১২, ২৪ ও ৩৬ বছর পীরের কদমে খেদমতে থাকার নিগূঢ় রহস্য

১২, ২৪ ও ৩৬ বছর পীরের কদমে খেদমতে থাকার নিগূঢ় রহস্য

খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনে কামেল পীরের কদমে দীর্ঘ সময় (১২ বছর বা ২৪ বছর অথবা ৩৬ বছর) ব্যাপী খেদমতে থাকার নিগূঢ় রহস্য কি?

যে জ্ঞান পাত্রান্তরিত করিতে দুই এক মিনিটের বেশী সময় লাগে না, সেই জ্ঞান অর্জন করিতে দীর্ঘ সময় ব্যাপী অর্থাৎ ১২ বছর, ২৪ বছর বা ৩৬ বছর পীরের কদমে আহার-নিদ্রা ত্যাগ পূর্বক এত কঠিন খেদমত কেন করিতে হয়? এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগে।

আসলে এলমুল কালব পাত্রান্তরিত করিতে সময় তেমন প্রয়োজন হয় না বটে কিন্তু যে পাত্রে ইহা প্রদান করা হয়, সেই পাত্র তৈরী করিতে সময় লাগে প্রচুর। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। কেহ একটি সুদৃশ্য অট্টালিকা তৈরী করিল। বেশ কয়েকটি কোঠা বা রুম আছে সেই অট্টালিকাতে। কিন্তু রুমগুলি অন্ধকার; কারণ রুমে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা নাই। এই অট্রালিকাতে যদি আলোর ব্যবস্থা করিতে হয়, তাহা হইলে রুমগুলোকে প্রথমে বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি যথারীতি স্থাপন করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী প্রয়োজন যিনি স্ব-স্ব স্থানে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি সেট (Set) করিবেন। অতঃপর রুমগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ করিলে বৈদ্যুতিক আলোতে কোঠাগুলি দীপ্তিময় হইবে।

অট্টালিকার কক্ষ সমূহকে ওয়েরিং করিতে বা বৈদ্যুতিক তার, হোলডার, বাল্ব, সুইজ, বা সুইজবোর্ড ইত্যাদি সেট বা স্থাপন করিতে নিশ্চয় বেশ সময়ের প্রয়োজন। ঠিক তেমনি মানবদেহরূপ অট্টালিকাতে ৩৩ কোটি কোঠা আছে। প্রত্যেকটি কোঠাতে নাফসে আম্মারার শিকড় প্রোথিত আছে। পীরে কামেল ধীরে ধীরে মুরীদের দেহস্থিত তেত্রিশ (৩৩) কোটি কোঠা হইতে মূলসহ নাফসকে উপড়াইয়া ফেলেন, কোঠাসমূহকে পরিস্কার করেন। অতঃপর সবগুলি কোঠাতেই আল্লাহ নামের বাল্ব সেট করিয়া তাহাতে খোদাতায়ালার নূরের সংযোগ দেন। ফলে মুরীদের সমস্ত সত্ত্বাই আলোক উজ্জল হয়। মুরীদ কোটি কোটি বাল্ব প্রজ্জলিত নূরের দেহ প্রাপ্ত হয়।

তবে কোটি কোটি কোঠা থেকে নাফসের মূল উপড়াইয়া ফেলিতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। কাহারো জন্য ১২ বছর, কাহারো জন্য ২৪ বছর বা কাহারো জন্য ৩৬ বছর। এই কারণেই আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলিতেন, হাতে-কলমে শিক্ষা দিলেও এই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিতে দীর্ঘ ২৪ বছর সময় লাগে।

মুরীদের দেহস্থিত কোঠাসমূহকে নাফসের বন্ধনমুক্ত না করিয়া, দেহস্থিত উপাদান সমূহের দোষ-ত্রুটি পরিস্কার না করিয়া যদি নূরের সংযোগ দেওয়া হয় বা তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করা হয়, তবে হয় সে মুরীদ মারা যাইবে, না হয় পাগল হইবে, নতুবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হইবে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়।

একদা হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের দিল্লিস্থ দরবার শরীফে কয়েকজন মেহমান আসেন। কিন্তু সেইদিন দরবারে মেহমানদারি করিবার মত তেমন কোন খাবার ছিল না। হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ)ছাহেব অতিথিবৎসল ছিলেন। মেহমান আসিয়াছে, অথচ উপযুক্ত খাদ্য নাই বিধায় তিনি দুশ্চিন্তায় পড়িলেন।

হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের একজন মুরীদ ছিলেন-যিনি দরবারের নিকটস্থ বাজারে রুটির দোকান করিতেন। সেই মুরীদ সেই সময় কাশফে পীর ছাহেবের চিন্তাক্লিষ্ট চেহারা মুবারক এবং চিন্তিত হওয়ার কারণ জানিতে পারিয়া দ্রুত কিছু রুটি এবং মাংস লইয়া দরবারে আসিয়া মেহমানদের তৃপ্তির সাথে খাওয়ান। আগত অতিথিবর্গ অতীব খুশী হন।

হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব সেই রুটি বিক্রেতা মুরীদের প্রতি অত্যন্ত প্রীত হইলেন। মুরীদকে ডাকিয়া বলিলেন, বাবা, তুমি সময়মত মেহমানদারি করিয়া আমাকে দুশ্চিন্তামুক্ত করিয়াছ। আমি তোমার উপর অতিশয় খুশী। বল, তুমি কি চাও? উত্তরে মুরীদ বলিল, হুজুর, আমি কিছু চাই না। হযরত খাজা বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব পুনরায় বলিলেন, বাবা, আমার নিকট তুমি কিছু চাও। মুরীদ এবারও নেতিবাচক জবাব দিল। পীর ছাহেব তৃতীয়বারের মত মুরীদকে কিছু চাইতে বলায় মুরীদ বলিল, হুজুর, আমাকে যদি কিছু দেনই, তবে হুবহু আপনার মত করিয়া দেন। আমি আপনার মত হইতে চাই। পীর ছাহেব বলিলেন, বাবা, ইহা ব্যতীত অন্য কিছু চাও। কিন্তু মুরীদ পুনরায় একই কথা উচ্চারণ করিল। সে বলিল, আমাকে যদি কিছু দিতে চান, তবে আপনার মত করিয়া দেন।

এইবার হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব সেই মুরীদকে লইয়া খাছ কামরায় গেলেন। দীর্ঘ দুই ঘন্টা মুরীদসহ তিনি সেই কামরাতে থাকিলেন। এই দিকে দরবারের প্রধান প্রধান খাদেমেরা হোজরার দরজায় অপেক্ষমান। দুই ঘন্টা পরে পীর ছাহেব এবং মুরীদ খাছ কামরা হইতে বাহির হইলেন। বাহির হওয়ার দুইটি দরজা। দুই দরজা দিয়া দুইজন বাহির হইলেন। দুই জনই হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব। চেহারা সুরত, আকার-আকৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ সবই এক। কে আসল বাকীবিল্লাহ (রঃ), আর কে নকল বাকীবিল্লাহ-তাহা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝা গেল না। বুঝা গেল তিন দিন পরে। তিন দিন অন্তে নকল বাকীবিল্লাহ (রঃ) ইন্তেকাল করিলেন। আসল বাকী বিল্লাহ (রঃ) থাকিয়া গেলেন।

কাজেই পীরের কদমে দীর্ঘ সময় ব্যাপী খেদমতশূন্য মুরীদকে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিলে; হয় সে মারা যাইবে, নতুবা পাগল হইবে বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হইবে।

আর তাই এই মিসকীনকে যুগের শ্রেষ্ঠতম কামেল হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেবের কদমে দীর্ঘ চল্লিশ বছর সুকঠিন খেদমতে অতিবাহিত করিতে হইয়াছে।

তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করিতে চাও, তবে খেদমত করিতে থাক। নাফসের বিরোধিতায় সব সময়ই লিপ্ত থাক। দুনিয়ার মহব্বত ত্যাগ কর। পীরকে ভালবাস। শরীয়ত ও সুন্নত অনুযায়ী চলিতে থাক। তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি যথারীতি আদায় কর। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইলে আল্লাহতায়ালার অনুকম্পা তোমাদের উপর আসিবে। তোমরা কামিয়াবী হইতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন।

আমীন!

সূত্র: শাহসুফি খাজাবাবা ফরিদপুরীর নসিহত: হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এবং হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দী (রঃ), পৃষ্ঠা-১০৭

আরো পড়ুনঃ