আমি তোমাদেরকে একটি আদর্শে দেখতে চাই।
আমি তোমাদেরকে একটি আদর্শে দেখতে চাই। এবং যেকোনো একটি, শুধু মাত্র একটি আদর্শ’ই তোমাদের জন্য যথেষ্ট বলে আমি মনে করছি। তোমাদের একটি নিরিখ থাকা চাই, যার উপরে তোমরা পূর্ণ দণ্ডায়মান থাকবে। এবং এটি সেই নিরিখ যে নিরিখ তোমাদেরকে জীবনীশক্তির অনুপ্রেরণা দিবে৷ দেখো আমি এতো পেঁচিয়ে কথা বলতে চাইনা, তোমাদেরকে সহজ ভাষায় বলতে চাই।
আর যা সহজ ভাষায় বলা যায় তাকে জোর করে পেঁচিয়ে বলে আধ্যাত্মিকতার মাহাত্ম্য বুঝাতে আমি ইচ্ছুক নই। কারণ এমনিতে’ই আধ্যাত্মিকতা ‘গোপন আর বুঝবানা’ যুক্তিতে আধ্যাত্মিকতার শরিয়াকেও অনেক ভয়ংকর করা হয়েছে যা এখন মোটামুটি অন্ধকারে রূপ নিয়েছে বললে’ই চলে। আমি চাইনা আধ্যাত্মিকতা কোনো এক স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকুক, আধ্যাত্মিকতা সীমাবদ্ধতার গণ্ডি থেকে যত উন্মুক্ত হইবে তত’ই আধ্যাত্মিকতার নামে ব্যাবসা আর ভণ্ডামির রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে৷ যাই হোক আমি বলেছিলাম তোমাদের একটি আদর্শ থাকা চাই এবং তা যেকোনো একটি আদর্শ হলে’ই হবে, কারণ যেকোনো আদর্শের মাঝে’ই অসীম সত্তার সম্বন্ধে ধারণা নেয়ার সহজ উপায় থাকবে।
এবার তোমরা যদি আমাকে প্রশ্ন করো যে, আমরা যদি একাধিক আদর্শকে রাখতে চাই? তাহলে আমি বলবো তোমরা আমার চেয়ে অগ্রিম এবং তোমরা আমার চেয়েও সচেতন,আর তোমাদের যথেষ্ট তীক্ষ্ণতা রয়েছে। আমি মূলত এজন্য’ই তোমাদের প্রশংসা করছি যে তোমরা একাধিক আদর্শ রাখার সাহস করেছো, এবং একাধিক আদর্শ রাখলে তোমরা তোমাদের ইন্দ্রিয় চাহিদার তফাত খুব সহজে অনুমান করতে পারবে, কারণ এক একটি আদর্শের এক একটি ভিন্নতা রয়েছে।
স্বার্থ হাসিলের জন্য আদর্শকে ব্যাবহার করলে আদর্শ কখনো’ই কালো হয় না, মূলত তোমরা’ই কালো হয়ে যাও। মিথ্যাকে বর্জন করা নীতিগত সিদ্ধান্ত, কিন্তু তোমরা আদর্শে থেকেও মিথ্যাকে পুষে রাখা স্বভাবে পরিণত করেছো এতে তোমাদের’ই ক্ষতি। তোমাদেরকে জড়জগৎ ত্যাগ করতে হবে এবং অসীমের গভীরতাকে ছুঁয়ে দেখতে হবে, আর তার জন্য প্রয়োজন কঠিন তাপস্য। তোমাদেরকে ক্রমাগত উচ্চ থেকে আরও উচ্চতর হতে হবে এবং যখন তোমরা ক্রমাগত উচ্চতরে প্রবেশ করবে তখন আর তোমাদের মাঝে কোনো আদর্শ’ই স্থায়িত্ব হবেনা, কারণ অসীম’কে যারা অনুসন্ধান করে তাদের সামনে কোনো আদর্শ’ই টিকে থাকতে পারেনা।
আদর্শ তোমাদেরকে প্রথমে একটা সীমাবদ্ধতায় রাখে কিন্তু অনুসন্ধানীরা উন্নতির চরম অবস্থানে যেতে যেতে তাঁরা সকল আদর্শকে’ই চূর্ণ করে দেয়৷ আমি শুরু থেকে’ই কেন তোমাদেরকে একটি আদর্শে দেখতে চাই? আমি তোমাদেরকে একটি আদর্শে এজন্য’ই দেখতে চাই যে, সকল আদর্শের মূল লক্ষ্য’ই হচ্ছে সচেতন হওয়া, আর আদর্শ হলো সচেতন হওয়ার জন্য উপায় বাতলে দেয়ার প্রথম দরজা। তুমি যে আদর্শকে’ই গ্রহণ করো কোনো সমস্য নেই, তুমি হিন্দু হয়ে মন্দিরে যাবে? যাও! তুমি মুসলিম হয়ে মসজিদে যাবে? যাও! তুমি যদি মন্দিরে গিয়ে লোভ অহম মুক্ত হতে পারো তবে তুমি তো একজন চমৎকার মানুষ! তুমি যদি মসজিদে গিয়ে লোভ-অহম মুক্ত হতে পারো তবে তুমিও তো একজন চমৎকার মানুষ।
তুমি নামাজ পড়ে অথবা পূজা করে যদি জড়জগতকে ছাড়িয়া যাইতে পারো তাহলে তুমি তো মহান! এবার তুমি যীশুকে মানবে নাকি কৃষ্ণকে মানবে এটা একান্ত তোমার ব্যাপার, তুমি ঈশ্বর বিশ্বাস করবে নাকি ঈশ্বর অবিশ্বাস করবে এটাও তোমার ব্যাপার। আমি তোমাকে বলছিনা যে তুমি অমুককে তমুককে না মানলে বা তাদেরকে অস্বীকার করলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে, নাহ এটা মোটে’ই না বরং আমি বলতে চাইছি যে, কারো জন্য তোমার ধ্বংস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ কাকে স্বীকার করবে আর কাকে অস্বীকার লোভ-অহম এসবের মানদণ্ডে থাকেনা। তুমি যাকে’ই অনুসরণ করো,মন্দিরে পূজা কিংবা মসজিদে নামাজ, ঈশ্বরে বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী যাহা কিছুই হও এসবের মূলে’ই রয়েছে চিরন্তন আত্মত্যাগ বা লোভ অহমের বিনাশ করা। এসকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু’ই হলো লোভ অহংকার নাশ করা, এদের বৃদ্ধি করা না।
তুমি যাহা কিছু করো বা যাহার অনুসারী’ই হও, এবং মোল্লা-পণ্ডিত, পাদরি-পুরোহিত, আস্তিক-নাস্তিক, ধনী-গরীব যেই হও আগে নিজের কাছে নিজেকে জবাবদিহি করাও, বিশ্বাসের উপর ভর করে থেকোনা, নিজের উপরে নিজে জবাবদিহি চালাও তবে’ই লোভ অহংকার তোমার সামনে ধরা দিবে। ঈশ্বর আছে কিবা নেই? অমুককে মানলে ঈমাণ যাবে নাকি থাকবে? মন্দির ভালো নাকি মসজিদ? পূজা ঠিক নাকি নামাজ? এসব বিশ্বাসের প্রশ্ন করা বাদ দাও, বাস্তবতাকে মেনে নাও, তুমি কোথায় গেলে লোভ অহংকার থেকে মুক্ত হতে পারবে সেদিকে যাও। এসব প্রশ্নের উত্তর তোমাকে লোভ অহংকার থেকে মুক্ত করবেনা, কোনো আদর্শ বিশ্বাস কালো নয়, তুমি যদি সকল আদর্শ বিশ্বাসকে কালো হয়ে মেনে চলো তবে সকল প্রকার আদর্শ’ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়৷
– বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






