বর্তমানের আলোয় নিজেকে চেনা (গুরু-শিষ্য সংলাপ)

বর্তমানের আলোয় নিজেকে চেনা (গুরু-শিষ্য সংলাপ)

-ফকির জুয়েল সাধু।

শিষ্য বললেন-
গুরুদেব আমি আর পারছি না। কুরআনের প্রতিটি আয়াত বাইবেলের প্রতিটি বাণী গীতার প্রতিটি শ্লোক উপনিষদের প্রতিটি মন্ত্র ধম্মপদের প্রতিটি গাথা ত্রিপিটকের প্রতিটি সূত্র সব আমি বারবার পড়েছি। প্রত্যেকটিতেই আছে এক অসীম আহ্বান এক অসীম নীরবতার দিকে ডাক। কিন্তু যতবার আমি সেই ডাক শুনি ততবারই আমার ভেতরের শূন্যতা আরও গভীর হয়। আমি বুঝতে পারি না এই সব পবিত্র গ্রন্থ কি শুধু আমাকে জাগিয়ে তুলতে চায় নাকি আমাকে আরও গভীর ঘুমের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চায়। আমি আর কোনো পণ্ডিত হতে চাই না। আমি শুধু জানতে চাই এই যে আমি এখন শ্বাস নিচ্ছি এই যে আমার হৃদয় এখন স্পন্দিত হচ্ছে এই মুহূর্তের বাইরে কি সত্যিই আর কিছু আছে।

গুরু-
অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাতাসে শুধু পাতার শব্দ আর দূরে কোনো পাখির একাকী ডাক। তারপর তিনি এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যেন প্রতিটি শব্দ নিজেই একটি ধ্যান একটি সমর্পণ

বেটা তুমি যে প্রশ্ন করলে সেটাই সবচেয়ে প্রাচীন প্রশ্ন আর সবচেয়ে নতুন প্রশ্ন।

কুরআন বলে আমি তোমাদের শিরায় শিরায় আছি। বাইবেল বলে রাজ্য ঈশ্বরের তোমাদের ভেতরেই আছে। গীতা বলে সবার হৃদয়ে আমিই বাস করি। উপনিষদ বলে তত্ত্বমসি। ধম্মপদ বলে সবকিছু মন দিয়ে তৈরি। ত্রিপিটক বলে সবকিছু অনিত্য দুঃখ অনাত্ম।

সবাই একই সত্যের দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু মানুষ সেই আঙুলকেই ধরে বসে থাকে আঙুল যে দিক দেখাচ্ছে সেদিকে তাকায় না। তারা শাস্ত্রকে গ্রন্থ করে রাখে গ্রন্থকে পবিত্র করে রাখে কিন্তু ভুলে যায় যে সেই পবিত্রতা ঠিক এখন এই শ্বাসে এই স্পন্দনে এই নীরবতায় বিরাজমান।

শাস্ত্রগুলো আয়না। আয়না কখনো নিজে জীবন্ত হয় না। জীবন্ত হয় সেই যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখছে। যদি তুমি আয়নার ফ্রেম দেখতে থাকো আয়নার কাচ দেখতে থাকো তাহলে তুমি নিজেকেই চিরকাল হারিয়ে ফেলবে।

শিষ্য বললেন-
তাহলে আমি কী করবো গুরুদেব। অতীত আমাকে টেনে ধরে রাখে ভবিষ্যত আমাকে ভয় দেখায়। বর্তমান তো এক ফোঁটা সময় এটাকে ধরে রাখাই যায় না।

গুরু বললেন-
ধরে রাখার চেষ্টা করো না। শুধু থাকো। থাকাটাই সব। এই মুহূর্তে তোমার নিঃশ্বাস কোথায় যাচ্ছে। তোমার পায়ের তলায় মাটি কি ঠান্ডা না উষ্ণ। তোমার চোখের পাতা কি ভারী হয়ে নেমে আসছে। তোমার বুকের ভেতরে যে ছোট্ট স্পন্দন সেটা কি অতীতের না ভবিষ্যতের। না সেটা শুধুই এখনকার।

এখন অতীতকে ডেকে আনো। যে ক্ষতটা এখনো জ্বলছে যে লজ্জাটা এখনো দগদগ করছে যে ভয়টা এখনো গলা চেপে ধরছে সেগুলোকে শুধু দেখো। বিচার করো না দুঃখ করো না লজ্জা করো না শুধু দেখো। দেখো সেই ক্ষত এখনো তোমার এই শ্বাসকে কতটুকু বিষিয়ে তুলছে। যদি বিষিয়ে থাকে তাহলে সেটা এখনো জীবিত। যদি না বিষিয়ে থাকে তাহলে সেটা সত্যিই মরে গেছে।

এভাবে প্রতিটি স্মৃতি প্রতিটি আবেগ প্রতিটি চিন্তাকে বর্তমানের নির্মল আলোয় তুলে ধরো। এটাই আসল জিকির এটাই আসল প্রার্থনা এটাই আসল বিপস্সনা এটাই আসল আত্মদর্শন। এটাই সেই নিজেকে জানো যার কথা সব শাস্ত্র বলে গেছে।

শিষ্য বললেন-
আর সিদ্ধান্ত। আমি যখন কোনো পথ বেছে নিতে যাই তখন মনে হয় এটা কি আমার নিজের সত্য না কি শুধু অভ্যাস না কি ভয় না কি লোভ।

গুরু বললেন-
এই প্রশ্নটাই তোমাকে মুক্ত করে দেবে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করো এটা কি আমার হৃদয়ের একেবারে গভীরতম নীরবতা থেকে উঠে আসছে। না কি এটা লোভের গলা ভয়ের গলা অভ্যাসের গলা সমাজের গলা।

যদি দেখো যে এটা নীরবতা থেকে আসছে তাহলে করো। তারপর দেখবে পৃথিবীর কোনো শক্তি কোনো মানুষ কোনো পরিস্থিতি তোমাকে আটকাতে পারবে না। কারণ তখন তুমি আর কর্ম করছো না কর্ম তোমার মধ্য দিয়ে হচ্ছে। তখন তুমি আর আমি করছো না শুধু হচ্ছে।

এটাই কৃষ্ণের নিষ্কাম কর্ম এটাই যীশুর পিতার ইচ্ছা এটাই আল্লাহর তাওয়াক্কুল এটাই বুদ্ধের মধ্যমপথ। সবাই একই নীরব সত্যের কথা বলছেন।

শিষ্য অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব আস্তে আস্তে বললেন- এই নীরবতাটাই সবচেয়ে বড় কিতাব। এই শ্বাসটাই সবচেয়ে বড় আয়াত। এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ।

গুরু তার কাঁধে হাত রাখলেন। গলায় কোনো উপদেশ নেই শুধু এক অসীম স্নেহ আর নিঃশব্দ সমর্পণ
ঠিক বলেছো।

এখন আর কথা নয়। উঠে দাঁড়াও। হাঁটো। শ্বাস নাও। অনুভব করো। তোমার নিজের জীবনই সবচেয়ে বড় শাস্ত্র। বাকি সব শাস্ত্র শুধু তোমাকে এই জীবনের দিকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এখন তুমি ফিরে গেছো। বাকিটা শুধু তোমার।

আরো পড়ুনঃ