প্রাণায়াম অভ্যাস কর, সাধন পথে মন আমার (বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা)
প্রাণায়াম অভ্যাস কর,
সাধন পথে মন আমার
রেচক পূরক কুম্ভকেতে
লুপ্ত কর কাম বিকার।।
পরে ষটচক্র শোন নিগুমেতে কর ধ্যান
দম সামর্থ্যে কর সাধন,
গুহ্যমূলে মূলাধার সেই পদ্মেতে কুণ্ডলিনী,
ভূজঙ্গ সেই রূপিনী সাড়ে তিন প্যাচ দিয়ে তিনি,
দৃষ্টি রাখছেন সহস্রবার।।
উর্ধ্ব দেশে চলোরে মন,
বীজ মন্ত্র করে রোপন ছাড়াইয়া লও ধরা সাধন,
দেখবে মজা চমৎকার ডাকিনী যোগিনী নিয়া,
আছেন মা সুখে ঘুমাইয়া
উর্দ্ধশ্বাসে লও জাগাইয়া, রুদ্ধ রাখছে ব্রহ্মদ্বার।।
চলরে জাহ্নবীর কূলে,
স্বাধীষ্ঠান ষড়দলে ঝম্প দিয়ে পড়গে জলে,
যদি মন জানো সাঁতার স্নিগ্ধ জলে শুদ্ধ হইয়া,
জলের উপর আসন নিয়া মণিপুরে যাও চলিয়া,
থাকবে না আর অন্ধকার।।
কমল বরণ মণি কোঠা, একটি ফুলের পাখি দশটা
যদি হইতে পারো নিষ্ঠা, খাইবে মধু বেশুমার
অগ্নিকুণ্ডের কোলাহলে, কান ফেটে যায় ভূমণ্ডলে
ঝাপ দেওগে সেই চিতানলে, যদি ইচ্ছা থাকে কার।।
লোল জিহ্বা ধুধু করে, যেজন সাহসের জোরে দম রাখিয়া পুড়ে মরে,
অগ্নি হয় তার তাবেদার সেই অগ্নিতে হলে দাহন,
হয়ে যাবে অগ্নিবাহন সিদ্ধ হবে কর্মকারণ,
কাঞ্চন বরণ হবে তার।।
হৃদিপদ্ম অনাহত, বারোটি দল রয় পবিত্র
নারায়ণ বিরাজিত, বায়ুতে তার আহার বিহার
সেই পদ্ম হইলে সাধন, বায়ুর সনে করবে ভ্রমণ
পরমাত্মা হবে দর্শন, পূণর্জন্ম হবেনা আর।।
ষোলো দল কণ্ঠমূলে, বিশুদ্ধাক্ষ পদ্ম বলে
সাধন হলে আকাশ কোলে, সুখের নাহি পারাপার
সুষুম্মার ছিদ্র দিয়া, দ্বিদল পদ্মে ওঠো গিয়া
আজ্ঞাচক্র ভেদ করিয়া, করে লও জাতের বিচার।।
ব্রহ্মপুরে সহস্র দল, সাধকের সাধনার বল
রাজ্য সম্পদ সবই বিফল, কুণ্ডলিনী জাগে যার
সেই দেশেতে গেলে পরে, মুক্ত জীব বলে তারে
জালালে কয় যাবে সেরে, যমের নাইরে অধিকার।।
জালাল উদ্দিন খাঁ এই গানে সাধকের পথকে অপূর্ব রূপকে এঁকেছেন। তিনি বলেন “প্রাণায়াম অভ্যাস কর, সাধন পথে মন আমার” অর্থাৎ দম আর মন এক না হলে সাধনা শুরুই হয় না। “রেচক পূরক কুম্ভকেতে লুপ্ত কর কাম বিকার” লাইনে তিনি দেখান, দেহসংযমেই কামনা ক্ষয় হয়।
মূলাধারের কুণ্ডলিনী থেকে শুরু করে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত পেরিয়ে সহস্রার এই যাত্রা আসলে বাহ্যিক কিছু নয়, সাধকের অন্তর্গত রূপান্তর। “রাজ্য সম্পদ সবই বিফল” বলে জালাল খাঁ স্মরণ করিয়ে দেন, দম চেতনার সাধনার কাছে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য তুচ্ছ।
এই গান সেই সাধকের প্রশস্তি, যিনি সাহস, নিষ্ঠা আর দয়ার পথে হেঁটে নিজের ভেতরের মানুষকে জাগাতে পারেন। জালাল খাঁর কৃপায় এই গানে সাধনা আর মুক্তি একাকার হয়ে উঠেছে।
নিচে গানের কথার অল্প কিছু ব্যাখ্যা করবো সাধুগুরুর কৃপায়।
প্রাণায়াম অভ্যাস কর,
সাধন পথে মন আমার
রেচক পূরক কুম্ভকেতে
লুপ্ত কর কাম বিকার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
এই অন্তরায় প্রাণায়ামের (শ্বাস নিয়ন্ত্রণের) গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যা পতঞ্জলির যোগসূত্রে (অধ্যায় ২, সূত্র ৪৯-৫৩) মনের অস্থিরতা (বিকার) নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মূল অঙ্গ হিসেবে বর্ণিত। রেচক (শ্বাস বের করা), পূরক (শ্বাস নেওয়া) এবং কুম্ভক (শ্বাস ধরে রাখা) দিয়ে কাম (কামনা বা লালসা) নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা কুণ্ডলিনী যোগের প্রারম্ভিক ধাপ। এটি মনকে সাধনার পথে স্থির করে, শারীরিক এবং মানসিক অশুদ্ধি দূর করে সমাধির দিকে নিয়ে যায়।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি হাবস-ই-দম (শ্বাস ধরে রাখা) এবং ধিকর (আল্লাহর স্মরণ) এর সাথে সম্পর্কিত, যা নাফস (অহংকার বা নিম্নতর আত্মা) নিয়ন্ত্রণ করে। রুমী বা ইবন আরাবির মতো সূফীদের মতে, শ্বাস নিয়ন্ত্রণ দিয়ে কামনা (শাহওয়াত) দমন করা হয়, যা আধ্যাত্মিক যাত্রার (তরীকত) প্রথম ধাপ। এটি লতাইফ-এর নাফস কেন্দ্রকে শুদ্ধ করে, ফানা (আত্ম-বিলয়) এর দিকে নিয়ে যায়।
পরে ষটচক্র শোন নিগুমেতে কর ধ্যান
দম সামর্থ্যে কর সাধন,
গুহ্যমূলে মূলাধার সেই পদ্মেতে কুণ্ডলিনী,
ভূজঙ্গ সেই রূপিনী সাড়ে তিন প্যাচ দিয়ে তিনি,
দৃষ্টি রাখছেন সহস্রবার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
এখানে ষটচক্র (ছয়টি চক্র, সপ্তম সহস্রার সহ) এবং মূলাধার চক্রের উল্লেখ, যা হঠযোগ প্রদীপিকায় (অধ্যায় ৩) বর্ণিত। কুণ্ডলিনী শক্তি সর্পাকারে (ভূজঙ্গ) মূলাধারে (গুহ্যমূলে) ঘুমিয়ে থাকে, সাড়ে তিনটি প্যাঁচ (coils) দিয়ে। ধ্যান এবং দম (শ্বাস নিয়ন্ত্রণ) দিয়ে এটি জাগানো হয়, যা সুষুম্না নাড়ির মধ্য দিয়ে উর্ধ্বগামী হয়ে সমস্ত চক্র ভেদ করে।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি লতাইফ-এর নাফস কেন্দ্রের সাথে সমান্তরাল, যা শরীরের নিম্নভাগে অবস্থিত এবং অহংকারের প্রতীকe1d0e6। কুণ্ডলিনীর জাগরণের মতো, সূফীতে ধিকর দিয়ে নাফস শুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে যাত্রা শুরু হয়। ইবন আরাবির মতে, এটি আত্মার ‘সর্প’ (ego’s coil) মুক্ত করে, সিরাত-আল-মুস্তাকিম (সরল পথ) এর দিকে নিয়ে যায়।
উর্ধ্ব দেশে চলোরে মন,
বীজ মন্ত্র করে রোপন ছাড়াইয়া লও ধরা সাধন,
দেখবে মজা চমৎকার ডাকিনী যোগিনী নিয়া,
আছেন মা সুখে ঘুমাইয়া
উর্দ্ধশ্বাসে লও জাগাইয়া, রুদ্ধ রাখছে ব্রহ্মদ্বার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
কুণ্ডলিনীকে জাগানোর কথা, যা মূলাধার থেকে উর্ধ্বে যায়। বীজ মন্ত্র (যেমন ‘লং’ মূলাধারের) দিয়ে সাধনা, ডাকিনী-যোগিনী (দেবী শক্তির রূপ) সাথে। উর্ধ্বশ্বাস (প্রাণায়াম) দিয়ে ব্রহ্মদ্বার (সহস্রারের দ্বার) খোলা হয়, যা শিব-শক্তির মিলনের প্রতীক।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি ফানা-র প্রথম ধাপ, যেখানে নাফস থেকে কালব (হৃদয়) এ উঠা। ‘মা’ (দেবী) আল্লাহর রহমতের প্রতীক, যা ধিকর দিয়ে জাগানো হয়। ব্রহ্মদ্বার রুদ্ধ রাখা মানে ইলহাম (divine inspiration) এর দ্বার, যা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ দিয়ে খোলা হয়।
চলরে জাহ্নবীর কূলে,
স্বাধীষ্ঠান ষড়দলে ঝম্প দিয়ে পড়গে জলে,
যদি মন জানো সাঁতার স্নিগ্ধ জলে শুদ্ধ হইয়া,
জলের উপর আসন নিয়া মণিপুরে যাও চলিয়া,
থাকবে না আর অন্ধকার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
স্বাধিষ্ঠান চক্র (জলের উপাদান, ৬ দল) এবং মণিপুরে (অগ্নির উপাদান) যাত্রা। জাহ্নবী (গঙ্গা) প্রতীক শুদ্ধির। সাঁতার (নিয়ন্ত্রণ) দিয়ে জল (আবেগ) অতিক্রম করে অগ্নিতে যাওয়া, যা অন্ধকার (অজ্ঞান) দূর করে।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
লতাইফ-এ কালিব (শারীরিক) থেকে রুহ (আত্মা) এ উঠা, যা জলের মতো শুদ্ধি এবং অগ্নির মতো পরীক্ষা। সূফীতে মুরাকাবা (meditation) দিয়ে নাফস শুদ্ধ করে রুহ জাগানো, যা অন্ধকার (জাহিলিয়া) দূর করে।
কমল বরণ মণি কোঠা, একটি ফুলের পাখি দশটা
যদি হইতে পারো নিষ্ঠা, খাইবে মধু বেশুমার
অগ্নিকুণ্ডের কোলাহলে, কান ফেটে যায় ভূমণ্ডলে
ঝাপ দেওগে সেই চিতানলে, যদি ইচ্ছা থাকে কার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
মণিপুর চক্র (১০ দল, অগ্নির কুণ্ড), যা নিষ্ঠা (ভক্তি) দিয়ে সক্রিয় হয়। অগ্নিতে ঝাঁপ (তপস্যা) দিয়ে মধু (আমৃত) পাওয়া, যা শক্তি এবং জ্ঞান দেয়।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
রুহ লতাইফ (অগ্নির মতো শক্তি), যা জিকর দিয়ে সক্রিয় হয়। অগ্নিতে ঝাঁপ মানে তপস্যা (রিয়াজত), যা আল্লাহর নূর (light) দেয়।
লোল জিহ্বা ধুধু করে, যেজন সাহসের জোরে দম রাখিয়া পুড়ে মরে,
অগ্নি হয় তার তাবেদার সেই অগ্নিতে হলে দাহন,
হয়ে যাবে অগ্নিবাহন সিদ্ধ হবে কর্মকারণ,
কাঞ্চন বরণ হবে তার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
মণিপুরে অগ্নি সাধনা, যেখানে দম (শ্বাস) দিয়ে অগ্নি নিয়ন্ত্রণ করে সিদ্ধি লাভ। কাঞ্চন বরণ (সোনালী) মানে শুদ্ধ দেহ।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
রুহ-এ অগ্নি পরীক্ষা, যা নাফস-কে পোড়ানো (ফানা)। সিদ্ধি মানে বাকা (আল্লাহতে অস্তিত্ব), যা সোনালী নূর দেয়।
হৃদিপদ্ম অনাহত, বারোটি দল রয় পবিত্র
নারায়ণ বিরাজিত, বায়ুতে তার আহার বিহার
সেই পদ্ম হইলে সাধন, বায়ুর সনে করবে ভ্রমণ
পরমাত্মা হবে দর্শন, পূণর্জন্ম হবেনা আর।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
অনাহত চক্র (হৃদয়, ১২ দল, বায়ু উপাদান), যেখানে নারায়ণ (পরমাত্মা) বিরাজমান। সাধনা দিয়ে পুনর্জন্ম মুক্তি (মোক্ষ)।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
কালব লতাইফ (হৃদয়), যা আল্লাহর প্রেমের কেন্দ্র। ধিকর দিয়ে পরমাত্মা দর্শন, যা পুনর্জন্মের মতো সংসার থেকে মুক্তি।
ষোলো দল কণ্ঠমূলে, বিশুদ্ধাক্ষ পদ্ম বলে
সাধন হলে আকাশ কোলে, সুখের নাহি পারাপার
সুষুম্মার ছিদ্র দিয়া, দ্বিদল পদ্মে ওঠো গিয়া
আজ্ঞাচক্র ভেদ করিয়া, করে লও জাতের বিচার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
বিশুদ্ধ চক্র (কণ্ঠ, ১৬ দল, আকাশ উপাদান) এবং আজ্ঞা চক্র (দ্বিদল)। সুষুম্না দিয়ে উঠে জাতের বিচার (অজ্ঞান দূর)।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সির এবং খাফি লতাইফ, যা অন্তর্দৃষ্টি এবং জ্ঞান দেয়। ধিকর দিয়ে আকাশের মতো সুখ, এবং জাতের বিচার মানে হাকিকত (truth) উপলব্ধি।
ব্রহ্মপুরে সহস্র দল, সাধকের সাধনার বল
রাজ্য সম্পদ সবই বিফল, কুণ্ডলিনী জাগে যার
সেই দেশেতে গেলে পরে, মুক্ত জীব বলে তারে
জালালে কয় যাবে সেরে, যমের নাইরে অধিকার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
সহস্রার চক্র (ব্রহ্মপুর, ১০০০ দল), যেখানে কুণ্ডলিনী পৌঁছে মুক্তি (কৈবল্য)। যম (মৃত্যু) এর অধিকার নেই।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
আখফা লতাইফ (divine center), যা আল্লাহর সাথে ঐক্য (ওয়াহদাত আল-ওয়ুজুদ)। মুক্ত জীব (মুক্ত আত্মা), যেখানে দুনিয়ার সম্পদ বিফল এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করে
প্রাণায়াম অভ্যাস কর,
সাধন পথে মন আমার
রেচক পূরক কুম্ভকেতে
লুপ্ত কর কাম বিকার ।।
পরে ষটচক্র শোন নিগুমেতে কর ধ্যান
দম সামর্থ্যে কর সাধন,
গুহ্যমূলে মূলাধার সেই পদ্মেতে কুণ্ডলিনী,
ভূজঙ্গ সেই রূপিনী সাড়ে তিন প্যাচ দিয়ে তিনি,
দৃষ্টি রাখছেন সহস্রবার।।
উর্ধ্ব দেশে চলোরে মন,
বীজ মন্ত্র করে রোপন ছাড়াইয়া লও ধরা সাধন,
দেখবে মজা চমৎকার ডাকিনী যোগিনী নিয়া,
আছেন মা সুখে ঘুমাইয়া
উর্দ্ধশ্বাসে লও জাগাইয়া, রুদ্ধ রাখছে ব্রহ্মদ্বার।।
চলরে জাহ্নবীর কূলে,
স্বাধীষ্ঠান ষড়দলে ঝম্প দিয়ে পড়গে জলে,
যদি মন জানো সাঁতার স্নিগ্ধ জলে শুদ্ধ হইয়া,
জলের উপর আসন নিয়া মণিপুরে যাও চলিয়া,
থাকবে না আর অন্ধকার।।
কমল বরণ মণি কোঠা, একটি ফুলের পাখি দশটা
যদি হইতে পারো নিষ্ঠা, খাইবে মধু বেশুমার
অগ্নিকুণ্ডের কোলাহলে, কান ফেটে যায় ভূমণ্ডলে
ঝাপ দেওগে সেই চিতানলে, যদি ইচ্ছা থাকে কার।।
লোল জিহ্বা ধুধু করে, যেজন সাহসের জোরে দম রাখিয়া পুড়ে মরে,
অগ্নি হয় তার তাবেদার সেই অগ্নিতে হলে দাহন,
হয়ে যাবে অগ্নিবাহন সিদ্ধ হবে কর্মকারণ,
কাঞ্চন বরণ হবে তার।।
হৃদিপদ্ম অনাহত, বারোটি দল রয় পবিত্র
নারায়ণ বিরাজিত, বায়ুতে তার আহার বিহার
সেই পদ্ম হইলে সাধন, বায়ুর সনে করবে ভ্রমণ
পরমাত্মা হবে দর্শন, পূণর্জন্ম হবেনা আর ।।
ষোলো দল কণ্ঠমূলে, বিশুদ্ধাক্ষ পদ্ম বলে
সাধন হলে আকাশ কোলে, সুখের নাহি পারাপার
সুষুম্মার ছিদ্র দিয়া, দ্বিদল পদ্মে ওঠো গিয়া
আজ্ঞাচক্র ভেদ করিয়া, করে লও জাতের বিচার।।
ব্রহ্মপুরে সহস্র দল, সাধকের সাধনার বল
রাজ্য সম্পদ সবই বিফল, কুণ্ডলিনী জাগে যার
সেই দেশেতে গেলে পরে, মুক্ত জীব বলে তারে
জালালে কয় যাবে সেরে, যমের নাইরে অধিকার।।
প্রথম অন্তরা:
প্রাণায়াম অভ্যাস কর,
সাধন পথে মন আমার
রেচক পূরক কুম্ভকেতে
লুপ্ত কর কাম বিকার ।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
এই অন্তরায় প্রাণায়ামের (শ্বাস নিয়ন্ত্রণের) গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যা পতঞ্জলির যোগসূত্রে (অধ্যায় ২, সূত্র ৪৯-৫৩) মনের অস্থিরতা (বিকার) নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মূল অঙ্গ হিসেবে বর্ণিত। রেচক (শ্বাস বের করা), পূরক (শ্বাস নেওয়া) এবং কুম্ভক (শ্বাস ধরে রাখা) দিয়ে কাম (কামনা বা লালসা) নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা কুণ্ডলিনী যোগের প্রারম্ভিক ধাপ। এটি মনকে সাধনার পথে স্থির করে, শারীরিক এবং মানসিক অশুদ্ধি দূর করে সমাধির দিকে নিয়ে যায়।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি হাবস-ই-দম (শ্বাস ধরে রাখা) এবং ধিকর (আল্লাহর স্মরণ) এর সাথে সম্পর্কিত, যা নাফস (অহংকার বা নিম্নতর আত্মা) নিয়ন্ত্রণ করে। রুমী বা ইবন আরাবির মতো সূফীদের মতে, শ্বাস নিয়ন্ত্রণ দিয়ে কামনা (শাহওয়াত) দমন করা হয়, যা আধ্যাত্মিক যাত্রার (তরীকত) প্রথম ধাপ। এটি লতাইফ-এর নাফস কেন্দ্রকে শুদ্ধ করে, ফানা (আত্ম-বিলয়) এর দিকে নিয়ে যায়।
পরে ষটচক্র শোন নিগুমেতে কর ধ্যান
দম সামর্থ্যে কর সাধন,
গুহ্যমূলে মূলাধার সেই পদ্মেতে কুণ্ডলিনী,
ভূজঙ্গ সেই রূপিনী সাড়ে তিন প্যাচ দিয়ে তিনি,
দৃষ্টি রাখছেন সহস্রবার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
এখানে ষটচক্র (ছয়টি চক্র, সপ্তম সহস্রার সহ) এবং মূলাধার চক্রের উল্লেখ, যা হঠযোগ প্রদীপিকায় (অধ্যায় ৩) বর্ণিত। কুণ্ডলিনী শক্তি সর্পাকারে (ভূজঙ্গ) মূলাধারে (গুহ্যমূলে) ঘুমিয়ে থাকে, সাড়ে তিনটি প্যাঁচ (coils) দিয়ে। ধ্যান এবং দম (শ্বাস নিয়ন্ত্রণ) দিয়ে এটি জাগানো হয়, যা সুষুম্না নাড়ির মধ্য দিয়ে উর্ধ্বগামী হয়ে সমস্ত চক্র ভেদ করে।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি লতাইফ-এর নাফস কেন্দ্রের সাথে সমান্তরাল, যা শরীরের নিম্নভাগে অবস্থিত এবং অহংকারের প্রতীকe1d0e6। কুণ্ডলিনীর জাগরণের মতো, সূফীতে ধিকর দিয়ে নাফস শুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে যাত্রা শুরু হয়। ইবন আরাবির মতে, এটি আত্মার ‘সর্প’ (ego’s coil) মুক্ত করে, সিরাত-আল-মুস্তাকিম (সরল পথ) এর দিকে নিয়ে যায়।
উর্ধ্ব দেশে চলোরে মন,
বীজ মন্ত্র করে রোপন ছাড়াইয়া লও ধরা সাধন,
দেখবে মজা চমৎকার ডাকিনী যোগিনী নিয়া,
আছেন মা সুখে ঘুমাইয়া
উর্দ্ধশ্বাসে লও জাগাইয়া, রুদ্ধ রাখছে ব্রহ্মদ্বার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
কুণ্ডলিনীকে জাগানোর কথা, যা মূলাধার থেকে উর্ধ্বে যায়। বীজ মন্ত্র (যেমন ‘লং’ মূলাধারের) দিয়ে সাধনা, ডাকিনী-যোগিনী (দেবী শক্তির রূপ) সাথে। উর্ধ্বশ্বাস (প্রাণায়াম) দিয়ে ব্রহ্মদ্বার (সহস্রারের দ্বার) খোলা হয়, যা শিব-শক্তির মিলনের প্রতীক।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সূফীতে এটি ফানা-র প্রথম ধাপ, যেখানে নাফস থেকে কালব (হৃদয়) এ উঠা। ‘মা’ (দেবী) আল্লাহর রহমতের প্রতীক, যা ধিকর দিয়ে জাগানো হয়। ব্রহ্মদ্বার রুদ্ধ রাখা মানে ইলহাম (divine inspiration) এর দ্বার, যা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ দিয়ে খোলা হয়।
চলরে জাহ্নবীর কূলে,
স্বাধীষ্ঠান ষড়দলে ঝম্প দিয়ে পড়গে জলে,
যদি মন জানো সাঁতার স্নিগ্ধ জলে শুদ্ধ হইয়া,
জলের উপর আসন নিয়া মণিপুরে যাও চলিয়া,
থাকবে না আর অন্ধকার ।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
স্বাধিষ্ঠান চক্র (জলের উপাদান, ৬ দল) এবং মণিপুরে (অগ্নির উপাদান) যাত্রা। জাহ্নবী (গঙ্গা) প্রতীক শুদ্ধির। সাঁতার (নিয়ন্ত্রণ) দিয়ে জল (আবেগ) অতিক্রম করে অগ্নিতে যাওয়া, যা অন্ধকার (অজ্ঞান) দূর করে।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
লতাইফ-এ কালিব (শারীরিক) থেকে রুহ (আত্মা) এ উঠা, যা জলের মতো শুদ্ধি এবং অগ্নির মতো পরীক্ষা। সূফীতে মুরাকাবা (meditation) দিয়ে নাফস শুদ্ধ করে রুহ জাগানো, যা অন্ধকার (জাহিলিয়া) দূর করে।
কমল বরণ মণি কোঠা, একটি ফুলের পাখি দশটা
যদি হইতে পারো নিষ্ঠা, খাইবে মধু বেশুমার
অগ্নিকুণ্ডের কোলাহলে, কান ফেটে যায় ভূমণ্ডলে
ঝাপ দেওগে সেই চিতানলে, যদি ইচ্ছা থাকে কার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
মণিপুর চক্র (১০ দল, অগ্নির কুণ্ড), যা নিষ্ঠা (ভক্তি) দিয়ে সক্রিয় হয়। অগ্নিতে ঝাঁপ (তপস্যা) দিয়ে মধু (আমৃত) পাওয়া, যা শক্তি এবং জ্ঞান দেয়।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
রুহ লতাইফ (অগ্নির মতো শক্তি), যা জিকর দিয়ে সক্রিয় হয়। অগ্নিতে ঝাঁপ মানে তপস্যা (রিয়াজত), যা আল্লাহর নূর (light) দেয়।
লোল জিহ্বা ধুধু করে, যেজন সাহসের জোরে দম রাখিয়া পুড়ে মরে,
অগ্নি হয় তার তাবেদার সেই অগ্নিতে হলে দাহন,
হয়ে যাবে অগ্নিবাহন সিদ্ধ হবে কর্মকারণ,
কাঞ্চন বরণ হবে তার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
মণিপুরে অগ্নি সাধনা, যেখানে দম (শ্বাস) দিয়ে অগ্নি নিয়ন্ত্রণ করে সিদ্ধি লাভ। কাঞ্চন বরণ (সোনালী) মানে শুদ্ধ দেহ।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
রুহ-এ অগ্নি পরীক্ষা, যা নাফস-কে পোড়ানো (ফানা)। সিদ্ধি মানে বাকা (আল্লাহতে অস্তিত্ব), যা সোনালী নূর দেয়।
হৃদিপদ্ম অনাহত, বারোটি দল রয় পবিত্র
নারায়ণ বিরাজিত, বায়ুতে তার আহার বিহার
সেই পদ্ম হইলে সাধন, বায়ুর সনে করবে ভ্রমণ
পরমাত্মা হবে দর্শন, পূণর্জন্ম হবেনা আর।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
অনাহত চক্র (হৃদয়, ১২ দল, বায়ু উপাদান), যেখানে নারায়ণ (পরমাত্মা) বিরাজমান। সাধনা দিয়ে পুনর্জন্ম মুক্তি (মোক্ষ)।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
কালব লতাইফ (হৃদয়), যা আল্লাহর প্রেমের কেন্দ্র। ধিকর দিয়ে পরমাত্মা দর্শন, যা পুনর্জন্মের মতো সংসার থেকে মুক্তি।
ষোলো দল কণ্ঠমূলে, বিশুদ্ধাক্ষ পদ্ম বলে
সাধন হলে আকাশ কোলে, সুখের নাহি পারাপার
সুষুম্মার ছিদ্র দিয়া, দ্বিদল পদ্মে ওঠো গিয়া
আজ্ঞাচক্র ভেদ করিয়া, করে লও জাতের বিচার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
বিশুদ্ধ চক্র (কণ্ঠ, ১৬ দল, আকাশ উপাদান) এবং আজ্ঞা চক্র (দ্বিদল)। সুষুম্না দিয়ে উঠে জাতের বিচার (অজ্ঞান দূর)।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
সির এবং খাফি লতাইফ, যা অন্তর্দৃষ্টি এবং জ্ঞান দেয়। ধিকর দিয়ে আকাশের মতো সুখ, এবং জাতের বিচার মানে হাকিকত (truth) উপলব্ধি।
ব্রহ্মপুরে সহস্র দল, সাধকের সাধনার বল
রাজ্য সম্পদ সবই বিফল, কুণ্ডলিনী জাগে যার
সেই দেশেতে গেলে পরে, মুক্ত জীব বলে তারে
জালালে কয় যাবে সেরে, যমের নাইরে অধিকার।।
যোগশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা:
সহস্রার চক্র (ব্রহ্মপুর, ১০০০ দল), যেখানে কুণ্ডলিনী পৌঁছে মুক্তি (কৈবল্য)। যম (মৃত্যু) এর অধিকার নেই।
সূফীমতবাদীয় ব্যাখ্যা:
আখফা লতাইফ (divine center), যা আল্লাহর সাথে ঐক্য (ওয়াহদাত আল-ওয়ুজুদ)। মুক্ত জীব (মুক্ত আত্মা), যেখানে দুনিয়ার সম্পদ বিফল এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করে।
লেখা- ফকির জুয়েল সাধু






