সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)’র জীবনপাঠ।
আলোর দিশারী: চিশতীয়ার আলোকবর্তিকা সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)’র জীবনপাঠ।
আধ্যাত্মিক আলো ও মানবতার পথে জীবনপাঠ:
প্রতিটি আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানীর জীবনে এমন কিছু মানুষ আসে, যাদের জীবন কেবল ইতিহাসের অংশ নয়; বরং হৃদয় ও মনকে আলোকিত করার দিশারী। শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.), যিনি শামপুরী হুজুর নামে খ্যাত—কারণ তিনি শামপুর দায়রা শরীফ থেকে এসেছিলেন—এরকম একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ও খেদমত মানুষের আত্মা ও সমাজের জন্য সত্যিকার আলোর উৎস। বর্তমান সময়ে তাঁর দরবার অবস্থিত পণ্ডিতসার গ্রাম, ওয়ার্ড ১, ডিংগামানিক ইউনিয়ন, নড়িয়া থানা, শরিয়তপুর জেলা। সংক্ষেপে এটি পরিচিত “চিশতীনগর” নামে, এবং পূর্ণরূপে বলা হয় “চিশতীনগর খানকায়ে চিশতিয়া”। এই পবিত্র স্থান প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও জ্ঞানপিপাসুদের আত্মার খোরক জোগাচ্ছে, একই সঙ্গে দরবারের নূর ছড়িয়ে দিচ্ছে মন ও হৃদয়ে শান্তি। শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫—সেই দিনটি জিয়ারতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জীবনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে রইল। মাজার জিয়ারত এবং পরিবেশের পবিত্রতা দর্শনার্থীর অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করছিল। তাঁর জীবনপাঠ আমাদের শিক্ষা দেয় যে আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ও মানবিক সহানুভূতি অর্জন করা যায় শুধু নামাজ, রোজা বা ইবাদতের মাধ্যমে নয়; বরং খেদমত, বিনয় এবং মানুষের সেবার মাধ্যমে। এই জীবনী পাঠককে অনুপ্রাণিত করে—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে নিয়োজিত করার, সমাজের কল্যাণে সেবা করার, এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে ধৈর্য ও অধ্যবসায় বজায় রাখার জন্য।
আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার:
সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী ছিলেন, শাহ সুফি যাকী উদ্দীন হোসাইনী (রহ.)—এর ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি। হযরত শাহ সুফি সৈয়দ যাকী উদ্দীন হোসাইনী ইসলামাবদী (রহ.) ছিলেন, ঢাকার আজিমপুর ছোট দায়রা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা শাহ সুফি রৌশন আলী (রহ.)—এর একনিষ্ঠ খলিফা। সৈয়দ যাকী উদ্দীন হোসাইনীর পূর্বপুরুষদের মধ্যে অন্যতম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মারুফ হুসাইনী বাগদাদী (রহ.), বাগদাদ শরীফ হতে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল ইউনিয়নের হাওলা গ্রামে আগমন করেন। এই ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক ধারা, দরবারের বরকত ও পবিত্র চেতনায় নিজেকে নিবেদিত করে তিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ আলোকিত করেন।
পবিত্র আগমন: জন্ম ও আধ্যাত্মিক পূর্বাভাস:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী আল—চিশতী (রহ.) ১৫ মে ১৯০৫ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের শামপুর দায়রা শরীফ গ্রামের পবিত্র মাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাহ সুফি সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া (রহ.) ছিলেন একজন ধমীর্য় আলেম এবং পীর এবং মাতৃ সৈয়েদা বিবি আসিয়া (রহ.) ছিলেন একজন পরহেজগার রমণী। জন্মের পূর্বেই বহু বুযুর্গ ও আধ্যাত্মিক পণ্ডিত স্বপ্নে এবং প্রকাশ্যে তাঁর শুভাগমন ও মহত্ত্বের প্রমাণ লাভ করেন। যেন সৃষ্টি তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল।
নূরানী আগমন ও নূরে মোহাম্মাদির জালওয়া:
যখন সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী (রহ.) পৃথিবীতে প্রবেশ করেন, তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আলোকস্রোতের মতো—মাধুর্য, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দীপ্তির মিলন। তাঁর নূরানী চেহারা, সৌন্দর্যময় অবয়ব এবং অন্তরাত্মার আলোকপ্রকাশ মানুষের হৃদয়ে ভক্তি ও আকর্ষণ জাগাত। তাসাউফের দৃষ্টিতে এটিই বলা হয় “নূরে মোহাম্মাদির জালওয়া”, যেখানে তাঁর মুখমণ্ডলে প্রতিফলিত নূর অবশিষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করত। যার চোখ পড়ত সেই নূরের দিকে, সে অবশ হয়ে থাকত এক অনন্ত আধ্যাত্মিক প্রেরণার ভেতরে।

নববী শিক্ষার আলোকিত জীবন:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী মাতৃবিয়োগের বেদনা সহ্য করে পিতার তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর শামপুর গ্রামের জনাব ইমাম উদ্দিন মুন্সীর কাছে শিক্ষাজীবন শুরু করেন, পরবর্তীতে করপাড়া মাইনর স্কুল ও লাকসামের হাজমপাড়া মাদ্রাসা—তে অধ্যয়ন করেন। প্রাথমিক ও মধ্যম শিক্ষার পর তিনি চট্টগ্রামের মোহসেনিয়া মাদ্রাসা—তে ভর্তি হয়ে উচ্চতর শিক্ষা শুরু করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকার সরকারি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা—তে ভর্তি হন—যা পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক সংলগ্ন এবং নবাব খাজা আবদুল গণির দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তখন লোকমুখে ‘ঢাকা নবাব বাড়ী মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত ছিল। ঢাকায় অধ্যয়নকালীন আবাসিক সংকটের কারণে তিনি পুরান ঢাকার মিটফোর্ড রোডে অবস্থিত ঢাকা মেডিকেল স্কুলের ছাত্রাবাসে বসবাস করতেন—যা ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল—এর পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান।
অসাধারণ মেধা ও বহুভাষিক পাণ্ডিত্য:
সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী (রহ.) ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী। তিনি বাংলা, আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজিতে পারদর্শী ছিলেন। এই বহুভাষিক জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি মিলে তাঁকে মুরীদ ও অনুসন্ধানীদের জন্য আলোর প্রদীপে পরিণত করেছিল।
আধ্যাত্মিক উচ্ছাসের দুই দীপ্তি:
সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী (রহ.) আধ্যাত্মিক উচ্ছাসে নিমজ্জিত ছিলেন দুই মহৎ দীপ্তির স্পর্শে। এক, রক্তের পবিত্রতা—নবীজীর নূরানী বংশ, হাশেমী আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য। দুই, বিশুদ্ধ আকিদার শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে জ্ঞানচর্চা—চট্টগ্রামের সরকারি মোহসিনীয়া মাদ্রাসার প্রখ্যাত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত আলেমদের কাছ থেকে। এই দুই দীপ্তি মিলিত হয়ে তাঁকে আলোকিত করেছিল। নবীজীর নূরের ধারায় মধুর্য এবং জ্ঞানের আলো তাঁকে তাসাউফের উচ্চতম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক দরবেশ—যাঁর জীবন, ভাব ও পদক্ষেপে ছড়িয়ে পড়ত পবিত্রতার, জ্ঞানের ও আধ্যাত্মিকতার অনন্ত আলো।
আল্লাহর বিশেষ বরকতে তাসাউফে নিযুক্তি ও মেধার আলোকিত পথ:
ঢাকায় উচ্চতর পড়াশোনা সমাপ্ত করার পর, সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী (রহ.)—এর পরিবার তাঁকে মিশরের বিশিষ্ট আল—আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এক সাধারণ দৃষ্টিতে এটি ছিল শিক্ষার এক মহৎ সুযোগ। কিন্তু আল্লাহ পাকের বিশেষ ইচ্ছায় ঘটল এক অমোঘ আয়নাবদল। সেই মুহূর্তে তাঁর মেধা, জ্ঞান এবং অন্তর্দৃষ্টি আলোকিত হয়—শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নয়, বরং ইলমে বেলায়েতের পথে নিবেদিত জীবন যাপনের জন্য। আল্লাহ তাঁর অন্তরে এমন আধ্যাত্মিক চেতনা প্রজ্বলিত করলেন, যা তাঁকে আত্মার উচ্চতম শিক্ষার দিকে পরিচালিত করল। মিশরে গেলে, সে পক্ষে সম্ভব হতো না সেই কঠোর রিয়াজত, ধ্যান ও সাধনা—যা একজন কামিল আল্লাহর ওলী হতে আবশ্যক। তাই আল্লাহর বরকতবশত, তাঁর মেধা শক্তি লোপ পায়, যাতে প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি মুহূর্ত তাসাউফের উচ্চতায় উজ্জ্বল হতে পারে। এই ঐশ্বরিক নিয়ম এবং অভ্যন্তরীণ দিকনির্দেশনার ফলেই সৈয়দ গোলাম মাওলা চিশতী (রহ.) হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত আলোকিত দরবেশ। তাঁর জীবন শিক্ষা দেয়—যে প্রকৃত শিক্ষার আলো শুধুই বই—পড়া বা পাঠ্য জ্ঞান নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছার প্রতিফলন, যেখানে মেধা, সাধনা, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক নক্ষত্রের দীপ্তি এক অসাধারণ মিলনে ফোটে।
সাধনার পথে এক দরবেশের অভিযাত্রা:
মানসিক দুর্বলতা ও মেধার ক্ষয় তাঁকে ভেঙ্গে ফেললেও, পূর্ববর্তী আউলিয়ার স্বপ্ন ও ইশারা তাঁকে বারবার সাধনার পথে আহবান করল। আহ্বানে প্রণোদিত হয়ে তিনি ছুটে চললেন সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরবারে, যেখানে নামাজ, রোজা ও কঠোর ইবাদত তাঁকে আত্মার আলোকপ্রকাশে নিমজ্জিত করল। অপরিচিত এক দরবেশের অলৌকিক দর্শন ও তত্ত্বাবধানে তিনি ছুটলেন আজমীর শরীফের উদ্দেশ্যে, পথিমধ্যে আখাউড়া কেল্লা শাহ মাজার ও দিল্লির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারে কঠোর রিয়াজতে নিমজ্জিত হলেন। চূড়ান্ত গন্তব্যে— হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.)—তিনি কঠোর সাধনার মাধ্যমে শরিয়ত ও তরিকতের হারানো জ্ঞান পুনঃপ্রাপ্ত করলেন। খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর রুহানি তালিমে তিনি চিশতীয়া তরিকার সমস্ত ছবক, লতায়েফ ও গূঢ় বিদ্যা অর্জন করে খেলাফতের মর্যাদা লাভ করলেন, হয়ে উঠলেন এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক কিংবদন্তি। পরবর্তীতে জন্মভূমি শামপুর দায়রা শরীফে ফিরে এসে তিনি আলাদাভাবে খানকা প্রতিষ্ঠা করে তরিকতের প্রচার—প্রসার শুরু করেন। স্বপ্ন ও নির্দেশের আলোয় তিনি হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ আলী সুরেশ্বরী হুজুরের কন্যা আরেফা খাতুনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সেখান থেকেই ইলমে বেলায়েতের সৌভাগ্য অর্জন করেন।
ভারতের আধ্যাত্মিক বাতাসে বায়াত:
বাংলাদেশের অধিকাংশ সুফিয়া একরামের জীবনীতে দেখা যায়, তারা ভারতীয় আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে জ্ঞানার্জন করে দেশে ফিরে আসতেন। কিন্তু সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)—এর ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি ভারতের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গকে তাঁর মুরিদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন পীরজাদা হযরত শাহ্জী মিয়া চিশতী (রহ.), আহমদাবাদের সুপ্রসিদ্ধ পীর পরিবারে জন্মগ্রহণকারী, যিনি খাজা ফরিদউদ্দিন মাসুদ গঞ্জে—শক্করের বংশধর। আজমীর শরীফের পবিত্র বাতাসে তিনি সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)—এর বায়াত গ্রহণ করেন এবং তাসাউফের আলোকিত পথে নিমজ্জিত হন। আজমীর শরীফে তিনি শুধুমাত্র নিজের রিয়াজতে নিমগ্ন ছিলেন না, বরং তাঁর সান্নিধ্যে চিশতীয়া তরিকার বহু অনুসারী, মুরিদ এবং সাধকরা দোয়া ও বায়াতের জন্য আগমন করতেন। তারা তাঁর থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষার আলো ও তাসাউফের দিশারী প্রাপ্ত হতেন। এভাবে সৈয়দ গোলাম মাওলা (রহ.) শুধু বাংলাদেশের মুরিদদের নয়, ভারতীয় আধ্যাত্মিক অঙ্গন থেকেও অনুসারী ও বায়াতপ্রাপ্তদের মাধ্যমে চিশতীয়া তরিকার দীপ্তি ছড়িয়ে দেন, এবং তাসাউফের আলোকিত পথকে সুদূর প্রসারিত করেন।

খানকা ও মসজিদ: পবিত্র স্থাপনা ও আধ্যাত্মিক দিশা:
নদী ভাঙ্গার ফলে তিনি সুরেশ^র দরবার শরীফ থেকে অদূরে পণ্ডিতসারে গ্রামে চিশতীনগর দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি মসজিদও। মসজিদটি ছিল, ছোট একটি টিনের নির্মাণ, যেখানে নিয়মিত জুমা ও ওয়াক্তিয়া নামাজ আদায় হতো। বহু বছর মসজিদটি পাকা নির্মাণের সুযোগ পায়নি। ২৭শে ডিসেম্বর ১৯৮১ সালে খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহ.)—এর ওরস মোবারক উপলক্ষে অনুষ্ঠিত একটি মাহফিলে তিনি গভীর আধ্যাত্মিক ভাষণে বলেছিলেন, “আমার দিল পেরেশান, এজন্য যে, এই খানকায়ে চিশতীয়ার মসজিদটি খুবই দুর্বল ও কাঁচা। এ মসজিদকে আল্লাহ আমাকে যে দিন পাকা দেখাবে, সেই দিন আমার দিল খুশি হবে।” এই বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে যে, মসজিদ শুধু ইট—পাথরের নির্মাণ নয়; এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার কেন্দ্র, যেখানে সাধক ও মুরীদরা নামাজ, রোজা ও রিয়াজতের মাধ্যমে আল্লাহর নূরের ছোঁয়া পায়। মসজিদকে দৃঢ় ও পাকা করা মানে হলো আধ্যাত্মিক চেতনার ঘরকে স্থায়ী করা, যাতে তাসাউফের আলো মুরীদদের অন্তর জ্যোতির্ময় করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তিনি নির্মাণে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আহ্বান জানান। পর্যায়ক্রমে, ১৯৮৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর, মসজিদটি নামাজ আদায়ের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছিল “মসজিদে চিশতীয়া”, কিন্তু পাকা নির্মাণের পর এটি নতুন নামে পরিচিত হয়— “খানকায়ে চিশতীয়া জামে মসজিদ।” ১৩৯২ সালের দশে পৌষ শুক্রবার মসজিদের নাম পলক উদ্বোধন করা হয়, যেখানে দুই ঘণ্টা ব্যাপী মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। ইতিহাস প্রমাণ করে—যে স্থানে আউলিয়া কেরামগণ অবস্থান করেন, সেখানে তারা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পূণ্য ও পবিত্র নির্মাণে নিয়োজিত থাকেন। খানকায়ে চিশতীয়া জামে মসজিদ কেবল স্থাপনা নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক দিশার প্রতীক, যেখানে সাধক ও মুরীদরা আল্লাহর নূরের সন্ধানে একত্রিত হন। এটি তাসাউফচর্চার কেন্দ্র এবং মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে।
শামপুরীর আধ্যাত্মিক কেন্দ্র:
তার নির্দেশ ও প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য খানকা, মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভক্তবৃন্দ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়মিত ইবাদত, জিকির ও দোয়া করে যাচ্ছেন। প্রতিটি স্থাপনা যেন আধ্যাত্মিক নূরের দীপ্তিতে আলোকিত, তার আদর্শ ও তরিকার জীবন্ত নিদর্শন হয়ে উঠেছে। এখানে আসা মানুষ কেবল জ্ঞান অর্জন করে না, বরং আত্মার প্রশান্তি, হৃদয়ের নূর ও মনের স্থিরতা লাভ করে। শামপুরীর বাতাসে প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আল্লাহর রহমত বিরাজ করছে, যা ভক্তবৃন্দ ও অনুসারীদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। শরীফিয়া লাইব্রেরী দরবারের নূর ছড়ানোর পাশাপাশি প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও জ্ঞানপিপাসুদের আত্মার খোরক জুগিয়ে চলেছে।
খানকায়ে চিশতীয়ার আধ্যাত্মিক স্থাপত্য ও অন্তরশান্তি:
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.) পৃথিবীতে অবস্থানকালে কোনো অট্টালিকা বা দালান নির্মাণের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিলনা; তাঁর একমাত্র আগ্রহ ও ইচ্ছা ছিল, মসজিদ পাকাকরণ। তিনি চাইতেন মানুষের অন্তরে আল্লাহর সান্নিধ্য ও তাসাউফের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ুক, বড় বড় দালান বা বিলাসিতা নয়। কিন্তু তাঁর পৃথিবী ত্যাগের পর, দরবারে অসাধারণ স্থাপত্য শিল্পের ছোঁয়া ধরা পড়ে। এ সবকিছুর মধ্যে রয়েছে এক অপরূপ বাগান, যেখানে রঙ—বেরঙের ফুল, ফল এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন মানুষকে আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে। এ স্থানে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়—প্রথম, মানুষের আত্মিক প্রশান্তি ও ইবাদতের জন্য এখানে আসা; দ্বিতীয়, মানসিক ও মনিকল্যাণের জন্য যারা আসে, তারা এই পবিত্র স্থান থেকে শান্তি, সান্ত্বনা ও জীবনের জ্ঞানের সঞ্চার গ্রহণ করে। এই বাগান ও স্থাপত্যের সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, বরং মানুষের অন্তরকে আলোকিত করার জন্য নির্মিত হয়েছে—একভাবে এটি মানুষকে আল্লাহর প্রতি স্মরণ করায় এবং তাসাউফচর্চার অনন্ত অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। সুতরাং, খানকায়ে চিশতীয়ার এই স্থাপনা ও বাগান একান্তই আধ্যাত্মিক নির্দেশ, যেখানে দর্শন, প্রশান্তি ও প্রার্থনার মিলন ঘটেছে—এটি এক জীবন্ত দরবার, যেখানে মানুষ শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রশান্তি লাভ করে।
দরবারের নীরব সৌন্দর্য ও পবিত্র পরিবেশ:
দরবারের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে—চারদিকে আধ্যাত্মিকতার নীরব নূর ঝরে পড়ছে। এই দরবারের হৃদয়স্থলে রয়েছে পবিত্র হুজরা শরীফ, যেখানে তিনি দীর্ঘ সময় নির্জনে ইবাদত করতেন, জিকিরে মগ্ন থাকতেন এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতেন। যারা ভক্তিভরে হুজরার সামনে দাঁড়ায়, তাদের বুকেও এক অদ্ভুত কাঁপুনি জাগে—এ যেন অলৌকিক প্রশান্তির পরশ, আউলিয়ার নিঃশ্বাসের সুবাস। হুজরার পাশেই রয়েছে, মেহমান ও ভক্তদের সুবিধার জন্য তৈরি মেহমানখানা, যার পরিবেশ শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও আদবপূর্ণ। মহিলাদের জন্য নির্মিত হয়েছে স্বতন্ত্র নামাজখানা, যাতে পর্দা রক্ষা ও ইবাদতের মনোযোগ অটুট থাকে। এছাড়া বিস্তীর্ণ একটি মাঠ রয়েছে, যেখানে জামায়াতের সময় মানুষের কণ্ঠ মিলেমিশে সৃষ্টি করে তিলাওয়াত ও তাকবিরের আধ্যাত্মিক সমুদ্র। মনে হয়—এ যেন দুনিয়ার বুকে চিশতীয়ার ছোট্ট একটি রূহানি ময়দান। ভক্তদের বিশ্রাম ও আতিথেয়তার জন্য নির্মিত খাজা মঞ্জিল, আর বিশেষ অতিথিদের জন্য রয়েছে শাহ যাকী মঞ্জিল নামে সুদৃশ্য মেহমানখানা। মহিলাদের জন্যও আলাদা মেহমানখানা এবং সুশোভিত আন্দরবাড়ী রয়েছে, যা দরবারের আদব, পর্দা এবং দরবেশি আচারকে আরও দৃঢ় করেছে। দরবারের একটি উল্লেখযোগ্য সৌধ হলো শতবর্ষের অধিক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভবনটি—যেখানে আজও টিকে আছে চিশতীনগর প্রিন্টিং প্রেস এবং চিশতীনগর কম্পিউটার্স। এই পুরোনো স্থাপনার দেয়ালে যেন ইতিহাস কথা বলে— “যুগ বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু চিশতী তরিকার খেদমত কখনো বদলায় না।
সহধর্মিণীর ইন্তেকাল ও দরবারে সংরক্ষণ:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)—এর জীবনের আরেকটি গভীর অধ্যায় তাঁর সহধর্মিণী, জান শরীফ মাওলানার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি পৃথিবী থেকে চলে যান ১৯৮৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ঢাকাস্থ অবস্থানকালে, যেখানে তাঁর বড় ছেলে নিজস্ব ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পৃথিবীর অস্থায়ী ভুবন ত্যাগের পর, তাঁকে দরবার শরীফে আনা হয়। সদরঘাট থেকে লঞ্চযাত্রার মাধ্যমে পবিত্র স্থানে পৌঁছানো হয় এবং দরবারের পবিত্র জমিতে সংগ্রহীত করা হয়। এই নিঃশব্দ প্রস্থান ও সংরক্ষণ, জীবনের চিরন্তন ধারায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা বহন করে—যেখানে পুণ্য, স্মৃতি ও তাসাউফের আলো একসাথে বিরাজ করে।
শরীয়ত—তরিকতের মিলনে এক নূরের মানুষ:
তিনি শুধু একজন সাধক ছিলেন না—তিনি ছিলেন মহৎ মনের আলেম, আল্লাহওয়ালাদের সারিতে এক আলোকিত দিশারী। তাঁর প্রাণে ছিল শরীয়তের জ্ঞান, আর হৃদয়ে জাগ্রত ছিল তরিকতের নূর। এই দু’টি পথ তাঁর সত্তায় এমনভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল যে, তাঁকে দেখলেই বোঝা যেত—ইলম ও ইরফানের সংযোগ কোথায় এসে একাকার হয়। কথা বলতেন ধীর স্থির, দরবেশি স্বরে; কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল গভীর, আর ব্যাখ্যা ছিল জ্ঞানসমৃদ্ধ। তিনি ছিলেন, একজন উচ্চমানের সাহিত্যিক—বাংলা, উর্দু ও ফার্সির মিষ্টি সংমিশ্রণে এমন সব সালাম ও কালাম রচনা করেছেন, যেগুলো আজও মুরিদদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর লেখা শুধু শব্দ নয়, যেন জিকিরের মতো মনে প্রবেশ করে। তাঁর রচনার ভাণ্ডারও ছিল সমৃদ্ধ। যেসব গ্রন্থে তিনি সুফি—ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা, পীর—মাশায়েখদের জীবনী ও মুরশিদের আদব তুলে ধরেছেন—তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ১. ওহাবী ইতিহাস, ২. শাহানশাহে চিশত ও দরবারে গরীব নওয়ায, ৩. হযরত খাজা বাবার জীবনী ও তাঁহার পীরানে—পীরগণের পরিচিতি, ৪. হযরত কুতবে আলম শাহ্ ছৈয়্যদ যকীউদ্দীন যেন্দাপীরের জীবন কথা, ৫. কুতবে এরশাদ হযরত সুরেশ্বরী কেবলা কা’বার জীবনী, ৬. অজিফায়ে চিশতীয়া ও আদাবে মুরশিদ প্রতিটি গ্রন্থেই তাঁর ভাষা ছিল স্নিগ্ধ, মন ছিল দরবেশি, আর শিক্ষা ছিল পথিকদের জন্য দীপ্ত মানচিত্রের মতো। তিনি পাঠককে শুধু জ্ঞান দেননি—হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটানোর মতো আলোকরশ্মি উপহার দিয়েছেন।

তাঁর চরিত্র—দরবেশি গুণের এক পবিত্র সমাহার:
তাঁর চরিত্র ছিল এমন নূরানী যে, তাঁকে দেখলে মনে হতো—এ যেন অলৌকিক সরলতার চলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন তাকওয়াবান, আল্লাহভীরু এক মানুষ; তাঁর দীনদারিতা ছিল নিখুঁত, আর পরহেজগারিতা ছিল জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকা এক রূপ। স্বভাবতই স্বল্পভাষী—কিন্তু তাঁর অল্প কথার মধ্যেই ছিল গভীর প্রভাব। দরবেশরা যাকে বলে “তাসীর”, আর আরেফগণ যাকে বলে “লুত্ফুল লিসান”—তাঁর জবান ছিল ঠিক তেমনই। তিনি কিছু বললে তা মানুষের অন্তরে ঢুকে যেত। তাঁর একটি নির্দেশ, একটি পরামর্শ, একটি ছোট্ট বাক্যও মুরিদদের অন্তরে এমনভাবে বসে যেত যে তারা দ্বিধা ছাড়াই তা পালন করত। যেন তাঁর কথার সঙ্গে সঙ্গে রহমতের বাতাসও মানুষের হৃদয়ে বয়ে যেত। খাদ্যে ছিলেন অল্প আহারী, চলাফেরায় নিরহংকার, আর আচরণে সুমিষ্ট। তাঁর মিষ্টভাষা ছিল এমন যে, রাগী মানুষও তাঁর সামনে এসে নরম হয়ে যেত। বিনয় তাঁর পোশাকের মতো ছিল—যেখানেই যেতেন, মানুষ তাঁর আচরণ দেখে বিস্ময়ে বলত: “এ লোকটি তো আল্লাহর ওলীদের দলভুক্ত।” তিনি কারো উপকার করলে প্রকাশ করতেন না, কারো ভুল দেখলে কঠোরতা দেখাতেন না—বরং নরম ভাষায়, দরবেশি ইশারায় বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর উপস্থিতিতে মানুষ পেত শান্তি, আর তাঁর নীরবতা পর্যন্ত ছিল এক ধরনের শিক্ষা।
খলিফা ও বিশিষ্ট মুরিদগণ:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)’র আওলাদ ব্যতিত একমাত্র খেরকা প্রাপ্ত খলিফা ছিলেন মাওলানা জালালুল চিশতী জিন্দা ওলি। তার বিশিষ্ট মুরিদগণের মধ্যে আছেন হযরত মনু পাটোয়ারী, অধ্যক্ষ মোঃ শামসুল হক, মাওলানা আবুল খায়ের মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চিশতী এবং এ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী চিশতী। এই মহৎ খলিফা ও মুরিদগণ শামপুরীর দরবেশি পরম্পরার ধারক এবং চিশতীয়া তরিকার নূরের প্রেরণাদায়ক। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলতে চলতে তরিকার আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও জীবন্ত বাণী মুরীদদের মাঝে বিস্তার করছেন, এবং শামপুরীর আধ্যাত্মিক জগতকে চিরন্তন দীপ্তিতে আলোকিত করে চলেছেন।
কারামাতুল আউলিয়া হাক্কুন: শামপুরীর রুহানী নিদর্শন:
সত্যিকারের আধ্যাত্মিক পথিক ও মুরীদদের জন্য এটি এক দৃষ্টান্ত। ১৯৯০ সালের ২ ডিসেম্বর, অধ্যাপক জি. নেওয়াজ খান—ঢাকার নটরডেম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক—হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৬ দিন কঠোর প্রার্থনা ও আল্লাহর রহমতের মধ্যে, প্রিয় মুর্শিদ সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)’র বিশেষ দয়ায়, তিনি পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। ঘটনাটির বিশদ এখানে বর্ণনা করা হলো না; কারণ সত্যিকার ইলমে তাসাউফের অনুসারীরাই এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম। যারা গভীর মারফতের জ্ঞান রাখে না, তারা বিভ্রান্ত হবেন বা বিভ্রান্তি ছড়াবেন। গ্রন্থকার একজন শিক্ষাবিদ হওয়ায়, এ কারামতের সত্যতা অক্ষুণ্ণ এবং এটি প্রমাণ করে যে আধ্যাত্মিক দিশারী ও মুর্শিদের দয়া জীবনের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ইন্তেকাল ও আধ্যাত্মিক প্রস্থান:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.) জীবনপথের শেষ অধ্যায়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ভক্তবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করেছিলেন, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নিদর্শন হিসেবে বলেছিলেন: “আগামী ৭ই ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, আমি পণ্ডিতসারে যাব।” এই বাণী ছিল, এক আধ্যাত্মিক পূর্বাভাস—যা আউলিয়া কেরামগণ পৃথিবী ত্যাগের আগে স্বচ্ছভাবে জানতেন, আল্লাহর বিশেষ ইশারায়। নির্ধারিত দিনে, ১৯৮৬ সালের, ৬ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, তিনি ঢাকার প্রান্তর ত্যাগ করে সদরঘাটের মাধ্যমে লঞ্চে উঠলেন এবং পুণ্যভূমি সুরেশ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। সেখানে প্রথমে তিনি তাঁর শ্বশুর, হযরত জান শরীফ মাওলানার মাজার শরীফ জিয়ারত করেন। ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে তিনি নিবেদন করলেন এক আধ্যাত্মিক অনুরোধ: “আগামীকাল যাতে আপনাকে পণ্ডিতসার পায়।” এই বাণীর মধ্য দিয়ে তিনি পরের দিনের পৃথিবী ত্যাগের পূর্বাভাস দিলেন। পরদিন ৭ই ফেব্রুয়ারি, পুণ্যভূমি পণ্ডিতসারে তিনি আখিরাতের পথে পা বাড়ালেন। তাঁর প্রস্থান শান্তিময়, আলোয় ভরা এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে অনন্য ছিল। ভক্তবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যরা তাঁর উপস্থিতি অনুভব করে, তাদের হৃদয়ে শোকের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোর সঞ্চার অনুভব করেন। সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)’র পৃথিবী ত্যাগ, আধ্যাত্মিক দিশার এবং তাসাউফের পথিক হিসেবে জীবনে চিরন্তন প্রেরণা হয়ে রইল। তাঁর পদক্ষেপ ও জীবনপথ থেকে আজও মুরীদরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করে, ওলিয়ার বাণীর ছায়ায় চলতে থাকে।
পীরজাদা প্রকৌশলী সৈয়দ গোলাম মুরসালিন: নীরব দরবেশের খেদমত:
চিশতীনগরের দরবারের বর্তমান খেদমতদারদের মধ্যে উজ্জ্বলতম নাম হলো পীরজাদা প্রকৌশলী সৈয়দ গোলাম মুরসালিন। আজও তিনি জীবিত, শান্ত ও ধীর, হাতে সেবার আলো নিয়ে দরবারের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে মনে হয়, তিনি যেন পূর্বপুরুষ আউলিয়াদের নীরব খেদমতের ধারায় চলছেন, চোখে শান্তি, হৃদয়ে আলোর স্পর্শ। তিনি শুধু দরবারের স্থাপনা বা রক্ষণাবেক্ষণে সীমাবদ্ধ নন; বরং সমাজ, মানবতা ও ধর্মীয় উন্নয়নের বহু ধারাতেই তাঁর অবদান প্রবাহমান। যেমন নদীর পানি নীরবে জমিতে প্রাণ ফিরিয়ে দেয়, তেমনি তিনি মানুষের জীবনে ফিরিয়ে দিচ্ছেন দয়া, সেবা ও আলোর স্পর্শ। তন্মধ্যে— ১. মানুষের সেবায় অকৃত্রিম খেদমত: তিনি গরিব ও দুঃখীদের পাশে দাঁড়ান, বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণ করেন। রোগীদের জন্য তিনি চক্ষু শিবির ও চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করেন। অসুস্থ ও দরিদ্রদের বিনামূল্যে ওষুধ ও সহযোগিতা প্রদান করে চলেছেন। দরবারের প্রতিটি কার্যক্রমে মানবতার স্পর্শ স্পষ্ট। ২. জ্ঞান ও শিক্ষার আলোকপ্রদীপ: দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি বৃত্তি ও শিক্ষা সহায়তা প্রদান করেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তাসাউফ ও ইসলাহের আলো ছড়িয়ে দেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধক ইনজেকশন প্রদানেও তাঁর খেদমত চলে। ৩. যুবসমাজ ও গ্রামীণ উন্নয়নে উদ্যোগ: চিশতীনগর জনকল্যাণ প্রকল্পের মাধ্যমে, বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায়, স্থানীয় বেকার যুবক—যুবতীদের জন্য তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন করেন। এর মধ্যে রয়েছে মৎস্যচাষ, হাঁস—মুরগি পালন, গবাদি পশুপালন এবং প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক সহায়তা। ৪. সেচ প্রকল্প: দরবারের বরকত ছড়িয়ে গ্রামীণ জীবনে: পীরজাদা মুরসালিনের উদ্যোগে গ্রামীণ কৃষকদের জন্য চালু হয়েছে সেচ প্রকল্প। ফসলি জমিতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, বোরো ও আমন মৌসুমে কৃষকদের সহায়তা এবং গ্রামের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য এটি কার্যকর হচ্ছে। প্রকল্পটি যেন আউলিয়ার দরবারের খেদমতেরই আরেক রূপ—জল দিয়ে জমি বাঁচে, খেদমত দিয়ে মন।
রূহানি দৃষ্টি: পীরজাদার অভিজ্ঞতা
পীরজাদার সঙ্গে আলাপের এক মুহূর্তে আমি জানতে চেয়েছিলাম, “আপনার আব্বা আপনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কেমন অনুভূতি হত?” তিনি ধীরস্বরে বললেন, “যখন তিনি তাকাতেন, মনে হতো তিনি শুধু চোখে দেখছেন না, বরং অন্তর ও বাহ্য, ভেতর—ভিতরের সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে অনুভব করছেন। তার রূহানি দৃষ্টি ছিল অতীব প্রখর, যা একজন সাধারণ মানুষের কাছে অচিন্ত্য, একধরনের আধ্যাত্মিক আলোর ছায়া।” এই ছোট ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.)—এর আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা ও দৃষ্টি শক্তির গভীরতা, যা মুরিদ ও ভক্তদের হৃদয়ে অবিচল প্রভাব ফেলত।
উপসংহার:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.) শুধুমাত্র এক দরবেশ বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না; তিনি ছিলেন আলোর পথ প্রদর্শক, মানবতার সেবক এবং শিক্ষার এক উঁচু মানের আলেম। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে ধর্ম ও তরিকত কেবল ইবাদতের সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের কল্যাণ, শিক্ষার প্রসার, দয়া ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। তাঁর পদচারণা, খেদমত ও সেবা আজও দরবার, গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনে আলো জ্বালায়। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করায়—আধ্যাত্মিক উচ্চতা ও সামাজিক খেদমত একসাথে মিললে, তবেই জীবন পূর্ণ হয় এবং সমাজে স্থায়ী শান্তির প্রভাব পড়ে।
সহায়ক গ্রন্থ ও প্রকাশনা:
সৈয়দ গোলাম মাওলা হোসাইনী (রহ.) সম্পর্কিত জীবনী ও গবেষণায় যে উৎসগুলি বিশেষ সহায়ক, তা হল—
- ১. হযরত কুতবুল আলম শামপুরী রাঃ — গ্রন্থকার অধ্যাপক জি. নেওয়াজ খান।
- ২. নিউজ লেটার (অর্থনীতি বিষয়ক পাক্ষিক) — প্রকাশিত ২০২০। সম্পাদক ও প্রকাশক: এম. সহিদুল ইসলাম।
- ৩. ত্রৈমাসিক প্রদীপন — সপ্তম সংখ্যা ২০২৪। সম্পাদক ও প্রকাশক: সৈয়দ গোলাম মুরসালিন।
- ৪. স্বাক্ষাৎকার — পীরজাদা সৈয়দ গোলাম মুরসালিন।
কলামিস্ট ও সাংবাদিক: কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী






