আত্মজ্ঞান কী?

আত্মজ্ঞান কী?

তুমি কি মনে করো এটি কোনো গ্রন্থের পাতায় লুকানো জ্ঞান, কোনো ঋষির উপদেশে বন্দি সত্য, নাকি কোনো দূরের তীর্থে পাওয়া মুক্তি? না, আত্মজ্ঞান এসবের বাইরে। এটি তোমার ভেতরের এক অনন্ত যাত্রা, যেখানে তুমি নিজেকে খুঁজে পাও—নিজের সত্য, নিজের আলো, নিজের অস্তিত্ব। আত্মজ্ঞানের পথ কোনো বাহ্যিক গন্তব্যে নিয়ে যায় না; এটি তোমাকে ফিরিয়ে আনে তোমারই কাছে, তোমার হৃদয়ের গভীরতায়। এই পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো থামা।

তুমি ছুটছো—অতীতের গল্পের পেছনে, শাস্ত্রের শব্দে, অন্যের বিশ্বাসের ছায়ায়। কিন্তু থামো। একটি গভীর শ্বাস নাও। তোমার হৃদয়ের স্পন্দনে কান পাতো। এই নীরবতায় তুমি শুনতে পাবে তোমার আত্মার ফিসফিস। সে বলছে, “তুমি যা খুঁজছো, তা আমারই মধ্যে। আমাকে জানো।”আত্মজ্ঞানের পথে তুমি যে প্রশ্নগুলো নিয়ে ছুটছো—জীবনের অর্থ কী, সত্য কোথায়, মুক্তি কীভাবে পাবে—সেগুলোর উত্তর বাইরে নেই। তুমি যখন শাস্ত্রের পাতা উল্টাও, নবীদের কথা শোনো, ঋষিদের দর্শন গ্রহণ করো, তখন তুমি অন্যের সত্যে হারিয়ে যাও। কিন্তু তোমার সত্য কোথায়?

সেটি তোমার শ্বাসে, তোমার হৃদয়ের ধক ধকে, তোমার জীবনের প্রতি ক্ষণে। আত্মজ্ঞান হলো সেই সত্যকে স্পর্শ করা, যা তুমি নিজেই। এই পথ কঠিন, কারণ এটি তোমাকে তোমার ছায়ার মুখোমুখি করে। তোমার ভয়, তোমার দুঃখ, তোমার অহংকার—সব তোমার সামনে দাঁড়ায়। তুমি ভাবো, এগুলো তোমাকে আটকে রাখে। কিন্তু জানো, এই ছায়াগুলোই তোমার পথের সঙ্গী। এদের আলিঙ্গন করো। এদের জানো। কারণ, আত্মজ্ঞানের পথে তুমি যখন নিজের অন্ধকারকে জয় করো, তখনই তোমার ভেতরের আলো জ্বলে ওঠে। তুমি কেন ভাবো, সত্য বাইরে?

তুমি কেন শোনা কথাকে বিশ্বাস করো, আর চোখের সামনে প্রবাহিত জীবনকে উপেক্ষা করো? শাস্ত্রের শব্দ কি তোমার হৃদয়ের সত্যের চেয়ে বড়? হাজার বার ‘প্রেম’ লিখলেও কি হৃদয় উষ্ণ হয়? লক্ষ বার ‘আলো’ লিখলেও কি অন্ধকার দূর হয়? সত্য কাগজে নয়, শব্দে নয়—সত্য তোমার নিঃশ্বাসে, তোমার অনুভূতিতে, তোমার বর্তমানে। আত্মজ্ঞানের পথে তুমি শিখবে, তুমি একা নও। তুমি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি অংশ—একটি স্ফুলিঙ্গ, যা অনন্তের আগুনে জ্বলে। যখন তুমি একটি ফুলের সৌন্দর্যে হারাও, যখন বাতাসের স্পর্শে তোমার মন শিহরিত হয়, যখন একটি শিশুর হাসিতে তোমার হৃদয় নেচে ওঠে—তখন তুমি আত্মজ্ঞানের কাছে দাঁড়াও। এই মুহূর্তগুলোই তোমার তীর্থ, এই অনুভূতিগুলোই তোমার শাস্ত্র।

তুমি যে বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে আছো, সেটি কি তোমার? নাকি অন্যের দেওয়া? তুমি যে সত্যের কথা বলো, সেটি কি তোমার হৃদয়ে জন্মেছে, নাকি শোনা কথার প্রতিধ্বনি? আত্মজ্ঞানের পথে তুমি এই বিশ্বাসের আবরণ খুলে ফেলবে। তুমি দেখবে, তোমার বিশ্বাস কেবল তোমার ভয়ের প্রতিচ্ছায়া। সেই ভয়কে জয় করো, তবেই তুমি নিজেকে জানবে। জীবন এক অসমাপ্ত গান। এর প্রথম সুর হারিয়ে গেছে, শেষ সুর এখনো বাজেনি। তুমি মাঝের কয়েকটি সুর নিয়ে ব্যস্ত, ভেবে নিয়েছো এটিই সম্পূর্ণ। কিন্তু আত্মজ্ঞান তোমাকে শেখায়, এই অসম্পূর্ণতাই পূর্ণতা। তুমি যে গোছানোর স্বপ্ন দেখো, তা কখনো শেষ হবে না। যম আসে, আর তখনই সব গোছানো সম্পূর্ণ হয়—এক নিমেষে।

তোমার শ্বাসই তোমার ধর্ম, তোমার হৃদয়ই তোমার মন্দির। তুমি যদি সত্য জানতে চাও, তবে নিজের গভীরে ডুব দাও। তোমার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করো, তোমার কামনার মুখোমুখি হও। দেখবে, তোমার বিশ্বাস কেবল তোমার ইচ্ছার ছায়া। সেই ছায়া সরিয়ে ফেলো, তবেই তুমি আত্মার আলো দেখবে।তুমি শূন্য হাতে এসেছো, শূন্য হাতেই যাবে। তবে কেন ভয়? তুমি যা খুঁজছো, তা তোমারই ভেতরে। তোমার প্রতিটি শ্বাস একটি প্রার্থনা, প্রতিটি পদক্ষেপ একটি তীর্থযাত্রা। আত্মজ্ঞানের পথে তুমি নিজেকে পাবে—না শাস্ত্রে, না অন্যের কথায়, শুধু তোমার নিজের হৃদয়ে। জাগো, প্রিয় নিজের গভীরে ডুব দাও। তোমার সমুদ্রে সাঁতার কাটো। সেখানেই তুমি পাবে তোমার সত্য, তোমার শান্তি, তোমার অনন্ত।

– ফরহাদ ইবনে রেহা

আরো পড়ুনঃ