বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা
– মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার নবাবগঞ্জে ১৭৩৩ সালের ৩১ অক্টোবর জন্মগ্ৰহণ করেন। পিতা জয়নুদ্দিন পাটনা প্রদেশের সুবেদার, মাতা আমিনা বেগম নবাব আলিবর্দী খাঁর কনিষ্ঠা তনয়া। পারিবারিক নাম শাহকুলী খাঁ মির্জা মুহাম্মদ সিরাজ-উদ-দৌলা। মাতামহের আদরে সিরাজ বড়ো হতে থাকে। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর বাংলা, বিহার, উড়িশার শেষ স্বাধীন অধিপতি, নবাব মনসুর- উল-মূলক সিরাজ-উদ-দৌলা শাহকুলী খাঁ মির্জা মুহাম্মদ হায়বত জঙ্গ বাহাদুর। ইউরোপীয় বণিকেরা কার্য্যত সিরাজকে নবাব বলে স্বীকার করে নেন।
১৭৫৬ সালের ৪ জুন কাশিমবাজারের ইংরাজ দুর্গ সিরাজের হস্তে সমর্পিত হল। ১৮ জুন ১৭৫৬ সালে প্রতু্ষে নবাব সেনা কামানে অগ্নি সংযোগ করে। ২০ জুন ১৭৫৬ সালে মর্মান্তিক নিশীথে ১৪৬ জন বন্দির মধ্যে ১২৩ জন হতভাগ্য অন্ধকূপে জীবন বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিল।কলকাতা নবাবের অধিকারে আসে। ১৭৫৬ সালের ১১ জুলাই সিরাজ রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। ১৬ অক্টোবর ১৭৫৬ লর্ড ক্লাইভ ও ওয়াটসনের রণবাহিনী মাদ্রাজের উপকূলে উপনীত হল।
২৭ ডিসেম্বর ১৭৫৬ ময়দাপুরের ময়দানের ঘাটে জাহাজ হাজির হয়। ১৭৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আলিনগরের সন্ধিতে ক্লাইভ, ওয়াটশন, মীরজাফর, রায়দুর্লভ স্বাক্ষর করলেন। ফলে মীরজাফর, রায়দুর্লভ,ইয়ার লতিফ প্রমুখ সেনাপতি এবং রাজবল্লভ, কৃষ্ণবল্লভ, জগৎশেঠ, উর্মিচাঁদ প্রমুখ প্রভাবশালী পাত্রমিত্র পরিষদ ও পুঁজিপতিরা বিদেশী ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করতে রাতদিন ষড়ষন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
২২ জুন ১৯৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভের আদেশে সকাল ৫টায় বৃটিশ বাহিনী গঙ্গাপার করলো। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বৃহস্পতিবার পলাশি প্রান্তরে বৃটিশ-মিত্র শক্তি পরীক্ষার অভিপ্রায়ে মীরমদনের সিপাহী সেনা, ফরাসি বীর সিনফ্রে, বাঙালি বীর মোহনলাল, মধ্যভাগে সেনাপতি মীরমদন সেনা পরিচালনার ভার গ্ৰহণ করলেন।
অন্যদিকেলক্ষ বৃক্ষে পরিপূর্ণ লক্ষ বাগে ক্লাইভ চারটি দলের মেজর কিলপ্যাট্রিক, মেজর গ্ৰান্ট, মেজর কূট, ক্যাপ্টেন গর্পের অধীনে সেনা অস্ত্র ধারণ করলো। মীরমদন বেলা ৮ টায় কামানে অগ্নিসংযোগ করলেন সরোবর তীরে। বীরবিক্রমে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। মীরমদন আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যু হয়। মোহনলাল বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন।
মীরজাফর, পুত্র মীরনের চক্রান্তে নবাব সিরাজ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে স্বয়ং নবাব ও পত্নী লুৎফরন্নেসা মহানন্দা নদী পথে অজানা স্থানে পাড়ি দিলেন। মহানন্দা স্রোত অতিক্রম করে কালিন্দীর জলপ্রবাহ উত্তীর্ণ বখরা বরহাল নামক স্থানে পুরাতন পল্লীর নিকটে নাজিরপুরের মোহনায় জলাভাবে নৌকা চললো না। ১৭৫৭ সালের ২৯ জুন আকস্মিক দূর্ঘটনায় সিরাজের সর্বনাশের সূত্রপাত হল। সিরাজ নদীর তীরে অবতরণ করলেন। সপরিবারে মীর দাউদ ও মীর কাশিমের হস্তে বন্দি হলেন। ৩ জুলাই ১৭৫৭ সালে সিরাজকে বন্দি অবস্থায় মুর্শিদাবাদে উপনীত করা হল।
সিরাজের মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ চলমান ছিল। লর্ড ক্লাইভ ও মীরজাফর ভাগিরথীর পশ্চিমতটে অবস্থান করছিলেন এরং মীরন পূর্বদিকে ছিলেন। এহেন সময় সিরাজের দেহরক্ষক নিযুক্ত হলেন মীরণ। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই মূহাম্মদী বেগ কর্তৃক নবাব সিরাজ শহীদ হলেন। অতঃপর সিরাদের শবদেহ ভাগিরথীর পশ্চিমতটে নবাব আলিবর্দীখাঁর সমাধির পূর্ব পাশে বাংলার বরেণ্য চির তরুণ, শেষ নবাবকে সমাধিস্থ করা হল। (তথ্যসূত্র-বিশ্ব মনীষী কোষ)






