দায়েমী নামাজ (আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা)
পড়রে দায়েমী নামাজ এ দিন হল আখেরী।।
মাশুকরূপ হৃদ কমলে
দেখ আশেক বাতি জ্বলে
কিবা সকাল কিবা বৈকালে
দায়েমীর নাই আঁধারী।।
সালেকের বাহ্যপনা
মুজ্জুবী আশেক দেওয়ানা
আশেক দেল করে ফানা
মাশুক বিনে অন্য জানে না
আশার ঝুলি লয়ে সেনা মাশুকের চরণ ভিখারী।।
কেফায়া আইনি জিন্নি
এহি ফরজ জাত নিশানী,
দায়েমী ফরজ আদায়
যে করে তার নাই জাতের ভয়,
জাত এলাহির ভাবে সদায়
মিশেছে সে জাতে নূরী।।
আইনি অদেখা তরিক
দায়েমী বরজখ নিরিখ,
সিরাজ সাঁইজীর হকের বচন
ভেবে কহে অবোধ লালন,
দায়েমী নামাজী পড়ে যে জন
সমন তাহার আজ্ঞাকারী।।
وَ اۡمُرۡ اَہۡلَکَ بِالصَّلٰوۃِ وَ اصۡطَبِرۡ عَلَیۡہَا ؕ لَا نَسۡـَٔلُکَ رِزۡقًا ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُکَ ؕ وَ الۡعَاقِبَۃُ لِلتَّقۡوٰی ﴿۱۳۲﴾
ওয়া’মুর আহলাকা বিসসালা-তি ওয়াসতাবির ‘আলাইহা- লা-নাছআলুকা রিঝকান নাহনুনারঝুকুকা ওয়াল ‘আ-কিবাতুলিত্তাকওয়া-।
আর তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও এবং তাতে অবিচল থাক। আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাইনা, আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই এবং শুভ পরিণামতো মুত্তাকীদের জন্য।
সালাত শব্দটি আরবী। এর বহুমুখী অর্থ রয়েছে। সাধারণত প্রার্থনা, রহমত, ক্ষমা, স্বরণ, সংযোগ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইসলামী তথ্যানুযায়ী আব্রাহামিক সকল ধর্মেই সালাত পালনের নির্দেশ রয়েছে। বিধি নিষেধের ভিন্নতা থাকলেও সালাত পালনের উদ্দেশ্য একটা ই।সেটা হল স্বর্গ প্রাপ্তি।
কিন্তু আত্মতাত্বিক বিশ্লেষকদের মতে সালাত সার্বজনীন, সকল মানুষের জন্য পালনীয়। যার উদ্দেশ্য একটাই স্রষ্টার সাথে সংযোগ স্থাপন করা। ধর্মান্ধ মুসলিমরা মনে করে সালাত কেবল তাদের পালনীয় ধর্ম, বস্তুত সালাতের উপস্থিতি পৃথিবীর সকল ধর্মেই রয়েছে নামের ভিন্নতায়।
ইসলামী আইন শাস্ত্রের প্রধান গ্রন্থ পবিত্র কোরানে প্রায় বিরাশি বার সালাত পালনের নির্দেশ রয়েছে।এর পাশাপাশি যাকাতের কথাও এসেছে।বর্তমান মুসলিমরা সংখ্যাভিত্তিক কিছু শারীরিক কসরতকে ই সালাত হিসেবে ধরে নিয়েছে।যা দিনে পাচবার পালন করা হয়। এ নিয়ে রয়েছে হরেকরকম বিচিত্র হাদিস।প্রকৃত পক্ষে এ ধরনের কোন সালাতের কথা কোরান বর্ণনা করেনি।
বলা হয়ে থাকে, শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর মাধ্যমে ই নাকি মেরাজ হতে নামাজ আনয়ন করা হয়েছে; অথচ শেষ নবীর পূর্ববর্তী সকল নবী-রসুলের আমলেই সালাত পালনের উপস্থিতি রয়েছে।যার প্রমাণ কোরানেই রয়েছে।
যেমন -সূরা মরিয়ম- ৫৫ আয়াত-
وَ کَانَ یَاۡمُرُ اَہۡلَہٗ بِالصَّلٰوۃِ وَ الزَّکٰوۃِ ۪ وَ کَانَ عِنۡدَ رَبِّہٖ مَرۡضِیًّا ﴿۵۵﴾
সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের নিকট সন্তোষভাজন।
আলে ইমরান -৪৩
یٰمَرۡیَمُ اقۡنُتِیۡ لِرَبِّکِ وَ اسۡجُدِیۡ وَ ارۡکَعِیۡ مَعَ الرّٰکِعِیۡنَ ﴿۴۳﴾
হে মারয়্যাম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও, (তাঁকে) সিজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।
সূরা বাকারা -৮৩-
وَ اِذۡ اَخَذۡنَا مِیۡثَاقَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ لَا تَعۡبُدُوۡنَ اِلَّا اللّٰہَ ۟ وَ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا وَّ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ ﴿۸۳﴾
আর (স্মরণ কর সেই সময়ের কথা) যখন বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে আমি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্রের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামাযকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা সকলে অগ্রাহ্য ক’রে (এ প্রতিজ্ঞা পালনে) পরাঙ্খমুখ হয়ে গেলে।
এবার প্রশ্ন হল সেই সমস্ত নবী রাসূল গণ তাদের অনুসারীদের কোন নামাজ শিক্ষা দিতেন বা কি ধরণের নামাজ তারা পালন করতেন?যেহেতু পরবর্তীতে শেষ নবী কর্তৃক মেরাজ হতে আনিত সেই কথিত নামাজের কোন অস্তিত্বই ছিল না তখন? আরও মজার ব্যপার হচ্ছে, পূর্ববর্তী নবীগণের অনুসারীদের মাঝে কোন আনুষ্ঠানিক ওয়াক্তিয়া নামাজ পালনের প্রথা প্রচলিত ছিল এমন কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ ঐশী গ্রন্থ সমূহ- কোরান, ইঞ্জিল, যাবুর তাওরাত এর কোথাও কোন উল্লেখ নেই । আরও একটা মজার বিষয় হচ্ছে নবী মোহাম্মদ (স.) মক্কায় অবস্থান কালেও ওয়াক্তিয়া নামাজ প্রচলিত ছিল এমন কোন তথ্য নির্ভর প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু,আশ্চর্যের ব্যপার হলো, কোরানের ১১৪ টি সূরার মধ্যে ৮৬ টি সূরাই মক্কাতে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মক্কায় নাজেল হওয়া অধিকাংশ সূরাতেই সালাতের কথা উল্লেখ রয়েছে; তাহলে উক্ত সূরাগুলোতে কোন নামাজের কথা বলা হয়েছে?
রাসূল সাঃ এর মেরাজ সংগঠিত হয়েছিল নবুয়াতের দশম বছর তথা হিজরতের পূর্বের বছর।তার ও পূর্বে মহানবী কি সালাত পালন করেন নি?তিনি কি আল্লাহর স্বরণের বিমুখ ছিলেন?এক কথায় উত্তর তিনি তখনও সালাত করেছেন, তবে প্রচলিত ওয়াক্তিয়া মতে না।যার নির্দেশ আমরা কোরানের সুরা মারেজের ২৩ নং আয়াতে পাই।আর তা প্রতিষ্টার জন্য ৮২ বার একই আদেশের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে কোরানে।একই আদেশের ৮২বার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ওয়াক্তিয়া সালাত প্রতিষ্টার কথা বলা হয়নি বরং সুরা মারেজে বর্ণিত দায়েমী সালাতের কথা বলা হয়েছে।যা পূর্বেও ছিল এখনো থাকা উচিৎ।
আর ওয়াক্তিয়া সালাত পূর্বেও ছিল না এখনো থাকা উচিৎ না। কেননা আল্লাহ তায়ালা কোরানে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন সুরা বণী ইসরায়েলের ৭৭ নং আয়াতে-
سُنَّۃَ مَنۡ قَدۡ اَرۡسَلۡنَا قَبۡلَکَ مِنۡ رُّسُلِنَا وَ لَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحۡوِیۡلًا ﴿٪۷۷﴾
ছুন্নাতা মান কাদ আরছালনা-কাবলাকা মিররুছুলিনা-ওয়ালা-তাজিদুলিছুন্নাতিনা-তাহবীলা।
আমার রাসূলদের মধ্যে তোমার পূর্বে যাদেরকে আমি পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম এবং তুমি আমার নিয়মের কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা।
আরও একটা বিবেচ্য বিষয় হল, কোরানের যে সমস্ত আয়াতগুলোকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান-প্রিয় আলেমগণ নামাজের ওয়াক্ত সৃষ্টি করেছেন , হাস্যকর বিষয় হল মহানবীকে সাঃ এর মেরাজে যাবার কথাটি কোরানে ঠিকই উল্লেখ আছে, কিন্তু নবী (স.) কর্তৃক মেরাজ হতে আমদানীকৃত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মত গুরুত্বপূর্ণ কথাটি কোরানের কোথাও উল্লেখ নাই । অথচ এই নামাজ না পড়লে নাকি কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। বান্দার সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ নামাজের বিষয়টি আল্লাহ্ এড়িয়ে গেলেন।
তবে সৃষ্টি কর্তা ভুল করলেও পরবর্তীতে এজিদী রাজ শক্তি ও আব্বাসীয়ারা তাদের পোষা আলেমগণ কর্তৃক কোরানের দায়েমী সালাত এবং হেরা গুহার নিরবিচ্ছিন্ন ধ্যান সাধনার ধর্ম দর্শনকে বাদ দিয়ে উহার স্থলে ওয়াক্তিয়া নামাজকে কোরানের প্রকৃত সালাত বলে চালিয়ে দিতে একটুও ভুল করেনি।
আরবী ফারসীতে পান্ডিত্য অর্জন কারী পেটুকরাজদের ধোকার ধুলোবালিতে যখন সরল মনা মানুষ গুলো গড়াগড়ি খাচ্ছিল তখনই বঙের ভাগ্যাকাশে ঐশী অবতার হয়ে আবির্ভূত হলেন মহান সংস্কারক মহাত্মা ফকির লালন সাঁই।তিনি তার গানের ভণিতায় ধর্মীয় এবং সামাজিক নানা কুসংস্কার আর অনাচারের বিরুদ্ধাচরণ করে প্রকৃত সত্য পৌঁছে দিয়েছেন গায়ে গঞ্জে শহর পল্লীতে।আজ আমরা আরবী ফারসীর পান্ডিত্যের স্তুপের নিচে চাপা পড়া এমন এক বিষয়ে আলোচনা করবো যা মানবের আত্মমুক্তির প্রধান হাতিয়ার।
আলোচনার শুরুতে আমরা সাঁইজির বহুল প্রচলিত এবং প্রচারিত একটি পদ সংযোজন করেছি। যার প্রথমেই বলা হয়েছে –
“পড়রে দায়েমী নামাজ,
এই দিন হল আখেরী।”
পবিত্র কোরানে সুরা মারেজের ২৩ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে –
الَّذِیۡنَ هُمۡ عَلٰی صَلَاتِهِمۡ دَآئِمُوۡنَ
অর্থ: যারা তাদের নামাজে সার্বক্ষনিক কায়েম থাকে। (সুরা মাআরেজ ২৩)
প্রথমে আমরা জেনে নিব দায়িমী অর্থ কি?
দামে শব্দের অর্থ হল অবিরাম, সর্বদা বা বিরতিহীন আর সালাত অর্থ হলো স্মরণ করা বা প্রতিষ্ঠা করা।
দায়েমী সালাতকে সূফী সদর উদ্দিন চিশতী চমৎকার ভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।যার সারাংশ হল-
“দায়েমী সালাত অর্থ আল্লাহ ওঁ তাঁহার রসূল কে অবিরাম বা নিরবিচ্ছিন্ন স্মরণের দ্বারা তাঁহাদের সাহিত সংযোগ স্থাপন করা । প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি নিশ্বাস-প্রশ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ ক্রিয়া চালিয়ে যাওয়াই দায়েমী সালাত । আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হলে প্রথমে তাঁহার রসূলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। রসূলের সংযোগ ই আল্লাহর সংযোগ । প্রতিটি কামেল মুর্শিদই যে একজন রসূল এই কথা না বুঝিলে সালাতের মূলনীতি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এক প্রকার অসম্ভব।
রসূল রূপে প্রভু মোহাম্মদ (সঃ) হইলেন সকল রসূলদের সর্দার বা নেতা তাই রসুলুল্লাহ বলা হয়। সালাতের মূল নীতি ব্যক্তি জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে আত্ম দর্শনের গভীরতা অর্জন করতে হলে প্রথমে আপন মুর্শিদ কে অবিরামভাবে স্মরণ করতে হবে। এই স্মরণ থেকে শুরু করে পরিনামে বাস্তব সংযোগ প্রতিষ্ঠা করাই হইলো দায়েমী সালাত । Salat means attemps for nearness to God.
সালাত অর্থই দায়েমী সালাত বা নিরবিচ্ছিন্ন স্মরণ –
দায়েমী সালাতের নির্দেশই আল কোরআনে দেয়া হয়েছে ।
“সেই ব্যক্তিই মুসল্লি যিনি তাঁহার সালাতে (স্মরণে) সর্বক্ষণ অধিষ্ঠিত থাকেন।” আল- কোরআন ( ৭০ : ২২-২৩) ।
যেহি মুর্শিদ সেই তো রসূল
তাঁহাতে নাই কোন ভুল,
আহাম্মদের রূপে এবার খোদাও সে হয়
লালন কয়না এমন কথা, কোরআনে কয়।।
কামেল একজন মহা পুরুষের মধ্যে আল্লাহ সত্তা ব্যতীত ভিন্ন কোন সত্তা নেই । তাই স্মরণ মূলত আপন পীরের দিকেই করতে হয় । কোরানুল করীমের ভাষা হল সালাত কায়েম করো বা স্মরণ প্রতিষ্ঠিত করো ।
সালাত প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হবে সালাতি ব্যক্তির হৃদয়ের মধ্যে । সালাতি ব্যক্তি যখন নিজের অন্তঃকরণের মধ্যে আপন পীরের স্মরণকে নিরবিচ্ছিন্ন করতে পারবে তখনই তাঁহার সালাত কায়েম হবে ।”
আত্মমুক্তি বা আত্মপ্রশান্তি প্রতিষ্টা কেবল অবিরাম স্বরণ সংযোগেই আসে।সুরা রাদে সে বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে –
اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰهِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ
অর্থ: নিশ্চই আল্লাহর জিকিরই আত্মা প্রশান্তি লাভ করে। (সুরা রাআদ ২৮)
আরেকটি আয়াতে উল্লেখ আছে,
وَ الذّٰکِرِیۡنَ اللّٰهَ کَثِیۡرًا وَّ الذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا
অর্থ: আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারীদের জন্য মহান আল্লাহ্ মহা পুরস্কার রেখেছেন। (সুরা আহযাব ৩৫) সুতরাং বুঝা গেল আল্লাহর জিকরই সর্বশ্রেষ্ট কাজ। যেমন আল্লাহ বলেন,
ؕ وَ لَذِکۡرُ اللّٰهِ اَکۡبَرُ
অর্থ: আর আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। (সুরা আনকাবুত ৪৫)
উপরিউক্ত আলোচনার দ্বারা দায়েমী সালাতের পরিচয়,গুরুত্ব এবং তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে গেল।এবং প্রতিয়মান হয়ে গেল কোরানে বর্ণিত বিরাশি স্থানে কোন ওয়াক্তিয়া সালাতের কথা বলা হয়নি বরং দায়েমী সালাত কে প্রতিষ্টার নির্দেশনা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।আর এই দায়েমী সালাত ব্যতিরেকে কখনও ই ঈশ্বর প্রাপ্তি ঘটবে না।মহাত্মা লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত একটি গানে প্রচলিত ওয়াক্তিয়া সালাতের অসারতা এভাবে প্রকাশ হয়েছে-
পড় গে নামাজ ভেদ বুঝে সুঝে।
বরজখ নিরিখ
না হলে ঠিক
নামাজ আরও মিছে৷
সুন্নত করণ নফল সকল,
রেকাত গোনা নামাজে
থাকলে এসব
হিসাব কিতাব
বরজখ ঠিক বয় কিসে।।
আত্তাহিয়াত রুকু সালাম
তাহার প্রমাণ আছে,
আপনি কেনে
আপন পানে
তাকাও নামাজে বসে৷।
দেখে তার ভজনের হুকুম
সাদের করেছে
বলছে লালন,
আন্দলা এমাম
ইস্তিন্দা নাই তার পিছে৷।
তাই সাঁইজি কোরানে বর্ণিত দায়েমী সালাত পালনের কথা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে।
মাশুকরূপ হৃদ কমলে
দেখ আশেক বাতি জ্বলে
কিবা সকাল কিবা বৈকালে
দায়েমীর নাই আঁধারী।।
মাশুক রুপ তথা আপন প্রেমাস্পদের নুর ময় প্রশান্তি রুপ হৃদয়ে ধারন করে নিরবিচ্ছিন্ন স্বরণে সংযোগ প্রতিষ্টা করা। আর তাতে নির্দিষ্ট কোন বাধা ধরা সময় নির্ধারণ করা থাকে না। সকাল বিকাল সার্বক্ষণিক মাশুকের ধ্যানে নিজের মন নিবিষ্ট রাখতে হয়।
সালেকের বাহ্যপনা
মুজ্জুবী আশেক দেওয়ানা
আশেক দেল করে ফানা
মাশুক বিনে অন্য জানে না
আশার ঝুলি লয়ে সেনা মাশুকের চরণ ভিখারী।।
অলী আউলিয়াগণের বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ আচরণ বিশ্লেষণ পূর্বক তাদের দুভাগে ভাগ করা হয়। যেমন – সালেক, এবং মজ্জুব।
সালেক এবং মজ্জুব শব্দ দুটির শাব্দিক অর্থ এক হলেও তাদের মধ্যে আচরণ গত কিছু পার্থক্য আছে। যিনি সালেক তার আচার আচরণ অন্যান্যদের মত স্বাভাবিক।তিনি সামাজিক রীতি রেওয়াজ আইন কানুন যথাযথ ভাবে পালন করে থাকেন।তার সু গঠিত একটা পরিবার থাকে।এবং পরিবারের পরিপালনের জন্য তারা পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে।
আরবী জযবা থেকে মজ্জুব । জযবা শব্দের অর্থ হচ্ছে- আকর্ষণ,আর মজ্জুব হল আকর্ষিত।যে ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর ভালবাসায় নিমজ্জিত, আল্লাহর ভালোবাসায় দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন,আল্লাহর প্রতি আকর্ষিত, পাগল (আল্লাহর প্রেমে), দিওয়ানা সহ ইত্যাদি।
সাধারণভাবে মজ্জুব হল তাদেরকেই বলে, যারা সর্বদা প্রেমাস্পদের ভাবে বিভোর থাকে। যাদের জীবনযাপন সমাজের বাকি আট-দশজনের মত নয়। দুনিয়া হতে যারা নিজেরদেরকে পরিপূর্ণ বিমুখ হয়ে প্রেমাস্পদের হয়ে যান। যাদের মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায়। বাহ্যিকভাবে তাদের দেখতে মনে হয় শরিয়ত বিবর্জিত। কিন্তু তারা আসলে তা নন। তারাই প্রকৃতপক্ষে শিরক মুক্ত শরীয়তে প্রতিষ্টিত আছে।
মজ্জুবদের বিষয়ে মহানবী সাঃ এর একটি বিখ্যাত হাদিস ও রয়েছে
মুসলিম শরীফে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ، ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗَﺎﻝَ ” ﺭُﺏَّ ﺃَﺷْﻌَﺚَ ﻣَﺪْﻓُﻮﻉٍ ﺑِﺎﻷَﺑْﻮَﺍﺏِ ﻟَﻮْ ﺃَﻗْﺴَﻢَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻷَﺑَﺮَّﻩُ
অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, এমন অনেক উষ্ক-খুষ্ক লম্বা চুলধারী ধূলামলিন বিশিষ্ট লোক আছেন, যাদেরকে মানুষের দরজা থেকে বিতারিত করা হয়, অথচ তারা যদি আল্লাহর কাছে কিছু দাবী করে, তাহলে আল্লাহ তাদের সে দাবী পূরণ করেন।”। (মুসলিম শরীফ, কিতাবু বিররি ওয়াসসিলা ওয়াল আদব, বাব
(অনুচ্ছেদ/পরিচ্ছেদ) :
ﺑﺎﺏ ﻓَﻀْﻞِ ﺍﻟﻀُّﻌَﻔَﺎﺀِ ﻭَﺍﻟْﺨَﺎﻣِﻠِﻴﻦَ
হাদিস নং-২৬
২২ (মূল মুসলিম শরীফ -মিশরী ছাপা) অনুবাদ হাদিস নং-৬৪৯৪ সম্ভবত) এছাড়া এ ধরণের আরও একটি হাদিস তিরমিজী শরীফ সহ আরও কয়েকটি হাদিসের গ্রন্থে রয়েছে।
যেমন:
ﻛَﻢْ ﻣِﻦْ ﺃَﺷْﻌَﺚَ ﺃَﻏْﺒَﺮَ ﺫِﻱ ﻃِﻤْﺮَﻳْﻦِ، ﻳﻌﻨﻲ ﺛﻮﺑﻴﻦ ﺑﺎﻟﻴﻴﻦ، ﻟَﺎ ﻳُﺆْﺑَﻪُ ﻟَﻪُ، ﻟَﻮْ ﺃَﻗْﺴَﻢَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻟَﺄَﺑَﺮَّﻩُ
অর্থাৎ ‘হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহর অনেক বান্দা এমন হন যে, তাদের চুল থাকে আলুথালু। দেহ থাকে ধুলি মলিন। (কেননা চুল ও দেহ পরিচর্যার সংগতি থাকে না তাদের)। দুটি ছেড়াফাটা পুরোনো চাদর পরিধান করেন তাঁরা। কেউ তাঁদেরকে খুব একটা গনায় না ধরলেও তাঁরা যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কোনও একটা কসম খেয়ে বসেন যে, এটি এমন হবে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কসম পূরণ করেন। (অর্থাৎ তিনি যেমন চান তেমনই হয়। (তিরমিজী, কিতাবুল মানাকিব, বাব মানাকিবি বারা ইবন মালিক, হাদিস নং-৩৮৫৪, মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিসকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নং-৬২৪৮, এছাড়া ইমাম বায়হাকি দালায়েলুন নবুয়াত কিতাবেও হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
সালেক মাত্রই বাহ্যিক আচার বিধি পরিপালনে বাধ্য এবং অভ্যস্থ।আর মজ্জুব সার্বক্ষণিক তার মাশুকের ভাবে বিভোর থাকে।সে তার প্রেমাস্পদের স্পর্শ ব্যতিত অন্য কিছু কামনা করে না।সে সর্বদা প্রেমাস্পদের স্পর্শ পেতে বেকুল হয়ে থাকে।
কেফায়া আইনি জিন্নি
এহি ফরজ জাত নিশানী,
দায়েমী ফরজ আদায়
যে করে তার নাই জাতের ভয়,
জাত এলাহির ভাবে সদায়
মিশেছে সে জাতে নূরী।।
অবশ্য পালনীয় শরার আইনের পাশাপাশি আরও একটা বিষয় জানতে হবে আর সেটা হল মানব প্রেম।কেননা যেজন দায়েমী সালাত প্রতিষ্টা করেন তার মধ্যে আর জাতপাতের গন্ধ থাকে না।সে তার প্রেমাস্পদের ভাবে বিভোর হয়ে এমন অবস্থানে পৌছায় যেখানে আশেক আর মাশুক এর মধ্যকার কোন পার্থক্য থাকে না।
আইনি অদেখা তরিক
দায়েমী বরজখ নিরিখ,
সিরাজ সাঁইজীর হকের বচন
ভেবে কহে অবোধ লালন,
দায়েমী নামাজী পড়ে যে জন
সমন তাহার আজ্ঞাকারী।।
দুই চর্ম চক্ষু বন্ধ করে তৃতীয় নেত্র দ্বারা গুরুরুপে মন নিবিষ্ট করে দায়েমী সালাত পালনের কথা বলছেন দরবেশ সিরাজ সাঁই।মহাত্মা ফকির লালন সাঁইয়ের মতে যেজন দায়েমী সালাত প্রতিষ্টা করে সমন তথা যমদূত ও তার আজ্ঞাবহ হয়।
দায়েমী সালাত আদায় প্রসঙে মহাত্মা ফকির লালন সাঁইয়ের আরও কিছু কালাম পাওয়া যায়।
না পড়িলে দায়েমী নামাজ,
সেকি রাজী হয়,
কোথায় খোদা কোথায় সেজদা করছো সদায়।
বলেছে তার কালাম কিছু
আনতা আবুদু ফানতা রাহু,
বুঝিতে হয় বোঝ কেহ
দিন তো বয়ে যায়৷
এক আয়াতে কয় তাফাক্কারুন
বোঝ তাহার মানে কেমন,
কলুর বলদের মতন
ঘুরার কার্য নয়।
আঁধার ঘরে সর্প ধরা
আছে সাপ, নয় প্রত্যেয় করা,
লালন তেমনি বুদ্ধিহারা
পাগলের প্রায়।
সার্বক্ষণিক স্বরন ব্যতিরেকে বরযখ নিরিখ ঠিক থাকে না।তাই আন্দাজে সেজদা গ্রহন যোগ্য নয়।কেননা তাতে শিরক হবার সম্ভাবনা অধিকন্তুর বেশি।
পবিত্র কোরানে প্রকৃত পক্ষে যে সালাতের প্রতি সর্বদা নিষ্ঠাবান’ থাকার কথা বলা হয়েছে, উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা তা স্পষ্ঠ হয়েছে। এবং সেই দায়েমী সালাত কায়েম তথা প্রতিষ্ঠিত হলেই কোরানে বর্ণিত সুরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতটি বাস্তবায়ন হবে।
اُتۡلُ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنَ الۡکِتٰبِ وَ اَقِمِ الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ لَذِکۡرُ اللّٰہِ اَکۡبَرُ ؕ وَ اللّٰہُ یَعۡلَمُ مَا تَصۡنَعُوۡنَ ﴿۴۵﴾
উতলুমাঊহিয়া ইলাইকা মিনাল কিতা-বি ওয়া আকিমিসসালা-তা ইন্নাসসালা-তা তানহা-‘আনিল ফাহশাই ওয়াল মুনকারি ওয়ালাযিকরুল্লা-হি আকবারু ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুমা-তাসনা‘ঊন।
তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব আবৃত্তি কর এবং সালাত প্রতিষ্ঠিত কর। নিশ্চয়ই সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা জানেন।
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, “সালাতে খুশূ-খুযূ (ধ্যান ও বিনয়) তারই অর্জন হয়, যে নিজের অন্তরকে সবকিছু থেকে ফিরিয়ে শুধু সালাতের মধ্যেই নিবিষ্ট রাখে।” [তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩ খণ্ড ২৯৫ পৃষ্ঠা]
আর যখন কেউ এমন ধ্যানের সাথে দায়েমী সালাত কায়েম তথা প্রতিষ্টা করে তখনই তার চক্ষু শীতল হয়,তার অন্তরে প্রশান্তির বারী বর্ষণ হয় । যেমনটি মহানবী সাঃ বলেছিলেন – “সালাতেই দান করা হয়েছে আমার চক্ষুর শীতলতা।” [মুসনাদে আহমাদ, সুনানে নাসাঈ]
লেখা কিংবা তথ্যে কোন প্রকার ভূল পরিলক্ষিত হলে অবশ্যই সংশোধনযোগ্য।
পরিশেষে,
পড়ো রে দায়েমী নামাজ
নিজ মোকাম চিনে
মুর্শিদ ধরে জানো ,
নবীর মিম্বর কোনখানে ।।
লা-ইলাহা কলেমা পড়ো
ইল্লাল্লাহ দম শুমারে ধরো,
দম থাকিতে আগে মরো
বোরাকে বসিয়ে বামে ।।
দেখতে পেলে নূর তাজেল্লাহ
জেগে উঠে ইসকে আল্লাহ,
সামনে আসে ছবি মওলার
নিরিখ রাখলে মুর্শিদ কদমে ।।
আপনার আপনি চিনবি যবে
নামাজের ভেদ পাবি তবে,
ছয় লতিফা হাসিল হবে
পড়ো নামাজ দমে দমে ।।
সিরাজ সাঁই দরবেশে বলে
শোনরে লালন বলি খুলে,
শিরিক পাপ হয় দলিলে
নিরাকারে সেজদা দিলে ।।
লেখা- মোহন
জয় হোক মানুষ এবং মানবতার






