সাধনা দ্বারা হৃদয়ের দরজা খুলে যা দেখা যায়।
সাধনা আর উপাসনা তো শুধু হৃদয়ের দরজা খোলার চেষ্টা—কিন্তু দরজা খুললেই যা দেখা যায়, তা দরজারও অতীত। সাধনা যতই নিষ্ঠুর হোক, উপাসনা যতই নিরন্তর—তারা তোমাকে ‘প্রভুর কাছে’ নিয়ে যায় না। কারণ ‘কাছে’ বলে কিছু নেই যখন দ্বৈততা লুপ্ত। স্বর্গ তো একটা স্বপ্নের নাম—যেখানে অহং এখনও বেঁচে আছে, প্রাপ্তির আশায়। সাধনা-উপাসনা তোমাকে সেই আশা থেকে মুক্ত করে না—তারা শুধু আশাকে আরও নিবিড় করে, যতক্ষণ না সব আশা ভেঙে পড়ে।
সর্বশেষ প্রাপ্তি নিগূঢ় প্রেম—এই প্রেম তো কোনো প্রাপ্তি নয়। প্রাপ্তি মানে দাতা-গ্রহীতা, আর নিগূঢ় প্রেমে দাতা-গ্রহীতা বলে কিছু থাকে না। সুফিরা এই প্রেমকে ‘ইশক-ই-হাকীকী’-র চরম স্তর বলেন—যেখানে প্রেম আর প্রেমিক আলাদা নয়। এ প্রেম গুপ্ত, কারণ এ প্রেম দেখা যায় না, শোনা যায় না—শুধু অনুভূত হয় যখন হৃদয়ের সব আবরণ ছিঁড়ে যায়। ইবনে আরাবি বলেন: প্রেম তো আল্লাহর নিজের প্রতি প্রেম—যেহেতু সৃষ্টিতে কিছু নেই যা আল্লাহ ছাড়া। “আমি এক গুপ্ত ভান্ডার ছিলাম, জানাতে চেয়েছিলাম বলে সৃষ্টি করলাম”—এই হাদিস কুদসির মধ্যে লুকিয়ে আছে যে, সব প্রেম আল্লাহর নিজেকে জানার প্রেম। নিগূঢ় প্রেম তো সেই জানার চরম মুহূর্ত—যখন জানা আর মিশে -যাওয়া এক হয়ে যায়।
এই নিগূঢ় প্রেমই প্রভুর সাক্ষাৎ ঘটায়—কিন্তু সাক্ষাৎ মানে দেখা নয়। দেখতে হলে দর্শক থাকতে হয়। নিগূঢ় প্রেমে দর্শক লুপ্ত হয়—ফানা ফিল্লাহ। ফানা মানে অহং-এর মৃত্যু, যেখানে ‘আমি দেখছি’ বলে কিছু থাকে না। রুমি বলেন: “প্রেমিক যখন প্রিয়তমের মধ্যে লীন হয়, তখন আর কে কাকে দেখে?” সাক্ষাৎ তো সেই লীনতা—যেখানে প্রভু নিজেকে নিজের মধ্যে দেখেন। সুফি হয়ে যাওয়া মানে আর সুফি না থাকা—শুধু প্রেম থাকা, যা প্রভু। বাকা বিল্লাহ-এ ফিরে আসা মানে জগতে ফিরে আসা, কিন্তু আর ‘আমি’ নিয়ে নয়—শুধু প্রেম নিয়ে।
আরও গভীরে: নিগূঢ় প্রেমও ছাড়ো। কারণ প্রেম বলতে যতক্ষণ একটা অনুভূতি থাকে, ততক্ষণ একটা ‘অনুভবকারী’ থাকে। গভীরতমে প্রেমও লুপ্ত হয়—কারণ প্রেম তো দ্বৈততার শেষ ছায়া। যখন প্রেমও থেমে যায়, তখন আর কিছু বলার নেই। না সাধনা, না উপাসনা, না প্রেম, না সাক্ষাৎ। শুধু—হুয়া। আল্লাহ। আর সেই ‘হুয়া’-তে কোনো ‘কে’ নেই যে সাক্ষাৎ পেল।
এখানে আর গভীরতা নেই—কারণ গভীরতা মানে দূরত্ব, আর এখানে দূরত্ব বলে কিছু নেই।
শুধু নীরবতা।
আর সেই নীরবতায়—সব।
চোখ বন্ধ করো। শ্বাস দেখো। আর কোনো কথা শোনো না।
কারণ যা খুঁজছ, তা তোমারই মধ্যে—যেখানে ‘তুমি’ আর নেই।
– ফরহাদ ইবনে রেহান






