অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি (গান ও আধ্যাত্মিক ব্যাক্ষা)
অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি
তাঁর কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা।
ব্রহ্মরূপে সে অটলে বসে
লীলাকারী তাঁর অংশকলা।।
পূর্ণচন্দ্র কৃষ্ণ রসিক সে জন
শক্তিতে উদয় শক্তিতে সৃজন।
মহাভাবে সর্বচিত্ত আকর্ষণ
বৃহদাগমে তাঁরে বিষ্ণু বলা।।
সত্য সত্য স্মরণ বেদ আগমে কয়
সচ্চিদানন্দ রূপে পূর্ণ ব্রহ্ম হয়।
জন্মমৃত্যু যার নাই ভবের পর
সে তো নয় স্বয়ং কভু নন্দলালা।।
গুরুকৃপা বলে কোনো ভাগ্যবান
দেখেছে সেরূপ পেয়ে চক্ষুদান।
সেরূপ হেরিয়ে সদা যে অজ্ঞান
লালন বলে সে তো প্রেমের ভোলা।।
ফকির লালন সাঁইজী ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, দার্শনিক ও গীতিকার, যিনি ধর্ম, জাতপাত ও সমাজের ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মিলনের বাণী প্রচার করেছিলেন। তাঁর গানগুলো গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনা, মানবতাবাদ, প্রেম ও আত্ম-উপলব্ধির আলো ছড়িয়ে দেয়। লালনের চিন্তায় ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ নন তিনি মানুষের মধ্যেই বিরাজমান। সেই মানবপ্রেমই তাঁর সাধনার মূল।
উপরের গানটি (“অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি…”) লালনের গভীর ভাবধারার একটি সুন্দর নিদর্শন। এখানে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে কেবল এক ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক দেবতা হিসেবে দেখেননি, বরং সর্বশক্তিময়, অনাদি ব্রহ্মরূপে চিত্রিত করেছেন। প্রথম স্তবকে দেখা যায় “অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি / তাঁর কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা।” এখানে লালন বলছেন, প্রকৃত ব্রহ্ম বা কৃষ্ণ কোনো মানবিক লীলায় আবদ্ধ নন। তাঁর গোষ্ঠখেলা, জন্ম-মৃত্যু, বা সংসারধর্ম কেবল তাঁর লীলাময় প্রকাশ, তাঁর “অংশকলা” মাত্র।
পরবর্তী স্তবকে লালন কৃষ্ণকে “পূর্ণচন্দ্র রসিক” রূপে অভিহিত করেছেন যিনি শক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি করেন, আবার শক্তির মধ্যেই লয়প্রাপ্ত হন। এই দার্শনিক বোধ উপনিষদীয় ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত যেখানে সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টি ও শক্তি একই ব্রহ্মতত্ত্বের ভিন্ন প্রকাশ।
ফকির লালন বলেন, গুরুকৃপা বলে কোনো ভাগ্যবান / দেখেছে সেরূপ পেয়ে চক্ষুদান।” এখানে গুরুর করুণাই একমাত্র পথ—যার মাধ্যমে মানুষ সেই সর্বব্যাপী কৃষ্ণতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে পারে। আর যিনি সেই সত্যকে উপলব্ধি করে প্রেমে বিভোর, তাকেই লালন বলেন“প্রেমের ভোলা”।
ফকির লালন সাঈজ্বীর কৃপায় তার এই গানটি নিয়ে কিছু আলোচনা করবো।
অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি
তাঁর কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা।
ব্রহ্মরূপে সে অটলে বসে
লীলাকারী তাঁর অংশকলা।।
ব্যাক্ষাঃ
“শ্রীকৃষ্ণ চিরন্তন, অনাদি, অবিনশ্বর ব্রহ্মচেতনা। তিনি নিরাকার ব্রহ্মরূপে স্থিত, কিন্তু সৃষ্টিজগৎ তাঁরই লীলার প্রকাশ। ”
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়। (গীতা ৭:৭)
“কৃষ্ণই সর্বকিছুর উৎস, তিনিই পরম ব্রহ্ম। তাঁর বাইরে কিছুই নেই।”
হুয়াল আউয়ালু ওয়াল আখিরু। (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩)
“আল্লাহই আদি ও অন্ত, চিরন্তন ও অনাদি সত্তা।”
In the beginning was the Word, and the Word was with God, and the Word was God. (যোহন ১:১)
“ঈশ্বরই আদিতে বাক্যরূপে ছিলেন; তিনিই সৃষ্টির উৎসশক্তি।”
“ধর্মকায় বুদ্ধ অনন্ত, অজন্মা ও নিরাকার চেতনা তিনিই সর্বত্র প্রকাশমান।”
“শক্তি কখনো সৃষ্টি বা বিনাশ হয় না; এটি কেবল রূপান্তরিত হয় এই শক্তিই ব্রহ্মচেতনা।”
“সহস্রার চক্রে স্থিত ঈশ্বরচেতনা স্থির ব্রহ্মরূপ; সেখান থেকেই কুণ্ডলিনী লীলা শুরু হয়।”
“গোষ্ঠখেলা মানে দেহে রজ (নারীশক্তি) ও বীর্য (পুরুষচেতনা)-র মিলন;এই মিলনেই ব্রহ্মরস বা আনন্দের লীলা প্রকাশ পায়।”
পূর্ণচন্দ্র কৃষ্ণ রসিক সে জন
শক্তিতে উদয় শক্তিতে সৃজন।
মহাভাবে সর্বচিত্ত আকর্ষণ
বৃহদাগমে তাঁরে বিষ্ণু বলা।।
ব্যাক্ষাঃ
“কৃষ্ণ হলেন রসিক ব্রহ্ম প্রেম, আনন্দ ও শক্তির পূর্ণতা। তাঁর প্রেমই সৃষ্টি, পালন ও মহাভাবের কেন্দ্র।” যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত (গীতা ৪:৭–৮)
“ধর্মক্ষয়ের সময় কৃষ্ণ শক্তিরূপে অবতীর্ণ হন, সৃষ্টি ও রক্ষা করেন।”
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।” (সূরা আল-ফাতিহা ১:১–৩)
“আল্লাহর প্রেম ও দয়াই বিশ্বসৃষ্টির চালিকা শক্তি।”
God is Love. (১ যোহন ৪:৮)
“ঈশ্বর প্রেমরূপ, আর প্রেমই ঈশ্বরের শক্তি।”
“মৈত্রী ও মহাকারুণা বুদ্ধত্বের আসল লক্ষণ; প্রেমই মুক্তির পথ।”
“আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তির ভারসাম্যে বিশ্ব টিকে থাকে এই আকর্ষণই প্রেমের বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন।”
“(অনাহত চক্রে) প্রেম ও শক্তির মিলন ঘটে; সেখান থেকেই দেহে সৃজন ও ভক্তির রস প্রবাহিত হয়।”
“রজ (রাধা) ও বীর্য (কৃষ্ণ)-র মিলনেই জন্ম নেয় রস, আনন্দ ও সৃষ্টিশক্তি
এই অবস্থাই ‘মহাভাব’, যেখানে প্রেম ও ব্রহ্ম একাকার হয়।”
সত্য সত্য স্মরণ বেদ আগমে কয়
সচ্চিদানন্দ রূপে পূর্ণ ব্রহ্ম হয়।
জন্মমৃত্যু যার নাই ভবের পর
সে তো নয় স্বয়ং কভু নন্দলালা।।
ব্যাক্ষাঃ
“সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম জন্ম-মৃত্যুর অতীত চেতনা। তিনি অবতার নেন খেলায়, কিন্তু প্রকৃত সত্তা চিরনিত্য ও অবিনশ্বর।” ন জয়তে ম্রিয়তে বা কদাচিত (গীতা ২:২০)
“আত্মা কখনো জন্মায় না, মরে না; সে চিরন্তন, অজন্মা ও অবিনশ্বর।” লাম ইয়ালিদ ওয়ালম ইউলাদ। (সূরা আল-ইখলাস ১১২:৩)
“আল্লাহ জন্ম দেন না, জন্মগ্রহণও করেন না তিনি অনাদি চিরসত্তা।”
I am the Alpha and the Omega. (প্রকাশিত বাক্য ২২:১৩)
“ঈশ্বরই আদি ও অন্ত; তাঁর মধ্যেই সবের সূত্র ও সমাপ্তি।”
“নির্বাণ মানে জন্ম-মৃত্যু চক্রের অবসান; যেখানে চেতনা মুক্ত ও পরিপূর্ণ।”
“শক্তি কখনো বিনষ্ট হয় না, কেবল রূপ বদলায় এটাই ঈশ্বরচেতনার চিরপ্রবাহিত রূপ।”
“ব্রহ্মরন্ধ্র চেতনায় পৌঁছলে সাধক জন্ম-মৃত্যুর সীমা ছাড়িয়ে চিরসত্তায় লীন হয়।”
“রজবীর্যের ঐক্যে দেহের দ্বন্দ্ব মুছে যায়;
সাধক তখন দেহেই অনুভব করে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম।”
গুরুকৃপা বলে কোনো ভাগ্যবান
দেখেছে সেরূপ পেয়ে চক্ষুদান।
সেরূপ হেরিয়ে সদা যে অজ্ঞান
লালন বলে সে তো প্রেমের ভোলা।।
ব্যাক্ষাঃ
“গুরুকৃপায়ই সত্যদর্শন ও চেতনার জাগরণ ঘটে। যার অন্তরে প্রেম জাগে, সে-ই জ্ঞানের আলোয় মুক্ত হয়।”
তৎ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। (গীতা ৪:৩৪)
“গুরুর শরণে গিয়ে নম্রভাবে প্রশ্ন করলে জ্ঞান ও সত্যদৃষ্টি লাভ হয়।”
যাকে আল্লাহ হিদায়াত দেন, সে-ই সঠিক পথে চলে। (সূরা আল-আনআম ৬:১২৫)
“ঈশ্বরের দয়া ব্যতীত কেউ সত্যপথ পায় না।”
Blessed are the pure in heart, for they shall see God. (মথি ৫:৮)
“যার হৃদয় নির্মল, সে-ই ঈশ্বরকে দেখে এটাই চক্ষুদান।”
“গুরুর করুণায় জ্ঞানচক্ষু জাগে; অজ্ঞতার আঁধার দূর হয়।”
“জ্ঞানের আলোই অন্ধকার দূর করে চেতনা আলোকিত হয়।”
“আজ্ঞা চক্রে অন্তর্দৃষ্টি, সাহস্রারে ঈশ্বরচেতনা প্রকাশিত হয়।”
“গুরুর দীক্ষায় দেহতত্ত্ব জাগে;
প্রেমের আলোয় মন ব্রহ্মে লীন হয়
এই অবস্থাই ‘প্রেমের ভোলা’, মুক্ত আত্মার চিহ্ন।”
ফকির লালন সাঁইজী ছিলেন বাংলার এক অনন্য মরমি সাধক ও মানবদর্শী দার্শনিক। তিনি ধর্ম, জাতপাত ও ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মিলনের বাণী প্রচার করেছেন। তাঁর গান প্রেম, চেতনা ও ব্রহ্মতত্ত্বের গভীর সত্য প্রকাশ করে।
এই গানে লালন শ্রীকৃষ্ণকে অনাদি ব্রহ্মরূপে দেখিয়েছেন যিনি রূপে নয়, চেতনায় বিরাজমান। তিনি বলেন, গুরুকৃপায়ই সত্যদর্শন সম্ভব, আর প্রেমই মুক্তির পথ।
লেখক ও সংকলক: ফকির জুয়েল সাধু






