পুল সিরাত ও তার রহস্য ভেদ (সূফীমত)।

পুল সিরাত ও তার রহস্য ভেদ (সূফীমত)।
ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

পুল সিরাত ও তার রহস্য ভেদ (সূফীমত)।

পুল সিরাত একটি মিশ্রিত শব্দ, পুল ফার্সী শব্দ এর অর্থ; সেতু। সিরাত আরবী শব্দ এর অর্থ রাস্তা বা পথ। আমাদের দেশে শব্দ দু’টিকে একত্রিত করে পুল সিরাত বলা হয়ে থাকে। মূলত দু’টি শব্দ একই প্রকার অর্থ বহন করে। পুলসিরাত শব্দটির অর্থ দাড়ায়; যে রাস্তা পুলের ন্যায়। প্রচলিত ধারনা মতে, পুলসিরাত বলতে -জাহান্নামের উপরে বিস্তৃতি এমন এক সেতু বুঝানো হয়, যা চুলের চেয়ে চিকন এবং হীরার চেয়েও ধারালো। এ পুল পার না হয়ে বেহেস্তে যাওয়া যাবে না।

এ সুদীর্ঘ পুল পার হতে ৩০ হাজার বছরের প্রয়োজন এবং তার তিনটি অংশে বিভক্ত। ১ম অংশ উপরের দিকে, ২য় অংশ সমতল এবং ৩য় অংশ নীচের দিকে ঢালু। পূণ্যবানগন বিদ্যুৎ গতিতে এ পুল পার হয়ে বেহেস্ত লাভ করবেন। পক্ষান্তরে, জাহান্নামীরা যথা সাধ্য চেষ্টা করেও এ পুল অতিক্রম করতে পারবে না। বরং এর সুক্ষতার কারনে নিমিষেই টুকরা টুকরা হয়ে জাহান্নামে পতিত হবে।

পবিত্র কোরআন ও হাদীস শরীফের কোথাও পুলসিরাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি যেমন কোরআনে বলা হয়েছে,

صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ

অর্থঃ সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। (১; ৫/৬)

সিরাতে বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُو۟لَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّۦنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَ وَحَسُنَ أُو۟لَٰٓئِكَ رَفِيقًا

অর্থঃ আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম। (৪;৬৯)

অন্যত্র বলেন,
ِ وَمَن يُضْلِلْ فَلَن تَجِدَ لَهُۥ وَلِيًّا مُّرْشِدًا

তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।(১৮;১৭)

বস্তুতঃ নবী রাসুল ও মহামানবগনের অনুসৃত পথই হলো সিরাতুল মুস্তাক্বিম। কোন মানুষ আল্লাহ মনোনীত মহামানবগের সান্নিধ্যে গমন করে সবক নেয়ার পরে মোর্শেদের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে রুহানি যোগসূত্র স্থাপন করে অবিরাম ফায়েজ বরকত, রহমত ও নেয়ামত লাভ করতে পারে। কিন্তু কোন কারনে যদি তার মনে মহামানবগনের প্রতি বিশ্বাসে ত্রুটি সৃষ্টি হয়ে সে রুহানী যোগসূত্র হারিয়ে ফেলে, তখন সে সিরাতুল মুস্তাক্বিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারে পতিত হয়। এতে সে চরম অশান্তির মাঝে নিপতিত হয়।

আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের মৃত্যুর পরে কোন ইবাদত থাকে না, আবার এ-ও বিশ্বাস করি যে মৃত্যুর পরেই পুলসিরাত পার হতে হবে। প্রকৃত পক্ষে মৃত ব্যক্তির দেহের কোন ক্রিয়া থাকে না, তার আত্মার উপরেই সব কিছু হয়ে থাকে। আর আত্মাকে পরিত্যক্ত দেহে কখনো প্রবেশ করানো হয় না।

পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে; তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তাকে উহা পার হতে হবে না। এটা তোমার প্রতিপালকের অবধারিত ফয়সালা। তারপর আমি ধর্ম ভীরুদেরকে নিস্তার দিবো এবং অত্যাচারিতদেরকে অধঃমুখে দোযখে নিক্ষেপ করবো। (১৯;৭১/৭২)

হাদিস শরীফে সিরাত প্রসংগে বলা হয়েছে, সিরাতের উপর মু’মিনদের বিশেষ সংকেত হবে, হে রবি রক্ষা করো রক্ষা করো। (তিরমিজি শরীফ ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা -৬৯)

উপরোক্ত আলোচনার পাশাপাশি ব্যাক্তি জীবনেও পুল-সিরাতের অপূর্ব মিল রয়েছে, মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হায়াতে জিন্দিগিতে সিরাতুল মুস্তাক্বিম বা আলোর পথে পরিচালিত হয়ে ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই এক প্রকার পুলসিরাত। আর পুলসিরাত পার হওয়া বলতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর কায়েম থাকা এবং ঈমান নিয়ে মৃত্যু বরণ করাকে বুঝায়।

এই ঈমান আল্লাহর সূক্ষ নূর বিশেষ। মনের সামান্যতম সন্দেহই উহাকে নিভিয়ে মানুষকে ঈমানহারা করে অন্ধকারে নিপতিত করতে পারে। এ জন্যই বলা হয়েছে – উহা চুলের চেয়েও চিকন এবং হীরার চেয়েও ধার। মুমিন বান্দাদের যে দুনিয়াতে দুঃসহ কঠিন সময় অতিক্রম করে পরকালের জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে, এসম্পর্কে হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,

“দুনিয়া মুমিনের জন্য যন্ত্রনাময় স্থান এবং কাফেরের জন্য বেহেস্ত।” (মুসলিম শরীফ, ২য় খন্ড,পৃষ্ঠা -৪০৭; মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা -৪৩৯)

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানব জীবনে ৩টি অধ্যায় রয়েছে। যথা (১) শৈশব থেকে যৌবন, (২) যৌবন থেকে প্রৌঢ়, (৩) প্রৌঢ় থেকে বার্ধক্য।

মানব জীবনের এই তিনটি কালকেও পুলসিরাতের সাথে তুলনা করা যায়। যেমন; প্রথম অংশটি উপরের দিকে অর্থ্যাৎ -শৈশব থেকে যৌবন কাল পর্যন্ত মানুষ ঈমানের উপর কায়েম থাকার জন্য মহামানবগনের সাহচর্যে গিয়ে উত্তম চরিত্র গঠনের লক্ষ্যে কঠিন সাধনা করে থাকে। এ সময়ে মানুষের ভিতরে নৈতিকতা ও পাপ পূণ্য সম্পর্কে যে ধারনার সৃষ্টি হয়, তা আজীবন তার মনে ক্রিয়াশীল থাকে। দ্বিতীয় অংশটি সমতল অর্থ্যাৎ – যৌবন থেকে প্রৌঢ় পর্যন্ত বয়স কালে জীবনের প্রথম অংশে গড়ে তোলা নীতি ও চরিত্রের ধারা অনুসারে জীবন পরিচালনা করে জীবনে পূর্ণতা আনয়ন করে থাকে এবং তৃতীয় অংশটি নীচের দিকে অর্থ্যাৎ -প্রৌঢ় থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের দেহের অবনতি ঘটে এবং কর্মক্ষমতা লোপ পেতে থাকে।

এমতাবস্থায় মানুষের নতুন কিছু করার থাকে না। জীবনের প্রথম অংশে অর্জিত চরিত্রের আলোকে দ্বিতীয় অংশের পূর্ণ বয়সে সঞ্চিত কর্মফলের মাধ্যমে মানুষের জীবনের তৃপ্ত অংশ অতিবাহিত হয়ে মৃত্যু বরণ করে মানুষ জীবনের পরপারে চলে যায়। সুতরাং, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর প্রেরিত মহামানবগনের সাহচর্যে গিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথে তথা আলোর পথে পরিচালিত হওয়াও একপ্রকার পুলসিরাত অতিক্রম করা।

সূত্র: আল্লাহ কোন পথে।

নিবেদক: অধম পাপী মোজাম্মেল পাগলা।