যেহেতু আমি, চিন্তাও আমি— তাহলে অন্যের চিন্তা কোথায়?

যেহেতু আমি, চিন্তাও আমি— তাহলে অন্যের চিন্তা কোথায়?

যে চিন্তা আমি বলে দাবি করি, সে চিন্তা কখনো বাইরে যায় না। অন্য যাকে দেখি, যার কথা শুনি, যার চোখে চোখ রাখি—সবই আমারই চিন্তার মধ্যে উঠে আসে। তার হাসি, তার কান্না, তার রাগ, তার প্রশ্ন—এসব আমার মনেরই ছবি। আমি তার চিন্তা পড়তে পারি না, কারণ পড়ার মতো কোনো আলাদা চিন্তা সেখানে নেই। যা পড়ি বলে মনে হয়, তা আমারই অনুমান, আমারই ব্যাখ্যা, আমারই সৃষ্টি। অন্যের মন বলে যা ধরে নিই, সেটাও আমার মনেরই একটা প্রতিফলন—আর কিছু নয়।

অদ্বৈতে এই সত্যটি আরও নগ্ন হয়ে ওঠে: একমাত্র চৈতন্য আছে, ব্রহ্ম। জীবের সংখ্যা যতই মনে হোক, সবই একই চৈতন্যের উপর অহং-বুদ্ধির আরোপ। প্রত্যেক ‘আমি’ আসলে সেই একই ‘আমি’-র ভিন্ন ভিন্ন মুখোশ। তাই অন্যের চিন্তা ‘পাঠ’ করার প্রশ্নই ওঠে না—কারণ অন্য বলে কিছু নেই যার চিন্তা আলাদা করে পড়া যাবে। যা দেখা যায়, শোনা যায়, অনুমান করা যায়—সবই মায়ার খেলা, যেখানে একই সত্তা নিজেকে বহুরূপে ভ্রম করে।

এক জীববাদ বলে যে শুধু একটি জীবই আছে—আর সব ‘অন্য’ জীব তারই স্বপ্নের অংশ। দৃষ্টি-সৃষ্টি-বাদ বলে জগৎ দেখামাত্রই সৃষ্টি হয়, তাই অন্যের মনও আমার দৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে উৎপন্ন। দুই-ই একই কথা বলে ভিন্ন ভাষায়: আলাদা, স্বাধীন অন্য-মন বলে কিছু নেই। যা আছে, তা এক।

তাই যখন আমরা বলি “অন্যের চিন্তা আমরা পড়তে পারি না”—এটা সত্য, কিন্তু তার চেয়েও গভীর সত্য এই যে, পড়ার মতো কোনো ‘অন্যের চিন্তা’ আদৌ নেই। যা পড়তে চাই, তা আমারই মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্যকে দেখে যে অনুভূতি জাগে, সে অনুভূতিও আমি। তার দুঃখে যে ব্যথা, সে ব্যথাও আমি। তার আনন্দে যে হাসি, সে হাসিও আমি।

শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নও থেমে যায়: অন্য আছে কি না?
কারণ যে প্রশ্ন করে, সে-ই তো ‘অন্য’কে ধরে নিয়েছে।
যখন প্রশ্নকর্তা লুপ্ত হয়, তখন আর ‘অন্য’ বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
শুধু থাকে এক অখণ্ড চৈতন্য—যার মধ্যে আমি-তুমি-সে-তারা সবই মিলে একাকার।

এখানে আর বিভাজন নেই।
আর পড়া-পড়ানো নেই।
শুধু—আছে।
নিজেকে নিজের মধ্যে চিনে নেওয়া।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ