রসুল যিনি নয়গো তিনি আবদুল্লার তনয়: (গানের আধ্যাতিক, ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক ব্যাক্ষা)
রসুল যিনি নয়গো তিনি
আবদুল্লার তনয়।
আগে বোঝো পরে মজো
নইলে দলিল মিথ্যা হয়।।
মোহম্মদ আবদুল্লার ছেলে
রজঃবীজে জন্ম নিলে।
আমেনাকে মা বলিলে
প্রকাশ হলেন মদিনায়।।
তাঁর চার সন্তান চার সন্ততি গণনা
এই হলো সৃষ্টির বাসনা
তিন বিবি হয় সৈয়েদিনা
এগারটি বাদ পড়ে রয়।।
মুহম্মদ জন্মদাতা
নবি হলেন ধর্মপিতা
ফকির লালন বলে
সৃষ্টির লতা আল্লাতে মিশে রয়।।
লালন সাঁইয়ের গানগুলো শুধু সঙ্গীত নয়; এগুলো এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রকাশ। এই নির্বাচিত গানটিও তার ব্যতিক্রম নয়। গানটি চারটি স্তবকে মানব জীবনের সত্য অনুসন্ধান, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং গুরু-শিষ্য সম্পর্কের জটিলতা সহজ ও সরলভাবে তুলে ধরেছে। নবী তত্ত্ব রসূল তত্ত্ব জীবন বিধান জীবন রহস্য।
গানটি সহজ ভাষা ও লোকসংগীতের ছন্দে হলেও এর আধ্যাত্মিক ভাবনা অত্যন্ত গভীর। প্রতিটি স্তবক একেকটি দর্শনময় শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করায়।আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচ্য গানটি নিয়ে যৎসামান্য আলোচনা করবো।
“রসুল যিনি নয়গো তিনি আবদুল্লার তনয়, আগে বোঝো পরে মজা, নইলে দলিল মিথ্যা হয়”
লালন এখানে নবী মুহাম্মদ (সা.)এর দুটি সত্তার কথা বলেছেন। একটি মানবিক, অন্যটি ঐশ্বরিক।
কুরআনে বলা আছে:-
“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের শেষ নবী” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪০)
“বলুন, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ; তবে আমার প্রতি ওহি নাযিল হয় যে তোমাদের ইলাহ একমাত্র আল্লাহ” (সূরা কাহফ ১৮:১১০)
অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ (সা.) মানুষের মতো জন্মগ্রহণ করলেও, তিনি আল্লাহর নির্বাচিত বার্তাবাহক।
সুফি তত্ত্বে বলা হয়, নবীর মধ্যে দুটি রূপ আছে বাহ্যিক মানুষ মুহাম্মদ এবং অন্তর্গত “নূর-এ-মুহাম্মদ”।
হাদীসে নবী (সা.) বলেছেন:-
“আল্লাহ প্রথমে আমার নূর সৃষ্টি করেন, আর সমস্ত সৃষ্টি সেই নূর থেকে উদ্ভূত”
অর্থাৎ:
“রসুল হলেন ঈশ্বরীয় নূর, আর আবদুল্লার তনয় হল দেহগত মানুষ”
ফকিরি মতে বলেন:-
“রসুল মানে অন্তরের চেতনা, আর আবদুল্লার তনয় মানে বাহ্যিক দেহ”
“যে শুধু শরীর দেখে, সে নবুত্ত্বের আলো চিনতে পারে না”
বিজ্ঞানের ভাষায়:-
“রসুল প্রতীক চেতনা বা আত্মা, আর আবদুল্লার তনয় প্রতীক দেহ বা পদার্থ”
“দুটি মিলে মানুষ পূর্ণতা পায়”
যোগশাস্ত্র ও চক্রার দৃষ্টিতে:-
“রসুল” হলো চেতনার শক্তি কেন্দ্র (আজ্ঞা ও সাহস্রার চক্রা), আর “আবদুল্লার তনয়” হলো দেহ ও প্রাকৃতিক শক্তির কেন্দ্র (মূলাধার ও স্বাধিষ্ঠান চক্রা)।
“মোহাম্মদ আবদুল্লার ছেলে রজঃবীজে জন্ম নিলে, আমেনাকে মা বলিলে প্রকাশ হলেন মদিনায়”
নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রকৃতির নিয়মে জন্মগ্রহণ করেছেন।
কুরআনে বলা আছে:-
“আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ; তবে আমার প্রতি ওহি নাযিল হয়” (সূরা কাহাফ ১৮ঃ১১০)
সুফিরা বলেন:- নবীর জন্ম মানবদেহে হলেও, তাঁর ভেতর প্রকাশিত হয়েছে আল্লাহর নূর। তাঁকে বলা হয় “ইনসান-এ-কামেল” পরিপূর্ণ মানুষ, যেখানে আল্লাহর নূর সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়।
ফকিরি মতে:-
“রজঃ মানে নারীশক্তি, বীজ মানে পুরুষশক্তি”
“এই দুই শক্তির মিলনেই সৃষ্টি হয়, এবং এই মিলনের মধ্যেই আল্লাহর প্রকাশ ঘটে”
বিজ্ঞানের ভাষায়:- জন্ম হয় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে। নবীর জন্মও প্রাকৃতিক, কিন্তু তাঁর চেতনা ছিল অসাধারণ মানবতার আলোকধারা।
যোগশাস্ত্রে:- “রজঃ ও বীজ” কেন্দ্রগুলো মূলাধার ও স্বাধিষ্ঠান চক্রার সমন্বয়ে সৃষ্টির শক্তিকে নির্দেশ করে।
“তাঁর চার সন্তান চার সন্তুষ্টি গণনা, এই হলো সৃষ্টির বাসনা, তিন বিবি হয় সৈয়েদিনা, এগারটি বাদ পড়ে রয়”
কুরআনে বলা আছে:-
“এবং তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়” (সূরা আন-নাবা ৭৮:৮)
“আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এক নিখুঁত রূপে” (সূরা আত-তীন ৯৫:৪)
লালন এখানে চার সন্তানকে প্রতীক হিসেবে দেখেছেন মাটি, জল, আগুন, বায়ু। তিন বিবি হলো ইচ্ছা, জ্ঞান ও ক্রিয়া। এই সাত শক্তির মিলনেই সৃষ্টি সম্পূর্ণ হয়।
ফকিরির দেহতত্ত্বে বলা হয়:-
“চার সন্তান হলো মাটি, জল, আগুন, বায়ু; চার সন্তুষ্টি হলো রক্ত, পিত্ত, কফ, বায়ু; তিন বিবি হলো ইচ্ছা, জ্ঞান, ক্রিয়া”
“এই ৪ + ৪ + ৩ = ১১ তত্ত্বেই মানবদেহ পূর্ণ হয়। যে সাধক এগারো তত্ত্ব বুঝে সংযমে রাখে, তার দেহেই নবীচেতনা জাগে”
বিজ্ঞানের ভাষায়:- দেহে চার মৌলিক উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন। এই উপাদান ও স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্যই মানবচেতনা ও শান্তির ভিত্তি।
যোগ ও জ্যোতিবিদ্যা অনুযায়ী:- এগারো তত্ত্বের সমন্বয় চক্রার ভারসাম্য নিশ্চিত করে, যা নবীচেতনার বিকাশ ঘটায়।
নবীর সন্তানদের প্রতীকী শক্তি
সন্তান প্রতীকী শক্তি
কাসিম “জ্ঞান ও আলোর আলো”
আবদুল্লাহ “পবিত্র আত্মা”
ইব্রাহিম “ত্যাগ ও আত্মনিবেদন”
চতুর্থ পুত্র “প্রাণ বা শ্বাসচেতনা”
জয়নাব “কর্মশক্তি”
রুকাইয়্যা “মমতা ও করুণা”
উম্মে কুলসুম “বাকশক্তি”
ফাতিমা “আল্লাহর নূর বা প্রেমচেতনা”
কুরআনে বলা আছে:
“নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে” (সূরা আশ-শামস ৯১:৯)
“মুহাম্মদ জন্মদাতা, নবি হলেন ধর্মপিতা,
লালন বলে সৃষ্টির লতা আল্লাতে মিশে রয়”
কুরআনে বলা আছে:- “নবী তোমাদের নিজেদের চেয়ে অধিক হকদার তোমাদের প্রতি” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬)
সুফিরা বলেন: “নবী হলেন “নূর-এ-মুহাম্মদ” আল্লাহর প্রথম আলো, যেখান থেকে সৃষ্টি প্রবাহিত হয় এবং আবার আল্লাহর নূরে ফিরে যায়”
ফকিরেরা বলেন:- “সৃষ্টির লতা মানে দেহ, যা আল্লাহর বীজে বেড়ে ওঠে”
বিজ্ঞানে সব জীব এক উৎস থেকে এসেছে। এই ঐক্যই আধ্যাত্মিক ভাষায়: “আল্লাতে মিশে থাকা”
দেহতত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:
ধারণা পদার্থ/শক্তি প্রভাব: চার সন্তান মাটি, জল, আগুন, বায়ু → অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন দেহের মৌলিক উপাদান।
চার সন্তুষ্টি রক্ত, পিত্ত, কফ, বায়ু দেহীয় রস ও জীবনীশক্তি।
তিন বিবি ইচ্ছা, জ্ঞান, ক্রিয়া মন ও চেতনার শক্তি
এগারো তত্ত্ব ৪ + ৪ + ৩ = ১১ মানব দেহ-মন-আত্মার ঐক্য।
যোগ ও চক্রার দৃষ্টিতে, এগারো তত্ত্বের সমন্বয় = দেহ-চেতনা-আত্মার ভারসাম্য → নবীচেতনা ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা।
চক্রা শক্তি কেন্দ্র প্রভাব:
মূলাধার মাটি + রক্ত জীবন শক্তি, শারীরিক ভিত্তি।
স্বাধিষ্ঠান জল + কফ সৃজনশীলতা ও অনুভূতি।
মণিপুর আগুন + পিত্ত ইচ্ছা, শক্তি, আত্মনির্ভরতা।
অনাহত বায়ু + মন প্রেমচেতনা, হৃদয়শক্তি।
বিশুদ্ধ বাকশক্তি + ক্রিয়া প্রকাশ ও ভাবমূর্তি।
আজ্ঞা জ্ঞান + ইন্দ্রিয় অন্তর্দৃষ্টি, অনুধ্যান।
সাহস্রার আল্লাহর নূর আধ্যাত্মিক পূর্ণতা, নবীচেতনা।
লালন ফকিরের গান ইসলাম, সুফিবাদ ও দেহতত্ত্বের এক সুন্দর সমন্বয়। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন:
“নবী কেবল ইতিহাসের মানুষ নন, তিনি প্রতিটি মানুষের অন্তরের আলো”
“যে দেহতত্ত্ব বোঝে, ইন্দ্রিয় সংযমে রাখে, সে নিজের মধ্যেই নবীচেতনা বা আল্লাহর নূর অনুভব করতে পারে”
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবে”
গানটি সহজ ভাষা ও লোকসংগীতের ছন্দে হলেও এর আধ্যাত্মিক ভাবনা অত্যন্ত গভীর। প্রতিটি স্তবক একেকটি দর্শনময় শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করায়।
-ফকির জুয়েল সাধু






