সাধনে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছাতে দেহের ৬টি বিষয় অবগত থাকা আবশ্যক।
মানব কায়া সাধনে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছাতে হলে দেহের ছয়টি সেন্টারের বিষয় অবগত থাকা আবশ্যক। কায়া সাধনে যে ছয়টি সেন্টার বা ষটচক্র রয়েছে তা আমাদের আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ খুঁটি।
প্রথমে’ই রয়েছে মূলাধার চক্র, এর পরে-স্বাধিষ্ঠান চক্র, এর পর-মণিপুর চক্র, এর পরে-অনাহত চক্র ও বিশুদ্ধ চক্র এবং সর্বশেষ আজ্ঞা চক্র।
০১. মূলাধার চক্র:
এ মূলাধার চক্রের তত্ত্ব হলো~ ক্ষিতি অর্থাৎ, পৃথ্বী। আর চক্রের দেবতা হলো~ ব্রহ্ম, এবং অধিদেবতা হলো~গণেশ ও তীর্থ~ পুষ্করতীর্থ। এ চক্রের বর্ণ হলো চারটি। মূলাধার চক্র সাধনের দরুন সাধকের শৌর্য-বীর্য, সু-বুদ্ধি ও মনে পবিত্রতার উদয় হয়৷ মূলাধার চক্রটি সৃষ্টির সৃজন ক্ষেত্রে মূল ভুমিকা পালন করে থাকেন এবং কাম সূত্রটিও এখানে’ই৷ মূলাধার চক্র ত্রুটিমুক্ত সাধনা করতে না পারলে ব্যাক্তি অতিরিক্ত কামুক ও যৌনতার দ্বারা পরিচালিত হয়, সাধন বলে মুলাধারের তীর্থে তথা ব্রহ্মতীর্থে স্নান করতে পারলে মুক্তির প্রথম ধাপ অতিক্রম করা সম্ভব।
০২. স্বাধিষ্ঠান চক্র:
এ চক্রের তত্ত্ব হলো~ অপ অর্থাৎ, জল। আর চক্র দেবতা হলো~ বিষ্ণু, এবং অধিদেবতা হলো~ আদ্যাশক্তি ও তীর্থ~ স্বর্গতীর্থ। স্বাধিষ্ঠান চক্রের ছয়টি বর্ণ রয়েছে৷ স্বাধিষ্ঠান চক্রটি মূলত লিঙ্গমূলে অবস্থান করেন, এ স্বাধিষ্ঠান চক্রের ভিতর দিয়ে’ই আবার সুষুম্না নাড়ী, সাধক তার সাধনা বলে এ চক্রের শক্তি জাগ্রত করতে পারলে তখন সুষুন্নাতে দেবদেবীর দর্শন পায়৷ এমতবস্থায় সাধকের মাঝে থাকা সকল প্রকার বস্ত মোহ সাধককে গ্রাস করয়ার চেষ্টা করে। তখন সাধক যদি তাদের ফাঁদে পা দেয় তবে সাধকের আর সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, এ স্থানে এসে যে-সকল সাধক ফেরে পরেছেন তাঁরা সকলে’ই অস্বাভাবিক ভাবে যৌনতা করে থাকেন। এবং বিকৃত কামাচারে লিপ্ত থাকেন।
০৩. মণিপুর চক্র:
এ চক্রের তত্ত্ব হলো~তেজ অর্থাৎ, অগ্নি। আর চক্র দেবতা হলো~ রুদ্র, এবং অধিদেবতা হলো~সূর্য ও তীর্থ~ দেবতীর্থ। মণিপুর চক্রের দশটি বর্ণ রয়েছে। নাভিমূলে এ চক্রটির অবস্থান, এটি তেজতত্ত্ব চক্র। ইষ্ট দেবতা এ চক্রে’ই বাস করেন৷ দেখতে অনেকটা’ই উজ্জ্বল নীলার জ্যোতি তাই চক্রটির নাম মণিপুর। এ চক্রের সাধনা করে সাধক অব্যাপ্ত বাক্যেকে ব্যাপ্ত করতে পারেন, এবং এমতাবস্থায় দেব-দেবতাগন সাধকের সেবা করে থাকেন। এ পর্যায়ে গিয়ে সাধকের মাঝে যদি মহা সাধকের ভাব জন্ম নেয় তবে সাধক নিব্বানা থেকে বঞ্চিত হয়। উল্লেখ্য যে প্রথম সারির তিনটি চক্র সফল ভাবে সাধনা করে উত্তীর্ণ হতে পারলে মোটামুটি আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে গণ্য করা যায়৷
০৪. অনাহত চক্র:
অনাহত চক্রের তত্ব হলো~ বায়ু। চক্র দেবতা হলো~ ঈশ, এবং অধিদেবতা হলো~বিষ্ণু ও তীর্থ~ নাদতীর্থ। অনাহত চক্রের বারোটি বর্ণ রয়েছে। এ চক্রটি বুকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করেন৷ উনি অবেগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন, হৃদয় শক্তির নাম অনাহত, সাধকের মাঝে যখন প্রথম চক্রটি কার্য শুরু করেন তখন সাধক জ্যোতি দর্শন পেয়ে থাকেন৷ এমতাবস্থায় সাধক জীবাত্মা থেকে বিশুদ্ধ জীবাত্মায় প্রবেশ করেন৷ সাধকের অনাহত চক্র কার্যক্রম শুরু করলে সাধকের মাঝে দয়া ক্ষমা করুণা করার গুণ বৃদ্ধি পায়, এ ধরণের সাধক চলন পথে সকলকে’ই তার প্রতি আকৃষ্ট করে থাকেন, দেহ ভান্ডে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয় তাকে নাদ বা শিবসঙ্গীত বলা হয়৷ এ সঙ্গীত দেহে শব্দহীন হয়ে অবস্থান করেন বলে তাকে অনাহত বলা হয়, অন্যান্য ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনিকেও অনাহত বুঝানো হয়৷
০৫. বিশুদ্ধ চক্র:
এ বিশুদ্ধ চক্রের তত্ত্ব হলো~ আকাশ। চক্র দেবতা হলো~ সাদা শিব, এবং অদিদেবতা হলো~ শিব ও তীর্থ~ হরিদ্বারতীর্থ। বিশুদ্ধ চক্রটি কণ্ঠমূলে অবস্থান করেন, এবং এর ষোলটি বর্ণ রয়েছে৷ সাধক এখানে তার জীবাত্মা দর্শন করেন৷ এবং ঐ জীবাত্মার সাক্ষাৎ পাওয়া মাত্র’ই তার আত্মা বিশুদ্ধতা লাভ করেন বলে’ই একে বিশুদ্ধ চক্র বলা হয়। বাক্য প্রকাশ এখান থেকে এবং বাক্যের শক্তি নিয়ন্ত্রণও হয় এই বিশুদ্ধ চক্র থেকে। এ চক্রের কার্য শুরু হলে সাধকের ত্রিনয়ন উন্মুক্ত হয়, তখন তিনি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল বিষয়ে ইচ্ছা করলে’ই দেখতে পারেন৷ সাধারণ মানুষেরা সাধকের এ অবস্থাকে মহাসাধক বলেও উল্লেখ করেন, বিশুদ্ধ চক্রের কর্মেন্দ্রিয় হলো মুখ।
০৬. আজ্ঞা চক্র:
ভ্রূ-যুগলের মধ্যবর্তী স্থানে এ চক্রের অবস্থান৷ আজ্ঞা চক্রে স্বয়ং পরমগুরু শিব অবস্থান করেন৷ যারা সাধনায় পূর্ণ সাধক হয় এবং সাধনায় সর্বত্র সিদ্ধি লাভ করেন তাঁরা ছয়টি চক্রের তিন গাঁট তথা সত্ত্ব-ব্রহ্ম, রজঃ-বিষ্ণু, তমো- রুদ্র, অথবা- ব্রহ্মগাঁট, বিষ্ণুগাঁট, রুদ্রগাঁট, এই তিনটি গাঁটের সাধনা করে আধ্যাত্মিকতার পূর্নতা অর্জন করেন৷
এই ছয়টি গাঁট সাধনা করার মহা শক্তিকে নারী শক্তি বা মাতৃশক্তি বলা হয়, তাই এ অবস্থায় সাধককে মাতৃসাধকও বলা হয়৷ ছয় চক্রের তিন গাঁট সাধনার প্রথম গাঁট হলো-ব্রহ্মগাঁট, এই গাঁট ভেদ করতে পারলে সাধক মায়া থেকে বের হয়ে অন্তর্মুখী হতে পারেন৷ এর পরের গাঁট হলো- বিষ্ণুগাঁট। এই গাঁট ভেদ করতে পারাটা অনেক মুশকিল, কারণ সাধকের পূর্বজন্মকৃত ফল অনুযায়ী সকল ফল এ গাঁটে আসা মাত্র’ই ভোগ করানোর জন্য উপস্থিত হয়, এবং সাধক তখন তার সাধন বলে সকল ফল আদ্রতা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করে থাকেন।
এই বিষ্ণুগাঁটে’ই সাধক সাম্য বাদী হয়ে যায়, তখন সে চরম বৈরাগ্য’কে উপস্থিত পায়৷ এর পরের গাঁট হলো- রুদ্রগাঁট। সাধক এ গাঁটে থাকা অবস্থায় জীবনের চরম হতাশার মুখ দেখে থাকেন, জগতের সকল কিছু’ই তখন তার নিকট বিষময় হয়ে ওঠে। সাধনা করে রুদ্রগাঁট ভেদ করলে সাধক সকল কিছুর প্রাপ্তি সুখ উপভোগ করে থাকেন। সাধকের এই অবস্থাকে জীবাত্মা বলা যায় না, তখন তাকে পরমগুরু বলা উচিৎ, কারণ এখানে আর কোনো কিছুর তত্ব নেই, নেই কোনো সত্য মিথ্যার তর্ক, সাধকের অবস্থা তখন এসবের উর্ধ্বে চলে যায়।
লেখা: বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






