হোম পেজ ইলমে মারেফত মুসলিম জাতির উদ্দেশে -আল্লামা ইকবাল

মুসলিম জাতির উদ্দেশে -আল্লামা ইকবাল

মুসলিম জাতির উদ্দেশে -আল্লামা ইকবাল

জাতি আজ ইহসাসে মিল্লী’ সহমর্মিতার বোধ হারিয়ে ফেলেছে, ফলে না মরার মধ্যে তাদের মজা না জীবিত থাকার মধ্যে মজা এটা বোঝার জ্ঞান তাদের নেই। তারা সকাল-সন্ধ্যা একে অপরের রক্ত পান করছে। আর জাতির এ অবস্থার উপর আফসোস করছি, আমার বক্ষে হাজার লক্ষ জযবাত ও খেয়ালত বের হওয়ার জন্য পেরেশান হয়ে আছে।

কিন্তু আফসোস, কাওমের মাঝে এর মূল্যায়ন করার লোক নেই। যদি স্বজাতির প্রতি তার দরদ থাকতো তাহলে সে অন্য ব্যথিত ব্যক্তির দরত বুঝতে পারতো। তাই মুসলিম জাগরণের মহাকবি আল্লামা ইকবাল জাতির প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য ও মহব্বতের কারণে বার বার নিজ মনের খেদ প্রকাশ করেছেন।

  • ১) হতে পারে তুর কুহকানে অলস হ্নদয় দ্বিতীয় বার জাগ্ৰত হবে। ঘুমন্ত অলস পথচারী আবার জেগে উঠবে।
  • ২) অর্থাৎ ওফাদারীর নব অঙ্গীকারে অলস অন্তর আবার জিন্দা হয়ে উঠবে। পুরোনো সুরা পান করতে আবার হ্নদয় ব্যস্ত হবে।
  • ৩) আমি আযমী হিন্দী হলেও আমার সুরা আৱৰ দেশীয়, আমার গজল হিন্দী হলেও সুরটি কিন্তু হেজাজের।

হে প্রভু! আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি, তুমি আমার কথার মধ্যে কবিতায় এমন স্পৃহা সৃষ্টি করে দাও যাতে করে মুসলমানদের অন্তর তার দ্ধারা প্রভাবিত হয় এবং তাঁরা তাঁদের ক্ষতির বিষয় বুঝতে পারে। আর পুনরায় তোমার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং তাদের অন্তরে কুরআন ও ইসলামের মুহব্বত গাঢ় হয়ে যায়। আমি যদিও আমার কালাম কবিতা রূপে পেশ করলাম, তাতে কি আসে যায়। কি পয়গামের রূহ তো কুরআন থেকে নির্গত। আর আমি যদিও উর্দু ভাষায় কবিতা লেখেছি কিন্তু তার বিষয় তো ইসলামী।

সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের জাগরণের জন্য আমার এ আহ্বান তো তোমার পবিত্র কালামে পাকের বাণীরই সার-সংক্ষেপ। তোমার প্রিয় মাহবুর নবীর পবিত্র জবানে উচ্চারিত বাণীরই পুণরাবৃত্তি করেছি মাত্র। ইকবাল কামনা করেছেন একজন মুসলমানকে যেমন আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক পথের অনুগামী হতে হবে, তেমনি বাস্তবতার আলোকে জাতি গঠনে তাঁকে অগ্ৰণী হতে হবে।

হেরা পর্বতের ঘটনা অবলোকন করলে আমরা দেখতে পাই নবীজী (সা.) এর দীর্ঘ ১৫টি বছর কেটেছে আধ্যাত্মিক সাধনায়। যে সাধনায় মুগ্ধ হয়ে আল্লাহ পাক তার উপর পাক কোরান নাজিল করেন। হাদিস হতে জানা যায় এক মুহুর্তের ধ্যান একশ বছরের নফল ইবাদত হতে উত্তম। তাহলে ধ্যান সাধনা জান ও মানা এবং অনুসরণ করা অতি প্রয়োজন। একজন মুসলমান হিসেবে ধ্যান সাধনা করা যাবে না এমন কোন বর্ণনা হাসিদ হতে পাওয়া যায় না।

তাই আধ্যাত্মিক সাধনা ব্যতীত কোন মুসলমান মুক্তি পাবে না। নবীয়ে মহান এর উদারতার একটা বিবরন দেয়া প্রয়োজন মনে করি। এক বুড়ি নবীজীর চলার পথে প্রতিদিন কাঁটা দিত। হঠাৎ একদিন নবীজী দেখলেন পথে আজ আর কাঁটা বিছানো নেই। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই বুড়ির কোন অসুখ হয়েছে। তাই তিনি বুড়ির বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। গিয়ে দেখলেন সত্যিই বুড়ির অসুস্থ হয়েছে। নৰীজীর উপস্থিতিতে বুড়ি ভয় পেলেন। নবীজী তাঁকে শান্তনা দিয়ে রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করলেন। বুড়ি ভালো হলো। এই শিক্ষা আমরা বিশ্বনবীর থেকে গ্রহণ করতে পেরেছি কি-? আমার কথা হলো একজন মুসলমান হিসেবে এহেন কার্যাবলি আমাদের মাঝে থাকা প্রয়োজন কিনা-? একটু ভাবা দরকার। শুধু পঞ্চবিনা নির্ভর হলেই কি মুক্তি পাওয়া যাবে।

না নবীর চরিত্র বাস্তবে রূপায়িত করতে হবে-? অন্য এক বুড়ির গাঠরী নিজের মাথায় করে নিয়ে বুড়িকে গন্তব্যস্থলে পোছে দিয়েছেলেন। এমন ঘটনা আমাদের জিবনে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন কি না-? নবীজীর জিবনের শেষ অলৌকিক ঘটনা মেরাজ। আর একাজ মুসলিম সমাজের জন্য করণীয় কিনা? যার হয় নেই মেরাজ বৃথাই তার নামাজ।

নবীজী (সা.) হাদিস শরিফে বলেন- “আস সালাতু দিরাজুল মুমিনিন” অর্থাৎ- নামাজ মুমিনের মেরাজ বা সাক্ষৎ।

একাজ সহজে হাসিল হয় না। নামাজ বিষয়ে নবীজী (সা.) আরও বলেন-

“আস সালাতু কোরবায়ে আইনি ফিচ্ছালাতা” অর্থাৎ- নামজে আমার চক্ষু শীতল হয়।

এ হাদিস হতে বুঝা যায় নামাজ দর্শনীয় বস্তু। আমি শুধু পড়া সমাপ্ত করলাম, আসলে এর বাস্তবতা কোথায় -?
বিষয়টি একটু ভেবে দেখা দরকার। আল্লাহর নবীর কিশোর সময়ের এক ঘটনা হতে জানা যায়,ঐ সময় মক্কার কাবাঘর সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এ সময় হাজরে আসওয়াদ তথা কৃষ্ণপাথর স্থানান্তরিত করা হয়। যখন কাবাঘরের সংস্কারের কাজ শেষ হয়ে যায় তখন হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন নিয়ে নানা গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব হতে রক্তক্ষয়ী সংগ্ৰামের সৃষ্টি হয়।

তখন ওয়ালিদ বিন মুগীরা বললেন আগামী কাল ভোরে যে প্রথমে কাবাঘরে প্রবেশ করবে তার উপর মীমাংসার ভার ন্যস্ত করা হবে এবং তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হবে। সেই মোতাবেক দেখা গেল ভোরে হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্ব প্রথমে কাবাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছেন। তখন সবাই নবীজীর উপর মীমাংসার ভার নেস্ত করেন। নবীজী (সাঃ) একটা চাদর বিছিয়ে চাদরের উপরে পাথরটি রেখে চাদরের কোনো চারটি গোত্রের প্রধানদের ধরতে বললেন। তারপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি প্রতিস্থাপন করলেন। ফলে এতে দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান হলো, উদ্ভুত সমস্যার সমাধান হলো।

এতে আল্লাহর হাবীবের সম্মান আরও বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে হাদিস হতে জানা যায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি এমন উৎকৃষ্ট কাজের কথা বলিব না যা সালাত ও রোজা হতে উত্তম-? আর তা হলো পরস্পরের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা। একজন মুসলমান হবে জ্ঞানী, গুণী ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। বিষয় মোহ লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ হতে তার অন্তর হবে ক্লেশ মুক্ত। প্রেম,পীরিতি, ভালোবাসা তার মধ্যে থাকবে বিরাজমান।

তাঁকে হতে হবে উদার, ন্যায়-নিষ্ঠাবিন, হ্নদয়বান, পরকল্যানময়, ধৈর্য শীল, মিষ্টিভাষী, নম্র, ভদ্র, দয়া, মায়া, স্নেহ,ক্ষমা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সর্ব জিবের কল্যাণ তার মধ্যে থাকবে বিরাজমান। এ সমস্ত মানবীয় গুণাবলিসম্পন্ন হবে একজন মুসলমানের আদর্শ। তাঁর বিত্তের চেয়ে চিত্ত হবে বড়। আর এসব গুণের অধিকারী মুসলমান হবে অলি আউলিয়া। এদের গু্ণে মুগ্ধ হয়ে মানুষ মুসলমান হবে। উল্লেখিত গুণগুলি আল্লাহর নবীর মধ্যে বিরাজমান ছিল। আর আমরা এ গুণগুলি হতে সরে ইসলাম হতে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি।

হুজুর (সা.) বলেন- আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দিব না যে, কার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম? শান্ত মেজাজ,নরম কমল স্বভাব, মিশুক হদয়, নেক খাসিলত লোকের জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম ? সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি নিবৃত্তি মুসলমানের অতি প্রয়োজন। হাদিসে আসছে সুদ, দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই হারাম।
হিংসা, নিন্দা, অহংকার, বড়াই, তাকাব্বুরী হতে আত্মরক্ষা দরকার।

মনের কু-কামনা, বাসনা,কু-ধারনা একজন মুসলমানের জন্য মানা বা নিষেধ। ছল, চাতরী, ফেতনা-ফ্যাসাদ ইসলামে নেই।

হাদিসে আছে- “যে ব্যক্তি প্রতারণার আশ্রয় নেয়া সে আমার দলভুক্ত নয়”

“ফিৎনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর” (আল কোরান সুরা বাকারার)

বান্দার হক নষ্টকারীকে আল্লাহ মাফ করবেন না। পরনিন্দা, পরচর্চা, অপবাদ,জেদ, ক্রোধ প্রতিরোধ প্রয়োজন।
রাহাজানি,ছিনতাই,চুরি,মারামরি,খুনাখুনি, ইত্যাদি মুসলমানের জন্য হারাম। চুরি সম্পর্কে নবীজী(সাঃ) বলেন,সে ব্যক্তি মুমিন মুসলমান নয় যে ব্যক্তি চুরি করে কিংবা মদ পান করে অথবা লুন্ঠন করে বা পরের ধন আত্মসাত করে, সতর্ক হও, সতর্ক হও উপরে উল্লেখিত অপরাধ হতে নিজেকে বাঁচাতে পারলেই কেবল মুসলমান হওয়া যাবে।

নিশ্চয়ই মুসলমান ভাই ভাই, (সূরা-হুজরাত)। এক মুসলমান বিপদে পড়লে অন্য মুসলমানের তাঁকে সাহায্য করা ঈমানী দায়িত্ব। হাদিসে আছে, দুনিয়াবাসীদের প্রতি সদয় হও, তাহলে আসমানের প্রভু তোমাদের প্রতি সদয় হবে।

হুজুর পাক (সাঃ) আরও বলেন:-
“হিংসা কর না পরষ্পরকে ঘৃণা কর না পরস্পরকে এবং হও খোদার বান্দা সব ভাই”

নবীজী (সাঃ) আরও বলেন, “আল্লাহ দয়া করে না তাকে যে দয়া করে না মানুষকে।”

“মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করতে হবে, নচেৎ সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে না।”

“তারাই আল্লাহর সবচেয়ে বড় শত্রু যারা ইসলাম গ্রহণ করে ও অবিশ্বাসীর কর্ম তথা মানুষের রক্তপাত করে।” (আল হাদিস)।

কুরআন শরিফে আছে, “ওলা ইয়াগতাব বায়াদুকুম আইউ হিব্বা আহাদুকুম আই ইয়া কুলা লাহমা আখিহি মাইতান ফাকারিহু তুহুম”

অর্থ-“আর গীবত করিবে না একে অন্যের, যদি কেহ গীবতে দুস্তি রাখে অর্থাৎ গীবত করে, সে তার মৃত ভ্রাতার গোস্ত খাইল, অতএব গীবত থেকে বিরত থাক।”

মুসলমানগণ অলস, ভিক্ষাবৃত্তি তাদের পছন্দনীয় অথচ নবী ভিক্ষা বর্জন করে। পরিশ্রমী হতে নির্দেশ দিয়েছেন। পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। দ্বীনের নবীর সাফল্যের আদর্শের মধ্যে এর সফল বাস্তবায়ন দেখা যায়।

কুরআন শরিফে আছে, “ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল আবদাল মুহতারিফ”।

অর্থ: ‘আল্লাহ উপার্জনশীল বান্দাদের পছন্দ করেন।

নবীর আদর্শ ও কুরআনের শিক্ষা সমানভাবে গ্রহণের জন্য আল্লাহপাক আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

তাই সুরা ফাতাহ তে আছে, “ইন্নাল্লাজিনা ইউ বায়িউনাকা ইন্নামা ইউ বায়িউনাল লাহা ইয়াদুল্লাহি ফাওকা আহদিহিম ফামান নাকাছা ফাইন্নামা ইয়ানকুছু আলা নাফছিহী অমান আওফা বিমা আহাদা আলাইহুল লা হা ফাছা ইউতিহী আজরান আজীমা।”

অর্থ- “নিশ্চয়ই যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারাতো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। আর যে ব্যক্তি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে সে তা করবে নিজের অনিষ্টের জন্যে।”

“আর যে ব্যক্তি কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ করবে আল্লাহ অচিরেই তাকে মহা পুরস্কার দান করবেন।”

তাদের হাত এখানে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই রাসুলের হাতের বাইরেও হাত আছে। আর এ হাতগুলো নিশ্চয়ই অলি-আউলিয়া তথ্য বুজুর্গগণের হাত। তাই আসুন নবীর অবর্তমানে তাঁর নায়েবে রাসুলের হাতে, হাত রেখে তাঁর আদর্শ, মহব্বত ও কুরআনের নির্দেশ মতে জীবন গড়ে তুলি। আসুন আমরা মুসলমান জাতি সত্যের সাথে একমত হই।

সূত্র: (শিকওয়া জওয়াবে শিকওয়া পৃ:-৮৮-৯২)

পূর্ববর্তী পোস্টধর্মের সঠিক ও ভয়হীন পথ
পরবর্তী পোস্টমাওলা আলীর জিকির (স্বরণ) করা ইবাদত
হে মানব! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত যে কঠোর সাধনা করে থাকো, তা তুমি দেখতে পাবে। - (সূরাঃ আল ইনশিকাক-৬)

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন