উপমহাদেশে ইমামবাড়ার ইতিবৃত্ত।

উপমহাদেশে ইমামবাড়ার ইতিবৃত্ত।

সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, কবে কোথায় ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে জনশ্রুতি মোতাবেক, ১২০৬ সালে ভারতের রাজস্থানের আজমেরীর তাড়াগড় পাহাড়ের বিশালচূড়ায় খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ও তদীয় সঙ্গীগণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল পাক-ভারতের সর্বপ্রথম ইমামবাড়া। এবং সেখানেই সর্বপ্রথম তাজিয়া মিছিলের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে উপমহাদেশের ছড়িয়ে পড়ে।

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছরপূর্বে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের সর্বপ্রথম সূফি ভাবধারায় ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জ জেলাধীন অষ্টগ্রাম থানার সুবিখ্যাত ‘ভাটিরওলি’ খ্যাত সৈয়দ আব্দুল করিম হোসাইনী উরুফে প্রকাশ সুফি সৈয়দ আলাই মিয়া আল হোসাইনীর (রহ.) এর মাধ্যমে। সৈয়দ আলাই মিয়া আল হোসাইনী সাহেব ছিলেন নবীবংশের পুরুষ এবং জোয়ান শাহী পরগনার নয়কোষা জমিদার। তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় নয়কোষা জমিদারী ত্যাগ করে সাধনায় সিদ্ধ হয়ে পরবর্তীতে ইমাম হোসাইনের (আ.) প্রেমে নিজেকে বিলীন করে কারবালার আধ্যাত্মিকচর্চার মাধ্যমে মানবজীবনের সমস্ত কলুষিত বিষয়াদি বর্জন করে সুন্দর, প্রেমময় ও আলোকিত করে জীবনকে তোলার জন্য নিজ আঙিনায় গড়ে তোলেন কারবালার স্মৃতিসৌধ ‘ইমামবাড়া’।

প্রতিবছর আরবি মোহররম মাসের ০১তারিখ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত নানা শোকানুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপিত কারবালা চর্চার পরবর্তীতে তাঁরই ধারক-বাহক ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হেকিম মিয়া আল হোসাইনী চিশতি (রহ.) এবং সৈয়দ কুতুবউদ্দিন আহমেদ আল হোসাইনী চিশতি (রহ.) ও বর্তমানে সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান (বাবু সাহেব), ও সৈয়দ মোমতাজ হাসান সুজন সাহেব কারবালা চর্চার তালিম দিয়ে যাচ্ছেন।

৬১ হিজরীতে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরে ইমাম হোসাইন (আ.) সমর্থক-অনুসারীরা কেউ সমাজে প্রকাশ্যে ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর পক্ষে কথা বলতে পারত না। মসজিদের ইমামরা ইয়াজিদের আনুগত্য প্রকাশ করত, শহরের কাজীরা রাজতন্ত্রের সকল অপকর্মের বৈধতা দিয়ে দিত। ইয়াজিদের পিতা মুয়াবিয়ার সময় থেকেই তার অধীন মসজিদসমূহে হযরত আলী (আ.) কে গালি দেয়া হত। ইবনে আবীল হাদিদ ও আল্লামা মাজলিসি তাঁদের কিতাবে উল্লেখ করেছেনঃ সে সময় আহলে বাইতে রাসূল আলাইহিমুস সালামকে ভালোবাসতো মক্কা- মদীনায় এমন মানুষের সংখ্যা বিশ জনও ছিল না। তাই ইমাম ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) মসজিদের পরিবর্তিতে একটি ঘর নির্মান করেন।

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) এই ঘরে বসে কারাবালার ঘটনা বর্ণনা করতেন তাই এই ঘরটাকে ‘বাইতুল হুজন’ বা দুঃখের ঘর বলা হত। মসজিদে যেহেতু কারবালার ঘটনা আলোচনা করার সুযোগ ছিল না সেহেতু ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সমর্থক-অনুসারীরা নিজ নিজ এলাকায় শুধু কারবালা- ইমাম হোসাইন (আ.) কে কেন্দ্র করে বিশেষ ঘর নির্মাণ করতেন, যা তখন থেকে এখনও সমগ্র বিশ্বে বিদ্যমান। সেই বিশেষ ঘরগুলোকে আরব-পারস্যে হোসাইনিয়া, পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশে আশুরাখানা/ইমামবাড়া (ইমামবারগাহ)/পাক পাঞ্জাতন মোকাম বলা হয়।

বর্তমান সময়ে অনেকের ধারণা, কারবালার চর্চা দীর্ঘদিনের প্রথা কিংবা কুসংস্কার বা ইসলামে এর কোনো স্থান নেই। অথচ উপমহাদেশে কারবালা চর্চার সূচনা করেন খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)। তরিকায়ে চিশতিয়ায়ে হোসাইনীয়ার প্রবর্তক খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ভারতবর্ষে এসেই বজ্রকন্ঠে বলেছিলেন- আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হলেন হোসাইন, বাদশাহ হলেন হোসাইন, ধর্ম হলেন হোসাইন, ধর্মের আশ্রয়দাতা হলেন হোসাইন। শির দিয়েছেন তবুও ইয়াজীদের হাতে হাত রাখেন নি, প্রকৃতপক্ষে হোসাইন লা-ইলাহার বুনিয়াদ।

আজমেরী শরীফে খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এর মাজারে আশেপাশে অনেকগুলো ইমামবাড়া রয়েছে।ভারতের উপমহাদেশের কোনো মাজার, খানকা, কিংবা দরবারেও এতোগুলো ইমামবাড়া একসাথে নেই। খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এর মুল মাজারের সামনের নামাজের মসজিদ, মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি ইমামবাড়া। তাছাড়াও মাজারের পাশে দিঘীর বাজারে রয়েছে আরো একটি ইমামবাড়া; যেটি খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এর মাজারের সবচেয়ে বড় ইমামবাড়া। প্রতিবছর আরবি মোহররম মাসের শুরুতে আজমেরী শরিফের প্রতিতে বাড়িতে বাড়িতে, অলি-গলিতে, মহল্লায় লাল-কালো পতাকায় উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কারবালা চর্চার শোকানুষ্ঠান। উল্লেখ্য, আজমেরী শরিফে মোহররমের ০১ হতে ১০ তারিখ পর্যন্ত কাওয়ালি-গান বাজনা পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

তবে বাদ্যযন্ত্রের সহিত শোকগাঁথা মর্সিয়া, জারি ও মাতম হয়। ইমাম হোসাইনের (আ.) মাজারের নকশায় তাজিয়া শরিফ, প্রতীকি দুলদুল ও শোক মিছিল হয় দশদিনব্যাপী। আজমেরী শরিফে কারবালা শোকানুষ্ঠান শুধু ইমামবাড়া গুলোতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঘরোয়াভাবেও প্রায় অনেকেই তাজিয়া পাক, মর্সিয়াপাঠ, ও শোকমাতম করেন ইমাম হোসাইন (আ.) এর স্মরণের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি প্রার্থনায়।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পাহাড়গঞ্জে প্রাচীন স্থাপিত্যের নিদর্শন হিসেবে আজও অক্ষত রয়েছে ঐতিহাসিক ‘দিল্লি ইমামবাড়া’। এই ইমামবাড়াতে মোহররম শরীফ উদযাপন না হলেও দিল্লির অনেক জায়গায় মোহররম শরীফ উদযাপন হয়। তন্মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার।

প্রতিবছর হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার হতে তাজিয়া পাক ও শোক মিছিল হয়। তাছাড়া দিল্লির বাহিরে মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে ব্যাপক পরিসরে প্রতিবছর মোহররম শরীফ উদযাপন হয়েছে আসছে। মুম্বাইয়ে সর্ববৃহৎ তাজিয়া মিছিলের আয়োজন হয় ভেন্দিবাজার, মোঘল মসজিদ ও উমরখাদীতে। অন্যান্য এলাকায়ও কারবালার শোকানুষ্টান উদযাপিত হয়ে থাকে।

হিন্দু অধ্যিষুত ভারতের উত্তরপ্রদেশেও রয়েছে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ভারতের বৃহৎ ইমামবাড়ার গুলোর মধ্যে অন্যতম ‘বড় ইমামবাড়া’, হিন্দি ও ইংরেজিতে যাকে ‘Bara Imambara’ বলা হয়। বড় ইমামবাড়াটি ১৭৮৪ সালে আওধের নবাব আসাফ-উদ-দৌলা নির্মাণ করেছিলেন। জানা যায়, তাঁর পাশে আরো অনেক স্থাপত্যশৈলীও তিনি তৈরি করেছিলেন। এবং এই ইমামবাড়ার একটি অংশে নবাব আসাফ-উদ-দৌলাকে পরবর্তীতে সমাহিত করা হয়। বড় ইমামবাড়াটিতে আজও কারবালার শোকানুষ্টান উদযাপিত হয়। এবং একই প্রদেশের রাজধানি লখনৌতে ১৮৪৭সালে নবাব আমজাদ আলী শাহের পুত্র নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ ‘সিবতাইনাবাদ ইমামবাড়া’ নামে নির্মিত ইমামবাড়াটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অন্যতম স্থাপত্য হিসেবে খ্যাতি রয়েছে। উল্লেখ্য, নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ১৮৫৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গদিচ্যুত করেন।

ন্যায়বিচারের দাবিতে তিনি ইংল্যান্ড যাবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাকে কলকাতার কাছাকাছি এসেই থামতে হয়। এর কিছুদিন পর সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে ২৬ মাসের জন্য কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দি রাখে। মুক্তির পর থেকে ১৮৮৭ সালে তাঁর মৃত্যু অব্দি ওয়াজিদ আলি শাহ কলকাতার উপান্তে মেটিয়াবুরুজে থাকতেন। তাঁর প্রিয় শহর লখনৌর সিবতাইনাবাদ ইমামবাড়ার আদলে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে তৈরি হয়েছিল সিবতাইনাবাদ ইমামবাড়া। এবং আজও অব্দি নবাব পরিবার ও শিয়া-সুন্নী দুই সম্প্রদায়ের মুসলমানদের দ্বারা প্রতিবছর কারবালার শোকানুষ্ঠান মোহররম শরীফ উদযাপিত হয়ে আসছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে আর্চায জগদীশ চন্দ্র বোসের রোডের “মওলা আলী শাহ দরগা” ও মওলা আলী শাহ মসজিদে প্রতিবছর হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত উপস্থিতিতে ১০ই মোহররম আশুরার বিভিন্ন কর্মাদি উদযাপিত হয়ে থাকে। তাছাড়া নগরীর মেটিয়াবুরুজ এলাকায় রয়েছে কারবালা মসজিদ। কারবালা মসজিদটি শিয়া সম্প্রদায়ের হলেও সুন্নি শিয়া এই দু’সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রতি বছর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে ১০ই মোহররম পবিত্র আশুরা উদযাপন করেন। কলকাতা শহরের অনেক মসজিদ, ইমামবাড়া, মাজার শরীফে শাহাদাত কারবালার স্মরণে তাজিয়া, শোকসভা, জারি-মর্সিয়ার মাধ্যমে শোকানুষ্টান করে আসছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা। শহরের মেটিয়াবুরুজের “কারবালা মসজিদ” ছাড়াও একই নামকরণে শহরের ওয়াটগঞ্জেও রয়েছে আরেকটি কারবালা মসজিদ। সেখানে রয়েছে ইমামবাড়া।

কলকাতা শহরে সন্ধান মিলে বিভিন্ন ইমামবাড়ার। শহরের তিরেত্তি’তেও রয়েছে বাসরাভি মসজিদ ও ইমামবাড়া। এছাড়া বউবাজারের ওয়েস্টন স্ট্রিটে আছে ‘বারগাহ-এ-ইমাম হোসাইন (আ.) ইমামবাড়া’, মানিকতলার ‘হুসেইনি দালান ইমামবাড়া’, বেনিয়াপুকুর ‘চান্দ বিবি ইমামবাড়া’, তালতলার ‘বারো নাম্বার ইমামবাড়া’, বড়বাজার বটতলার ‘কারবালা ইমামবাড়া’, গিরিশচন্দ্র বোস রোডের ‘বিবি আনারো ইমামবাড়া’। শহরের মৌলালি, পার্কসার্কাস, শিয়ালদহ, রাজাবাজার, খিদিরপুরেও প্রতিবছর তাজিয়া মিছিল হয়।

কলকাতা শহরের বাহিরে হুগলি জেলায় রয়েছে বাংলার সবচেয়ে বড় ইমামবাড়া ‘হুগলি ইমামবাড়া’। বাংলার বিখ্যাত দানবীর হাজি মহসিন এই ইমামবাড়ার প্রতিষ্ঠাতা। হাজি মহসিন ১৮৪১ সালে এই ইমামবাড়া ও মসজিদের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ২০ বছর পরে এই ইমামবাড়া কাজ সমাপ্ত হয়। হুগলি ইমামবাড়ার পাশেই রয়েছে হাজি মুহসিনের সমাধি। মুর্শিদাবাদ জেলায় ঐতিহাসিক হাজার দুয়ারির সাথে ও ভাগীরথী নদীর কাছে রয়েছে বাংলার আরেকটি বৃহত্তম ‘নিজামত ইমামবাড়া’। এটিকে মুর্শিদাবাদ ইমামবাড়াও বলা হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় তৎকালীন সময়ে বাংলার নবাব সিরাজ উদ-দৌলার নির্মিত এই ইমামবাড়া। নবাব সিরাজ উদ -দৌলার স্মৃতি বিজড়িত স্থাপনার মাঝে ইমামবাড়াটি আজও অক্ষত আছে। তবে মুর্শিদাবাদ জেলার ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্যমতে, নবাব সিরাজ উদ-দৌলার নির্মিত ইমামবাড়াটি ১৮৪২ এবং ১৮৪৬ সালে ইংরেজরা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৪৮ সালে একই স্থানে ‘নিজামত ইমামবাড়া’ প্রতিষ্ঠিত করেন নবাব মনসুর আলী খান।

শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সতেরো শতকে মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে বাংলাদেশের ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে গড়ে উঠে ঐতিহাসিক হোসেনী দালান। মাধ্যমিকে অধ্যয়ণ করার সময় ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ নামক পাঠ্যবই-এ পড়েছিলাম, ঢাকা শহরের গোড়াপত্তনকারী সুবেদার শায়েস্তা খাঁন ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে হোসেনী দালান ইমামবাড়াটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

প্রায় তিনশ সাতচল্লিশ বছরের পুরোনো হোসেনী দালান ইমামবাড়াটি। বাংলার সর্বপ্রথম ইমামবাড়া বলে ধারণা করা হয় বাংলাদেশের ঢাকার ফরাশগঞ্জের ঐতিহাসিক ‘বিবিকা রওজা’কে। আনুমানিক ১৬০০ সালে নির্মিত ইমামবাড়াটি পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মুসলমানদের ঐতিহ্যের প্রতীক বহন করলেও মসজিদ, মাদরাসা, ইমামবাড়া, ফলক, তোরণসহ অসম্ভবনীয় সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মুসলমানদের যে ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া তা সত্যিই গর্বের। আধুনিতে কালের ক্রমাগত বিবর্তনে সাধারণ মুসলমানদেরকে ইমামবাড়া থেকে বিমুখ করা মূর্খতা ও অজ্ঞতার পরিচয়। শুধু মসজিদ-মাদরাসা নয়, ইমামবাড়া, স্মৃতিসৌধ, সমাধি সৌধ, তোরণ, ইসলামি ভাষ্কর্যগুলো মুসলমানদের ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ।

শুধু নির্দিষ্ট ভাবে ইমামবাড়াতে কারবালার শোক অনুষ্ঠান আশুরা পালিত হয় না। কলকাতার বিভিন্ন সুফিদের দরগা, মাজার ও খানকা শরীফে আহলে বাইতের স্মরণীয় দিনগুলি পালিত হয়ে আসছে। পাকিস্তানের শাহবাজ শরিফের লাল শাহবাজ কালান্দার (রহ.) এর মাজারেও কারবালার চর্চা শোকানুষ্ঠান হয়, তাজিয়া মিছিল হয়, শোকগাঁথা মর্সিয়া-জারিগান, মাতম হয়। আজমেরী শরিফেও তাজিয়া মিছিল হয়, মাতম হয়, শোকগাঁথা মর্সিয়া-জারি হয়। এবং খাঁজা মঈনুদ্দিন চিশতি সাহেবের মাজারের অদূরে গফুর আলী শাহ (রহ.) এর মাজারের সামনে প্রতীকি কারবালার মাঠ রয়েছে।

দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারেও কারবালার চর্চা হয়। মুম্বাইয়ের বিভিন্ন দরগায়, মাজার ও ইমামবাড়াতেও কারবালার চর্চা হয়। সমগ্র ভারতব্যাপী রাজস্থান, দিল্লি, আহমেদাবাদ, কাশ্মীর, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, বাহরাইন, আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কাতার, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, তুরস্ক, মরক্কো, সৌদি আরব, লেবালন, জর্ডান, তিউনিসিয়া, ইউরোপের ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন, ইতালির রাজধানী রোম, মিলানো, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, আমেরিকা, মালেশিয়া, চীন, জাপানসহ সূদুর আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও ১০ই মোহররম পবিত্র আশুরা উদযাপন হয়ে আসছে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। শিয়া-সুন্নি, হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ভারতের বিভিন্ন দরবারে, দরগা, মাজার শরীফ, কিংবা ইমামবাড়াতে কারবালার চর্চা হলেও আমাদের বাংলাদেশের দরবার, দরগা, ও মাজার শরীফগুলো পরিত্যক্ত হয়ে থাকে ১০ই মোহররমের দিন। ইমাম হোসাইন (আ.) এর চর্চাকে শুধু শিয়াদের আকিদা বলে যারা প্রচার করে নিজেদেরকে খাঁজা বাবার ভক্ত বলে দাবী করাটা ভন্ডামী!

বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলায় আটোয়ারী ইমামবাড়া নামে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্বরূপ একটি ইমামবাড়া রয়েছে। যশোর জেলায় হাজি মোহাম্মদ মুহসিনের বৈপিত্রীয় বোন মন্নুজান খানম দ্বারা ২৫০বছর আগে নির্মিত ‘আড়াইশ বছরের মুড়লী ইমামবাড়া’টি আজও অক্ষত রয়েছে। ঢাকার হোসেনী দালান, মোহাম্মদপুর, পুরানঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, যশোর, বরিশাল, ফেনী, চট্টগ্রামসহ রাজবাড়ী জেলায় প্রতিবছর সুন্নিজামাতের সর্ববৃহৎ তাজিয়া মিছিলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের বিখ্যাত সূফি মওলা পাক (র.) তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা এবং ঢাকা অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার করেন। কলকাতা শহরের ‘দরবার শরীফ কলকাতা ও খানকাহ শরীফ মেদিনীপুর’ ও মেদিনীপুর মওলা পাকের মাজার এবং হাওড়া জেলার খানকা শরিফ দরবারে আজও ব্যাপক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে তাঁরা মোহররম শরীফ উদযাপন করে আসছে।

বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার গড়পাড়া ইমাম বাড়িতে অত্যন্ত শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে পবিত্র মহররম শরীফ উদযাপিত হয়। হিজরী ৬১ সনের ১০ মোহররম কারবালার প্রান্তরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে অস্ত্রধারণ করে বিশ্ব মুসলিম মুক্তির দিশারী আখেরী নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (আ.) কারবালায় যে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হয়েছিলেন তাঁরই স্মৃতিস্মরণে হযরত শাহ খলিলুর রহমান (রঃ) পীর সাহেব বাংলা ১৩২৮ সালে ও ইংরেজি ১৯২১ খ্রিঃ নিজ বাড়িত “গড়পাড়া ইমামবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন”।

এছাড়াও দেশের সর্বত্র ১০ই মোহররম পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাজিয়া মিছিল হলেও পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে এই মুহররম শরীফ সূচনা হয় আজ থেকে প্রায় সাতশ বছরের অধিক সময়ে হযরত শাহ জালাল (র.) এর সহচর সঙ্গী সিপাহসালার সৈয়দ নাছির উদ্দীন (রহঃ) এর ঐতিহাসিক তরফ রাজ্যে (বর্তমান সিলেট) এ আগমনের মাধ্যমে। সৈয়দ নাসিরউদ্দিন সিপাহসালার অধস্থন পুরুষ ছিলেন সৈয়দ আলাই মিয়া আল হোসাইনী (র.)। নয় কোষা জমিদারী দেখাশুনার দ্বায়িত্বে পূর্বাঞ্চলের অষ্টগ্রামে আসেন তিনি। সেখানে স্রষ্টার সাধনায় সিদ্ধ হয়ে নয় কোষা জমিদারীত্ব ত্যাগ করেন। এবং প্রায় ২৫০বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে প্রথম সূফিবাদের ভাবধারায় মোহররম তথা পবিত্র আশুরা উদযাপন করেন। পরবর্তী সময়ে মোহররম শরীফ উদযাপন ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সিলেট বিভাগ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুমিল্লাসহ আশেপাশে।

তথ্য সহায়ক-
• আল জাজিরা।
• দৈনিক প্রথম আলো।
• DW.COM
• মুর্শিদাবাদ জেলা ওয়েবসাইট।
• উইকিপিডিয়া।
• সৈয়দ হোসাইন উল হক

আরো পড়ুনঃ