এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে (লালনের কালামের ব্যাক্ষা)

এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে (লালনের কালামের ব্যাক্ষা)

“এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান
জাতি গোত্র ভেদ নাহি রবে”
– সাঁইজি ফকির লালন

সাঁইজির এই যে উক্তি উনি করে গেছেন তা থেকে মনে হয় এরকম একটা দিন বা সময় অবশ্যই সামনে আসবে। আজ আমি সেই আলোর দিন, সত্যের দিনের কথার কিছু আলোচনা করবো এই বাসনা নিয়ে লিখছি। জাতি গোত্র ভেদ তাদের কাছে নাই যাহারা জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান সম্পন্ন ব্যাক্তি বা সম্প্রদয় তো সেই দিন আসবে যেদিন অধিকাংশ মানুষ সৃষ্টিকর্তার অসিম কৃপায় জ্ঞান সম্পন্ন হয়ে দিব্যজিবন লাভ করবে। তাহলে আসা যাক মুল কথায়, এই আলোর সত্য দিনের বা দিব্য জীবনের সন্ধানে যেতে গেলে আগে আমাদের সৃষ্টির গোড়ায়, সৃষ্টির ধাপে ও পক্রিয়ার-তার জটিলতা, দু:খ, কষ্টে যেতে হবে।

তবে আমরা যাই দু:খ কষ্টের মুলে। সৃষ্টির সৃজন প্রক্রিয়ার শুরুতে- মহাজ্ঞানী অবতার পুরুষগন বলে গেছেন-সৃষ্টির কলা কৌশল নিপুন এক নাট্যমঞ্চ এর প্রথম ধাপে সব ছিল জড়পিন্ডবত অবস্থা। এভাবে চললো কিছুকাল তখন শুরুতে কোন গন্ডোগোল, বিশ্রিংখলা বা দু:খ নাই।

২য় ধাপে বা ষ্টেজে মহাশক্তি স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন উদ্ভিদকুল তাতে প্রানের সঞ্চার হলো তখনো কোন গন্ডোগোল, বিশ্রিংখলা বা দঃখ নাই।

৩য় ধাপে স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন কিছু প্রানীজকুল- (স্থল, জলজ, খেচর, উভচর) এই তখন থেকে শুরু হলো দুঃখে পালা। শুরু হল গন্ডোগোল দলে দলে আক্রমণ একে অপরকে মেরে হত্যা করে আহার করে জীবন ধারন করা শুরু করলো। শুরু হল হিংসা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও হত্যা করে আহার সংগ্রহ করা।

তারপর ৪র্থ ধাপে স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন মানবকুল এবার জমে উঠলো নাট্যমঞ্চ প্রত্যেকের চরিত্র আলাদা আলাদা হয়ে উঠলো, জীব বৈচিত্র্য ফুটানোর জন্য স্রষ্টা কাউকে বানালো সাধু, কাউকে ভন্ড অসাধু, কাউকে কঠিন নিঠুর, কাউকে কমল হৃদয়, কেউ সোজা কেউ বাকা এভাবে স্রষ্টা সৃষ্টি করে একটা নিদৃষ্ট পরমআয়ু দিয়ে অবাদে ছেড়ে দিলেন জগতে আর হুকুম হল যার যা চরিত্র সেই অনুযায়ী অভিনয় কলা দেখাতে আর বলা হল যার যার নিজ স্বরুপ ব্যাক্ত কর। তখনই বেধে গেল একে অপরের সাথে সংঘাত ঘরতরো দ্বন্দ্ব। যেখানেই চরিত্র আর স্বার্থের সংঘাত সেখানেই দুঃখের সৃষ্টি। ক্রমেই গত্রে, বর্ণে, জাতিতে সংঘাত যত বেড়ে চলেছে দুঃখ তত বেশী করে বেড়েছে, আর এটি অপরিহার্য কারন এটি যে নাটকের অংশ এই জটিলতা গন্ডোগোল দুঃখ না থাকলে নাটকের কোন প্রানই থাকে না। এই ৪র্থ ধাপেই যত দুঃখ কষ্টের ছড়াছড়ি আর বর্তমান দুনিয়া চলছে এই ৪র্থ ধাপ বা অধ্যায়।

এই ধাপেই ভয়াবহ দুঃখ কষ্টের সময় চলছে ঘোরতর সংঘাতের ভিতর দিয়েই আমাদের এই জটিল ভব পাড়ি দিতে হবে। নাটকের এই পর্য্যন্ত আনতে গিয়ে অনেক প্রজাতিকে বিলিন করতে হয়েছে অনেক বিবর্তন, পরিবর্তন, পরবর্ধন্ প্রলয় করতে হয়েছে। এরপর আসবে এক নতুন ধাপ বা অধ্যায় রাতের পর যেমন দিন উদয় হয় তেমনি দুঃখের পর সুখ। যুগে যুগে মহাপুরূষগন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দুঃখকে অত্যাচারকে বরন করে নিয়েছেন তাদের প্রস্তরের আঘতে রক্ত ঝরেছে, তাদের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে মুন্ডু কর্তন করা হয়েছে, শুলে চড়ানো হয়েছে আগুনে পুড়ানো হয়েছে অনেক অপমান লাঞ্চনা করা হয়েছে সব দুঃখ কষ্ট তারা হাসি মুখে বরন করে নিয়েছে কারন আগামি প্রজন্মের সুখের জন্য, সত্য সুন্দর স্বর্ণ দিনের জন্য।এত কিছুর পরও তারা সত্য প্রচার করে গেছেন প্রান বির্সযন দিয়েছেন হাসিমুখে বিনিময়ে তারা সৃষ্টির মঙ্গল কামনা করে গেছেন।

সাঁইজি ফকির লালন বললেন- “তারে জলেতে ডুবালো অগ্নিতে পোড়াল তবু না ছাড়িল সে শ্রীরুপ সাধনা” যত কষ্ট আসুক যত বিপদই আসুক সত্য প্রচার আর সাধনা এই রুপ করে যেতে হবে। দু:খ ছাড়া সুখের পরিনতি হয় না উন্মষ ঘটেনা। “দু:খ বিনা সুখ নাই সংসারে” বর্তমান বিশ্বে ক্রমেই সংঘাত আর দু:খের বোঝা বেড়েই চলেছে। কতশত বছর পার হয়ে গেল মহাপুরুষরা দু:খ বরন করে আমাদের মুক্তির পথ করে গেছেন হাজার হাজার বছর হয়ে গেল তারপরও কেন শেষ হচ্ছে না এই সংঘাত আর দু:খের দিন? কারন এই নাটকটা স্রষ্ঠা খুবই মন্থর গতিতে করাচ্ছেন। তবে আশার আলো এতটুকু যে বেশীদিন বাকী নাই, সেই আলোর দিন, সোনালী দিনের সেই লালন সাঁইজির বাক্যর যে দিন হিন্দু মুসলিম জাতি গোত্র ভেদাভেদ নাহি রবে। বর্তমান বিশ্বে মানুষের ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুর হানাহানি সংঘাত ও এত দু:খের দিন আগে দেখা যায়নি এ যেন চরম ও চুড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌছেছে।

অনাচার অবিচার, হানাহানি এটা কিন্তু প্রত্যাশিত, স্বাভাবিক। প্রদিপের তেল শেষ হয়ে গেলে প্রদিব নিভে যাওয়ার আগে অনেক বেশী করে আলো দিয়ে নিভে যায়। রাত শেষ হয়ে এলে ভোরের আলো ফোটার আগে অন্ধকার বেশী ঘনিভুত গাড় হয়।ঠিক যেন সে রকম একটা ব্যাপার এতে বুঝা যায় দু:খের দিন ফুরিয়ে এলো, আসছে নতুন প্রেমের স্বর্গিয় আলোর দিন, মিলনের দিন, আনন্দের দিন, দিব্য জিবন লাভের দিন। এই অংশে স্রষ্ঠা বিরহ বিয়োগ দেবে না। দিবে মিলনের অপার আনান্দ।এই শেষ ধাপে তিনি সমস্ত বিরধের মধ্যে একটা সুন্দর সামন্জ্ঞস্যতা সৃষ্টি করবেন প্রয়োজনে প্রলয় কান্ড ঘটাবেন। এই ধাপটা বা অধ্যয়টা এখনো বাকী রয়েছে। এই অংশটুকু হবে আমাদের জ্ঞানের জিবন আলোর জিবন দিব্যজিবনের পালা। সেদিন স্রষ্টার অপার কৃপায় পূর্ণচেতনা জ্ঞানের অন্ধকার কেটে যাবে তখন থাকবে না কোন বৈশম্য হামাহানি।

কারবার হবে সত্যের সাথে সত্যের। তখন হবে দিব্যজ্ঞানের উচ্চতর অতি মানস চেতনা। সেই উচ্চতর চেতনার রাজ্য এইতো সামনে – স্রষ্ঠা তার ৫ম ধাপে সেটা দেখাবেন এবং তিনি প্রস্তুত ও বটে ৫ম অধ্যায় শুরু করার জন্যে। এর আগের ধাপগুলো স্রষ্ঠা দেখিয়েছেন তাদের নিয়ে যারা বিবেক ও মনবিহীন পুতুল এর মত পুতুল খেলা। এবার মন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চরিত্র নিয়ে হচ্ছে একটু গন্ডোগোল। নাট্যকর চাচ্ছে একরকম কিন্তু অভিনেতারা তার উল্টা রোল প্লে করছে আর তার জন্যই দেরী হয়ে যাচ্ছে ৫ম ধাপের বা অধ্যায়ের শুরুটা।

তাই আমাদের উচিত এই ধাপের আমাদের সক্রিয় সহযোগিতা করে দিব্যজীবন অভিব্যক্ত হবার প্রয়াস করতে হবে যাতে আমাদের চেতনার প্রস্ফুটন হয়। আর এতেই আমাদের দুঃখ ঘুচে যেয়ে জিবনে আসবে অপার এক দিব্য আনন্দের পালা আর এর জন্য আমাদের করতে হবে কিছু গুরুমুখি কর্ম ।আর অভ্যন্তরিন সত্তা অন্তরআত্মাটির জাগরন তার জন্য সর্ব প্রথম দরকার স্রষ্টার প্রতি অটুট বিশ্বাস।

– Ripan Shikdar
আরো পড়ুনঃ