করি মানা কাম ছাড়েনা মদনে, প্রেম রসিকা হব কেমনে (গানের সকল ব্যাক্ষা)

করি মানা কাম ছাড়েনা মদনে, প্রেম রসিকা হব কেমনে (গানের সকল ব্যাক্ষা)

করি মানা কাম ছাড়েনা মদনে
প্রেম রসিকা হব কেমনে।।
এই দেহেতে মদন রাজা করে কাচারি
কর আদায় করে লয়ে যায় হুজুরি।
মদন তো দুষ্ট ভারি তারে দাও তহশিলদারি
করে সে মুনশিগিরি গোপনে।।
চোর দিয়ে চোর ধরাধরি একি কারখানা
আমি তাই জিজ্ঞাসিলে তুমি বলো না।
সাধু থাকে চেতন ঘরে চোর সব পালায় ডরে
নইলে চোর লয়ে যাবে কোনখানে।।
অধীন লালন বিনয় করে সিরাজ সাঁই এর পায়
স্বামী মারিলে লাথি নালিশ জানাব কোথায়।
তুমি মোর প্রাণপতি কি দিয়ে রাখবো রতি
কেমনে হব সতী চরণে।।

ফকির লালন সাঈজ্বী তার গানের মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্য ও মানুষের অন্তরের যন্ত্রণাকে সহজ ভাষায়, সরল ছন্দে বর্ণনা করেছে। তিনি প্রেম, কামনা, আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে একত্রিত করে মানুষের মনকে জাগ্রত করেছেন। তার গানের কথা কেবল সঙ্গীত নয়, বরং জীবন ও আধ্যাত্মিকতার দর্শনের অমর সংকলন, যা বাংলার লোকায়ত ও সাহিত্যিক ধারার অমূল্য ধন। তার এই গানটিও তার ব‍্যাতিক্রম নয় নিচে গানটির কিছুটা ব‍্যাক্ষা প্রদানের চেষ্টা করছি সাঈজ্বীর কৃপায়।

“করি মানা কাম ছাড়েনা মদনে / প্রেম রসিকা হব কেমনে”

লালন এখানে যৌবন শক্তি ও কামনার প্রাথমিক প্রলোভন নিয়ে বলেছেন। সংযমহীনতা কামনার চক্রকে উস্কে দেয় এবং যৌবন শক্তি দ্রুত ক্ষয় করে।

কুরআন: “যারা তাদের যৌনাঙ্গ রক্ষা করে, তারা সাফল্য অর্জন করে”
(সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫–৭)

রজঃবীর্য সংযম: “যৌবন শক্তি ধরে রাখতে এবং কামনার প্রলোভন নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “কক্সিক্স অঞ্চলে স্থিতিশীলতা এবং দেহের ভারসাম্য সম্পর্কিত স্নায়ু কেন্দ্র অবস্থিত”

ফকিরি মতে: “যৌবন শক্তি যদি সংযমে রাখা হয়, তা আত্মশক্তি ও প্রেমময় চেতনা বৃদ্ধি করে”

অবস্থান: মূলাধার চক্র (মেরুদণ্ডের গোড়া)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: কক্সিক্স অঞ্চল।

কাজ: স্থিতি, নিরাপত্তা।

“এই দেহেতে মদন রাজা করে কাচারি / কর আদায় করে লয়ে যায় হুজুরি”

যৌবন শক্তি ও সৃজনশীল শক্তি এই চক্রের কেন্দ্র। সংযমহীনতা কামনার প্রতি আসক্তি তৈরি করে।

কুরআন: “যে পুরুষরা তাদের দৃষ্টিকে নামিয়ে রাখে এবং যৌনাঙ্গ রক্ষা করে”
(সূরা আন-নূর ২৪:৩০)

রজঃবীর্য সংযম: “কামনার চক্র নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যৌবন শক্তি সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করা যায়”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ে হরমোন (টেস্টস্টেরন/এস্ট্রোজেন) উৎপাদন হয়”

ফকিরি মতে: “সংযমে যৌন শক্তি রাখলে, প্রেম ও ভক্তি মনোযোগী ও নিখুঁত হয়”

অবস্থান: স্বাধিষ্ঠান চক্র (যৌন অঙ্গ)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: অণ্ডকোষ / ডিম্বাশয়।

কাজ: যৌন শক্তি, সৃজনশীলতা।

“মদন তো দুষ্ট ভারি তারে দাও তহশিলদারি / করে সে মুনশিগিরি গোপনে”

যৌবন শক্তি কামনার সঙ্গে যুক্ত হলে রাগ, ভয় ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। সংযমহীনতা যৌবন শক্তি দ্রুত নষ্ট করে।

কুরআন: “যারা তাদের যৌনাঙ্গ রক্ষা করে, তারা অনৈতিক কামনা থেকে বিরত থাকে”
(সূরা আল-মারিয়াজ ৭০:২৯–৩১)

রজঃবীর্য সংযম: “রোজা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ যৌবন শক্তি ধরে রাখে”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি উত্তেজনা, রাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে”

ফকিরি মতে: “কামনার অতি চেতনায় আবেগ ও ভক্তি ক্ষয় হয়”

অবস্থান: মণিপুর চক্র (নাভি)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি।

কাজ: শক্তি, রাগ, ভয়। “সাধু থাকে চেতন ঘরে চোর সব পালায় ডরে / নইলে চোর লয়ে যাবে কোনখানে”
অনাহত চক্র আবেগ ও প্রেম নিয়ন্ত্রণ করে। সংযমহীন আবেগ যৌবন শক্তি ক্ষয় করে।

কুরআন: “সততা ও নৈতিক আচরণ আত্মাকে সুরক্ষিত রাখে” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৫)

রজঃবীর্য সংযম: “হৃদয় চক্র নিয়ন্ত্রণে রাখলে যৌবন শক্তি সংরক্ষিত হয়”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “লিম্বিক সিস্টেম আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে”

ফকিরি মতে: “ভালোবাসা ও সংযমের মিলিত চেতনা চিরস্থায়ী প্রেম সৃষ্টি করে”

অবস্থান: অনাহত চক্র (হৃদয়)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: কার্ডিয়াক + লিম্বিক সিস্টেম।

কাজ: ভালোবাসা, সহানুভূতি, আবেগ।

“চোর দিয়ে চোর ধরাধরি একি কারখানা / আমি তাই জিজ্ঞাসিলে তুমি বলো না”

সংযম ও সততা যৌবন শক্তি ধরে রাখে। অসৎ বা মিথ্যা আচরণ কামনার চক্রকে বাড়িয়ে দেয়।

কুরআন: “সহবাসস্থল সংযমে রাখার নির্দেশ”
(সূরা আল-মারিয়াজ ৭০:৩০)

রজঃবীর্য সংযম: “সত্যবাদিতা ও নৈতিক জীবন যৌবন শক্তি ধরে রাখে”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “থাইরয়েড হরমোন মানসিক স্থিতি ও শক্তি বজায় রাখে”

ফকিরি মতে: “সত্য ও নৈতিকতা কামনা ও প্রেমকে নির্মল রাখে”

অবস্থান: বিশুদ্ধ চক্র (গলা)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: থাইরয়েড।

কাজ: যোগাযোগ, সত্য বলা।

“বিনয়অধীন লালন করে সিরাজ সাঁই এর পায় / স্বামী মারিলে লাথি নালিশ জানাব কোথায়”

“তুমি মোর প্রাণপতি কি দিয়ে রাখবো রতি / কেমনে হব সতী চরণে”

আধ্যাত্মিক চেতনা কামনার চক্র ভেঙে দেয়। যৌবন শক্তি আত্মসমর্পণ ও সৃজনশীল কাজে রূপান্তরিত হয়।

কুরআন: “সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ”
(সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫–৭)

রজঃবীর্য সংযম: “রোজা, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক চর্চা যৌবন শক্তি সংরক্ষণ করে”

বৈজ্ঞানিকভাবে: “পিটুইটারি ও পাইনিয়াল হরমোন স্রোত মানসিক স্থিতি ও চেতনা বাড়ায়”

ফকিরি মতে: “আধ্যাত্মিক প্রেম ও ভক্তি যৌবন শক্তিকে সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করে”

অবস্থান: আজ্ঞা চক্র (কপাল) + সাহস্রার চক্র (মাথার শীর্ষ)।

বৈজ্ঞানিক অঙ্গ: পিটুইটারি + পাইনিয়াল, কর্টেক্স।

কাজ: জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি, চেতনা, ঈশ্বরবোধ।

“সাঈজ্বীর দর্শন জীবন, প্রেম ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য সংমিশ্রণ”

তিনি মানুষের অন্তরের কামনা, ভয়, আনন্দ ও দুঃখকে সরল ও জীবন্ত ভাষায় প্রকাশ করেছেন। সংযম, সততা ও আধ্যাত্মিক চর্চা যৌবন শক্তি সংরক্ষণ করে, সৃজনশীলতা, প্রেমময়তা এবং ঈশ্বরবোধের পথ সুগম করে।

“লালন ফকিরের দর্শনে মানুষের অন্তর ও দেহের শক্তি সংরক্ষণ, নৈতিক জীবন ও প্রেমময় চেতনা একসাথে চলে; যা বাংলার লোকসাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চেতনার অমর সম্পদ”

লেখক ও সংকলক: ফকির জুয়েল সাধু

আরো পড়ুনঃ