ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা অঞ্চলের সুফিবাদ।
মারেফাত, আধ্যাত্মিকতা বা সাধুমত বা পীর-ফকিরি অলি-আউলিয়ার যত মত-পথ কি শুধুই এই আরব দেশসমূহ ও পাক ভারত অঞ্চলেই রয়েছে নাকি ইউরোপ আমেরিকা আফ্রিকা অঞ্চলেও বিস্তৃত রয়েছে!?
এ ধরনের সবারই কমবেশি কনফিউশন বা প্রশ্ন আছে ,এর বাইরে অনেক ভুল ধারণা আছে যে মারেফত বা আধ্যাত্মিকতা শুধু আরব দেশ ও পাক ভারত অঞ্চলেই আছে, অন্য অঞ্চলে নেই, এজন্য এগুলো ভন্ডামী মনে করে অনেকেই।
ইউরোপ আমেরিকা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মারেফত বা আধ্যাত্মিকতা বা সাধুমত যারা চর্চা করেন তাদেরকে বলা হয় দার্শনিক বা ভাববাদী। আরব দেশগুলোতে যেমন নবী পয়গাম্বরের বিচরণ ভূমি, পাক ভারত যেমন পীর ওলি-আওলিয়া, পাগল-ফকিরদের বিচরণভূমি। তেমনি ইউরোপ আমেরিকা যারা এই আধ্যাত্মিকতা চর্চা করেন তাদেরকে বলা হয় ভাববাদী বা দার্শনিক।
ভাববাদী বা দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিলেন গ্রিক দার্শনিকরা। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক হচ্ছেন সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ডায়োজেনেসিস, রেনে ডেকার্ট প্রমুখ। দার্শনিক সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন প্লেটো, প্লেটোর ছাত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল। ঐ অঞ্চলের শিক্ষক ছাত্রের ধারা এই অঞ্চলে বা আমাদের দেশে পীর মুরিদ হিসাবেই পরিচিত।
দর্শন সম্বন্ধে চমৎকার একটি কথা প্রচলিত আছে— তা হল: “দর্শন হচ্ছে গুরুমারা বিদ্যা; প্রকৃত দার্শনিক তার ছাত্রদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করবেন। শিক্ষক যা বলেছেন যদি ছাত্র অন্ধভাবে সে কথারই পুনরাবৃত্তি মাত্র করেন, তা হলে সেটা আর যাই হোক দর্শন হবে না।”
একই ধরনের কথা এই অঞ্চলের সুফিমতের মধ্যে রয়েছে, “যা দেখি না দুই নয়নে, বিশ্বাস করিনা গুরুরো বচনে।”
সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টটল এই তিন গুরুশিষ্যই পশ্চিমা দর্শনের ভিত রচনা করেছেন বলা যায়। তারা অনেক থিওরি রেখে গেছেন, যে গুলোর উপর ঐ অঞ্চল গুলোতে মানুষ নিজেকে চিনে থাকে, নিজেকে চিনার চেষ্টা করে। বাকি আচার অনুষ্ঠান অঞ্চল বেধে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
এমনি কিছু দার্শনিকদের বানী,
- সক্রেটিস বলেছেন, “Know the self” অর্থাৎ “নিজেকে জানো।”
- প্লেটো বলেছেন, “সত্য কি”।
- অ্যারিস্টটল বলেছেন, “জীবনের উদ্দেশ্য কি?”
- রেনে ডেকার্ট বলেছেন, “আমি কি সত্যি আছি”।
- ডায়োজিনিস বলেছেন, “সহজ জীবন অর্জন করতে হবে”।
সক্রেটিসের “Know the self” থিওরির উপরে নিজেকে জানার, চেনার চেষ্টা করে থাকে ইউরোপ আমেরিকা আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষ জন।
ঠিক একই ভাবে, আরব অঞ্চলে সুফিমত রয়েছে, হযরত আলী (আঃ) বলেন, “মান আরাফা নাফসা হু, ফাকাদ আরাফা রাব্বা হু”।
এমনি ভাবে পাক ভারত অঞ্চলে সুফিমত রয়েছে, মহাত্মা লালন ফকির বলেছেন, “আপনারে আপনি চিনে নে”।
তেমনি ঐ অঞ্চলের সুফিমতের মানুষ নিজেকে চিনার চেষ্টা করতে করতে প্লেটোর মত “সত্য কি” খুঁজে চলেন। অ্যারিস্টটল এর মত “জীবনের উদ্দেশ্য কি” খুঁজে চলেন। ডায়োজিনিসের মত সহজ জীবন যাপন করার চেষ্টা করেন ঐ অঞ্চলের সুফিমতের মানুষরা। সহজ হতে হতে, রেনে ডেকার্ট এর মত নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধিতে পৌঁছেন আর ভাবেন, “আমি কি সত্যিই আছি?”
আমাদের এই অঞ্চলের সুফিমত এর সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায় , মহাত্মা লালন ফকির সেই সহজ জীবনের কথা বলে গেছেন, নিজেকে চিনার কথা বলে গেছেন। মহামতি গৌতম বুদ্ধ, জীবনের উদ্দেশ্য কি তালাশ করে গেছেন।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, আরব অঞ্চলের সুফিমত, হযরত আলী (আঃ) এর বানী “মান আরাফা নাফসা হু ফাকাদ আরাফা রাব্বা হু।” গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের, “Know the self” থিওরি এবং আমাদের মহাত্মা লালন ফকিরের, “আপনারে আপনি চিনে নে” কালাম একই সূত্রে গাঁথা। যাহা পানি, তাহাই জল, তাহাই Water.
লেখকঃ এনামুল করিম শিশির






