সূফি ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারীর আধ্যাত্মিক জীবন ও কর্ম

সূফি ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারীর আধ্যাত্মিক জীবন ও কর্ম

ইশ্কের দীপ্তিতে দীপ্যমান এক অলৌকিক সাধক: মাওলানা সূফি ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী।

(কলামিস্ট ও গবেষক, কায়ছার উদ্দীন আল মালেকী)

সূচনা: প্রেমের পথিক: ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা নিছক নাম নন, বরং আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়ে এক উম্মাহর রূহানী ছায়ায় পরিণত হন। হযরত মাওলানা শাহ্—সূফী ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.) ছিলেন ঠিক তেমনই এক দরবেশ যিনি ইলম, ইখলাস ও ইশ্‌কের সুবাসে যুগের বাতাসকে পরিশুদ্ধ করেছিলেন।

জন্মভূমি ও আত্মার প্রস্তুতি: আল্লাহ যাঁদের বন্ধুত্ব দেন, তাঁদের জন্মও হয় এমন এক ভূমিতে, যেখানকার মাটি, বাতাস, নদী ও বনভূমি নিজেই যেন জিকির করে। হযরতের জন্মস্থান ছিল সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানার অন্তর্গত নওধার গ্রাম। জলমাটির নিঃশব্দ সৌন্দর্যে মোড়া এ গ্রাম ছিল আধ্যাত্মিকতা ও সুফি চেতনার উর্বর ভূমি। এই নিসর্গ ঘেরা পরিবেশে পিতার ছায়ায় বেড়ে উঠতে থাকেন তরুণ ইছমাঈল আলী (রহ.)। পিতা সুফী দায়েম উল্লাহ মুন্সী (রহ.) ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান বুযুর্গ, যাঁর দৃষ্টি কেবল বাইরের জগত নয় অন্তর্জগতেও ছিল দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ।

জ্ঞানের পথ ও মুর্শিদের সন্ধান: আধ্যাত্মিক জগতের অলিগলিতে প্রবেশের প্রথম দরজা হলো ইলম। এ সত্য হৃদয়ে ধারণ করে তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন হুগলী মোহসিনীয়া মাদ্রাসায় ও কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি জ্ঞানের দীপ্তিতে দ্যুতিময় হয়ে ওঠেন। ঠিক তখনই কদরদান এক ওলী, শামসুল ওলামা অধ্যাপক গোলাম সালমানী আব্বাসি (রহ.)—এর নযরে পড়েন। তিনি শুধু তার ওস্তাদই নন পরিণামে হয়ে ওঠেন তাঁর আত্মিক আয়নার ঝিলিক।

সূফি তরীকার স্বর্ণমুকুট: খেলাফত ও সাধনার ধারা: সূফিবাদের চারটি মহাস্রোত চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া, মুজাদ্দেদিয়া এবং মোহাম্মদিয়া তরিকায় তিনি খেলাফত লাভ করেন। কিন্তু খেলাফত ছিল না নিছক কোনো অনুমতি, এ ছিল তাঁর সাধনার ফসল, রিয়াযতের ফলশ্রুতি। একটি পবিত্র দৃষ্টান্ত এই যে, হযরত গোলাম সালমানী আব্বাসী (রহ.) বহু খলিফাকে খেলাফত দান করেন, যার একজন হলেন এই মহান ওলী। এমন আত্মিক মর্যাদা কেবল তাকেই প্রদান করা হয়, যাঁর আত্মা আল্লাহ তা‘আলার সান্নিধ্যে গমন করার যোগ্যতা অর্জন করে।

রাজিবপুর খানকা প্রতিষ্ঠা ও রূহানী বিপ্লব: হযরত গোলাম সালমানী (রহ.)—এর নির্দেশে তিনি কেন্দুয়া উপজেলার রাজিবপুরে গিয়ে স্থাপন করেন তাওহীদ ও রেছালাতের মশাল একখানি খানকা। সেই খানকাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে সেবামূলক কার্যক্রম, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, তাযকিয়া ও সোহবতের প্রাণবন্ত পরিবেশ। “কেন্দুয়া পৌর শহর পীর বাড়ি” নামটি আজো টিকে আছে, যদিও বাস্তব কাঠামোটি আর নেই। কিন্তু নামটি আছে, কারণ হযরত শাহ ইছমাঈল আলী (রহ.)—এর রূহানী প্রভাব এখনো বেঁচে আছে লোকমানসে।

ওলীসুলভ স্বভাব ও আখলাক: আল্লাহর ওলীদের মধ্যে এমন এক কোমলতা থাকে, যা মানুষের অন্তর গলিয়ে দেয়। তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ প্রেমিক, যিনি কখনো কারও প্রতি অহংকার করেননি। নামের ওজন থাকলেও চরণ ছিল মাটিতে। তিনি ছিলেন ফিকাহ, তাফসীর, হেকমত, তাজবিদ, বালাগত ইত্যাদি জ্ঞানের ক্ষেত্রে অভিজাত অথচ বিনম্র।

কাব্য ও করুণা: এক প্রেমভাষ্য: তাঁর রচিত বাণী গুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর কবিতায় ছিল প্রেমিকের কান্না, সাধকের আকুতি ও আহ্বানের দহনে দগ্ধ হৃদয়। যেমন—

“পাইলাম না ওহে নাথ, তোমার মূলামূল
হৃদ মাজারে জ্বলছে দেখি প্রেমের আগুন।”

“খোদা তুই গাফফার গফুর
…মনের গহীনে আনাল হক জহুর।”

এগুলো নিছক কবিতা নয় এগুলো ছিল তাঁর ‘রূহানী তাওয়াজ্জুহ’, যা মুরিদদের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়।

সূফি ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর

খিলাফতের উত্তরসূরী: এক প্রেমজ সন্তান: তিনি গড়ে তুলেছিলেন আরেক মরমী সত্তাকে শাহ্—সূফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.), ছয়আনী দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে গড়ে তোলেন নিজ হাতে, অন্তর দিয়ে। এই সম্পর্ক ছিল শুধুই শিষ্যতা নয়, বরং এক হৃদয়ান্তিক তাল্লুক বিল্লাহ।

চিশতিয়া তরিকার শাজরা (আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা): হযরত মাওলানা শাহ্—সূফী ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.)—তার পীর ছিলেন শামসুল ওলামা হযরত গোলাম সালমানী আব্বাসী। তার পীর ছিলেন সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি বর্ধমানী, এরপর তার পীর শায়খুল হাদিস সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী। এছাড়া তার পীর সৈয়দ আহমদ শহীদ রায়বেরেলভি, পীর শাহ আবদুল আজিজ দেহলভী, এবং পীর শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ছিলেন। এভাবে চিশতিয়া তরিকার ধারায় তিনি হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) হয়ে সরাসরি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সম্পর্ক যুক্ত।

পীরভাইদের পরিচিতি ও ঠিকানা: ইসলামী তাসাউফে পীরভাই বা আধ্যাত্মিক নেতাদের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাসহ সমগ্র উপমহাদেশে অনেক বিশিষ্ট পীর ছিলেন যারা সমাজের আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা শাহ্—সূফী ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারীর সময়কালে জ্ঞাত ও শ্রদ্ধেয় কিছু পীরভাই ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের নাম ও ঠিকানা উল্লেখযোগ্য। এই পীরভাইদের মধ্যে ছিলেন শাহ মাহাতাব উদ্দিন (পুকুরনিয়া, পাবনা), যিনি তাঁর নিরন্তর খিদমত ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা দ্বারা বহু হৃদয় প্রজ্জ্বলিত করেছেন। করমজি, বগুড়ার শাহ সূফি আবদুল মজিদ ও সিলেটের ভদ্রেশ্বরের হাজি আবদুল্লাহ ছিলেন আদর্শবান পীর, যাদের জীবন ও কর্ম বহু শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ভারতের ব্যাণ্ডেল অঞ্চলের সুফি সৈয়দ আবদুল বারী শাহ্ এবং কলকাতার ইন্সপেক্টর জেনারেল আমিনুল ইসলাম, বর্ধমানের হাজি আবদুল লতিফসহ অন্যান্য পীর ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সমাজের নানামুখী উন্নয়নে সক্রিয় ছিলেন।

নবাব সুলতান আলম (আইনজীবি, হাইকোর্ট), শাস্তিপুরের হাজি মোঃ দাউদ, সাতকানিয়ার মাওলানা হায়দার আলি, ত্রিপুরার মাওলানা মুহাব্বত আলি, খুলনার মাওলানা আবদুল হালিম ও ফুলতলার মাওলানা গুলজার হোসেন তাদের নিজ নিজ এলাকায় আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ভূমিকা পালন করেছেন। কলকাতার উচ্চ আদালতের আইনজীবি আবদুল জওয়াদ এবং কলকাতার মাদ্রাসার অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ মাজহার ছিলেন জ্ঞানী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। বগুড়ার সদর কাজি মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব, পাইকড়ের হাজি বরকতুল্লাহ, বগুড়ার বেলাইল এলাকার আলেক মাহমুদ ও হিলিবাজারের দিদার মাহমুদ সরকার স্থানীয় সমাজে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এছাড়া মহেশপুরের আনিসউদ্দিন আহমদ, পাবনার মুআজ্জম আলি, সিলেটের তফাজ্জল আলি, কলকাতার হাফেজ ফতেহ নসীব, নওয়াখালির পূর্ব—ইয়ারপুর এলাকার মাওলানা হাফিজুল্লাহ, ফরিদপুরের মুহাম্মদ নিজামউদ্দিন খাঁ, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মাওলানা আশরাফ আলি, ময়মনসিংহের মুহাম্মদ ইউনুস, কুমিল্লার আবদুল আজিজ, গাইবান্ধার কামদিয়ার মহিউদ্দিন চৌধুরী, বীরভূমের মাওলানা এহসান আলি ও নওয়াখালির এনায়েনপুরের মাওলানা আবদুর রউফ সমাজে সুদৃঢ় প্রভাব বিস্তার করেছেন। ২৪ পরগনার শশীপুরের গোলাম সরওয়ার, যশোরের বাকসাডাঙ্গীর কাজি নসিমউদ্দিন, বগুড়ার হাবিবুর রহমান, কলকাতার ফজলে করিম, জব হাসপাতালে আবদুল গফফর, যশোরের বেরইলের মাওলানা আবদুল অহেদ এবং চারিখাদার ডাঃ আবদুল আজিজসহ অনেকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কাজের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন।

রিণতি: ওলী কখনো মরে না: বাংলা ১৩৫৯ সালে এই আলোকিত আত্মা ফিরে যান তাঁর প্রভুর ডাকে। কিন্তু মাটির নিচে নেমে গিয়েও তিনি রয়ে গেছেন খানকার বাতাসে, মাদ্রাসার চাতালে, মুরিদের চোখের জলে।

মাজার: আত্মিক জাগরণের প্রাণকেন্দ্র এ মহান ওলীর মাজার রাজিবপুর, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা।

উপসংহার: সূফিবাদের পবিত্র প্রতিচ্ছবি: হযরত ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.) ছিলেন আল্লাহর এমন এক প্রেমিক, যাঁর হৃদয়ে কেবল আল্লাহর নাম ছিল। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, যে জীবন ফকিরির, সেই জীবনেই লুকিয়ে থাকে রাজসিক সৌন্দর্য। তিনি বেঁচে আছেন প্রেমিকের স্মৃতিতে, সোহবতের আলোয়, আর সে সব বাণীতে, যেখানে আজো রূহে এলাহী দুলে ওঠে।

যার জীবন নিজেই এক কাব্যিক সাধনা, তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিবেদন করছি নিম্নের পঙক্তিমালা:-

“জলভেজা পদ্মের মত তুমি, ওলি”

জলভেজা পদ্মের মত তুমি, ওলি—
পুণ্য নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছো,
পেছনে রয়ে গেছে হাজার কেল্লা, মিনার,
আর তুমি হাতে শুধু ঝর্ণার শাদা তোয়ালে।
তোমার চোখে আসমান ঝুঁকে পড়ে,
রাত্রির তারা নেমে আসে সিজদার ভেতর।

তুমি জাহাঙ্গীর— কিন্তু বাদশাহ নও,
তোমার সালতানাত হল আত্মা, দীন, আর ধ্যানে জেগে থাকা,
যেখানে নেই যুদ্ধ, নেই হিংসা—
শুধু ফুরফুরার গোলাম সালমানির ঘ্রাণে
ভেসে আসে ওয়াইসি দাদাপীর দিওয়ানের গন্ধ।

সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসির ছায়ায় তুমি—
তোমার কলম থেকে ঝরে পড়ে নূরের চরণ,
কাগজে লেখো না, লেখো মানুষের অন্তরে—
সেখানে আয়াত, সেখানে সিমা,
সেখানে আল্লাহর নামের প্রতিধ্বনি বাজে।

কেন্দুয়ার আকাশে আজো তুমি আলো,
তোমার জিকিরে কেঁপে ওঠে নিসর্গের পাতাগুলো,
বাতাসের ঢেউয়ে উচ্চারিত হয়
“হু আল হক হু আল হক”

আরো পড়ুনঃ