প্রেমের জন্য নীরবতা

প্রেমের জন্য নীরবতা

প্রেমের জন্য নীরবতা – কেবল একটি পটভূমি নয়, বরং সেই অগাধ সত্তা, যেখানে আত্মার স্বর নিজেকে খুঁজে পায়। নীরবতা শূন্যতা নয়, এটি সেই অসীম গভীরতা, যেখানে শব্দের জন্ম হয়, আবার শব্দ তাতেই লীন হয়ে যায়। এই নীরবতা থেকেই উৎসারিত হয় সৃষ্টি-সংহারের ঊর্ধ্বে অবস্থিত জ্ঞান, যা প্রেমের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রেম ও জ্ঞানের এই গভীর সম্পর্ক নীরবতার অতল গহ্বরে নিহিত, যেখানে মানুষের চেতনা তার শাশ্বত সত্যের মুখোমুখি হয়।

নীরবতা হলো সেই পবিত্র মন্দির, যেখানে প্রেম তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। এই ভাষা শব্দের নয়, বরং অনুভূতির, যা হৃদয়ের গভীরতম স্তরে সঞ্চারিত হয়। যখন মন বাহ্যিক কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে নীরবতার আলিঙ্গনে ডুবে যায়, তখন প্রেম তার স্বচ্ছ, অকৃত্রিম রূপে প্রকাশ পায়। এই প্রেম কোনো সীমাবদ্ধ আবেগ নয়; এটি সেই শক্তি, যা সৃষ্টির সবকিছুকে একটি অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখে। নীরবতার এই গভীরতায় প্রেম কেবল দুই হৃদয়ের মিলন নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সাথে একাত্মতার অনুভূতি।

শব্দের সৃষ্টি ও লয় নীরবতারই খেলা। শব্দ যেন সেই ঢেউ, যা সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসে এবং পুনরায় তাতেই মিশে যায়। প্রেমের শব্দও তেমনি—কখনো কবিতায়, কখনো সঙ্গীতে, কখনো নীরব দৃষ্টির বিনিময়ে প্রকাশ পায়। কিন্তু এই শব্দের উৎস ও গন্তব্য নীরবতা। যখন আমরা প্রেমের কথা বলি, তখন আমরা কেবল তার বাহ্যিক রূপটিকে স্পর্শ করি। প্রকৃত প্রেম তখনই অনুভূত হয়, যখন শব্দ থেমে যায়, এবং নীরবতার মধ্যে দুটি আত্মা একে অপরের সাথে সংনাদিত হয়।

জ্ঞানেরও উৎপত্তি এই নীরবতা থেকে। এটি সেই জ্ঞান, যা বইয়ের পাতায় বা বিজ্ঞানের সূত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সেই চিরন্তন সত্য, যা সৃষ্টি ও সংহারের খেলাকে অতিক্রম করে। নীরবতার মধ্যে মন যখন তার চিন্তার জটিলতা ত্যাগ করে, তখনই এই জ্ঞানের দ্বার উন্মোচিত হয়। এই জ্ঞান প্রেমেরই আরেক রূপ—যেখানে আত্মা বিশ্বের সাথে একাকার হয়ে তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে। প্রাচীন ঋষিরা এই নীরবতাকে ‘মৌন’ বলেছেন, যেখানে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়, এবং প্রেম ও জ্ঞান একই সত্তায় মিলিত হয়।

তাই নীরবতা কেবল প্রেম ও জ্ঞানের উৎস নয়, বরং তাদের পরিপূর্ণতার স্থান। এটি সেই অগাধ সমুদ্র, যেখানে প্রেমের ঢেউ ও জ্ঞানের আলো একত্রিত হয়ে মানুষকে তার শাশ্বত সত্তার দিকে নিয়ে যায়। যখন আমরা নীরবতার গভীরে ডুব দিই, তখন আমরা কেবল প্রেম বা জ্ঞানই পাই না, বরং নিজেকে খুঁজে পাই—সেই নিজেকে, যিনি বিশ্বের সাথে অভিন্ন, অথচ অনন্য। এই নীরবতাই প্রেমের চূড়ান্ত আশ্রয়, জ্ঞানের শাশ্বত উৎস, এবং আত্মার পরম গন্তব্য।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ