তাহিক দিকনির্দেশনার সুযোগ। দুর্ভাগ্যবশত, বহু ক্ষেত্রে খুতবা কেবল আরবিতে সীমাবদ্ধ থাকায় সাধারণ মুসল্লিরা এর মর্মার্থ থেকে বঞ্চিত থেকে যান। কুরআনে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাসূলকে তাঁর নিজ জাতির ভাষায় পাঠানো হয়েছিল, যাতে তিনি বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে পারেন (সূরা ইব্রাহিম: ৪)। এই নীতি অনুসরণ করেই জুমার খুতবা যদি স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ কুরআন, হাদিস ও ফিকহের বিষয়গুলো সহজে অনুধাবন করবেন এবং শরীয়াহর বিধান নিজের জীবনে প্রয়োগে উৎসাহিত হবেন।

২. হাদিসের মর্যাদা ও ‘আহলে কুরআন’ প্রবণতার বিপদ:

ইসলামের মূল কাঠামো কুরআন ও সুন্নাহর সমন্বয়ে গঠিত; হাদিস ছাড়া কুরআনের ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, তাঁকে কুরআনের পাশাপাশি তার সমপরিমাণ আরেকটি বিষয়—অর্থাৎ হাদিস—দেওয়া হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ)। যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাদিসের গুরুত্ব অস্বীকার করেন, তারা মূলত ইসলামের একটি মূল স্তম্ভকে দুর্বল করার প্রয়াস চালান। মাওলানা মিশকাত সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন যে, এই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি—বিশেষত সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এই ধরনের চিন্তাধারা থেকে সতর্ক থাকা ঈমান রক্ষার জন্য জরুরি।

৩. জীবনযাপনে সুন্নাহর প্রতিফলন: খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিতিবোধ:

বর্তমান সময়ের একটি বড় সংকট হলো অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন। রাসূল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুযায়ী শরীর সুস্থ রাখতে পরিমিত ও হালাল আহার অপরিহার্য। হাদিসে বলা হয়েছে, পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি অংশ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখা উচিত (তিরমিজি)। যারা শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই বিলাসী জীবনযাপন করছেন, তারা ক্রমেই জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, খাদ্যের বিশুদ্ধতা কেবল বস্তু হালাল হওয়ার ওপর নির্ভর করে না, বরং তার উৎসের ওপরও নির্ভরশীল—চুরি, জবরদস্তি বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত কিছু ভোগ করা হারাম, তা দৃশ্যত হালাল বস্তু হলেও।

৪. নিদ্রা ব্যবস্থাপনা: সুন্নাহভিত্তিক জীবনযাপন ও তাহাজ্জুদের প্রস্তুতি

আলোচনায় তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিদ্রার অভ্যাস। নবীজি (সা.) সাধারণত এশার নামাজের পরপরই ঘুমিয়ে পড়তেন, তবে বিশেষ প্রয়োজন বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে রাত জাগতেন। এরপর তাহাজ্জুদের নামাজের পূর্বে তিনি ঘুম থেকে উঠে যেতেন। মাওলানা মিশকাত সিদ্দিকী ব্যাখ্যা করেন, আমরা যদি এশার নামাজের পর খাওয়া-দাওয়া সেরে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ি, তাহলে তাহাজ্জুদের সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত পরিমাণ ঘুম সম্পন্ন হয়ে যায়, ফলে অনায়াসে ঘুম ভেঙে যাওয়া সম্ভব হয়—এর জন্য আলাদা অ্যালার্ম দেওয়া বা কাউকে ডেকে তোলার প্রয়োজন পড়ে না।

তিনি এই প্রসঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের একটি পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করেন—রাতের প্রথমাংশের ঘুম মধ্যাংশ বা শেষাংশের ঘুমের তুলনায় স্বাস্থ্যের জন্য অধিক উপকারী। ফলে এশার নামাজের পরপরই ঘুমিয়ে পড়লে তাহাজ্জুদের সময় স্বাভাবিকভাবেই ঘুম ভেঙে যায়, এবং আমরা তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজ আদায় করে কুরআন তিলাওয়াতে সময় দিতে পারি। এরপর সামান্য বিশ্রাম বা হালকা ঘুম দিয়ে নাস্তা সেরে দিনের কার্যক্রম শুরু করা যায়। এভাবে জীবনযাপন করলে একদিকে যেমন সুন্নাহ অনুসরণ করা হয়, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও তা উপকারী প্রমাণিত হয়।

৫. কুরআন শিক্ষা ও মসজিদভিত্তিক জ্ঞানচর্চা:

মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সাধারণ মুসল্লিদের কুরআন শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন। তিনি প্রস্তাব করেন, হেফজ বা কিতাব শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কুরআনের অর্থ ও তাফসিরও শেখানো হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি মসজিদে নামাজের আগে বা পরে প্রতিদিন অন্তত এক-দুই ঘণ্টা কুরআনের অনুবাদ শিক্ষা এবং জুমার আজানের পর অন্তত আধা ঘণ্টা কুরআনের অনুবাদ-ভিত্তিক আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছেন—প্রশ্ন হলো, উপদেশ গ্রহণ করার মতো কেউ আছে কি (সূরা ক্বামার: ১৭)। কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ অনুধাবন করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

৬. মসজিদে আদব-শিষ্টাচার ও ইমামতির ক্ষেত্রে ফিকহি অগ্রাধিকার

উক্ত আলোচনার সময় একটি দুঃখজনক দৃশ্যও চোখে পড়ে। মসজিদের সামনের কাতারে বসা কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লি নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত আলাপে ব্যস্ত ছিলেন, যার ফলে উপস্থিত শ্রোতাদের মনোযোগ বারবার বিঘ্নিত হচ্ছিল। অথচ ইসলামে জ্ঞানচর্চার মজলিসে নীরবতা, মনোযোগ ও আদব রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আচরণ শুধু বক্তার প্রতি অসম্মানই নয়, বরং অন্যদের উপকৃত হওয়ার সুযোগও ব্যাহত করে।

একই দিনে এশার নামাজে মসজিদের নিয়মিত ইমামই ইমামতি করেন, যদিও সে সময় উপস্থিত ছিলেন ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত মাওলানা মিশকাত সিদ্দিকী। ইসলামী ফিকহে ইমামতির ক্ষেত্রে কুরআন তিলাওয়াতে অধিক পারদর্শী ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা এসেছে; তিলাওয়াতে সমতা থাকলে সুন্নাহ ও ফিকহে অধিক জ্ঞানী, এরপর বয়োজ্যেষ্ঠ ও অন্যান্য শরয়ি অগ্রাধিকার বিবেচিত হয়। এ বিষয়ে -এ বর্ণিত হাদিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে একই সঙ্গে ফিকহবিদগণ এ বিষয়েও আলোচনা করেছেন যে, কোনো মসজিদের নিয়মিত নিযুক্ত ইমাম বা ইমাম-এ-রাতিবের একটি স্বীকৃত অধিকার রয়েছে। তাই অধিক যোগ্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও, যদি তিনি নিজে ইমামতি করতে আগ্রহ প্রকাশ না করেন বা নিয়মিত ইমাম তাঁকে অগ্রাধিকার না দেন, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত ইমামের ইমামতি করাও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অতএব, এ ধরনের বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, পারস্পরিক সম্মতি এবং ফিকহি বিধান—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সংকটময় সময়ে একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো আবেগনির্ভর ধর্মচর্চার পরিবর্তে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জ্ঞানভিত্তিক জীবন গড়ে তোলা। পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, হালাল উপার্জন, সুন্নাহর অনুসরণ, কুরআনের অর্থ ও তাফসির শিক্ষা এবং মসজিদকে ইবাদতের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের অন্যতম দাবি। একই সঙ্গে মসজিদের আদব-শিষ্টাচার রক্ষা, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পারস্পরিক সম্মান, বিনয় ও শরয়ি নীতির আলোকে নেতৃত্বের বিষয়গুলো বিবেচনা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক বুঝ দান করুন, হকের ওপর অবিচল রাখুন এবং উম্মাহর ঐক্য, জ্ঞান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করুন। আমীন।

আরো পড়ুনঃ