মায়ার নগরী থেকে চিরমুক্তি

মায়ার নগরী থেকে চিরমুক্তি

সুখ যা এক দোয়াসা ঘেরা বস্তু, যার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে মানুষের জীবন সায়াহ্নে নেমে আসে মৃত্যু নামক এক অমৃত সুধা। যা এই মায়ার নগরী থেকে চিরমুক্তি দিয়ে নিয়ে যায় মাওলার নিকট। সুখ সে তো কল্পনার এক মরীচিকা যা আদৌ কেউ কখনো কোনোদিন পেয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ সুখ নামক এই অধরাকে ধরতে মানুষ তার অমূল্য জীবনটাই শেষ করে ফেলে। যে জীবনে মাওলাকে চিনার কথা সে অমূল্য জীবনকে আমরা সুখের পিছনে দৌরাত্ব করে রাখি। যা মানুষকে ক্ষাণিক সময়ের জন্য একটু প্রণোদনা দান করেন সুখ সেটা নয় । সুখ সেটা তার কাঙ্খিত বস্তু তথা মাওলাকে তাঁর অপরূপে নিজের করে পাওয়ার নামই সুখ।

উক্ত লেখাটি গভীর সূফী চিন্তাধারার একটি শক্তিশালী প্রতিফলন, যেখানে “সুখ” নামক ধারণাটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাকে সুখ মনে করে, লেখক তা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে সুখকে একটি “দোয়াসা ঘেরা বস্তু” বা বিভ্রমময় কিছুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—যা মানুষকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধরা দেয় না।

প্রথমেই বলা হয়েছে, মানুষ সারাজীবন সুখের পিছনে ছুটতে থাকে। এই দৌড় কখনো থামে না—শৈশব থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য—প্রতিটি পর্যায়ে মানুষ মনে করে, “আর একটু পেলেই সুখ আসবে।” কিন্তু এই “আর একটু” কখনো শেষ হয় না। ফলে জীবন ধীরে ধীরে সায়াহ্নে পৌঁছে যায়, এবং শেষমেশ মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়। লেখক এখানে মৃত্যুকে ভয়াবহ কিছু হিসেবে দেখেননি; বরং একে “অমৃত সুধা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, মৃত্যু হলো সেই মাধ্যম, যা মানুষকে এই মায়াময় জগত থেকে মুক্ত করে প্রকৃত সত্তার দিকে নিয়ে যায়।

“মায়ার নগরী” বলতে এই পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী, পরিবর্তনশীল এবং প্রতারণাময় ও ধ্বংসশীল। মানুষ এখানে যা কিছু অর্জন করে—সম্পদ, খ্যাতি, সম্পর্ক—সবই একসময় হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ এই অস্থায়ী জিনিসগুলোকেই স্থায়ী সুখ মনে করে, এবং সেগুলোর পেছনে নিজের পুরো জীবন ব্যয় করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে লেখক একটি “মরীচিকা” বা মরুভূমির বিভ্রমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন দূর থেকে পানির মতো মনে হয়, কিন্তু কাছে গেলে কিছুই পাওয়া যায় না—ঠিক তেমনি জাগতিক সুখও মানুষকে প্রতারিত করে।

লেখক স্পষ্টভাবে বলেন, প্রকৃত সুখ কেউ কখনো পেয়েছে বলে তাঁর মনে হয় না। এই বক্তব্যটি বাহ্যিকভাবে হতাশাবাদী মনে হলেও, আসলে এটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে তুলে ধরে। কারণ, জাগতিক সুখ সবসময় শর্তসাপেক্ষ—কিছু পেলে সুখ, না পেলে দুঃখ। কিন্তু এই ধরণের সুখ কখনো স্থায়ী হয় না। তাই মানুষ যতই চেষ্টা করুক, সে এই সুখকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে না।

এরপর লেখক মানুষের জীবনের আসল উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবন অত্যন্ত অমূল্য, এবং এই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত “মাওলাকে চেনা”—অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। কিন্তু মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে সুখের পেছনে ছুটতে থাকে। ফলে সে নিজের আসল পরিচয় এবং উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে—ক্ষণিক প্রণোদনা ও প্রকৃত সুখের মধ্যে। লেখক বলেন, মানুষ যে ক্ষণস্থায়ী আনন্দ বা স্বস্তি পায়—যেমন কোনো ইচ্ছা পূরণ হলে যে ভালো লাগা তৈরি হয়—তা প্রকৃত সুখ নয়। এগুলো সাময়িক অনুভূতি, যা কিছু সময় পরে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ ভুল করে এগুলোকে “সুখ” বলে মনে করে এবং সেগুলোর পুনরাবৃত্তির জন্য জীবন কাটিয়ে দেয়।

প্রকৃত সুখ কী—এই প্রশ্নের উত্তরে লেখক বলেন, প্রকৃত সুখ হলো “মাওলাকে তাঁর অপরূপে নিজের করে পাওয়া।” এটি একটি সূফী ধারণা, যেখানে মানুষ নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার ও লোভ ত্যাগ করে, এবং সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে। এই অবস্থায় মানুষ এমন এক প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি অনুভব করে, যা কোনো জাগতিক অর্জনের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

এই ব্যাখ্যা আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সুখকে বাইরে খুঁজে পাওয়া যায় না; এটি একটি অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি। যতক্ষণ মানুষ বাহ্যিক জিনিসের ওপর নির্ভর করবে, ততক্ষণ সে প্রকৃত সুখ থেকে বঞ্চিত থাকবে। কিন্তু যখন সে নিজের ভেতরের জগতকে চিনতে শুরু করবে এবং সৃষ্টিকর্তার দিকে মনোযোগ দেবে, তখনই সে সত্যিকারের সুখের স্বাদ পাবে।

সারসংক্ষেপে, এই লেখাটি আমাদেরকে জাগতিক জীবনের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে আধ্যাত্মিক সত্যের দিকে দৃষ্টি দিতে আহ্বান জানায়। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন ক্ষণস্থায়ী, এবং এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমাদেরকে আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে হবে। সুখের পেছনে অন্ধভাবে দৌড়ানোর পরিবর্তে, আমাদের উচিত সেই চিরন্তন সত্তাকে খুঁজে পাওয়া—যার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত শান্তি, পরিতৃপ্তি এবং মুক্তি।

-সৈয়দ মামুন চিশতী

আরো পড়ুনঃ