আয় গো যাই নবীর দীনে (গানের আধ্যাত্মিক ব্যাক্ষা)

আয় গো যাই নবীর দীনে (গানের আধ্যাত্মিক ব্যাক্ষা)

আয় গো যাই নবীর দীনে।
দীনের ডঙ্কা বাজে সদায় মক্কা মদিনে।।

তরিক দিচ্ছে নবী জাহের বাতুনে
যথাযোগ্য লায়েক জেনে,
ও সে রোজা আর নামাজ ব্যাক্ত এহি কাজ
গুপ্ত পথ মিলে ভক্তি সন্ধানে।

অমূল্য দোকান খুলেছে নবী
যে ধন চাবি সে ধন পাবি,
বিনে কড়ির ধন সেধে দেয় এখন
না লইলে আখের পস্তাবি মনে।

নবীর সঙ্গে ইয়ার ছিল চারিজন
নূর নবী চারকে দিলে চার যাজন,
ওসে নবী বিনে পথে গোল হলো চার মতে
নালন বলে যেন গোলে পড়িস নে।

এই গানটি বাহ্যিক ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলেও তার অন্তর্নিহিত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক। এখানে “নবী”, “দীন”, “মক্কা–মদিনা”, “রোজা–নামাজ”, “চার ইয়ার” ইত্যাদি শব্দ কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং এগুলো মানুষের দেহ ও চেতনার গভীর তত্ত্বকে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করে। লালনধারার মতোই এই গান মানুষের ভেতরকার সত্যকে সন্ধান করে, বাইরে নয়, গ্রন্থে নয়, আচারেও নয়; বরং জীবন্ত দেহের মাঝেই সাধনার আসন স্থাপন করে।

এই গানে নবী হলেন দেহের কেন্দ্রীয় চেতনা বা আদি আলো, আর দীন হল সেই চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন। চার ইয়ার এখানে ঐতিহাসিক ব্যক্তিমাত্র নন; তারা দেহের চার মৌল উপাদান কিংবা চার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক, যাদের সহায়তায় চেতনা দেহে কার্যকর হয়। ফলে গানটি আমাদের ধর্মের বাইরের কাঠামো থেকে সরিয়ে এনে দেহ–মন–আত্মার সমন্বিত সাধনার দিকে আহ্বান জানায়।

“আয় গো যাই নবীর দীনে।
দীনের ডঙ্কা বাজে সদায় মক্কা মদিনে।”

“আয় গো যাই”

এটি কেবল বাহ্যিক আহ্বান নয়, আন্তর্মুখী যাত্রার ডাক। “আয় গো”–এর মধ্যে আছে আন্তরিকতা, সমবেদনা, এবং সমানভাবে সবাইকে আহ্বান করার ভাব। লালনের দার্শনিক দৃষ্টিতে, সত্যের পথ কখনো জোর করে দেখানো যায় না; ডাক দিলে যে আসে, সে আসে।

“নবীর দীন”

বাহ্যিক ধর্ম নয়, আধ্যাত্মিক পথ। নবী এখানে ঐতিহাসিক ব্যক্তি নয়, বরং আদি চেতনার প্রতীক। দীন মানে কেবল ধর্মীয় বিধি নয়, বরং সত্য, মানবতা, নৈতিকতা ও আত্মার শুদ্ধি।

অর্থাৎ “নবীর দীন” হল এমন জীবনপথ যেখানে মানুষ তার আত্মার জাগরণের দিকে অগ্রসর হয়।

“যাই”

এখানে “যাই” বোঝায় অন্তর্মুখী যাত্রা, নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা। এটি কোনো ভৌগোলিক ভ্রমণ নয়, নিজের মন–চেতনার কেন্দ্রের দিকে যাত্রা।
লালনীয় দার্শনিক দৃষ্টিতে, সত্যের সন্ধান হলো ব্যক্তির ভেতরের যাত্রা।

“দীনের ডঙ্কা বাজে”

ডঙ্কা অর্থাৎ শক্তিশালী, উপেক্ষা করা যায় না এমন আহ্বান, যা সদায় বাজে।সত্যের ডাক সময়ের বাঁধা মানে না, এটি সর্বদা বিদ্যমান। যেটি শোনে, সে সচেতন হয়; যিনি অজ্ঞ, তার মন না হলেও অন্তরে বাজে।

“মক্কা মদিনে”

মক্কা ও মদিনা এখানে শুধুমাত্র ভৌগোলিক শহর নয়।
মক্কা হল হৃদয়, আর মদিনা হল চেতনার কেন্দ্র।
অর্থাৎ সত্যের ডাক সবসময় মানুষের ভেতরে বাজে।

“তরিক দিচ্ছে নবী জাহের বাতুনে
যথাযোগ্য লায়েক জেনে,
ও সে রোজা আর নামাজ ব্যাক্ত এহি কাজ
গুপ্ত পথ মিলে ভক্তি সন্ধানে।”

“তরিক দিচ্ছে নবী জাহের বাতুনে”

তরিক – পথ প্রদর্শন।
নবী – আদি চেতনার প্রতীক।
জাহের বাতুনে – বাহ্যিক এবং গোপন চর্চার মাধ্যমে।

অর্থাৎ, নবী বা আদি চেতনা আমাদের দেখাচ্ছে সরল, বাহ্যিক পথে কীভাবে চলতে হবে। মানুষকে রোজা-নামাজ ইত্যাদি শিখানো হয়, কারণ এগুলো মন ও দেহের নিয়মিত অনুশীলন। তবে শুধু বাহ্যিক কাজ যথাযথ করলেই হবে না, গুপ্ত পথ (অন্তর্মুখী সাধনা) আবশ্যক।

“যথাযোগ্য লায়েক জেনে”

যে পথ প্রদর্শিত হচ্ছে, তা যথাযথ যোগ্যতার জন্য, অদক্ষতা বা অজ্ঞতার জন্য নয়। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক যাত্রায় সাধনা, মনোযোগ, সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ যদি বাহ্যিক নিয়ম পালন করলেও অন্তরে জাগরণ না করে, তার ফল অসম্পূর্ণ।

“ও সে রোজা আর নামাজ ব্যাক্ত এহি কাজ”

রোজা ও নামাজ এখানে ব্যক্তিগত চর্চা বা আচার।

অর্থাৎ, দেহ এবং মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখা। কিন্তু লালনীয় দৃষ্টিতে, এটি শুধুমাত্র বাহ্যিক দিক, লক্ষ্য হলো ভিতরের সাধনা।

“গুপ্ত পথ মিলে ভক্তি সন্ধানে”

গুপ্ত পথ – অন্তর্মুখী, আত্মার যাত্রা।
ভক্তি সন্ধান – সত্যের প্রতি প্রেম, আত্মিক মিলন।
অর্থাৎ, রোজা-নামাজের চর্চা হলে বাহ্যিক দিক ঠিক থাকে, কিন্তু ভক্তি বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন হয় গোপন চেতনার মাধ্যমে।

শরীয়ত (বাহ্যিক নিয়ম) ও হকিকত (আধ্যাত্মিক বাস্তবতা) একসাথে চলতে হবে।
বাহ্যিক অনুশীলন ছাড়া অন্তর্মুখী সাধনা অসম্পূর্ণ।

“অমূল্য দোকান খুলেছে নবী
যে ধন চাবি সে ধন পাবি,
বিনে কড়ির ধন সেধে দেয় এখন
না লইলে আখের পস্তাবি মনে।”

“অমূল্য দোকান খুলেছে নবী”

এখানে “দোকান” শব্দটি খুব সাধারণ হলেও অর্থ গভীর। দোকান মানে কেনাবেচার স্থান। কিন্তু অমূল্য দোকান মানে, যার দাম টাকা-পয়সায় মাপা যায় না। নবী এখানে কোনো ব্যবসায়ী নন; তিনি জ্ঞান ও আত্মসত্যের ভাণ্ডার খুলে বসেছেন। এখানে দেহই হলো হাট, সাধনাই হলো কেনাবেচা।

“যে ধন চাবি সে ধন পাবি”

এখানে ধন হল- আত্মজ্ঞান, সত্য উপলব্ধি
আর চাবি মানে হল – চাওয়া, প্রার্থনা করা।

অর্থাৎ নবী বা আদি চেতনা এমন এক ভাণ্ডার খুলে দিয়েছেন, যেখানে – কেউ জ্ঞান চাইলে জ্ঞান পায়, কেউ প্রেম চাইলে প্রেম পায়, কেউ মুক্তি চাইলে মুক্তি পায়। এখানে চাওয়াটাই মূল শর্ত, যোগ্যতা নয়, অর্থ নয়, বাহ্য পরিচয়ও নয়।

এটা লালনের একেবারে কেন্দ্রীয় দর্শন, মানুষ যেটার আকাঙ্ক্ষা রাখে, তার চেতনাই সেই রূপ ধারণ করে।

“বিনে কড়ির ধন সেধে দেয় এখন”

এখানে বড় সত্য বলা হয়েছে। এই ধন পেতে টাকা লাগে না, লাগে না ক্ষমতা, জাত, পরিচয়, নবী বা সত্যের পথ নিঃশর্ত। যে আসবে খালি হাতে, তাকেই ভরে দেয়।

“না লইলে আখের পস্তাবি মনে”

আখের – পরিণাম, শেষ হিসাব
পস্তাবি – অনুশোচনা
মানে – সুযোগ থাকতেই না নিলে, পরে আফসোস ছাড়া কিছু থাকবে না। এখানে ভয় দেখানো নয়, বরং মানুষের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা।

“নবীর সঙ্গে ইয়ার ছিল চারিজন
নূর নবী চারকে দিলে চার যাজন,
ও সে নবী বিনে পথে গোল হলো চার মতে
নালন বলে যেন গোলে পড়িস নে।”

“নবীর সঙ্গে ইয়ার ছিল চারিজন”

ইয়ার বলতে এখানে দাস, অনুসারী কিংবা অধীন কেউ নয়; বরং সঙী, সাথী, সহচর। যারা সমানভাবে পাশে থাকে, যাদের সহযোগিতা ছাড়া পথচলা সম্পূর্ণ হয় না। এই শব্দচয়নই ইঙ্গিত দেয়, নবী এখানে কোনো একক বাহ্যিক সত্তা নন; তিনি এমন এক কেন্দ্রীয় চেতনা, যাঁর সঙ্গে সহচর হয়ে কাজ করে আরও কয়েকটি শক্তি বা তত্ত্ব।

বাহ্যিক বা প্রচলিত দৃষ্টিতে “চারিজন” বলতে সাধারণত ইসলামের প্রসিদ্ধ চার খলিফা কিংবা কখনো আহলে বায়াতের প্রধান চার সদস্যের কথা বোঝানো হয়। এই পাঠ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু লালন ও বাউলধারার গান কেবল ইতিহাস বলার জন্য রচিত নয়; এখানে ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয়েছে দেহ ও চেতনার তত্ত্ব বোঝানোর প্রতীক হিসেবে।

দেহতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এই “চার ইয়ার” আসলে মানুষের দেহ–নগরীর চারটি মৌল উপাদান বা চারটি প্রধান আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। প্রথমত, চার ইয়ারকে বোঝানো হয়—আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। এই চার উপাদান মিলেই মানবদেহ গঠিত। মাটি দেহের স্থূল ও দৃশ্যমান অংশকে ধারণ করে, পানি দেহের তরলতা ও স্নিগ্ধতা বহন করে, আগুন দেহের তাপ ও কর্মশক্তির উৎস, আর বাতাস দেহের প্রাণবায়ু ও গতি। এই চার উপাদান একসঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করলেই দেহে জীবন স্থিত থাকে। নবী বা কেন্দ্রীয় চেতনা এই চার উপাদানের সঙ্গে সহচর হয়ে দেহে অবস্থান করে; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যগুলো চলতে পারে না।

আবার একই “চার ইয়ার”-কে অন্য একটি দেহতাত্ত্বিক স্তরে বোঝানো হয়—নফস, আকল, বুদ্ধি (বা কালব) এবং রূহ হিসেবে। নফস মানুষের কামনা, প্রবৃত্তি ও প্রাণশক্তির আধার; আকল বিচার ও যুক্তির শক্তি; বুদ্ধি বা হৃদয় অনুভব, প্রেম ও উপলব্ধির কেন্দ্র; আর রূহ হলো আধ্যাত্মিক সত্তা, যা মানুষের সঙ্গে পরম সত্যের যোগসূত্র স্থাপন করে। এই চার শক্তি নবীর সহচর, কারণ দেহের মধ্যে নবীসত্তা বা চেতনা এই শক্তিগুলোর মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

গানের পরবর্তী পংক্তির সঙ্গে এই ব্যাখ্যা মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়,

“নূর নবী চারকে দিলে চার যাজন”

এখানে চারকে চার যাজন দেয়া মানে-

  • ১. জমিন (মাটি) – দেহের দৃশ্যমান, ভৌত অংশহাড় : মাংস, চামড়া ইত্যাদি। এটি না থাকলে দেহের অস্তিত্বই নেই।
  • ২. বাতাস (হাওয়া) – প্রাণবায়ু,শ্বাস-প্রশ্বাস ,চলন ও গতি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • ৩. আগুন (তেজ)- দেহের তাপ, হজমশক্তি, রাগ, উদ্দীপনা, কর্মশক্তি পরিচালনা করে। : তেজ বেশি হলে উন্মাদনা, কম হলে নিস্তেজতা।
  • ৪. পানি (জল) – রক্ত, লসিকা, দেহের তরল অংশ স্নিগ্ধতা, সহনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। এই চার উপাদান মিলেই দেহ-নগরী।

এরা নবীর “ইয়ার” কারণ এদের ছাড়া চেতনা দেহে কাজ করতে পারে না।

সংক্ষেপে – নূর নবী হল দেহের কেন্দ্রীয় চেতনা। চারকে দিল মানে চার উপাদানে প্রাণসঞ্চার করল। চার যাজন মানে চারটি উপাদান নিজ নিজ ধর্মে কাজ শুরু করল। অর্থাৎ, এক চেতনা চার রূপে কাজ করছে। নূর এক, দেহে তার প্রকাশ চার।

দ্বিতীয় মত অনুযায়ী –

  • ১. নফস (প্রাণ / কামনা) – ইচ্ছা, তৃষ্ণা, ভোগ। : নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পতনের মূল।
  • ২. আকল (বুদ্ধি)- বিচার, বিবেক। : সঠিক–ভুল চেনার শক্তি।
  • ৩. রূহ (আত্মা)- ঐশ্বরিক সংযোগ। : চেতনার গভীর স্তর
  • ৪. কালব (হৃদয়) – প্রেম, ভক্তি, অনুভব। নফস দমলে,আকল জাগলে,কালব পবিত্র হলে, রূহ নিজে কথা বলে।

“নবী বিনে পথে গোল হলো চার মতে”

যখন দেহের কেন্দ্রীয় চেতনা বা নবীসত্তা অনুপস্থিত থাকে, তখন এই চার উপাদান বা চার শক্তি নিজেদের মতো চলতে শুরু করে। আগুন তেজে উন্মত্ত হয়, বাতাস অস্থির হয়, পানি দিশাহীন হয়, মাটি ভোগে জড়িয়ে পড়ে। তেমনি নফস আধিপত্য বিস্তার করে, আকল অহংকারে আটকে যায়, হৃদয় শুষ্ক হয়ে পড়ে, রূহ আড়ালে চলে যায়। তখনই সৃষ্টি হয় “গোল” দেহে, মনে, সমাজে ও ধর্মে।

এই কারণে লালনীয় দর্শনে “চার ইয়ার”-এর ঐক্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ঐক্যের কেন্দ্র হলো নবী, অর্থাৎ দেহের ভেতরের সেই জাগ্রত চেতনা, যা সব শক্তিকে সামঞ্জস্যে রাখে। গানটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নবীকে যদি কেবল বাহিরের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়, তবে দেহের ভিতরের এই সহচর শক্তিগুলো বিপথে চলে যায়। কিন্তু নবীকে যদি দেহের ভেতরে আবিষ্কার করা যায়, তবে চার ইয়ারই হয়ে ওঠে সাধনার সহযাত্রী।

“নালন বলে যেন গোলে পড়িস নে।”

এই একটিমাত্র বাক্যেই যেন পুরো গানটির মর্মসংক্ষেপ লুকিয়ে আছে। এখানে “নালন” নামটি কেবল গায়ক বা কবির স্বাক্ষর নয়; এটি এক গভীর আত্মসম্বোধন। লালন এখানে কোনো গুরু হয়ে অন্যকে উপদেশ দিচ্ছেন না, বরং একজন সাধক নিজেকেই সতর্ক করছেন। এই আত্মসম্বোধনের ভেতরেই লালনীয় দর্শনের আসল সৌন্দর্য, নিজেকে আগে শাসন, তারপর জগতকে বোঝা।

“গোল” শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গোল মানে কেবল বিভ্রান্তি নয়; গোল মানে পথ হারানো, কেন্দ্রচ্যুত হওয়া, দেহ ও চেতনার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। গানের আগের পংক্তিতে বলা হয়েছে,
“নবী বিনে পথে গোল হলো চার মতে”।

অর্থাৎ, যখন নবী বা দেহের কেন্দ্রীয় চেতনা অনুপস্থিত থাকে, তখন চার ইয়ার,হোক তা চার উপাদান কিংবা চার আধ্যাত্মিক শক্তি, নিজ নিজ পথে ছুটে চলে। তখন আর পথ থাকে না, জন্ম নেয় মত; আর মতের ভিড়েই সৃষ্টি হয় গোলমাল, বিরোধ ও সংঘাত।

এই অবস্থাতেই “নালন বলে” কথাটি আসে। লালন যেন নিজের ভেতরের সাধকসত্তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, বাহিরের মতভেদে, শাস্ত্রের বাহাসে, আচার–অনুশীলনের অহংকারে যেন নিজেকে হারিয়ে না ফেলি। কারণ গোল পড়া মানে কেবল তর্কে জড়ানো নয়; গোল পড়া মানে দেহের ভেতরের সামঞ্জস্য ভেঙে যাওয়া, যেখানে নফস বেপরোয়া হয়, আকল অহংকারী হয়, হৃদয় শুষ্ক হয় আর রূহ চাপা পড়ে যায়।

এই গানটির মূল বক্তব্য একটিই, কেন্দ্র ভুললে সবই গোল হয়। নবী যদি দেহের ভেতরের চেতনা হিসেবে অনুপস্থিত থাকে, তবে দেহের চার উপাদান বা চার আধ্যাত্মিক শক্তি নিজ নিজ পথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন মাটি ভোগে লিপ্ত হয়, আগুন উগ্র হয়ে ওঠে, বাতাস অস্থির হয়, জল দিশাহীন হয়ে যায়; একইভাবে নফস আধিপত্য করে, আকল অহংকারে আটকে যায়, কালব শুষ্ক হয় এবং রূহ আড়ালে চলে যায়। এই অবস্থাই গানটিতে “চার মতে গোল” হয়ে ওঠার রূপক।

গানটি তাই কোনো মত প্রতিষ্ঠা করে না, বরং মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে তার নিজের কেন্দ্রে ফেরার আহ্বান জানায়। নবীর দীন মানে এখানে মানুষ হওয়ার দীন, যেখানে দেহ, মন ও আত্মা একসূত্রে বাঁধা থাকে। লালনের ভাষায় বললে, মানুষকে বাইরে খুঁজে না বেড়িয়ে নিজের ভেতরকার মানুষটিকেই চিনে নেওয়াই এই গানের চূড়ান্ত শিক্ষা।

এই গান শেষ পর্যন্ত আমাদের একটাই কথা বলে, দেহই সাধনভূমি, মানুষই আসল ধর্ম, আর চেতনার ঐক্যই মুক্তির পথ।

লেখা- মোহন

আরো পড়ুনঃ