সুফিতত্ত্বের তাৎপর্য

সুফিতত্ত্বের তাৎপর্য

সুফিতত্ত্ব হলো ‘এক’-এর সন্ধান, যেখানে সব দ্বৈততা মিলে যায়। সুফির দৃষ্টিতে সত্য এক, বিধাতা এক, এবং সকল ধর্মের মূল সুর একই। আল্লাহ, ঈশ্বর, ব্রহ্ম, গড—এগুলো কেবল নামের বৈচিত্র্য, কিন্তু সত্তা এক। এই একত্বের উপলব্ধি থেকেই সুফি দর্শনের উৎস। সকল ধর্ম, শাস্ত্র, অবতার, বা সাধকের পথ ভিন্ন হলেও, তাদের গন্তব্য একই—সেই পরম সত্যের সান্নিধ্য।

সুফির কাছে বিধাতা আকার ও নিরাকারের সমন্বয়। তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তবু অধরা। মানুষের অহংবোধই তাকে বিধাতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ‘আমি’ ও ‘অন্য’—এই দ্বৈতবোধের জন্ম হয় অজ্ঞতা থেকে। যখন মানুষ বলে, ‘এটি আমার’, তখন সে ‘এটি আমি নই’ বলে জগৎকে নিজ থেকে পৃথক করে। এই অহংবোধ দূর করাই সুফিতত্ত্বের মূল লক্ষ্য। নিজেকে জানার মাধ্যমে, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে, সুফি সেই ‘এক’-এর সঙ্গে একাত্মতা লাভ করেন।

সুফিতত্ত্ব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় না। সক্রেটিসের “নিজেকে জানো”, উপনিষদের “আত্মানং বিদ্ধি”, বা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর “যে নিজেকে জানে, সে তার প্রভুকে জানে”—এই সব শিক্ষার মধ্যে সুফি কোনো পার্থক্য দেখেন না। সকল শিক্ষার মূলে রয়েছে একই সত্য—নিজেকে জানার মাধ্যমে পরম সত্যের সন্ধান।

ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি সুফিতত্ত্বের পরিপন্থী। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, বা প্যাগোডা—এগুলো ধর্ম নয়, কেবল মানুষের তৈরি কাঠামো। প্রকৃত ধর্ম মানুষের হৃদয়ে, তার স্বভাবে। যারা ধর্মকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তারাই বিভেদের জন্ম দেয়। তারা বলে, “আমাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ, আমাদের অবতারই একমাত্র”। কিন্তু সুফি জানেন, সত্যের কোনো ধর্ম নেই। যেমন গণিত হিন্দু বা মুসলিম হয় না, তেমনি সত্যও কোনো ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

আনুষ্ঠানিকতা ধর্মের পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু তা ধর্ম নয়। পূজা, নামাজ, উপাসনা—এগুলো মানুষকে ধর্মের কাছে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এগুলোই ধর্মের পূর্ণতা নয়। ধর্ম হলো মানুষের মধ্যে ঐক্য, প্রেম, ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠার পথ। যে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, তা ধর্ম হতে পারে না। সুফিতত্ত্ব এই ঐক্যের শিক্ষা দেয়, বিভেদের নয়।

সুফিতত্ত্বের দুটি ধারা—একটি বাহ্যিক, যা ধর্মকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, এবং অন্যটি মরমী, যা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে। মরমী সুফি জানেন, সকল ধর্মের মূলে একই সত্য। সাধু, সন্ত, যোগী, বাউল, বা সুফি—নাম যাই হোক, তাদের লক্ষ্য এক: পরমের সঙ্গে একাত্মতা।

বিধাতার অস্তিত্ব যুক্তি দিয়ে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায় না। তিনি উপলব্ধির বিষয়। শাস্ত্র পড়ে, শুনে, বা আনুষ্ঠানিকতা পালন করে তাঁকে জানা যায় না। নিজেকে জানতে হলে নিজেকে পড়তে হয়। এই পড়া এক কঠিন সাধনা। কারণ, জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এখানে এক। নিজেকে জানতে গেলে একা হতে হয়, নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু মানুষ একা থাকতে ভয় পায়। সে সর্বদা সঙ্গী খোঁজে, বাহ্যিক জগতের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। ফলে, সে দূরের গ্রহ সম্পর্কে জানে, কিন্তু নিজেকে জানে না। এই অজ্ঞতাই তার ভুলের মূল।

নিজেকে জানার প্রচেষ্টা অজ্ঞতা দূর করে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ তার আত্মপ্রবঞ্চনা চিনতে পারে, আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। আত্মশুদ্ধির এক পর্যায়ে আসে আত্মোপলব্ধি। সুফির কাছে তার নিজের দেহই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এই গ্রন্থই তার প্রতিদিনের পাঠ্য। বাহ্যিক শাস্ত্রের উপর নির্ভর না করে, সুফি নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করেন। যা তিনি নিজের জীবনে পরীক্ষা করে সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাই তিনি গ্রহণ করেন।

শাস্ত্রকে অন্ধভাবে প্রমাণ মেনে নিলে চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে মানুষের কর্মও স্বাধীন হয় না। সুফিতত্ত্ব এই স্বাধীনতার পথ দেখায়। এটি ধর্মকে মুক্ত চিন্তার সঙ্গে সমন্বয় করে। সুফি কোনো মতবাদের দাসত্ব স্বীকার করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, অনুসন্ধান করেন, এবং সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যান।

সুফি জানেন, বিধাতা বাইরে নন, তিনি ভিতরে। তাঁকে জানতে হলে নিজেকে জানতে হবে। “আমি কে?”—এই প্রশ্নই সুফির সাধনার মূল। দেহ, চিন্তা, বা সম্পত্তি—এগুলো কিছুই ‘আমি’ নয়। এই ‘আমি’-র খোঁজে সুফি তার ‘আমার’ বোধ ত্যাগ করেন। যখন ‘আমার’ বোধ লুপ্ত হয়, তখন ‘আমি’ প্রকাশিত হয়। এই উপলব্ধিতে সুফি জানেন, তিনি ও জগৎ এক। তখন তিনি সবকিছুতে নিজেকে দেখেন—ভালোয়, মন্দে, সুখে, দুঃখে। তিনি তখন অদ্বিতীয়, কারো প্রত্যাশী নন, কারো অধীন নন।

সুফিতত্ত্ব প্রেমের পথ। এই প্রেম বস্তুকেন্দ্রিক নয়, স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। এটি একটি অবস্থা—প্রেমময় হওয়ার অবস্থা। সুফি বিধাতার প্রেমে মগ্ন, তাঁর রঙে নিজেকে রাঙাতে চান। এই প্রেম তাকে বিভেদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। সে কাউকে ঘৃণা করে না, কারণ তার কাছে সবকিছুই সেই ‘এক’-এর প্রকাশ।

সত্য এখানে, এখন। তাকে খুঁজতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যেমন কাঠের মধ্যে আগুন লুকিয়ে থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যে সত্য লুকিয়ে আছে। ঘর্ষণের মাধ্যমে, সাধনার মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করতে হয়। সুফি সাধক জুনায়েদ বাগদাদি বলতেন, “দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করাই সুফি হওয়ার পথ।” সুফি এই পথে হাঁটেন। তিনি জগতের মায়া ত্যাগ করে, নিজের হৃদয়ের ডাকে সাড়া দেন। তাঁর কাছে জীবনের রহস্য উন্মোচিত, যা সাধারণের কাছে আবৃত থাকে।

সত্যের তৃষ্ণা সুফির জীবনের প্রেরণা। এই তৃষ্ণা যাকে পেয়ে বসে, তার কাছে জগতের সমস্ত সম্পদ তুচ্ছ। ইব্রাহিম আদহাম, সিদ্ধার্থ গৌতম, বা মনসুর আল-হাল্লাজ—তাঁরা এই তৃষ্ণার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। তাঁরা জীবন ত্যাগ করেছেন, কিন্তু সত্য ত্যাগ করেননি।

সুফির কাছে প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্পন্দন সত্যের সাক্ষী। তিনি প্রতি মুহূর্তে বিধাতার উপস্থিতি অনুভব করেন। তাই তাঁর কাছে তিনি সাকার, নিরাকার, সর্বব্যাপী। সুফির সাধনা হলো এই উপলব্ধির পথ—যেখানে ‘আমি’ ও ‘তুমি’ মিলে এক হয়ে যায়। এই একত্বই সুফিতত্ত্বের মর্ম।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ