আমরা মানুষরা কতটা অদ্ভুত!

আমরা মানুষরা কতটা অদ্ভুত!

আমরা মানুষরা কতটা অদ্ভুত! অসীমকে উপলব্ধি করার পরিবর্তে আমরা ছোট ছোট শব্দের ভেতরে তাঁকে বন্দী করার চেষ্টা করি। আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান, গড, পরমাত্মা নামগুলো শুধু ধ্বনি, মানুষের সুবিধার্থে দেওয়া একটি ইশারা মাত্র। কিন্তু আমরা সেই ইশারাকেই মূল সত্তা ভেবে বসে যাই। যেন নামেই স্রষ্টা আবদ্ধ, অথচ নাম তো কেবল একটি প্রতীক, অথচ তিনি প্রতীকেরও অতীত।

আকাশকে কি কোনো শব্দে বেঁধে রাখা যায়? সমুদ্রকে কি আমরা কোনো অক্ষরে সীমাবদ্ধ করতে পারি? তাহলে অসীম স্রষ্টাকে আমরা কেনো ক্ষুদ্র নামের ভেতর বন্দী করি? নাম কেবল একটি জানালা, কিন্তু জানালাকে যদি তুমি আকাশ ভেবে নাও তবে তুমি আকাশ কখনোই দেখতে পারবে না।

প্রত্যেক ধর্মই এই অসীম সত্তার দিকেই ইঙ্গিত করেছে। মুসলিমরা তাঁকে বলে আল্লাহ, হিন্দুরা বলে ভগবান বা ঈশ্বর, খ্রিস্টানরা বলে গড, কেউ বলে পরমাত্মা। নাম আলাদা, ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, কিন্তু যে সত্তার দিকে আঙুল তুলছে, তিনি কি আলাদা? সূর্যের আলো যেমন সব জানালায় সমানভাবে প্রবেশ করে, তেমনি অসীম স্রষ্টা সব হৃদয়ের ভেতর সমানভাবে বিরাজমান।

তাহলে বিভাজন কোথা থেকে এলো? বিভাজন এলো মানুষের অহংকার থেকে। মানুষ নিজের ধর্ম, নিজের সংস্কৃতি, নিজের নামকে একমাত্র সত্য ভাবতে শুরু করল। সে ভাবল আমার আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, আমার ভগবানই একমাত্র প্রভু, আমার গডই একমাত্র মুক্তিদাতা। অথচ সত্য তো হলো, যাকে আল্লাহ বলা হয় তিনি-ই ভগবান, যাকে ভগবান বলা হয় তিনিই গড, যাকে গড বলা হয় তিনিই পরমাত্মা। স্রষ্টা এক, ভাষা ভিন্ন।

যদি স্রষ্টা সত্যিই সার্বজনীন হন, তাহলে তাঁকে আমরা কেনো ছোট ছোট প্রাচীরে বন্দী করতে চাই? কেনো আমরা বলি তাকে আল্লাহ, ভগবান কিংবা অন্য নামে ডাকা যাবে না? স্রষ্টা কি কারো সম্পত্তি? অসীমকে ভাগ করে নেওয়া যায় না, যেমন আকাশকে কেটে ভাগ করা যায় না।

প্রিয় মানুষ, স্রষ্টাকে নাম দিয়ে ডাকো, কিন্তু সেই নামকে নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করো না। আল্লাহ বলে ডাকো, ভগবান বলে ডাকো, ঈশ্বর বলে ডাকো তুমি যদি সত্যিকারের প্রেমে তাঁকে ডাকো, তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন। মুসলিম হয়ে ভগবান বলে ডাকলে তিনি আসবেন না, এমন তো নয়। হিন্দু হয়ে আল্লাহ বলে ডাকলে তিনি সাড়া দেবেন না, এমন তো নয়। কারণ স্রষ্টার কাছে নাম নয়, হৃদয়ের প্রেমই আসল।

তাহলে আজ পৃথিবীতে এত বিরোধ কেন? এই বিরোধ স্রষ্টার জন্য নয়, এই বিরোধ মানুষের জন্য। ধর্মের নামে যারা নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, যারা অসীম স্রষ্টার নামকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে, যারা বিভাজন সৃষ্টি করে মানুষকে শাসন করে তারাই এই বিরোধের মূল কারণ।

ধার্মিক ও ধর্মব্যবসায়ীর মধ্যে পার্থক্য খুব সহজ। যে মানুষ অসীমকে সার্বজনীন বলে মানে, যে বিভাজনের দেয়াল ভেঙে ভালোবাসার স্রোত বইয়ে দেয়, সেই সত্যিকারের ধার্মিক। আর যে মানুষ আল্লাহকে কেবল ইসলামের ভেতরে, ভগবানকে কেবল হিন্দুত্বের ভেতরে, গডকে কেবল খ্রিস্টধর্মের ভেতরে বন্দী করে সে ধর্মব্যবসায়ী। তার কাছে যেয়ো না, কারণ তার কাছে তুমি সত্য পাবে না।

সত্যিকারের ধার্মিক তোমাকে কোনো প্রাচীরে আবদ্ধ করবে না। সে তোমাকে অসীমের পথ দেখাবে, যেখানে কোনো ধর্ম নেই, কোনো বিভাজন নেই, আছে শুধু প্রেম, আলো আর মুক্তি। অসীম স্রষ্টাকে পেতে হলে হৃদয়ের দ্বার খুলতে হবে। নাম ভুলে, সীমা ভুলে, অহংকার ভুলে তাঁকে ডাকতে হবে।

স্রষ্টা নামের ভেতরে নন, তিনি নামের অতীত। তিনি কোনো ধর্মের নন, তিনি সব ধর্মের। তিনি কোনো প্রাচীরের ভেতরে নন, তিনি সব প্রাচীরের ওপারে। তাঁর কাছে পৌঁছাতে হলে তোমাকে স্রেফ প্রেমিক হতে হবে, আর প্রেমিকের কোনো ধর্ম নেই, কোনো সীমা নেই, শুধু আকুল হৃদয় আছে।

– AR Junayed Hasan Shuvo

আরো পড়ুনঃ