রূহানি মহাজীবন: আলহাজ্ব আবু আহম্মদ মোবাশ্বার হোসেন।
গবেষক ও কলাম লেখক: মাওলানা কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
বাংলার রূহানি ইতিহাসের মানচিত্রে আলহাজ্ব আবু আহম্মদ মোবাশ্বার হোসেন (আবু কাওসার) এক জ্যোতির্ময় নক্ষত্র। তাঁর জীবন ছিল ‘মাদাজাত বেলায়েত’ বা জন্মগত ওলীত্ব এবং আধুনিক শিক্ষার এক বিরল ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়। ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর নামের প্রতিটি অংশ যেন তাঁর চরিত্রের এক একটি দিক উন্মোচন করে; তিনি ছিলেন একাধারে পবিত্র হজ পালনকারী ‘আলহাজ্ব’, মহানবী (সা.)-এর আসমানি নামের বরকতে ধন্য ‘আবু আহম্মদ’, আল্লাহর রহমতের সুসংবাদদাতা ‘মোবাশ্বার’, ইমাম হোসেন (রাদ্বি.)-এর আদর্শে চারিত্রিক সুন্দরের প্রতীক ‘হোসেন’ এবং রূহানি ফয়েজের অফুরন্ত উৎস ‘আবু কাওসার’।
তাঁর পিতৃ-পরিচয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল হিমালয়সম উচ্চ। তাঁর পিতা, উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবীদ মাওলানা প্রফেসর আবদুল খালেক এম.এ (রহ.), ছিলেন ফুরফুরার পীর হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা এবং পাকিস্তানের সংবিধান প্রণেতা। অন্যদিকে মাতৃকূলে তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রখ্যাত কনিকাড়া জমিদার বংশের উত্তরসূরি। শৈশব থেকেই তিনি আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলায় লালিত হন। তাঁর শিক্ষা জীবন ছিল ‘দুই সমুদ্রের মিলনস্থল’। পারিবারিক পরিবেশে কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করে তিনি যেমন একজন বিজ্ঞ আলেমের যোগ্যতা লাভ করেন, তেমনি তৎকালীন আধুনিক উচ্চশিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করে একজন পরিপক্ক ও যুগোপযোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।
আবু কাওসার সাহেবের আধ্যাত্মিক পথচলা ছিল রহস্যময় ও বিস্ময়কর। ১৯৫৫ সালে মাত্র ১৫ বছর ৭ মাস ১ দিন বয়সে যখন তিনি পিতাকে হারান, তখন থেকেই তাঁর স্কন্ধে রূহানি উত্তরাধিকারের গুরুভার অর্পিত হয়। এই অল্প বয়সে খেলাফত ও বেলায়েতের উচ্চস্তরে পৌঁছানোর মূলে ছিল তাঁর পিতার সেই অশ্রুসিক্ত দোয়া, যা তিনি পবিত্র হজ পালনকালে কাবার গিলাফ ধরে তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারীর জন্য করেছিলেন। আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘তায়্যুল মাকাম’ বলা হয়, সেই বিশেষ অনুগ্রহে তিনি অল্প সময়েই ইলম ও মারেফতের গভীর আমানত লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ফুরফুরার কনিষ্ঠ সাহেবজাদা মাওলানা শাহ সুফি নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রহ.)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করে তরিকতের পূর্ণতা ও খেলাফতে ধন্য হন।
তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল ঘড়ির কাঁটার মতো সুশৃঙ্খল। নিশিজাগরণ করে তাহাজ্জুদের সালাত ও অশ্রুসিক্ত নয়নে দীর্ঘ মুরাক্বাবার মাধ্যমে তাঁর রূহানি দিন শুরু হতো। ফজরের পর খতম শরীফ ও সওয়াব রেছানি শেষে তিনি সাংসারিক কাজে মনোনিবেশ করতেন। আসরের পর ভক্তদের সময় দেওয়া এবং মাগরিবের পর পুনরায় দীর্ঘ মুরাক্বাবায় মগ্ন হওয়া ছিল তাঁর নিয়মিত রুটিন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ বার দরুদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে তিনি নবী-প্রেমের যে নূরানি আভা অন্তরে লালন করতেন, তা-ই ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি। তিনি কেবল শিষ্যদের জিকির দিতেন না, বরং নিপুণ চিকিৎসকের মতো তাদের কলবের ব্যাধি নির্ণয় করে নিয়মিত ‘ছবক’ পরিবর্তনের মাধ্যমে মুরিদদের রূহানি জগতের নবদিগন্তে প্রবেশ করাতেন।
সমাজসেবার ক্ষেত্রে তাঁর দর্শন ছিল গগণচুম্বী। তিনি পাথরের দালান গড়ার চেয়ে ‘ইনসান’ বা আদর্শ মানুষ গড়াকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত দীক্ষা ছাড়া কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে পূর্ণতা দিতে পারে না। তাঁর এই বিনয় ও আধ্যাত্মিক যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর মুরশিদ তাঁকে ‘ছতুরা দরবার শরীফ’-এর দায়িত্ব দেন এবং তাঁরই তত্ত্বাবধানে পিতার স্মরণে ‘ঈসালে সওয়াব মাহফিল’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ২০২৬ সালে ৬৯তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। সমকালীন আলেম সমাজ তাঁকে একবাক্যে ‘খামুশ ওলী’ বা নিভৃতচারী সাধক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যাঁর সান্নিধ্যে এসে অসংখ্য মানুষ ভ্রান্ত পথ ছেড়ে জান্নাতের যাত্রী হিসেবে গড়ে উঠেছে।
৭১ বছর ২ মাস ২৬ দিনের প্রদীপ্ত সফর শেষে ২৭ নভেম্বর ২০১০ তারিখে তিনি ওফাত লাভ করেন। তাঁর মাজার শরীফটি তাঁর পরম বিনয় ও ঐশী সমর্পণের অনন্য নিদর্শন। পিতার মাজার মসজিদের অভ্যন্তরে হলেও, আবু কাওসার সাহেবের মাজারটি রাস্তার পাশে সম্পূর্ণ স্থাপত্যহীন ও খোলা আকাশের নিচে অবস্থিত। কোনো কৃত্রিম ছাদ না থাকায় আসমানি বৃষ্টির পানি সরাসরি তাঁর কবরে পড়ে, যা তাঁর সুফিসুলভ সরলতা এবং ‘ফানা-ফিল্লাহ’ মাকামের সাক্ষ্য দেয়। আজ তাঁর এই রূহানি সিলসিলার খাদেম হিসেবে তাঁর সুযোগ্য পুত্র আলহাজ্ব আশেক হোসেন (উচ্চশিক্ষিত ও ফুরফুরা থেকে খেলাফত প্রাপ্ত) অত্যন্ত নিস্বার্থভাবে তরিকতের খেদমত চালিয়ে যাচ্ছেন। বস্তুবাদী এই যুগে আবু কাওসার সাহেবের ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ও চরিত্র সংশোধনমূলক আদর্শ পথভ্রষ্ট মানবতার জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।






