গুরু-শিষ্য সংলাপ: জাহান্নাম, শয়তান এবং মৃত্যুর পরের চেতনা।
শিষ্য: গুরুদেব, আমার মনে একটা বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে বলে, মৃত্যুর পর জাহান্নাম আছে, শয়তানের কুমন্ত্রণায় পাপ করলে সেখানে চিরকালের শাস্তি। কিন্তু আমি ভাবি মরা মানুষের জন্য জাহান্নাম কোথায়? আমরা তো দেখি না কোনো প্রমাণ। মৃত্যুর সাথে সাথে চেতনা শেষ হয়ে যায়, শরীর পচে মাটিতে মিশে যায়। জীবিত অবস্থায় ভয়, লোভ, ক্রোধ এসব জান্নাত-জাহান্নামের মতো মনের সৃষ্টি। মৃত্যুর পর তো আর কিছু হারানোর থাকে না, ভয়েরও কারণ থাকে না। শয়তান কে দেখেছে? জাহান্নাম কোথায়? এসব কি মানুষের ভয় থেকে উদ্ভূত কল্পনা নয়?
গুরু: (হেসে) আর্যন, তোমার প্রশ্ন গভীর। এ ভাবনা অনেকের মনেই আসে, যখন তারা ধর্মের বাহ্যিক রূপ দেখে আর ভয়ে আচ্ছন্ন হয়। কিন্তু সত্যের সন্ধানে যাওয়া দরকার। বলো তো, তুমি কি মনে করো চেতনা শুধু শরীরের সাথে জড়িত?
শিষ্য: হ্যাঁ গুরুদেব। শরীর বেঁচে থাকলে চেতনা থাকে, মরলে সব শেষ। মৃত্যুতে যা হারায়, তাই সবচেয়ে বড় বেদনা। তারপর তো অচেতন, কোনো ভাবনা থাকে না।
গুরু: ভালো বলেছ। কিন্তু চিন্তা করে দেখো যে চেতনা তোমার মধ্যে এখন প্রশ্ন করছে, সে কি শরীরের অংশ? শরীর তো ক্রমাগত বদলায় শৈশব থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য। কোষগুলো মরে নতুন হয়। তবু তুমি একই ‘আমি’ অনুভব করো। এ ‘আমি’ আত্মা বা চেতনা শরীরের বাইরে। উপনিষদে বলা হয়, আত্মা অবিনশ্বর, নিত্য। শরীর মরে, কিন্তু আত্মা মরে না। সে শুধু দেহ ছেড়ে যায়, যেমন পুরানো কাপড় ফেলে নতুন পরা।
শিষ্য: কিন্তু গুরুদেব, জাহান্নাম-জান্নাতের কথা তো অনেক ধর্মে আছে। সেগুলো কি সত্যি নয়?
গুরু: জাহান্নাম বা নরক, জান্নাত বা স্বর্গ এগুলো প্রতীক। কিছু ধর্মে এগুলোকে বাহ্যিক স্থান বলা হয়, ভয় দেখিয়ে মানুষকে সৎপথে রাখার জন্য। কিন্তু গভীর দর্শনে যেমন অদ্বৈত বেদান্তে এগুলো মনের অবস্থা। জীবিত অবস্থায় যে ভয়, ক্রোধ, লোভে ভোগে, তার মনই তার জাহান্নাম। যে শান্তি, করুণা, জ্ঞানে থাকে, তার মনই জান্নাত। শয়তান? সে বাইরের সত্তা নয়, মনের অন্ধকার অংশ অজ্ঞতা, যা কুমন্ত্রণা দেয়।
মৃত্যুর পর? আত্মা কর্মানুসারে নতুন দেহ পায়, বা জ্ঞান লাভ করে মোক্ষে মিশে যায় ব্রহ্মে। কোনো চিরকালের আগুনের নরক নেই এটা ভয়ের সৃষ্টি। সত্যিকারের নরক হলো অজ্ঞতায় ভুগতে থাকা, পুনর্জন্মের চক্রে ঘুরতে থাকা।
শিষ্য: তাহলে ভয়ের কোনো দরকার নেই?
গুরু: ভয় নয়, বোধ দরকার। জীবিত অবস্থায় চেতনাকে জাগ্রত করো। মৃত্যুকে ভয় করো না, অজ্ঞতাকে ভয় করো। যে আত্মাকে জানে, সে জানে সবই এক ব্রহ্ম। জন্ম-মৃত্যু, স্বর্গ-নরক সব মায়া। এখানেই মুক্তি, এখানেই শান্তি। প্রার্থনা করো না জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করো জ্ঞানের জন্য, যাতে মনের অন্ধকার দূর হয়।
শিষ্য: (মাথা নত করে) গুরুদেব, আপনার কথায় মন শান্ত হলো। ভয়ের পরিবর্তে জ্ঞানের পথে চলব।
গুরু: (আশীর্বাদ করে) যাও বৎস, সত্যের সন্ধানে থেকো। ওম শান্তি।
– ফকির জুয়েল সাধু






