হা-মীম এর ব্যাখ্যা (সূফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতি)

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

হা-মীম এর ব্যাখ্যা (সূফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতি)

হা-মীম: হামদে মোহাম্মদ (অনন্ত মোহাম্মদের প্রশংসা)।

হা-মীমঃ ‘হামীম’-এর সংক্ষিপ্ত অর্থহামদে মোহাম্মদ‘ অর্থাৎ মোহাম্মদেরই প্রশংসা। মীমের উপর দীর্ঘ মদ দ্বারা বুঝাইতেছেন – অনন্ত মোহাম্মদেরই সকল প্রশংসা।

আরবি ভাষা বিশ্বের অন‍্যতম একটি ধর্মীয় ভাষা। এই ভাষার প্রত‍্যেক অক্ষরের একটি ভাব-দর্শন বা বৈশিষ্ট্য আছে এবং ইঙ্গিতবহ একটি দিক-দর্শন আছে।
‘হে’ অক্ষর দ্বারা মুখোমুখি হওয়া বুঝায়। আলিফ অক্ষরটি ‘হে’ -এর উপরে খাড়া জবররূপে স্থান পাইয়াছে। ‘আলিফ’ দ্বারা বুঝায় আমি বা স্বয়ং বা নিজ। নিজের মুখোমুখি হইয়া থাকাটাই আত্নদর্শন বা দিব‍্যজ্ঞান। ইহাকে বলা হয় ‘মান আরাফা নফসাহু’ যে নিজেকে দর্শন করে বা চিনে। নিজেকেই চিনিলেই অনন্ত মোহাম্মদের দর্শন নিজের মধ্যেই আপন রবরূপে দর্শন লাভ হয়।

এইরূপে প্রত‍্যেক মানুষকে মূলত মোহাম্মদী শেকেলে সৃষ্টি করা হইয়াছে যাহাতে সে আপন আমল দ্বারা সেই শেকেল অর্জন করিয়া লইতে হয় । ‘নূরে-মোহাম্মদীর একচ্ছটা তাহার মধ্যে আপন রবরূপে গুপ্ত ও সুপ্তভাবে বিরাজ করে। শুধু এইরূপেই আমরা মোহাম্মদের (আঃ) মত ‘বাশার’ অর্থাৎ দৈহিকভাবে মোহাম্মদের (আঃ) মত মানুষ।

‘হা-মীম’ -এর ‘হা’ অর্থ দর্শন বা দিব‍্যজ্ঞান। ‘মীম’ অর্থ মোহাম্মদ। এখানে মীম অনন্ত। এই অনন্ত সর্বদিক থেকে। প্রকাশে বা অস্তিত্বে অনন্ত, শক্তিতে অনন্ত। তিনি ছাড়া এই দুই গুনের অধিকারী অন‍্য কেহ বা কিছুই নাই। সকল মহাপুরুষ তাঁহার মধ‍্যেই বিলীন হন বা হারিয়ে যান। অন‍্য কোথাও হারিয়ে যাওয়ার জায়গা নাই। তাঁহার মধ্যে বিলীন হওয়াটাই চরম-পরম গন্তব‍্য। তিনি আদি, মধ্য, অন্ত। সর্বত্র তাঁহারই দুই গুণের প্রকাশ।

তাঁহার সর্বরূপে তাঁহাকে দর্শন করাই সাধনার চরম ও পরম লক্ষ। এই দর্শন কি? দেহ ও মনের তথা জাহের-বাতেনে সর্বরূপে তাঁহাকে দর্শন করিলে তাঁহাকে দেখা হয়। কিন্তুু এই দেখা অসম্পর্ণ এবং তাই দুর্বল। তাঁহাকে পরিপূর্ণভাবে দেখিতে হইলে লা-মোকামে তথা লোকোত্তরে উপনীত হইয়া পরিপূর্ণভাবে না-তে চলিয়া যাইতে হইবে। হ‍্যাঁ-এর কোন অংশই থাকিবে না।

ইহাতে সাধক, মোহাম্মদের বংশধরে এবং পরবর্তিতে মোহাম্মদে পরিণত হন। ইহাই হা-মীমের বাস্তবায়ন।

হা-মীম কথা দ্বারা আরম্ভ করা হইয়াছে সাতটি সূরা। এই সূরা সাতটি হা-মীমের বিশেষ ব‍্যাখ‍্যা। প্রকৃতপক্ষে কোরানের সকল কথাই হা-মীমের ব‍্যাখ‍্যা। জাহান্নামে যেমন সাতটা স্তর আছে হা-মীম সংকেত চিহ্নটিও কোরানে সাতবার আছে। মোহাম্মদী শক্তি দ্বারাই সাতটা জাহান্নামের এবং সাতটি জান্নাতে উত্তোরণ হইয়া থাকে।

মানুষকে কোরানে বৃক্ষ বলা হইয়াছে। সুতরাং রূপক উদাহরণে বলা যাইতে পারে যে, বৃক্ষের যেমন সার পদার্থ হিসাবে উহার কাণ্ড রহিয়াছে তেমনি রহিয়াছে তেমনি রহিয়াছে উহার আবরণ স্বরূপ ছাল, বাকল, পাতা ইত্যাদি। কাণ্ডের বাহিরে আবরনসমূহ সৃজনশীল। কারণ এইগুলি কাণ্ডকে অবলম্বন করিয়াই বৃক্ষের সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি ও বৃদ্ধিসাধন করে। কাণ্ড নিজে নিষ্ক্রয় কিন্তুু কাণ্ড ব‍্যতীত বৃক্ষের কোন অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। কাণ্ডই বৃক্ষের সার।

অনুরূপভাবে মানুষের ভিতরেও মূল কাণ্ড-শক্তি তদা মোহাম্মদী-অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্বকে অবলম্বন করিয়া রহিয়াছে তাহার নফসানী বা সংস্কার তথা জৈবিক অস্তিত্ব। এই অস্তিত্বই নানারূপ কার্যকরণের মাধ্যমে অস্তিত্বে প্রলম্বিত হইয়া চলিয়াছে। প্রলম্বিত অবস্থাটাই দুঃখ।

এই প্রলম্বিত অবস্থাটাই সূক্ষ্ম ভাবজগত হইতে স্থুল অস্তিত্ব জগতে রূপ হইতে রূপান্তরে সৃষ্টিরূপে প্রকাশিত হইতেছে। বাহ‍্যিক এই সৃজনশীল অবস্থাটা মূল অপরিবর্তনীয় একক মোহাম্মদী শক্তিকে অবলম্বন করিয়া চক্রাকারে ঘুরিতেছে। যাহাদের কাণ্ডজ্ঞান তথা মোহাম্মদী জ্ঞান আছে তাহারা আপন বর্ধিষ্ণু অবস্থানগুলিকে বা নফসানীয়াতকে অণু অণু ভাবে মুখামুখি দর্শন করে, যাহার ফলে তাহাদের সৃষ্টিচক্র কমিতে কমিতে মূলকাণ্ডে আসিয়া তথা মোহাম্মদী অস্তিত্বে আসিয়া শেষ হইয়া যায়। ইহাই তাহাদের মুক্ত অবস্থা।

অতএব কাণ্ডজ্ঞান হীন মানুষের মুক্তির কোন সম্ভাবনা নাই। কাণ্ডজ্ঞানের সহিত যাহারা আপন অস্তিত্বকে দর্শন করে তাহারা মোমিন। এই সূরাটি কাণ্ডজ্ঞানের কথা, তথা হা-মীমের কথা দ্বারাই আরম্ভ হইয়াছে, যাহাতে মানুষ মোমিন হইয়া মূল মোহাম্মদী শক্তিতে বিলীন হইতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ-
– মাওলা সদর উদ্দিন আহমদ চিশতি (রহঃ)।
– “কোরান দর্শন” সূরাঃ মোমিন, আয়াত (১) এর ব‍্যাখ‍্যা।

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!