মানুষের প্রাচীন রোগ (নিজের পথে-নীরবতার যাত্রা: পর্ব-৭)
সপ্তম অধ্যায়: কর্তৃত্ব — মানুষের প্রাচীন রোগ।
মানুষের ইতিহাস মূলত কর্তৃত্বের ইতিহাস।
একজন আরেকজনের উপর শাসন করেছে,
একটি গোষ্ঠী আরেকটি গোষ্ঠীকে দমন করেছে,
একটি বিশ্বাস আরেকটি বিশ্বাসকে নিঃশেষ করতে চেয়েছে।
এই ধারাবাহিকতার নামই সভ্যতা।
কর্তৃত্বের জন্ম ভয় থেকে।
যে নিজেকে দুর্বল ভাবে, সে অন্যকে দমন করতে চায়।
যে নিজের ভিতরে শূন্যতা অনুভব করে,
সে বাইরের জগতে ক্ষমতা খোঁজে।
ক্ষমতা তাই এক গভীর মানসিক ব্যাধি।
রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দৃশ্যমান।
অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব কঠোর।
কিন্তু আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ সেখানে দাসত্বকে বলা হয় মুক্তি।
সেখানে আনুগত্যকে বলা হয় ভক্তি।
সেখানে আত্মসমর্পণকে বলা হয় সাধনা।
একজন মানুষ যদি বলে—
“আমি তোমাকে মুক্তির পথ দেখাব”,
তবে বুঝতে হবে, সে তোমাকে নিজের পথের দাস বানাতে চায়।
কারণ সত্যের কোনো পথ নেই।
সত্য নিজেই পথ।
যেখানে পথ আছে, সেখানে গন্তব্য নেই।
যেখানে গুরু আছে, সেখানে সত্য নেই।
কারণ গুরু মানেই মধ্যস্থতা,
আর সত্য কোনো মধ্যস্থতাকে সহ্য করে না।
মানুষ মানুষকে পূজা করতে শিখেছে।
এই পূজাই মানবজাতির সবচেয়ে গভীর অবমাননা।
যখন তুমি কাউকে পূজা করো,
তখন তুমি নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে অস্বীকার করো।
আর যে পূজা গ্রহণ করে,
সে নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকতে চায়।
এই দু’জনই পরাজিত।
কর্তৃত্ববাদী কখনো প্রেমিক হতে পারে না।
কারণ প্রেমে সমতা,
আর কর্তৃত্বে শ্রেষ্ঠত্ব।
যেখানে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি,
সেখানে সম্পর্ক নেই—
শুধু শাসন।
আমি একদিন দেখলাম—
মানুষ মুক্তির নামে কত সহজে দাসত্ব মেনে নেয়।
সে প্রশ্ন করে না,
সে যাচাই করে না,
সে কেবল অনুসরণ করে।
কারণ অনুসরণ নিরাপদ।
নিজে ভাবা বিপজ্জনক।
কর্তৃত্ব ভাঙা মানে বিদ্রোহ নয়।
কর্তৃত্ব ভাঙা মানে জাগরণ।
বিদ্রোহ প্রতিক্রিয়া।
জাগরণ উপলব্ধি।
যে জেগে ওঠে,
সে কারো বিরোধিতা করে না,
সে কেবল আর অনুসরণ করে না।
তার স্বাধীনতাই তার বিপ্লব।
চলবে….
লেখক: ফরহাদ ইবনে রেহান
বই: নিজের পথে – নীরবতার যাত্রা
সপ্তম অধ্যায়: কর্তৃত্ব — মানুষের প্রাচীন রোগ।



