ফেরেব বনাম ফকির
ফেরেব ছেড়ে করোরে ফকিরী
দিন তোমার হেলায় হেলায়
হলো আখেরী।
ফেরেব ফকিরের ধারা
দরগা নিশান ঝাণ্ডা গাড়া,
গলায় বেঁধে হড়া মড়া
শিরনি খাওয়ার ফিকিরী।
আসল ফকিরী মতে
বাহ্য আলাপ নাহি তাতে,
চলে শুদ্ধ সহজ পথে
গোবধের চটক ভারি।
নাম গোয়ালা কাজী ভক্ষণ
তোমার দেখি তেমনি লক্ষণ,
সিরাজ সাঁই কয় অবোধ লালন
সাধুর হাটে করো চাতুরী।
মানবতাবাদী মহান সংস্কারক মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজী ছিলেন বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক ও মরমী চেতনার প্রাণ পুরুষ। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, আমির-ফকির ও আশরাফ-আতরাফ নামক সাম্প্রদায়িক ও জাতি-বর্ণের বিভাজনমুক্ত একটি অনুপম মানব সমাজের কথা ফুটে উঠেছে তার গানে।
একটি জাতপাত হীন সুষ্ঠু মানব সমাজ গঠনের পাশাপাশি লৌকিকতা মুক্ত শুদ্ধ আত্মসাধনার কথাও রয়েছে তার বাণীতে। আলোচিত গানটি তারই প্রমাণ বহন করে। আলোচ্য পদটি নিয়ে যৎসামান্য আলোচনা করব যদি সাইয়ের কৃপা হয়। আলোচ্য পদের মূল ভাবে প্রবেশের পূর্বে ফকির এবং ফেরেব শব্দ দুটি নিয়ে সামান্য কিছু কথা উপস্থাপন করার প্রয়োজন মনে করছি।
ফকির শব্দটি আরবি, এর আভিধানিক অর্থ হলো তত্ত্বজ্ঞানী, খোদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তি, সরল মনের অধিকারী, শুভ চিন্তার ধারক-বাহক, কলন্দর, সৎ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি, চারিত্রিক সৌন্দর্যের অধিকারী।
ফারসি দরবেশ শব্দটি এর সমার্থক, তাই ফকির-দরবেশ জোড়া শব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়! সাধারণ অর্থে ফকির অর্থ হলো অভাবী, যে দরজায় অপেক্ষমান থাকে, যারা মানুষের দরজায় অপেক্ষা করে তারা হলো ভিক্ষুক। আর সাধু পুরুষরা যেহেতু সদা প্রেমাস্পদের দরজায় নিজেকে অপেক্ষমান রাখেন তাই তাদের ফকির নামে অভিহিত করা হয়। আর ফকির যে কোন মতাদর্শের হতে পারে।
কিছু কিছু সূফী দার্শনিকের মতে শব্দটিতে তিনটি শব্দ ব্যবহার হয়েছে এবং তিনটি শব্দে সাধকের তিনটি অবস্থান কে ইঙ্গিত করে।
যেমন-
- ফে,
- ক্বাফ,
- রে
“ফে” হতে ফানা বা আল্লাহতে মিশে যাওয়া।
“ক্বাফ” হতে, ক্বাফ শক্তি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক মহাশক্তি। এই কাফ শক্তির ভিতর ছয়টি ভাবের শক্তির অবস্থান পাওয়া যায়।
যেমন পবিত্র কাফ অক্ষরটি আল্লাহ তায়ালার ছয়টি নামের প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যথাঃ-
- ১। কাইউমুন- চিরস্থায়িত্বের শক্তি। কাইউমু- স্থায়িত্ব নির্ধারিত করা হইল।
- ২। কুদ্দুসুন- দুর্বল এবং অধঃপতিতকে উন্নত মর্যাদা দানকারী শক্তি।
- ৩। কাবিউন- চিরঞ্জীব শক্তির উৎস।
- ৪। কাদিরুন- সুপরিমিত দানকারী শক্তি। ‘তকদীর’ অর্থ ‘ভাগ্য’ নহে। বরং ‘কর্মবৃত্ত দানকারী শক্তি। এই বৃত্ত সৃষ্টিজীব নিজ ক্ষমতায় বদলাইয়া লইতে পারে না। মানুষ তার ভালো আমলের দ্বারা উহা কাদির শক্তির নির্ধারিত স্বাভাবিক নিয়মেই পরবর্তী উন্নতি কর্মবৃত্ত প্রাপ্ত হইয়া থাকে। বস্তুজগতের সীমা ডিঙ্গাইয়া আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করিয়া অন্য কে দয়া করিয়া কাওকে যদি গ্রহন করে সেখানেও তাহার জন্য নিদিষ্ট একটি কর্মবৃত্ত দান করা হয়। এজন্য আধ্যাত্মিক জগতেও রসুলগণ একজন হইতে অন্য আরেকজন অধিক কামিয়াবি প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। যেমন আবু সালেহ লাহরী (রঃ) এর শিষ্য আহমদ উল্লাহ মাইজ ভানন্ডারি (রঃ)। কাদিরু- শক্তিশালী, সৃষ্টিকে শক্তি দেওয়া হইল।
- ৬। কাহ্হারুন- অপ্রতিহত ক্ষমতা। মৃত্যু দানকারী শক্তি। কাহ্হারু- ধ্বংসকারী। ‘না’ কে ধ্বংস করা হইল। যাহা নহে, অর্থ যাহা ক্ষণস্থায়ী এবং মিথ্যা তাহা ধ্বংস করা হইল। অর্থাৎ ‘যাহা নহে’ তাহাই ধ্বংস করা হইল।
- ৭। কাবিদু- নিয়ন্ত্রক। সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা হইল। আর এই সকল কাফ শক্তির অর্জন করার পরে সে হয় তখন মহান সাধক।
“রে” মানে বুঝানো হয়েছে- রেসালাত বা রেয়াজত করে প্রেম দিয়ে উপরে উঠিয়ে শুন্যে যাওয়া এবং পরিশেষে রসুলতত্ত্বের সাথে মিলিয়ে যাওয়া বুঝায়। আবার অনেকাংশ মনে করেন ফকির শব্দ লিখতে চারটি আরবি হরফ লাগে। যথা:
- ফা,
- ক্বফ,
- ইয়া,
- র,
এই চারটি অক্ষরের তাত্ত্বিক বিশ্লেষন উনারা এভাবে করেছেন।
- ফা’ – তে ফানাফিল্লাহ’
- ক্বফ ‘- এ রবের ক্বাফশক্তি ‘সমূহ।
- ইয়া’- তে নির্দিষ্টতা বা ইয়া-ইয়াদে ইলাহি
- র – তে রব বা র- তে রিয়াযত বোঝানো যায়।
ওই এক অদ্বিতীয় নিদিষ্ট রবের প্রতি ফানাফিল্লাহ হয়ে (স্বীয় অস্তিত্ব বিলীন করলে) রবের ক্বাফশক্তিসমূহ অর্জন করা। সহজ ভাষায় ফকির হল একজন পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী। যিনি জাগতিক বিষয় আশয় থেকে সর্বদা মুক্ত থেকে ঐশী প্রেমে বিভোর থাকে।
সাঁইজির পদের প্রথমাংশে ব্যবহৃত ফেরেব শব্দের অর্থ হল প্রবঞ্চনা,জুয়াচুরি,লোক ঠকানো ইত্যাদি। এই শব্দের অর্থ উপস্থাপনে ডিকশনারীতে যা আছে আমি তার হবহু নকল এখানে তুলে ধরছি।
প্রবঞ্চনা হল এমন বিবৃতি বা আচরণ সত্যকে গোপন করে এবং এমন বিশ্বাস, ধারণা বা চিন্তা প্রকাশ করে যা সত্য নয়। এটি সাধারণত ব্যক্তিগত লাভ বা সুবিধার জন্য করা হয়। প্রবঞ্চনায় কপটতা, প্রজ্ঞাপন, ভাবভঙ্গি, বিক্ষেপ, ছদ্মবেশ বা প্রচ্ছন্নতা অন্তর্ভুক্ত থাকে। ভ্রান্ত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এটি আত্মপ্রবঞ্চনা নামে পরিচিত। প্রভাবগতভাবে এটিকে প্রবচনা, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, অতীন্দ্রিকরণ, চতুরি বা কৌশল বলা যায়। প্রবঞ্চনা সম্বন্ধযুক্ত অন্যায়ের প্রতিনিধি যা সম্বন্ধযুক্ত সঙ্গীদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার মনোভাব এবং অবিশ্বাস তৈরি করে। প্রবঞ্চনা সম্বন্ধের নিয়মাবলীকে ভঙ্গ করে এবং এটিকে প্রত্যাশার নেতীবাচক লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধিকাংশ মানুষই বন্ধু, সম্বন্ধযুক্ত সঙ্গী এমনকি অপরিচিত ব্যক্তিদের বেশিরভাগ সময়ে সত্যবাদী হিসেবে প্রত্যাশা করেন। যদি মানুষেরা বেশিরভাগ কথোপোকথনকেই অসত্য হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাপ-আলোচনা ও যোগাযোগে বিক্ষেপ ঘটানো প্রয়োজন।
আলোচিত পদের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ফেরেব আর ফকির। ফেরেব্বাজী এবং ফকিরি। এক্ষণে আমরা শব্দ দুটির সাথে পরিচিত হলাম।
আত্মতাত্বিক বিশ্লেষক মহাত্মা ফকির লালন সাঁই অত্র পদের প্রথমাংশে বলেছেন-
ফেরেব ছেড়ে করোরে ফকিরী
দিন তোমার হেলায় হেলায়
হলো আখেরী।
অর্থাৎ প্রবঞ্চকতা, ধাপ্পাবাজি আর চাপাবাজি না করে ফকিরি করতে। কেননা ফকিরিতে এসব শোভা পায় না। যারা ফেরেব্বাজিতে আসক্ত তাদেরকে সাঁইজী স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছেন মানব জীবনের গণিত দিন গুলো ক্রমশ ই ফুরিয়ে আসছে।
সাইজী অন্যত্র বলেছেন –
হেলায় খেলায় দিন বয়ে যায় ঘিরে নিল কালে
আর কি হবে এমন জনম বসবো সাধু মেলে।
আবার –
এমন দিন কি আর হবে
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে…
ফেরেব ফকিরের ধারা
দরগা নিশান ঝাণ্ডা গাড়া,
গলায় বেঁধে হড়া মড়া
শিরনি খাওয়ার ফিকিরী।
দ্বিতীয়াংশে সাঁইজি ফেরেব ফকিরের কার্য্যসীমা বর্ণনা করেছেন। যিনি ফেরেব ফকির তিনি কেবল খানকা বা দরবারের প্রচারনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে কেননা দরবারের প্রচার যত বেশি হবে ততই লোক সমাগম হবে। আর লোক সমাগম বেশি হলে উপঢৌকন বা মানত ও বেশি হবে তাতে তার পকেট গরম হবে। তাদের উদ্দেশ্যে সাঁইজি অন্যত্র বলেছে –
শিরনি খাওয়ার লোভ যার আছে।
সে কি চেনে মানুষ রতন দরগাতলায় মন মজেছে।
যাদের মধ্যে পারলৌকিক স্বার্থ হাসিলের চিন্তা ভাবনা থাকে তারা কখনও সত্য মানুষের সন্ধান পাবে না এবং নিজেও সত্য মানুষ হতে পারবে না। তার লৌকিকতা আত্মমুক্তিতে কোন কাজে আসবে না। আবার মাথায় জটা গলে নানা রকম মালা হাতে আংটি পরলেই মুক্তি মিলবে না।
যেমন সাঁইজি বলেছেন –
না জেনে ফকিরি আঁটা
শিরেতে পড়ালাম জটা,
সার হলো ভাঙ ধুতরা ঘোঁটা
ভজন সাধন সব চুলাতে।
ফকিরির মুল না জেনে কেবল বেশ ধারণ করলেই ফকির হওয়া যায় না। আলোচ্য পদের চতুর্থাংশে সাঁইজি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন।
যেমন সাঁইজি বলেছেন –
আসল ফকিরী মতে
বাহ্য আলাপ নাহি তাতে,
চলে শুদ্ধ সহজ পথে
গোবধের চটক ভারি।
আত্মতাত্বিক বিধায়ক মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি আলোচিত পদ্যাংশে ফকিরের প্রকৃত রুপধারা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতে চাচ্ছেন আসল ফকিরিতে কোন বাহ্যালাপ নেই। এবং তিনি সব সময় শুদ্ধ এবং সহজ পথে জীবন ধারণ করেন। পবিত্র কোরানেও সুরা লোকমানের ছয় নং আয়াতে বাহ্যালাপের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে।
যেমন-
وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّ یَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ ﴿۶﴾
অর্থ: “মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।”
এই আয়াতকে কথিত ধর্ম ব্যবসায়ীরা গান বাজনা বিপক্ষে ফতোয়া হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। যা নিছক মূর্খামীর ই পরিচয় বহন করে।
নাম গোয়ালা কাজী ভক্ষণ
তোমার দেখি তেমনি লক্ষণ,
সিরাজ সাঁই কয় অবোধ লালন
সাধুর হাটে করো চাতুরী।
গোয়ালের কাজ দুগ্ধ দোহন করে অপর কে দেয়া তেমনি ফকির সব সময় ত্যাগের পথেই হাটে। কিন্তু ফেরেব বাজ সর্বদা নিজের ভোগ বিলাসিতা নিয়ে পরে থাকে। সাধু সংঘে থেকেও সে সংশোধন হবার বদলে দিব্যি খেয়ে দেয়ে চাতুরী করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তাই মহাত্না ফকির লালন সাঁই অন্যত্র বলেছেন-
ফকিরী ফিকিরী করা
হতে হবে জ্যান্তে মরা,
লালন ফকির নেংটী এড়া
আঁট বসে না কোনো মতে।
লেখা: মোহন
জয় হোক সাঁইয়ের, জয়হোক মানবতার






