আলী আল-মুরতযা (রা:)-এর পবিত্র জীবন ও মহান খিদমত।

আলী আল-মুরতযা (রা:)-এর পবিত্র জীবন ও মহান খিদমত।

সৈয়দুনা আলী আল-মুরতযা রাদিয়াল্লাহু আনহু: পবিত্র জীবন ও মহান খিদমত:

যাঁর শক্তিতেই ইসলাম ধর্মের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,
তিনি আলী—যাঁর সন্তুষ্টিতেই হক-এর ইচ্ছা কার্যকর হয়েছে।
যদি কেউ বলে, বিপদে হাসান ঘিরে পড়েছে,
হে শেরে খোদা! তলোয়ার হাতে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাও।

এই ধূলিময় পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জন্ম গ্রহণ করে এবং তাদের নির্ধারিত জীবনকাল পূর্ণ করে মৃত্যুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই নশ্বর দুনিয়াকে বিদায় জানায়। যদি তারা এই রঙিন জগতে কোনো একটি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যায়, তবে ইতিহাসের পাতায় তারা দীর্ঘদিন বন্দি হয়ে থাকে, নতুবা অস্তিত্বের পাতা থেকে মুছে যায়। আপনি ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখবেন, একদিকে এমন লোকও আছেন যারা পার্থিব শাসনব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক কাজে জীবন ব্যয় করে দুনিয়াদারির পোশাক পরেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, আবার অন্যদিকে এমন ব্যক্তিরাও আছেন যারা নিজেদের অমূল্য জীবন দ্বীন ও সুন্নাহর প্রচার ও সুদৃঢ়করণে এবং ইসলামের দাওয়াত ও প্রসারে ব্যয় করেছেন, আখিরাতের জীবন সাজাতে সদা সচেষ্ট থেকেছেন এবং দ্বীনের পতাকাবাহী হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করেছেন।

আবার এই দুনিয়াতেই অসংখ্য মানুষ জন্ম নিয়েছে, যাদের অধিকাংশের মধ্যেই কোনো বিশেষ গুণ বা কৃতিত্ব ছিল না, আর কেউ কেউ অল্প কিছু গুণের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম এমন এক মহান ও বরকতময় সত্তা, যিনি অসংখ্য গুণ ও কৃতিত্বের সমষ্টি। তিনি একদিকে শেরে খোদা, অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জামাতা। তিনি হায়দারে কাররার, আবার জুলফিকার-এর অধিকারী। তিনি হযরত ফাতিমা যাহরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সম্মানিত স্বামী এবং হাসান-হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার স্নেহময় পিতা। তিনি দানশীলতারও অধিকারী, আবার বীরত্বেরও। তিনি ইবাদত ও সাধনার মানুষ, আবার বাকপটুতা ও প্রাঞ্জল ভাষার অধিকারী। তিনি ধৈর্যের মানুষ, আবার জ্ঞানেরও। তিনি খাইবার বিজয়ী, আবার বক্তৃতার ময়দানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মোটকথা, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বহু গুণ ও কৃতিত্বের অধিকারী এবং প্রত্যেকটিতে অনন্য ও অসাধারণ। এই কারণেই দুনিয়া তাঁকে বিস্ময় ও আশ্চর্যের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই স্মরণ করতে থাকবে।

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম হলো “আলী ইবনে আবু তালিব” এবং তাঁর উপনাম আবুল হাসান ও আবু তুরাব। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর চাচা আবু তালিবের পুত্র, অর্থাৎ নবী ﷺ–এর চাচাতো ভাই। তাঁর সম্মানিতা মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিম, যিনি প্রথম দিককার ইসলাম গ্রহণকারী ও হিজরতকারী মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত। হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমের বংশধারা এভাবে বর্ণিত: আলী ইবনে আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ। তিনি ‘হাতির বছরের’ ত্রিশ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আলী আল-মুরতযা করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমের পিতৃবংশের বংশলতিকা এভাবে বর্ণিত: আলী আল-মুরতযা করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম ইবনে আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কা‘ব ইবনে লু’ই।

হযরত আলী আল-মুরতযা করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমের মাতৃবংশের বংশলতিকা এভাবে বর্ণিত: ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কা‘ব ইবনে লু’ই।
হযরত আলী আল-মুরতযা রাদিয়াল্লাহু আনহুর উচ্চতা ছিল মাঝারি, গায়ের রং শ্যামলা, চোখ বড়, বুক প্রশস্ত এবং শরীরে লোম ছিল প্রচুর। তাঁর বাহু ও পায়ের পেশি ছিল শক্ত ও মাংসল এবং দেহ ছিল কিছুটা ভরাট। কাঁধ ছিল চওড়া ও দৃঢ়, মাথার চুল তুলনামূলক কম ছিল। তাঁর দাড়ি ছিল ঘন। যে কেউ তাঁর পূর্ণ অবয়ব দেখত, তাতে মুগ্ধ হয়ে যেত। তিনি সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন এবং নবী ﷺ–এর মতো দুই চাদরের বেশি পোশাক ব্যবহার করতেন না। তিনি সাধারণত মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন।

নবী ﷺ–এর লালন-পালনের মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা ঘটে। নবুয়তের ঘোষণার আগেই তিনি সমগ্র সৃষ্টির নেতা, রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর তত্ত্বাবধানে আসেন। কুরাইশদের দুর্ভিক্ষের সময় রাসূল ﷺ আবু তালিবের পারিবারিক বোঝা হালকা করার জন্য হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এভাবে নবী ﷺ–এর স্নেহছায়ায় তিনি লালিত-পালিত হন এবং তাঁর কোলে থেকেই সচেতনতা লাভ করেন। চোখ খুলেই তিনি নবী ﷺ–এর নূরানি চেহারা দেখেছেন, তাঁর কথাই শুনেছেন এবং তাঁর অভ্যাসই শিখেছেন। এ কারণেই অজ্ঞতার অন্ধকার ও মূর্তিপূজার অপবিত্রতা কখনো তাঁর স্পর্শ করেনি। তিনি কখনো মূর্তিপূজা করেননি বলেই তাঁর উপাধি হয় “করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম”।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমকে ডেকে বলেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে হিজরতের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আজ আমি মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হব। তুমি আমার বিছানায় আমার সবুজ চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকবে। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। কুরাইশদের যেসব আমানত আমার কাছে রাখা আছে, সেগুলো তাদের মালিকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তুমিও মদিনায় চলে আসবে। এই সময়টি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। হযরত আলী জানতেন যে, কুরাইশ কাফিররা নবী ﷺ–কে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে।

তাই আল্লাহ তাআলা নবী ﷺ–কে নিজ বিছানায় শুতে নিষেধ করেছিলেন। সেদিন নবী ﷺ–এর বিছানা ছিল মৃত্যুর ফাঁদ, কিন্তু নবী ﷺ–এর এই আশ্বাস—“তোমার কোনো ক্ষতি হবে না”—হযরত আলীর মনে পূর্ণ বিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল যে শত্রুরা তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ফলে যে বিছানা বাহ্যিকভাবে কাঁটার শয্যা ছিল, সেটিই হযরত আলীর জন্য ফুলের শয্যায় পরিণত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সূর্য পূর্বের বদলে পশ্চিম দিক থেকেও উদিত হতে পারে, কিন্তু রাসূল ﷺ–এর কথার ব্যতিক্রম কখনো হতে পারে না। তিনি বলেন, আমি সারা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমালাম। সকালে উঠে মানুষের আমানত তাদের মালিকদের হাতে তুলে দিলাম এবং কারও কাছ থেকে কিছুই গোপন করিনি। এরপর তিন দিন মক্কায় থেকে সব আমানত আদায় করে মদিনার পথে রওনা হলাম। পথে কেউ আমাকে কোনো ক্ষতি করেনি এবং শেষ পর্যন্ত কুবায় পৌঁছলাম। তখন রাসূল ﷺ হযরত কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে অবস্থান করছিলেন, আমিও সেখানেই থাকলাম।

হযরত আলী আল-মুরতযা করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম ছিলেন কাশফ ও কারামতের অধিকারী। তাঁর জীবদ্দশায় এবং ইন্তেকালের পরও বহু কারামত প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

একবার হযরত আলী আল-মুরতযা একটি জরাজীর্ণ দেয়ালের ছায়ায় বসে একটি মামলার বিচার করছিলেন। লোকেরা বলল, “হে আমীরুল মুমিনীন! দেয়ালটি ভাঙা, আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে এটি ভেঙে পড়বে।” তিনি শান্তভাবে বললেন, “বিচারকার্য চালিয়ে যাও, আল্লাহই সর্বোত্তম রক্ষাকারী।” এরপর তিনি পূর্ণ মনোযোগে বিচার শেষ করে সেখান থেকে উঠে গেলেন। তিনি সরে যেতেই সেই দেয়ালটি ভেঙে পড়ল।

হযরত আলীর খিলাফতকালে একবার ফোরাত নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফসল নষ্ট হয়ে যায়। লোকেরা তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। তিনি নবী ﷺ–এর জুব্বা, পাগড়ি ও চাদর পরিধান করে ঘোড়ায় চড়লেন। তাঁর সঙ্গে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনসহ একদল লোক ছিল। তিনি ফোরাত নদীর সেতুর কাছে পৌঁছে লাঠি দিয়ে নদীর দিকে ইশারা করলে সঙ্গে সঙ্গে পানি কমতে শুরু করে। দ্বিতীয়বার ইশারায় আরও কমে যায় এবং তৃতীয়বার ইশারা করতেই সমস্ত পানি নেমে যায় ও বন্যা শেষ হয়ে যায়। তখন লোকেরা বলল, “হে আমীরুল মুমিনীন! এতটুকুই যথেষ্ট।”

আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন ক্ষমতা দিয়েছিলেন যে, তিনি ঘোড়ায় চড়ার সময় এক রেকাবে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতেন এবং অন্য রেকাবে পা রাখার আগেই সম্পূর্ণ কুরআন শেষ করে ফেলতেন।

একবার সফরের সময় তিনি এমন এক স্থানে পৌঁছান, যেখানে পরে ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবর হবে। তিনি বললেন, ভবিষ্যতে এখানে রাসূলের পরিবারবর্গের একটি কাফেলা অবস্থান করবে, তাদের উট বাঁধা হবে এবং এই ময়দানেই আহলে বাইতের যুবকদের শাহাদাত হবে। এই স্থান শহীদদের কবরস্থান হবে এবং আসমান ও জমিন তাদের জন্য কাঁদবে।

এক ব্যক্তি হযরত আলীর বিরোধীদের গুপ্তচর ছিল এবং গোপন তথ্য পৌঁছে দিত। যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো, সে মিথ্যা কসম খেতে লাগল। তখন হযরত আলী বললেন, “যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিন।” অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে অন্ধ হয়ে যায়।

হযরত আলীর ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। নবী ﷺ বহুবার তাঁর মর্যাদা ও গুণাবলি উল্লেখ করেছেন। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন, “মুনাফিক আলীকে ভালোবাসে না এবং মুমিন আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না।” নবী ﷺ বলেছেন, “যে আলীকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে আল্লাহকে ভালোবাসে।” তিনি আরও বলেছেন, “আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী সেই শহরের দরজা।” আরেক হাদিসে এসেছে, “আমি ও আলী একই গাছের শাখা।” নবী ﷺ বলেছেন, “আলীর দিকে তাকানোও ইবাদত।” তিনি আরও বলেছেন, “তুমি আমার, আর আমি তোমার।”

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, নবী ﷺ–এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন হযরত ফাতিমা, আর পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন হযরত আলী।

সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমও হযরত আলীর অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করেছেন এবং শরয়ি ও ফিকহি বিষয়ে তাঁর শরণাপন্ন হতেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রায়ই হযরত আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন এবং বলতেন, “আলীর মুখের দিকে তাকানোও ইবাদত।” হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আলীর এমন তিনটি ফজিলত আছে, যার একটি পেলেও তা আমার কাছে দুনিয়ার চেয়েও প্রিয় হতো।” হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমাদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর মতামতের অধিকারী আলী।”

এভাবে হযরত আলী আল-মুরতযা করমাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমের অসংখ্য ফজিলত হাদিস ও সাহাবাদের বক্তব্যে পাওয়া যায়। প্রয়োজন শুধু এগুলো বোঝা ও গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে হযরত আলীকে চিনে তাঁর জীবনকে নিজের পাথেয় বানায়, তার দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই সুন্দর হয়ে যায়। কারণ নবী ﷺ বলেছেন, “যে আলীকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে, আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে আল্লাহকে ভালোবাসে।”

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া—তিনি যেন আমাদের হযরত আলীর জীবন অনুসরণ করার তাওফিক দেন এবং তাঁর মতো গুণাবলি অর্জনের শক্তি দান করেন। আমিন, সাইয়্যিদুল মুরসালিনের ওসিলায়।

লেখক: রবিউল আলম
কপিলশহর, ডুরিয়া, মুরারাই, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ৭৩১২৩৪

আরো পড়ুনঃ