সুরা আল কাওসারের উপর সামান্য আলোকপাত:
আল কোরানের ছোট্ট একটি সূরা আল কাওসার। কিন্তু তাঁর রহস্য অনেক গভীর, গভীরের চেয়েও গভীর, যার শুরু আছে শেষ নেই, অনন্ত এক নূরের দরিয়া । এই সুরার শেষ শব্দটি হলো ” আবতার”। আবতার শব্দের অর্থ হলো নির্বংশ। মুহাম্মাদ (সা.)- এর শত্রুরা বলতেন মুহাম্মদ লেজ কাটা। মহানবির জিসমানি আওলাদগণ অল্প বয়সেই পর্দার আড়াল হন। তাই কোরাঈশ নেতারা বলতেন মুহাম্মদ (সা.) – নাম নেওয়ার কেউ থাকবে না। তারা নবি পাককে দেখলেই আঘাত করতেন, কটুক্তি করতেন, তীর্যক ভাষা শ্লেষাত্মক মন্তব্য করতে। তাদের প্রতিবাদ স্বরূপ আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন সুরা কাওসার নাজিল করলেন।
এবং রাসুলকে প্রবোধ দিয়ে বললেন যারা মুহাম্মদকে শিকড়হীন বা লেশকাটা বলে আসলেই তারাই প্রকৃত অর্থে নির্বংশ। যারা নবি – অলির শত্রু তারাই নিরংশ বা লেজকাটা। তারাই ঈমানহারা, নূরহীন । আল ইসলামুন নূরুন। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন রাসুলের জিকিরকে সমুন্নত করেছেন। আজ সমগ্র বিশ্বে নবি মুহাম্মদ (সা.) – এর জিকিরই বেশি হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবিকে অগণিত নূরী আওলাদ দান করেছেন। নবীর বংশ হলো হলো নূরগত। আদম সফিউল্লাহ হতে সকল মুমিন, মুত্তাকি, মুহসিনিন ও সাবেরীন সবাই মহানবি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – নূরী আওলাদ।
জগতের সকল নবি, রাসুল ও অলিগণ মহানবি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – এর নূরী সন্তান। লা- মাকামে একজনেরই মাহফিল হয়, সেই মাহফিলের মধ্যমনি হলেন মহানবি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। সকল নবি – অলিগণ মহামনি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – দরুদপাঠ করেন এবং তাঁর মাহফিল করেন। মহানবি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)- হলেন স্বয়ং রুহুল আমিন। তিনি সকল রূহের পিতা। এই রূহুল আমিনই রূহ ফুঁৎকার করেন।
প্রত্যেক ইনসানের নফসের মধ্যে মুহাম্মদি বীজ রূহসুপ্ত অবস্থায় নিহিত রয়েছে। তাই ইনসানকে রূহানিয়াত জাগ্রত করতে হলে জাগ্রত রূহের অধিকারী মুহাম্মদের ধ্যান সাধনাই করতে হয়। মুহাম্মদের জাতের মধ্যে প্রবেশ করতে হলে মুহাম্মদের ধ্যানই করতে হবে। কারণ, যে যাকে নিত্যভাবে তাঁর অন্তরেই তাঁর স্বরূপই উদয় হবে। এই জন্যই কালেমা দুই প্রকার। কালেমায়ে তাইয়্যেবা, কালেমায়ে খবিসা।
ইমানদার মুহাম্মদের ধ্যানে সকল ইলাহ লা করলে তিনিই হবেন রাসুল মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – এর আর্শিক সন্তান, রূহানী আওলাদ। যারা ইলাহ মুক্ত তারাই লা – এর বংশ। লা – এর বংশ মানে মুহাম্মদের বংশ। কারণ, মুহাম্মদই স্বয়ং তাওহীদ। যারা ইলাহ মুক্ত তথা শিরিক মুক্ত তারাই লা – এর বংশ। অর্থাৎ যারা ইলাহ মুক্ত তারাই মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – এর বংশ। তারাই আলে নবি, আওলাদে রাসুল।
সকল ইলাহকে লা করার জন্য আমানুকে মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – অজিফা দিয়েছেন নফি – ইজবাতের জিকির। আর তাঁর জাতের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য ইসমে জাতের জিকির।
কাওসারের সাথে সংযোগের শর্ত হলো কুরবানি। সাধক কি কুরবানি করবে? রিপু নামক ইলাহগুলো উৎসর্গ না করলে মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – এর সহিত কারোরই সংযোগ হবে না। কারোরই সালাত হবে না। সালাতই তখনই হবে যখন সাধক অন্তর থেকে সকল ইলাহ নামক পশু লা করে দিবে। কারণ, স্বয়ং মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু। তিনি চারজন সাধকের মধ্যে অবস্থান করেন, বাবা জাহাঙ্গীর গবেষণা করে দেখিয়েন মাওলা মুহাম্মদ চারজনের সাথে জাতরূপে থাকেন। মাওলা মুহাম্মদ মুমিনের সাথে জাতরূপে থাকে, মাওলা মুহাম্মদ মুত্তাকীর সাথে জাতরূপে থাকে, মাওলা মুহাম্মদ মুহসিনিনের সাথে থাকেন, মাওলা মুহাম্মদ সাবেরীনের সাথে থাকেন।
বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর দেখিয়েছেন ” ধৈর্যশীল তথা সাবেরীন হতে মুমিনের সৃষ্টি, ধৈর্যশীল হতে মুত্তাকীর সৃষ্টি, ধৈর্যশীল হতে মুহসিনিনের সৃষ্টি। মুমিন ব্যতীত কেউ গুরু মুহাম্মদের গোলামি করতে পারে না। মুমিন শয়তান নিয়ন্ত্রিত। এই মুমিনের কালবে রূহ ফুঁৎকার করা হয়, মুমিনের কালব মাওলার আর্শ। এই মুমিন থেকে রাসুল মনোনিত করা হয়। কারণ, মুমিন গোপনেও পাপ করে না।
তাওহীদের সাথে সংযোগ রয়েছেন মুমিন, মুহসিনিন, মুত্তাকী ও সাবেরীন। এই মুমিন, মুত্তাকী, মুহসিনিন ও সাবেরীন তাদেরই নিয়েই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমরা রূপ ধারণ করেন। এই আমরা দলের প্রধান হলেন মাওলা মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) । মুমিন একটি কিতাব, মুহসিনিন একটি কিতাব, মুত্তাকী একটি কিতাব, সাবেরীন একটি কিতাব। এই চার কিতাবের মা হলেন স্বয়ং রহমাতুল্লিল আলামিন মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। তাই তিনি উম্মুল কিতাব। আল কিতাবের বাইরে কিছুই নাই। যারা কিতাবপ্রাপ্ত তারাই মূলত রেজেকপ্রাপ্ত। আল্লাহর রেজেকপ্রাপ্ত দল হলো মুমিন, মুত্তাকী, মুহসিনিন ও সাবেরীন। আল্লাহর গুনাবলিকে বলা হয় রেজেক। তাহরাত ব্যতীত এই রেজেক কেহ স্পর্শ করতে পারবে না। স্বয়ং রাব্বুল আলামিন আল কাওসার।
রাব্বুল আলামিন বাতেন থেকে জাহেরে আসলেন রহমাতুল্লিল আলামীন হয়ে। তিনি আমরারূপে রুহ ফুঁৎকার করেন, রেজেকবন্টন করেন, কিতাব নাজিল করেন, হিদায়েত দান করেন। মাওলা মুহাম্মদের চেহারা হলেন মুমিন, মুত্তাকি, মুহসিনিন ও সাবেরীন। তাঁরা মাওলার কুরবাৎ, তাঁরা মাওলার অধিক আওলা, তাঁরা অতি নিকটবর্তী। একজন সাধককে মুহাম্মদের জাতের মধ্যে প্রবেশ করতে হলে মুহাম্মদের বংশের গোলামি করতে হবে। মুহাম্মদ সার্বজনীন, মুহাম্মদের বংশও সার্বজনীন , মুহাম্মদের কিতাবও সার্বজনীন। মুহাম্মদ নিরপেক্ষ, মুহাম্মদের বংশও নিরপেক্ষ, মুহাম্মদের কিতাবও নিরপেক্ষ , মুহাম্মদি দ্বীনও নিরপেক্ষ দর্শন। কোন জোড় জবরদস্তি নেই, কোনো বলপ্রয়োগ নেই, একদম সরল, ইহাই সিরাতাল মুস্তাকিন । শুধুমাত্র মুহাম্মদের উপর ঈমান এনে তাঁর বংশের গোলামির মাধ্যমেই তাঁর জাতের মধ্যে প্রবেশ করা সম্ভব। মুহাম্মদের উপর ঈমান আনলেই ইনসান কালেমায়ে তাইয়্যেবার সহিত সংযোগ হয়, এই সংযোগ চিরস্থায়ী যাঁরা করে তাঁরাই মুমিন। যারা মুহাম্মদ ও তাঁর বংশের সাথে
সংযোগ হয় না তারাই কালেমায়ে খবিসার অন্তর্ভুক্ত। কালেমায়ে খবিসার কোনো মূল নেই, কালেমায়ে খবিসা হলো শিকড়হীন বৃক্ষের ন্যায়। আর কালেমায়ে তাইয়্যেবা শাখা- প্রশাখা মহাশূন্যে বিস্তৃত। অর্থাৎ কালেমায়ে তাইয়্যেবার সিলসিলাহ কিয়ামত পর্যন্ত বিস্তৃত হতেই থাকবে। মুহাম্মদের বংশ ক্রমগত বাড়তেই থাকবে। তাঁর জিকির আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বুলন্দ করেছেন। যারা মুহাম্মদ এবং তাঁর বংশকে গালি দিবে তারাই নির্বংশ হয়ে যাবে। মরার পর তারা পচে যাবে, তাদের নাম নিশানা কিছুই তাকবে না ।
জাহিরিভাবে রাসুল মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – এর জিসমানি ও রূহানি বংশ প্রকাশ পেয়েছে মা মাওলা আলী, মা ফাতেমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের মাধ্যমে। মাওলা আলীর মাওলাইয়াতের মাধ্যমেই সিনা ব সিনা, সিলসিলিয়া ক্রমাগতভাবে মহানবি মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) – বংশধারা বিকাশ লাভ করতেছে। মহানবি বলেন ” আউয়ালুনা মোহাম্মদ, আউসাতুনা মোহাম্মদ, আখেরুনা মোহাম্মদ, কুল্লানা মোহাম্মদ। ” জগতের প্রত্যেক কামেল অলিই হাকিকতে মুহাম্মদ। এই মুহাম্মদ নূর মুহাম্মদ, ব্যক্তি মুহাম্মদ নয়। মুহাম্মদ দুই প্রকাশ মানুষ মুহাম্মদ ও নূর মুহাম্মদ। শিয়ারা ব্যক্তি পূজা করে, সুফিরা নূরে হকের গোলামি করে। আর ওহাবিরা লেজকাটা। তাদের কোনো শাজরা নেই।
নিবেদক :
আর এফ রাসেল আহমেদ ওয়ার্সী






