জীবনের দ্বৈততা এবং আধ্যাত্মিকতা

জীবনের দ্বৈততা এবং আধ্যাত্মিকতা

জীবনের দ্বৈততা এবং আধ্যাত্মিকতা
-শ্যামলী আক্তার

শিষ্য: ওহে গুরুদেব, আমার মন আজ অশান্ত। এই দুনিয়া যেন একটা নরক! চারদিকে দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা। এমন নরকের মাঝে বসে ইবাদত করার কী দরকার? অগ্নিকুণ্ডে বসে জলের স্নান করলে কী লাভ? আর জীবনকে সুন্দর দেখার চেষ্টা করা তো বোকামি! প্রত্যেক সুন্দরের পিছনে তো একটা ভয়ঙ্করত্ব লুকিয়ে থাকে। তাহলে কেন আমরা এই মায়াময় জীবনকে সুন্দর ভাবতে চাই? বুঝিয়ে দিন, গুরু!

গুরু: শোনো, বৎস। তোমার প্রশ্নগুলো গভীর, কিন্তু এগুলো জীবনের মূল সত্যকে ছুঁয়ে যায়। আসুন একে একে বিচার করি। প্রথমে নরকের মধ্যে ইবাদতের কথা। কী ভাবছ তুমি নরককে? এই দুনিয়া যদি নরক হয়, তাহলে তুমি কি তার বাইরে দাঁড়িয়ে আছ? না, তুমি তারই অংশ। ইবাদত বা আধ্যাত্মিক সাধনা তো সেই নরককে অতিক্রম করার উপায়। যেমন অগ্নিকুণ্ডে বসে জলের স্নান এটা অসম্ভব মনে হয়, কিন্তু আসলে এটা প্রতীকী। আগুন হলো কাম, ক্রোধ, লোভ এগুলোর মধ্যে থেকেই তোমাকে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। যদি নরক ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষা করো, তাহলে কখনো মুক্তি পাবে না। ইবাদত হলো সেই জল, যা আগুনের মধ্যেও শান্তি দেয়। ভগবান রামকৃষ্ণ বলতেন, “কাঁটায় কাঁটা তোলো”। দুঃখের মধ্যেই সুখের বীজ লুকিয়ে আছে।

শিষ্য: কিন্তু গুরু, জীবনকে সুন্দর দেখার চেষ্টা কেন করব? আমি তো দেখছি, ফুলের সৌন্দর্যের পিছনে কাঁটা, প্রেমের পিছনে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। প্রত্যেক সুন্দরের মধ্যে ভয়ঙ্করত্ব এটা সত্যি না? তাহলে এই মায়া কেন?

গুরু: হ্যাঁ, বৎস, সত্যি। জীবন দ্বৈততায় ভরা সুন্দর আর অসুন্দর, আলো আর অন্ধকার, সুখ আর দুঃখ। এটাই মায়া। কিন্তু তুমি যদি শুধু ভয়ঙ্করত্ব দেখো, তাহলে তুমি অর্ধেক সত্য দেখছ। উপনিষদে বলা আছে, “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” সবকিছুতেই ঐশ্বরিকতা। সুন্দরকে দেখো না শুধু বাহ্যিক রূপে; দেখো তার গভীরতায়। যেমন একটা গোলাপ: সৌন্দর্য আছে, কাঁটাও আছে। কাঁটা ছাড়া গোলাপ হয় না, কারণ কাঁটা রক্ষা করে। তেমনি জীবনের ভয়ঙ্করত্ব তোমাকে শক্তিশালী করে, সুন্দরকে উপভোগ করার যোগ্য করে। বোকা তুমি নও যদি সুন্দর দেখো; বোকা হবে যদি শুধু সুন্দর দেখো এবং ভয়ঙ্করকে অস্বীকার করো। আসল জ্ঞান হলো দুটোকে মিলিয়ে দেখা‌ এটাই অদ্বৈত। তুমি জীবনের উপর দাঁড়িয়ে জীবনকে সুন্দর দেখতে চাও? হ্যাঁ, চাও! কারণ তুমি জীবনের অংশ, তার বাইরে নও। এই দৃষ্টিভঙ্গি তোমাকে মুক্ত করে।

শিষ্য: তাহলে কী করব আমি? এই দ্বৈততার মধ্যে কীভাবে শান্তি পাব?

গুরু: সাধনা করো, বৎস। ইবাদত করো নরকের মধ্যেই কারণ সেটাই তোমার পরীক্ষা। প্রত্যেক সুন্দরে ভয়ঙ্কর দেখো, কিন্তু ভয় পেয়ো না; শেখো। যেমন সমুদ্রের ঢেউ: উঠে পড়ে, কিন্তু গভীরে শান্ত। তুমিও তাই হও। ধ্যান করো, কর্ম করো নিষ্কামভাবে। তাহলে অগ্নিকুণ্ডেও জলের স্নান সম্ভব হবে, আর জীবন সত্যিই সুন্দর মনে হবে তার সমস্ত দিক নিয়ে। শান্তি তোমার হাতে।

শিষ্য: ধন্যবাদ, গুরু। আজ আমার চোখ খুলে গেল।

আরো পড়ুনঃ