ভক্তি-সংসার ও কর্ম
“একমাত্র ভক্তির দ্বারা জাতিভেদ উঠে যেতে পারে। ভক্তের জাতি নাই। ভক্তের থাক আলাদা। তাদের মধ্যে জাতি বিচারের কোন দরকার নাই। ভক্তি হলেই দেহ-মন-আত্মা সব শুদ্ধ হয়। ঈশ্বরের নামে মানুষ পবিত্র হয়। অস্পৃশ্য জাতি ভক্তি থাকলে শুদ্ধ, পবিত্র হয়। ভক্তি থাকলে চন্ডাল, চন্ডাল নয়। ভক্তি হলে চন্ডালেরও অন্ন খাওয়া যায়।” (শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ)
“ভক্ত কুবীর জেতে জোলা
শুদ্ধ ভক্তি মাতোয়ালা
ধরেছে সে-ই ব্রজের কালা
দিয়ে স্বর্বস্ব ধন তাই”
(ফকির লালন সাঁই)
“একবার জগন্নাথে দেখরে যেয়ে
ও জাত কেমনে রাখ বাচিয়ে
চণ্ডালে রাধছে অন্ন
ব্রাম্মণে তা খায় চেয়ে।
জাত না গেলে পাইনে হরি
কি ছার জেতের গৌরভ করি
ছুঁসনে বলিয়ে;
লালন বলে জাত হাতে পেলে
পোড়াতাম আগুন দিয়ে।।”
(ফকির লালন সাঁই)
প্রসঙ্গ: ভক্তির উপায়
ঈশ্বরে কি করে মন হয়?
শ্রী রামকৃষ্ণ-ঈশ্বরের নামগুণগান সর্বদা করতে হয়। আর সৎসঙ্গ – ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু, এঁদের কাছে মাঝে মাঝে যেতে হয়। সংসারের ভিতর ও বিষয়কাজের ভিতর রাতদিন থাকলে ঈশ্বরে মন হয় না। মাঝেমাঝে নির্জনে গিয়ে তাঁর চিন্তা করা বড় দরকার। প্রথম অবস্থায় মাঝে মাঝে নির্জন না হলে ঈশ্বরে মন রাখা বড়ই কঠিন।
“সাধু সঙ্গ করোরে মন
অনর্থক হবে বিবর্তন”
“মায়াতে মত্ত হলে
গুরুর চরণ না চিনিলে
সত্য পথ হারাইলে
খোয়ালে গুরুবস্তু ধন।
মহতের সঙ্গ ধর
কামের ঘরে কপাট মার
লালন বলে সে রুপ দরশনে
পাবিরে পরশ রতন।।”
“যখন চারাগাছ থাকে, তখন তার চারিদিকে বেড়া দিতে হয়। বেড়া না দিলে ছাগল-গরুতে খেয়ে ফেলে।
“ধ্যান করবে মনে, কোণে ও বনে। আর সর্বদা সদসৎ বিচার করবে। ঈশ্বরই সৎ – যা কিনা নিত্যবস্তু, আর সব অসৎ – যা কিনা অনিত্য। এই বিচার করতে করতে অনিত্য বস্তু মন থেকে ত্যাগ করবে।”
প্রসঙ্গ: সংসারে কিরকম করে থাকতে হবে?
“গৃহস্থ সন্ন্যাস – উপায় – নির্জনে সাধন” – শ্রীরামকৃষ্ণ
“সব কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে। স্ত্রী, পুত্র, বাপ, মা – সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা করবে। যেন কত আপনার লোক। কিন্তু মনে জানবে যে, তারা তোমার কেউ নয়।”
“বড় মানুষের বাড়ির দাসী সব কাজ কচ্ছে, কিন্তু দেশে নিজের বাড়ির দিকে মন পড়ে আছে। আবার সে মনিবের ছেলেদের আপনার ছেলের মতো মানুষ করে। বলে ‘আমার রাম’ ‘আমার হরি’, কিন্তু মনে বেশ জানে – এরা আমার কেউ নয়।”
“কচ্ছপ জলে চরে বেড়ায়, কিন্তু তার মন কোথায় পড়ে আছে জানো? – আড়ায় পড়ে আছে। যেখানে তার ডিমগুলি আছে। সংসারের সব কর্ম করবে, কিন্তু ঈশ্বরে মন ফেলে রাখবে।”
“ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে যাও তাহলে আরও জড়িয়ে পড়বে। বিপদ, শোক, তাপ – এ-সবে অধৈর্য হয়ে যাবে। আর যত বিষয়-চিন্তা করবে ততই আসক্তি বাড়বে।”
“তেল হাতে মেখে তবে কাঁঠাল ভাঙতে হয়! তা না হলে হাতে আঠা জড়িয়ে যায়। ঈশ্বরে ভক্তিরূপ তেল লাভ করে তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়।”
“কিন্তু এই ভক্তিলাভ করতে হলে নির্জন হওয়া চাই। মাখন তুলতে গেলে নির্জনে দই পাততে হয়। দইকে নাড়ানাড়ি করলে দই বসে না। তারপর নির্জনে বসে, সব কাজ ফেলে দই মন্থন করতে হয়। তবে মাখন তোলা যায়।”
“আবার দেখ, এই মনে নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা করলে জ্ঞান বৈরাগ্য ভক্তি লাভ হয়। কিন্তু সংসারে ফেলে রাখলে ওই মন নীচ হয়ে যায়। সংসারে কেবল কামিনী-কাঞ্চন চিন্তা।”
“সংসার জল, আর মনটি যেন দুধ। যদি জলে ফেলে রাখ, তাহলে দুধে-জলে মিশে এক হয়ে যায়, খাঁটি দুধ খুঁজে পাওয়া যায় না। দুধকে দই পেতে মাখন তুলে যদি জলে রাখা যায়, তাহলে ভাসে। তাই নির্জনে সাধনা দ্বারা আগে জ্ঞানভক্তিরূপ মাখন লাভ করবে। সেই মাখন সংসার-জলে ফেলে রাখলেও মিশবে না, ভেসে থাকবে।”
“মন রে দিনের ভাব যেই ধারা
শুনলে রে জীবন অমনি হয় সারা
ওসে মরার সঙ্গে মরে ভাবসাগরে
ডুবতে যদি পারে রসিক তারা।
দুধে ননিতে মিলন সর্বদা
মন্থন-দন্ডে করে আলাদা আলাদা
মনরে তেমনি ভাবের ভাবে,
সুখানিধি পাবে
মুখের কথা নয়রে সে ভাব করা।।”
(ফকির লালন সাঁই)






