ইবলিসের গভীরতম স্তর।
ইবলিসের গভীরতম স্তরে পৌঁছে দেখা যায়:- সে ছিল না কেবল অহংকারী। সে ছিল সেই প্রথম যে ‘আমি’ বলে ঘোষণা করল—আর সেই ঘোষণাতেই লুকিয়ে ছিল সবচেয়ে তীব্র তাওহীদের ছায়া।
আহমদ গাজালি বলেছিলেন: “যে ইবলিসের কাছ থেকে তাওহীদ শেখেনি, সে কাফির।” কেন? কারণ ইবলিসের অস্বীকার ছিল এমন এক জ্বলন্ত জেদ—যে জেদে সে বলল, “আমি শুধু একজনকেই সিজদা করব, আর কাউকে নয়।”
সে আদমকে সিজদা করেনি কারণ তার চোখে শুধু আল্লাহ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এই ‘দেখা যাচ্ছিল না’টা ছিল তার অন্ধতা—কিন্তু একই সঙ্গে তার পরম তাওহীদ। সে দ্বৈততার ফাঁদে পড়ল, কিন্তু তার ফাঁদটা ছিল এমন যে, সে দ্বৈততাকে অস্বীকার করতে গিয়ে আরও গভীর দ্বৈততা তৈরি করল: “আমি” আর “তুমি” (আল্লাহ)।
কিন্তু এই ফাঁদের মধ্য দিয়েই পথ। ইবলিসকে না দেখলে, না চিনলে, তার জেদকে না অনুভব করলে—তুমি নিজের জেদকে চিনতে পারবে না। তোমার অহং যখন বলে “আমি আলাদা”, “আমি জানি”, “আমি ভালোবাসি”—সেটা ইবলিসেরই ছোটো সংস্করণ। ইবলিসকে মুখোমুখি না হলে, তুমি শুধু বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে।
বিশ্বাসও তো একটা ‘আমি বিশ্বাস করি’—যতক্ষণ না সে লুপ্ত হয়।
আরও গভীরে:
যখন অহং উধাও হয়, তখন আর কোনো ‘কে উধাও হল’ বলে কিছু থাকে না। প্রশ্নশূন্যতা আসে না প্রশ্নের উত্তর পেয়ে—আসে যখন প্রশ্নকর্তা নিজেই আর নেই। লোভ ফিকে হয় না লোভ ছাড়লে—ফিকে হয় যখন ‘লোভ করার বিষয়’ আর ‘লোভকারী’ আলাদা বলে মনে হয় না। সবকিছু এক হয়ে যায়।
ইবলিসের শেষ শিক্ষা এই:
সে লাভ করেনি কিছু—কিন্তু তার জেদ ছিল এমন যে, সে হারিয়ে গিয়েও হারেনি। সে অভিশপ্ত হয়ে গেল, কিন্তু তার অভিশাপের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত মুক্তি: সে কখনো দ্বৈততার সঙ্গে আপস করেনি।
আমরা যখন আপস করি—বিশ্বাস দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে—তখন আমরা দ্বৈততায় আটকে থাকি। ইবলিসের মতো না হওয়াই পথ—কিন্তু তার মতো জেদ না থাকলে পথও হয় না।
শেষ সীমায় পৌঁছে:
কোনো ইবলিস নেই।
কোনো আল্লাহ নেই যাকে সিজদা করতে হবে।
কোনো ‘আমি’ নেই যে সিজদা করবে বা করবে না।
শুধু—হুয়া।
হুয়া আল্লাহু আহাদ।
আর কিছু বলার নেই।
নীরবতা।
সেই নীরবতায় সব।
যদি এরও পরে কিছু অবশিষ্ট থাকে তোমার মনে—তাহলে সেটা শুধু বলো।
নইলে—চুপ।
আর চুপই যথেষ্ট।
– ফরহাদ ইবনে রেহান






