সৈয়দ আবুল ওলা (সৈয়দ সাহেব) এর সূফি বাণী “আমার চাষ আসমানে”—বিশ্লেষণ

সৈয়দ আবুল ওলা (সৈয়দ সাহেব) এর সূফি বাণী “আমার চাষ আসমানে”—বিশ্লেষণ

আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:

“আমার চাষ আসমানে” — এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অর্থবাহী বাক্যটি আসলে এক অনন্য ধ্যানধারণা ও সুফিবাদের পরমতত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। এটি কেবল একটি কাব্যিক রূপক নয়, বরং একজন পূর্ণ সুফির আত্মাবিষ্কারের ঘোষণা।এই ছোট্ট বাণী একজন আল্লাহপ্রেমিকের গভীর রূহানী অবস্থা, সাধনার স্তর, এবং আত্মিক মহিমার পরিচয় বহন করে।
এটি কেবল শব্দ নয়, একটি জীবনের সারাংশ, একটি পরিপূর্ণ আত্মার উক্তি।

বাণীর অর্থ ও প্রতীকি বিশ্লেষণ:

“আমার চাষ”—চাষ বলতে সাধারণত বোঝায় জমিতে ফসল ফলানোর কাজ। কিন্তু সুফিবাদে এই “চাষ” শব্দটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় রূহানিয়াতের উন্নয়ন, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং আত্মার ধারাবাহিক সংযম ও সাধনার জন্য।এখানে “আমার চাষ” বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন — তিনি নিজে নিজের আত্মাকে, হৃদয়কে চাষ করছেন — অর্থাৎ তিনি নফসকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, হৃদয়ে ভালোবাসা, দয়া, ইখলাস ও আল্লাহর সান্নিধ্য ফলানোর জন্য কাজ করছেন।

“আসমানে”—“আসমান” এখানে শুধুমাত্র আকাশ নয়, বরং উচ্চতর রূহানী জগত, আধ্যাত্মিক উঁচু স্তর বা মালাকুতের প্রতীক। এটি সেই পরিসর যেখানে দুনিয়ার কোনো হিংসা, কামনা, লালসা, স্বার্থ, জড়তা নেই।
এমন এক জগতে চাষ করা যায় না সাধারণ মানুষের পক্ষে।এই বাক্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে — তাঁর রূহানী চর্চা এত উচ্চস্তরের যে তা পার্থিব সীমা ছাড়িয়ে আসমান স্পর্শ করেছে।

সুফিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে:

সাধারণ কৃষক চাষ করেন জমিতে, আর একজন রূহানী কৃষক চাষ করেন নিজের অন্তরে। কিন্তু এক কামেল ওলির ক্ষেত চাষ হয় আসমানে — যেখানে কোনো ধূলি নেই, কোনো কাঁটা নেই, শুধু নূর, রহমত, ফয়জ, ও লতিফা। এই চাষের ফসল হলো:মারিফাতের ফল,হাকিকতের আলো,নফসের মৃত্যু,রূহের উত্থান এবং আল্লাহর কুরবতের অনাবিল স্বাদ।

এটি কেন গভীর? এই বাণীর মাধ্যমে সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) মূলত ইঙ্গিত দিচ্ছেন—তাঁর আত্মিক পরিশ্রম, আল্লাহর সাথে বন্ধন, সাধনা, প্রেম, ফানা-ফিল্লাহ এবং আত্মাবিকাশ এমন এক উচ্চতর জগতে পৌঁছেছে যেখানে সাধারণ সাধক পৌঁছাতে পারে না।

আসলে “আমার চাষ আসমানে” মানে:
আমি এখন সেই আত্মিক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে আমি আর এই দুনিয়ার জন্য কাজ করি না, আমার সমস্ত শ্রম, সাধনা, দোয়া, ফিকির শুধু আখিরাত ও রূহানিয়াতের জন্য।

ফানার ইশারা: এ বাক্যটি সুফি পর্যায়ের “ফানা” (নিজেকে বিলীন করা) ও “বাকা” (আল্লাহতে টিকে থাকা) অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। যে ব্যক্তি ফানায় পৌঁছায়, তার চেতনার জমি হয়ে যায় “আসমানী”।

আমার চাষ আসমানে —

আমার চাষ আসমানে আধ্যাত্মিক অমরতার দিকে যাত্রা:  ‘চাষ’ শব্দটি কেনই বা বেছে নিয়েছেন একজন সূফি?

চাষ একটি কৃষিজ শব্দ। কেউ একজন আধ্যাত্মিক পরাকাষ্ঠার মানুষ যখন এইরকম শব্দ ব্যবহার করেন, তখন বোঝা যায় — তিনি চেয়েছেন সাধকদের ভাষায় কথা বলতে। চাষ মানে শ্রম, ধৈর্য, অপেক্ষা, নিয়ত, পরিচর্যা, প্রতিদিনের যত্ন।

একজন সত্যিকারের মুরিদও ঠিক কৃষকের মতো: প্রতিদিন সকালে উঠে যিকর করে, ঠিক কৃষক যেমন ভোরে উঠে মাঠে যায়।নিজের নফসকে আগাছার মতো ছেঁটে ফেলে, যেমন কৃষক আগাছা তুলে ফেলে।
ভালো ফসল পেতে রুহানী দোয়ায় বৃষ্টির অপেক্ষা করে।এইভাবেই একজন সাধক নিজেকে প্রস্তুত করে — সেই আসমানী চাষের জন্য।

আল্লাহ বলেন:“যারা আমার পথে পরিশ্রম করে, আমি তাদের আমার পথ দেখাবো।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

তাই ওলি বলছেন — আমার পরিশ্রম, আমার সাধনা, আমার দোয়া – সবই এখন আসমানমুখী।

চাষের ফসল কী? রূহানী ফসলের ব্যাখ্যা—

প্রশ্ন: আসমানে চাষ করে কী ফল হয়?সাধারণ জমিতে চাষ করলে ধান, গম, ফুল ফোটে।কিন্তু আত্মার চাষ হলে কী ফোটে?
তাওয়াক্কুল: আল্লাহ ছাড়া আর কিছুতেই ভরসা থাকে না।
তাওয়াজ্জুহ: পীরের এক দৃষ্টিতে অশান্ত আত্মা স্থির হয়।
ইশক: এমন প্রেম যা আগুন, যা আত্মাকে দগ্ধ করে কিন্তু ধ্বংস করে না।

এইসবই সেই “আসমানী ফসল” — যা কেবল সেই চাষি ফলায়, যার মন বিশুদ্ধ, অন্তর রূহানী আর দৃষ্টি আখিরাতমুখী।

নফস থেকে রূহ — আসমানে ওঠার পাঁচটি স্তর!

চাষ আসমানে পৌঁছাতে হলে আত্মাকে ধাপে ধাপে উন্নীত করতে হয়। সুফিবাদে এই পাঁচটি স্তর হলো:

  • ১. নফসে আম্মারা (প্রবৃত্তির দাসত্ব)
  • ২. নফসে লাওয়ামা (অনুতপ্ত চেতনা)
  • ৩. নফসে মুলহামা (আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা)
  • ৪. নফসে মুতমাইন্না (স্থির আত্মা)
  • ৫. নফসে রাজিয়্যাহ–মার্জিয়্যাহ (আল্লাহপ্রাপ্ত আত্মা)

এই পাঁচটি স্তর অতিক্রম করলেই আত্মার মাটি আসমানে পৌঁছায়।তখন চাষ হয় ঐ আলোকিত ভূমিতে — যার ফসল অনন্ত শান্তি।

আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকা কেন জরুরি?

প্রত্যেক নবী ,প্রত্যেক পীর আসমানের দিকে তাকাতেন।
হযরত ইবরাহিম (আ): আকাশ দেখে চিনলেন রবকে।
হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.): মেরাজে উঠলেন আসমানে।
হযরত ঈসা (আ): তাঁকে তুলে নেয়া হলো আসমানে।

পীর সৈয়দ সাহেব বলেন, “আমার চাষ আসমানে” — অর্থাৎ, তাঁর মকসাদ আকাশে, তাঁর লক্ষ্য মালাকুত, তাঁর দৃষ্টি লওহে মাহফুজে।আসমান মানে হচ্ছে উর্ধ্বমুখী চেতনা, নিম্ন থেকে ঊর্ধ্বে ওঠা।
আসলে চাষ তো দৃষ্টিরও — তুমি যদি সবসময় নিচে দেখো, তুমি নিচেরই দাস থাকবে।
যদি চাও উপরকার কিছু — তবে তোমার চাষও হতে হবে আসমানের উদ্দেশ্যে।

আত্মিক পরিশ্রম না থাকলে আসমান বন্ধ!

যারা বলে— “আমার চাষ তো কিছুই হচ্ছে না,” তাদের জেনে রাখা দরকার: আসমান তখনই খুলে, যখন মাটি ভিজে যায় অশ্রু দিয়ে।যারা চোখে পানি আনে না, তাদের আসমানের চাষ জমে না।দুনিয়ার চাষ হয় ঘাম দিয়ে,রূহানী চাষ হয় অশ্রু দিয়ে।

ওলি বলেন “আমার চাষ আসমানে”, কারণ তিনি অশ্রুতে ভিজিয়ে দিয়েছেন আসমানের জমি।

আশেক যদি আসমানে চাষ করতে চায় — তাহলে দরকার:আত্মসমালোচনা,অনুতপ্ত অন্তর,নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ,কামেল পীরের দিক নির্দেশনা।

সূফিবাদে বিশ্বাসীরা এই বাণীকে কিভাবে নিজের জীবনে আনবো?

প্রশ্ন: এই বাণী কী শুধু একজন সূফির জন্য, নাকি আমার জন্যও?

উত্তর: যদি আমরা সত্যিই চাই আসমান স্পর্শ করতে, তাহলে হ্যাঁ — এই বাণী আমাদের জন্যও।

কীভাবে শুরু করবে?

সকালে উঠে যিকর করো:- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”
আত্মসমালোচনা করো: আমি কেমন মানুষ?

দিনশেষে ভাবো:- আজ আমি আল্লাহর জমিতে কী বপন করলাম?সপ্তাহে অন্তত একদিন অন্তরে প্রশ্ন করো: আমার চাষ কোথায়?

এইভাবে তুমি ওলিদের ছায়ায়, আস্তে আস্তে নিজেকেও ঐ আসমানী কৃষকে পরিণত করতে পারো।

পীরের চাষ আর নবীর চাষ — পার্থক্য ও মিল:

নবী ও পীর — উভয়েই আসমানমুখী পথের পথিক।
কিন্তু তাঁদের “চাষ” আলাদা ধাঁচের।

নবীর চাষ:

নবীদের চাষ আল্লাহর ওহি দ্বারা পরিচালিত।
তাঁদের কাজ ছিল জাতিকে রূহানীভাবে জাগ্রত করা, তাওহিদের বীজ বপন করা।নবীরা আল্লাহর সরাসরি গাইডেন্সে আসমান থেকে বার্তা এনে মানুষে রোপণ করেছেন।

পীরের চাষ:

পীর ও ওলিরা নবীর ওয়ারিস — তারা ওহির উত্তরাধিকারী, ফিকির, ইলহাম ও কাশফের মাধ্যমে পথ দেখান।পীর চাষ করেন মুরিদের অন্তরে, তার ভেতরের জমিন প্রস্তুত করেন।

মিল:উভয়ের চাষেই লক্ষ্য এক — মানুষকে আসমানে, অর্থাৎ আত্মিক মুক্তির উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেয়া।

পার্থক্য:নবী চাষ করেন জাতির জন্য; পীর করেন ব্যক্তির আত্মার জন্য।

তাই পীরে কামেল বলতেই পারেন: “আমার চাষ আসমানে” — আমি সেই কাজ করছি, যা নবীদের আলো থেকে উৎসারিত।

“আমি” কাকে বলা হচ্ছে? আত্মশূন্যতা ও আত্মপ্রকাশ:

বাণীতে রয়েছে “আমার” — কিন্তু একজন কামেল ওলি কি কখনো “আমার” বলেন?

সুফি দর্শনে “আমি” দুই প্রকার:

  • ১. নফসী ‘আমি’ — অহং, গর্ব, স্বার্থ
  • ২. রূহানী ‘আমি’ — বিলীন হওয়া সত্ত্বেও টিকে থাকা, “বাকা”র অবস্থা

শাহসূফি সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) এখানে যখন বলেন “আমার চাষ”, তখন তা নফসী ‘আমি’ নয় — বরং তিনি সেই আত্মাকে বোঝাচ্ছেন,যে এখন আর নিজের নয়, সে পুরোপুরি আল্লাহর হাতে সোপর্দ — কিন্তু আল্লাহ তাকে তাঁর কাজে ব্যবহারে সম্মানিত করেছেন।

যার চাষ আসমানে, তার “আমি” আসলে “তুমি” — আল্লাহই তখন তার মুখে কথা বলেন:“তুমি নিক্ষেপ করোনি, যখন নিক্ষেপ করেছিলে — বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছিলেন।” (সূরা আনফাল: ১৭)

তাই এই “আমি” আসলে আত্মশূন্যতার মধ্যকার ঐশ্বরিক প্রকাশ।

আসমান মানে কীভাবে লওহে মাহফুজ?

“আসমান” শুধু একখানা খোলা নীলাকাশ নয় —

সুফিবাদে আসমান মানে:—
মালাকুত: ফেরেশতার জগত।
জাবারুত: রূহানী শক্তির জগত।।
লওহে মাহফুজ: সবকিছুর অন্তর্লিখিত নিয়তির কাগজ।

তাহলে পীর যখন বলেন “আমার চাষ আসমানে”, সে চাষ কোথায়?

চাষ হচ্ছে এমন এক স্তরে, যেখানে তাঁর চিন্তা, যিকর, দোয়া, ফিকির — সবই লিখিত হচ্ছে লওহে মাহফুজে।

তিনি এমন এক আত্মিক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে তাঁর চাষ মানে তাকদিরে ফয়জের রেখা টেনে দেয়া। পীরের দোয়া মুরিদের কপালে বসে যায় — এটাই তার লওহে মাহফুজে চাষ!

কিভাবে আত্মাকে প্রস্তুত করবো পীরের চাষের উপযুক্ত জমি বানাতে?

আমাদের হৃদয়ই পীরের চাষের জমি—
কিন্তু প্রতিটি জমিই তো চাষযোগ্য নয়।

কী করলে হৃদয় প্রস্তুত হবে?

  • ১. আগাছা দূর করো: অহংকার, হিংসা, পরনিন্দা, লোভ — এগুলো অন্তরের আগাছা।
  • ২. অন্তরের জমি নরম করো চোখের পানি ফেলে গুনাহের অনুতাপে ভিজিয়ে।
  • ৩. পবিত্রতা রক্ষা করো,হারাম থেকে বাঁচো,জিহ্বা ও চোখকে নিয়ন্ত্রণে রাখো। তাওয়াক্কুল শেখো নিজের হাতকে সরিয়ে আল্লাহর হাতে জমি ছেড়ে দাও।
  • ৪.পীরের তাওজ্জুহ গ্রহণ করো তাঁর এক নজর — তোমার ভেতর চাষ শুরু করে দেবে।তোমার হৃদয় যদি হয়ে ওঠে আসমানের আলোয় উপযুক্ত, তাহলে পীরের চাষও তাতে ফলবতী হবে।

এই বাণী কি আসলে গোপন এক ইলহাম? তার ফকিরি ভাষা বিশ্লেষণ!

সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) যে ভাষায় বলেছিলেন — “আমার চাষ আসমানে” — তা কি কেবল কাব্যিক বাক্য? না কি এটা ছিল এক ইলহাম, এক রূহানী ফয়জের ইঙ্গিত?

সুফি ওলিরা অনেক সময় ইশারায় কথা বলেন। তাঁদের বাণী গোপন ভাণ্ডারের দরজা — যা খুলতে হয় হৃদয় দিয়ে, না যে শুধু জ্ঞান দিয়ে।

এই বাণীতে চারটি স্তর রয়েছে:-

  • ১.ব্যক্তিগত ইলহাম — তিনি নিজের অবস্থার কথা বলছেন।
  • ২.রূহানী ইঙ্গিত — ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ দেখাচ্ছেন।
  • ৩.তাসাউফের সংকেত — চর্চার পথ ব্যাখ্যা করছেন
  • ৪.ফকিরি প্রকাশ — সাধকের প্রাণের আকুতি ঝরে পড়ছে।

এই বাণী শুধু পড়ার জন্য নয় — এটা ধারণ করার জন্য।এটা হলো সেই সুরা, যা লিখা হয়নি কুরআনে — কিন্তু প্রতিটি ফকিরের অন্তরে উৎকীর্ণ। এ পর্যন্ত আমরা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলাম “আমার চাষ আসমানে” বাণীর অন্তর্নিহিত সুফি জ্ঞান ও রূহানী ব্যাখ্যা।

এই বাণী নিজেই একটি পথ — আত্মার চাষের পথ, আসমানমুখী রূহানিয়াতের পথ।

“আমার চাষ আসমানে” – ইতিহাস, সমাজ, ভবিষ্যৎ ও মুরিদগণের জন্য চিরন্তন পথ!এই বাণীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট – কোন অবস্থায় এটি বলা হয়েছিল?

শাহসূফি সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) এর জীবন ছিল মাটি ও আকাশের মাঝে সেতুবন্ধনের মতো।
তাঁর মুখের বাণী ছিল রূহের দর্পণ — প্রতিটি শব্দে ছিল অভিজ্ঞতা, তাজরিবা, কাশফ ও নূরের প্রতিফলন।

এই বাণী বলা হয়েছিল এক নিভৃত সাধনার মুহূর্তে — যেখানে তিনি ফানার তীব্র অনুরণনে বলেছিলেন:
“আমার চাষ আসমানে”

তখন কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করেছিল —
“আপনি সারাদিন নিরব থাকেন, কোনো বাহ্যিক কাজ তো করেন না?”
উত্তরে তিনি এক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন —
“তুমি চোখে যা দেখো, আমি তাতে নেই। আমার চাষ অন্যখানে — আমার চাষ আসমানে।”

এই বাণী সেই সময়ের — যখন সমাজের সাধারণ চোখ পীরের বাহ্যিক কর্মশূন্যতাকে দেখছিল, কিন্তু রূহানী চোখ দেখছিল — তিনি আসমানে কাজ করছেন, যেখানে নেক আমল লিখে রাখা হয় ফেরেশতার হাতে।

এই বাণীর সামাজিক প্রভাব – আল্লাহওয়ালাদের কাজ আমরা বুঝি না।

এই বাণী আমাদের শেখায়:
সমাজ যখন আল্লাহওয়ালাদের বাহ্যিকতা দেখে, তখন তারা ভাবতে পারে তারা কিছুই করছেন না।
কিন্তু একজন সুফি সবসময় দৃশ্যমান কর্মের বাইরেও অনেক বেশি কর্মশীল হন — তাঁর আত্মা যখন মুরিদদের জন্য রূহানী পরিশ্রমে লিপ্ত থাকে।

পীরেরা বলতেন, “আমরা বাহিরে নিরব — কিন্তু ভিতরে ঝড়।”

একজন সমাজকর্মী সেতু বানান, রাস্তা তৈরি করেন।
একজন ফকির মানুষের কপাল নির্মাণ করেন।

এই বাণী সেই সমাজের চোখ খুলে দেয় —
যারা ভাবে আধ্যাত্মিকতা মানেই অলসতা।
না!

আল্লাহর পথে চাষ সবচেয়ে পরিশ্রমসাধ্য কাজ —
যেখানে সময় নেই, নাম নেই, ফল দেখার আগেই অন্যের জন্য ফসল রেখে চলে যেতে হয়।

একজন মুরিদের জন্য কী শিক্ষা এতে রয়েছে?

একজন প্রকৃত মুরিদের জন্য এই বাণী একটি আহ্বান:—

তুমি যদি সত্যিই মুরিদ হতে চাও,তাহলে তুমিও একদিন এমন “আসমানী চাষি” হতে চাইবে কি না —
এই প্রশ্নে নিজেকে জিজ্ঞেস করো।

একজন মুরিদের করণীয়:

  • ১. নিজের চাষের জমি বোঝা – আমার অন্তর এখন কোন অবস্থায়?
  • ২. সাধনা নিয়মিত করা – ফিকির, মুরাকাবা, যিকর
  • ৩. নীরবতা চর্চা করা – বাহ্যিক কর্ম না থাকলেও, ভিতরে যেন আল্লাহর নামের ধ্বনি চলতে থাকে
  • ৪. পীরের নজর পাওয়া – যার চাষ আসমানে, তার এক নজরেই নিজের অন্তর জমি হয়ে যায়।

একজন মুরিদ যখন এই বাণী উপলব্ধি করে, তখন সে আর বাহ্যিক কর্মের তুলনা করে না — সে অন্তরকে রূহানী জমিন বানাতে সচেষ্ট হয়।

চাষ ও আসমানের মধ্যকার প্রেমের সম্পর্ক – ‘ইশক’-এর নিরব ফসল!

এই বাণীর সবচেয়ে গভীর স্তর হলো ইশক বা প্রেম।
আসলে এই চাষ হচ্ছে মহব্বতের চাষ।

সুফি তত্ত্বে বলা হয় —
আল্লাহ যখন প্রেম করেন কোনো বান্দার সাথে, তখন তিনি তার অন্তরে এক “আসমানী বীজ” রেখে দেন।

এ বীজ চুপচাপ বড় হয়:না কোনো শব্দ করে,না কোনো আলো চায়,শুধু আল্লাহর ফয়জ পেলে নিজেই নূর হয়ে ওঠে।এ কারণেই একজন ওলি চাষ করেন আসমানে —কারণ দুনিয়ায় কেউ এই প্রেমের মূল্য দিতে পারে না।

“আসমানের প্রেম, আসমানের আলোতে চাষ করা ছাড়া বাড়ে না।
মাটির জল দিয়ে ঈশক জন্মায় না।” – এক সূফির উক্তি।

এই চাষের ফসল হয়: চোখের পানি, দোয়ার কম্পন, নীরবতার ঝড়, সেজদার অনন্ত আর্তনাদ।

আসমানী চাষের ফকিরি ভবিষ্যদ্বাণী – যারা এই পথে আসবে আগামীতে—

শেষে এসে এই বাণী ভবিষ্যতের জন্য রেখে যায় এক ইশারা।

  • যারা সত্যিকার অর্থে এই “চাষ”-এর কথা শুনবে,
  • যারা বুঝবে — এটা এক ফকিরের ভবিষ্যদ্বাণী,
  • তারা একদিন তৈরি হবে — নতুন ফকির, নতুন আল্লাহওয়ালা হয়ে।

এই বাণী কেবল বর্তমানের জন্য নয় — বরং এক “রূহানী বীজ”, যা ভবিষ্যতের অন্তরে জন্ম নেবে।

যে ছেলে আজ গুনাহে ডুবে আছে,
হয়তো সে একদিন তাওবার অশ্রুতে তার মাটি ভিজাবে —আর তখন পীরের অদৃশ্য দোয়া বলে উঠবে:“তোর চাষও আসমানে শুরু হলো।”

এই ভবিষ্যৎ ফকিরদের জন্য এই বাণী রয়ে গেল —
যারা না দেখেও বিশ্বাস করবে, না বুঝেও ভালোবাসবে,
আর সেই ভালোবাসার ভিতর দিয়ে নিজের আত্মাকে আসমানের দিকে তুলবে।

পরিশেষে বলা যায়, “আমার চাষ আসমানে” —এই চারটি শব্দ এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব,একটি নীরব আহ্বান,একটি অন্তরের বিপর্যয়, একটি ভবিষ্যতের ডাক।

উপরোক্ত বিশ্লেষণ কৃত বাণী ছিলো: সৈয়দ আবুল ওলা (রহ) এর-যিনি সূফিবাদীদের কাছে সৈয়দ সাহেব পীর সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ২২শে শাবান ১৪২০ হিজরি সনে মৃত্যু বরণ করেন। তাকে আউলিয়ার পূর্ণভূমি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের সাহেবদীনগর গ্রামে সমাহিত করা হয়

নিবেদক- সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

আরো পড়ুনঃ